07/09/2026
আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পেনশন স্কিমের নাম সম্ভবত ছেলে-মেয়ে।
ধরেন কেউ চল্লিশ বছর চাকরি করছেন, ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকা নাই। পেনশন নাই। ভালো কোনো হেলথ ইন্সুইরেন্স নাই।
কিন্তু নিজের এক একটা ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়াতে ৪০ লাখ টাকা করে খরচ করেছেন।
কারণ হিসাবটা খুব সহজ। ছেলে দাঁড়িয়ে গেলে আমরাও দাঁড়িয়ে যাব।
তারপর ছেলের চাকরি হলো। বেতন ৫০ হাজার। বাবা-মা খুশি। ছেলে প্রতিষ্ঠিত।
এবার ৫০ হাজার টাকার আসল মালিক কয়জন একটু হিসাব করেন।
ছেলের নিজের বাসাভাড়া আছে। বাজার আছে। বাবা-মায়ের ওষুধ আছে। ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা আছে। গ্রামের বাড়িতে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। সামনে নিজের বিয়ে। তারপর নিজের বাচ্চা।
একটা ৫০ হাজার টাকার বেতনের উপর পাঁচজন মানুষের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ ঝুলছে।
এইটা পরিবার না, একটা বেতনের উপর দাঁড়ানো ছোটখাটো অর্থনীতি।
আর ছেলেটা হলো সেই অর্থনীতির বাংলাদেশ ব্যাংক। টাকা শেষ হলেও টাকা ছাপানোর ক্ষমতা নাই। 😄
বাবা-মাকে আমি একটুও দোষ দিই না।
অনেক বাবা নিজের জন্য ভালো জামা কেনেননি, জমি বিক্রি করেছেন, ধার করেছেন, শুধু ছেলে-মেয়েকে পড়িয়েছেন।
সমস্যাটা বরং এখানেই।
একজন মানুষ সারাজীবন কাজ করেও নিজের বৃদ্ধ বয়সটা চালানোর মতো ব্যবস্থা করতে পারেননি।
তাই শেষ বয়সের নিরাপত্তাটাও সন্তানের ঘাড়ে রাখতে হয়েছে।
এটা অনেকটা একটা বাড়ির ছাদ বানিয়ে কোনো পিলার না দেওয়া। তারপর বড় ছেলেটাকে মাঝখানে দাঁড় করিয়ে বলা, বাবা, ছাদটা একটু ধরে রাখিস।
ছেলেটাও ধরে রাখে।
সমস্যা হয় যখন তার নিজেরও একটা ছাদ বানানোর সময় আসে।
এখন একই বেতন দিয়ে তাকে দুই প্রজন্মের খরচ চালাতে হবে।
বাবা-মায়ের retirement।
নিজের সংসারের present।
নিজের সন্তানের future।
আর মজার ব্যাপার হলো, এই সাইকেল এখানেই শেষ হয় না।
এই ছেলেটা নিজের retirement-এর জন্য টাকা জমাতে পারে না, কারণ সে বাবা-মায়ের retirement চালাচ্ছে আর নিজের সন্তানকে মানুষ করছে।
একদিন তারও বয়স ৬০ হয়।
তারপর সে নিজের ছেলের দিকে তাকায়।
পেনশন স্কিমের নতুন কিস্তি শুরু।
আমাদের সমাজে সন্তান তাই শুধু সন্তান না।
কখনো retirement fund, কখনো health insurance, কখনো emergency fund।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার, এই fund-এরও নিজের জীবন আছে, নিজের সংসার আছে, নিজের স্বপ্ন আছে।
বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়া অবশ্যই দায়িত্ব, ভালোবাসাও।
কিন্তু একটা দেশের বৃদ্ধ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা যদি হয় তার সন্তান ভালো একটা চাকরি পাবে, তাহলে আমরা পরিবারকে শক্তিশালী করিনি।
আমাদের রাষ্ট্রের social security কই?
আমরা অবাক হই মধ্যবিত্ত মানুষটা ৪০ বছর বয়সেও সম্পদ বানাতে পারল না কেন।
পারবে কীভাবে?
যে গাছের ফল প্রতি মৌসুমেই পুরোটা পেড়ে খেতে হয়, সেই গাছের বীজ জমবে কখন?
আমাদের মধ্যবিত্তের বড় সমস্যা শুধু আয় কম না।
এক প্রজন্মের আয় দিয়ে প্রায়ই তিন প্রজন্মকে বাঁচতে হয়।
এই সমস্যার জন্য দায়ী কে?
কেউ দায়ী না। আবার সবাই দায়ী।
বাবা দায়ী না। তিনি সারাজীবন সংসার চালিয়ে নিজের বৃদ্ধ বয়সের জন্য যথেষ্ট জমাতে পারেননি।
ছেলেও দায়ী না। সে বাবা-মাকে ফেলে নিজের সম্পদ বানাতে পারে না।
দায়ী এমন একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যেখানে মানুষের বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তা মানুষ চাকরি করার সময় তৈরি হয় না, সারাজীবন ট্যাক্স পে করার সময় তৈরী হয় না, তৈরী হয় তার সন্তান চাকরি পাওয়ার পর।
তাই আমাদের এখানে একটা প্রজন্ম আসলে নিজের জীবনটা শুধু সামনে নিয়ে যায় না, পেছনের প্রজন্মকেও টানে, সামনের প্রজন্মকেও ঠেলে।
মাঝখানের মানুষটা তাই যত দ্রুতই দৌড়াক, খুব বেশি দূর যেতে পারে না।
তার সমস্যা পায়ে না। তার পিঠে দুইটা প্রজন্মের বোঝা।
-আমিরুল ইসলাম
***********************************************************
** এতকিছুর পরেও যারা নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে তারা আসলেই ভাগ্যবান। সবাই সেই ভাগ্যবান হতে পারে না। 😥