01/04/2026
মিডিয়া ও হিন্দু ভোটার: জামায়াতে ইসলামীর জন্য আগামীর বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ১৯৯১ সালের ১৮টি কিংবা ২০০৮ সালের ৩টি আসনের তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে দলটির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ফলাফল। তবে নির্বাচনের সময় 'ইঞ্জিনিয়ারিং' এবং মিডিয়া ক্যু-এর শিকার না হলে এই সাফল্য আরও বড় হতে পারত। বিশেষ করে দুটি স্পর্শকাতর বিষয়ে জামায়াতের অনভিজ্ঞতা বা কৌশলগত ভুল তাদের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার মাঝে বিশাল এক দেয়াল তুলে দিয়েছে।
১. মিডিয়া ব্যবস্থাপনা: আদর্শিক অনমনীয়তা বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মিডিয়া হাউস জামায়াতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে জামায়াত-শিবিরের অগ্রণী ভূমিকা এবং রাজপথে তাদের সুসংগঠিত অবস্থান দেখে মিডিয়া তাদেরকেই আগামীর ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু মনে করেছিল।
কিন্তু জামায়াত 'অনৈতিক প্রভাব বিস্তার' না করার আদর্শিক দোহাই দিয়ে মিডিয়া থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। জামায়াতের এই 'আদর্শিক জায়গা' রাজনৈতিকভাবে একটি কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ:
* শূন্যস্থান পূরণ: জামায়াত মিডিয়াকে আস্থায় না নেওয়ায় বিএনপি সেই সুযোগ লুফে নেয় এবং মিডিয়া হাউসগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
* প্রপাগান্ডা ও ব্ল্যাকআউট: পরবর্তীতে এই মিডিয়াগুলোই বিএনপি ও বিভিন্ন এজেন্সির স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বর্তমানে জামায়াতকে মিডিয়া থেকে প্রায় 'ব্ল্যাকআউট' করে দেওয়া হয়েছে এবং টকশোতে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে।
* মিডিয়া বিভাগের ব্যর্থতা: প্রতিকূল সময়ে মিডিয়াকে ডিল করতে জামায়াতের সংশ্লিষ্ট বিভাগটি চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, যার খেসারত দিতে হয়েছে ভোটের মাঠে।
২. হিন্দু ভোটার সমীকরণ: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিল
ডাকসু নির্বাচনে হিন্দু শিক্ষার্থীদের ১০টি ভোট পাওয়াকে জামায়াত হয়তো বড় কোনো পরিবর্তনের সংকেত মনে করেছিল। সেই অনুপ্রেরণা থেকে তারা হিন্দুদের আস্থা অর্জনে নিজেদের চিরচেনা অবস্থান থেকে সরে এসে অনেক নমনীয়তা দেখিয়েছে। মন্দির পাহারা দেওয়া থেকে শুরু করে পূজার শুভেচ্ছা জানানো—সবই ছিল জামায়াতের নতুন কৌশল।
কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা:
* ভোটের পরিসংখ্যান: দেশের প্রায় ১০ শতাংশ হিন্দু ভোটারের মধ্যে ১ শতাংশ ভোটও জামায়াতের বাক্সে পড়েনি। অথচ এই ভোটাররা সেই বিএনপিকেই বেছে নিয়েছে, যারা তাদের জন্য দৃশ্যমান তেমন কিছু করেনি।
* আসন হারানোর নেপথ্যে: ঠাকুরগাঁও-২ আসনে আব্দুল হাকিম ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েও হিন্দু ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। একই চিত্র দেখা গেছে ঠাকুরগাঁও-১-এ দেলোয়ার হোসেন, সুনামগঞ্জে শিশির মনির এবং বগুড়ায় নূর মোহাম্মদ তাহেরের ক্ষেত্রে। দিনাজপুরসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি আসনে জামায়াতকে হারতে হয়েছে মূলত এই সংখ্যালঘু ভোটারদের মেরুকরণের কারণে।
* দ্বিমুখী ক্ষতি: একদিকে হিন্দু ভোট না পাওয়া, অন্যদিকে তাদের তুষ্ট করতে গিয়ে নিজেদের কট্টর সমর্থক ও মুসলিম ভোটারদের একাংশের সমালোচনার শিকার হওয়া—জামায়াতকে উভয় সংকটে ফেলেছে।
আগামীর পথচলা: জামায়াতের করণীয়
অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জামায়াতকে এখন বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
১. মিডিয়া সংস্কার: মিডিয়া বিভাগকে ঢেলে সাজাতে হবে। আদর্শ বজায় রেখেও কীভাবে মিডিয়ার সাথে পেশাদার এবং প্রভাবশালী সম্পর্ক বজায় রাখা যায়, তা শিখতে হবে।
২. টার্গেট অডিয়েন্স নির্ধারণ: যে ১০ শতাংশ ভোটার বারবার জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, তাদের পেছনে অতিরিক্ত শক্তি ও আদর্শ ব্যয় না করে বাকি ৯০ শতাংশ ভোটারের ওপর মনোযোগ দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে পারলেই ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
উপসংহার: রাজনীতি কেবল আদর্শের লড়াই নয়, এটি কৌশলেরও লড়াই। জামায়াতকে যদি প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হয়, তবে মিডিয়া এবং ভোটার সাইকোলজি বুঝতে আরও পরিপক্কতার পরিচয় দিতে হবে।