28/08/2026
সময় নিয়ে একটু পড়বেন কি !
# **ছবির ফ্রেমে আটকে থাকা এক জীবনের গল্প**
# # # *স্মৃতি থেকে সাহিত্য, সাহিত্য থেকে সংস্কৃতি—তারপর স্বপ্নের পথে নিরন্তর পথচলা*
কিছু ছবি কেবল ছবি নয়—কিছু ছবি সময়ের দরজা।
হঠাৎ পুরোনো দুটি ছবি সামনে এসে পড়ল। বহু বছর আগের সেই ছবিগুলো যেন এক নিমিষেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল অতীতের এক অধ্যায়ে। মনে হলো, ছবির ফ্রেমে শুধু কয়েকজন মানুষ কিংবা একটি অনুষ্ঠানের দৃশ্য আটকে নেই; সেখানে আটকে আছে আমার জীবনের একটি সময়, কিছু স্বপ্ন, কিছু শ্রম আর পথচলার অসংখ্য স্মৃতি।
প্রথম ছবিটিতে ফিরে গেলাম প্রায় আঠারো বছর আগে—**২০০৯ সালে**। তখন আমি **নজরুল একাডেমি, সোনাগাজী উপজেলা শাখার সভাপতি**। সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করেছিলাম সংগীত প্রতিযোগিতা **‘কণ্ঠ ও মেধা যাচাই’**। ছবিটির একেবারে বাম পাশে হলুদ টি-শার্ট পরা তরুণটি—সেই সময়ের আমি।
আর দ্বিতীয় ছবিটিতে সাদা শার্ট পরা, বাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও আমি।
আজকের আমি যখন সেই ছবির তরুণটির দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—সময় কত নিঃশব্দে মানুষকে সামনে নিয়ে যায়! চেহারার পরিবর্তন হয়, ব্যস্ততা বাড়ে, জীবনের পরিধি বিস্তৃত হয়; কিন্তু বুকের ভেতরে যে স্বপ্নটি একদিন জন্ম নিয়েছিল, সেটি যেন আজও একই রকম তরতাজা।
ছবি দুটো হঠাৎ সামনে এসে পড়েছিল বলেই আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম। সেই সঙ্গে পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসারও একটা সুযোগ হয়ে গেল। আশা করি, কেউ বিষয়টিকে আত্মপ্রচার হিসেবে নেবেন না। বরং এটুকুকে একজন পথচলার মানুষের স্মৃতিচারণা হিসেবেই দেখবেন।
আমার সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু **১৯৯৩ সালে**। যদিও তারও আগে ছবি আঁকতাম, কখনো কবিতা, কখনো ছড়ার মতো করে কিছু লিখতাম। কী লিখছি, তার আগা-মাথা হয়তো নিজেই বুঝতাম না। তবু মনের মধ্যে কোনো ভাবনা এলেই কাগজে তুলে রাখতাম। আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই অগোছালো লেখাগুলোর মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে ছিল আমার ভবিষ্যতের পথচলার প্রথম বীজ।
**ফেনী শাহীন স্কুল ও কলেজে** পড়ার সময় প্রতি বৃহস্পতিবার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। অনুষ্ঠান শুরুর আগে শিক্ষকেরা দিতেন প্রেরণাদায়ী বক্তব্য। তাঁদের কথাগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আসতেন কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা। তাঁদের কথা, তাঁদের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিশীলতার গল্প আমার কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করত।
মূলত তাঁদের অনুপ্রেরণাতেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি আমার আকর্ষণ আরও গভীর হয়ে ওঠে।
তখন ৯×১৪ ইঞ্চি সাদা কাগজে নিজের হাতে লিখে **‘নবারুণ’** নামে একটি ছোট সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশ করতাম। প্রতি সপ্তাহে সেটি ফটোকপি করে পরিচিতদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতাম। কবিতা, গল্প, কৌতুক, প্রবন্ধ, নিবন্ধ—যে বিষয় নিয়ে লেখা থাকত, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেই ছবি আঁকতাম, নকশা করতাম। পরে স্কুল ও কলেজজীবনে দেয়ালিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশের সঙ্গেও যুক্ত হলাম।
তারপর এলো সেই স্মরণীয় দিন।
**১৯৯৩ সালে প্রথম আমার কবিতা প্রকাশিত হলো ‘ইনকিলাম’ পত্রিকায়।**
আমার নাম ও ঠিকানা দেখে এলাকার পোস্টমাস্টারই প্রথম আমাকে খবরটি দিয়েছিলেন। নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখে সেদিন যে আনন্দ পেয়েছিলাম, তা আজও মনে আছে। মনে হয়েছিল, আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে যেন কেউ হঠাৎ একটু বড় করে দিয়েছে।
সেই আনন্দই আমাকে আরও দূরে যেতে সাহস দিল।
তখন অনলাইন যুগ ছিল না। লেখা পাঠাতে হতো ডাকযোগে। তবুও বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায় নিয়মিত কবিতা ও ছোটগল্প পাঠাতাম। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকা, সাহিত্যপত্র ও ম্যাগাজিনে আমার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয়েছে প্রায় **দশটির মতো একক ও যৌথ কাব্যগ্রন্থ**। আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
সময়ের স্রোতে গড়ে উঠেছে **‘কাব্যসুধা বিশ্ব সাহিত্য’**—সাহিত্যচর্চার একটি অনলাইন ও অফলাইন পরিসর। রয়েছে এর ম্যাগাজিন, পেজ ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড। সেই পরিবারের সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করে আসছি আমি।
কবিতা লিখেছি, গান লিখেছি, গল্প লিখেছি, নাটক ও উপন্যাস লিখেছি। বর্তমানে যুক্ত হয়েছি সংগীতের কম্পোজিশনের সঙ্গেও। ব্যস্ততা বেড়েছে, কাজের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে; তাই আগের মতো নিয়মিত লিখতে পারি না। তবুও সাহিত্য ও সংস্কৃতির সেই পথ থেকে আজও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারিনি।
**১৯৯৩ থেকে আজ—দীর্ঘ তেত্রিশ বছরের পথচলা।**
কিন্তু এত বছর পরেও নিজের ভেতরে তাকালে আমার মনে হয়—আমি এখনো সেই ছোট্ট শিশুটিই রয়ে গেছি।
এখনো শিখছি।
আরও শিখতে চাই।
আরও জানতে চাই।
আরও বুঝতে চাই।
কারণ শেখার কোনো শেষ নেই।
**আজীবন, আমৃত্যু—শিখে যেতে হয়।**
তাই আমার কাছে সবাই গুরু, আর আমি এখনো একজন ছাত্র।
বন্ধুদের একটি কথা প্রায়ই বলি—**বড় হতে হলে আগে নিরহংকার হতে হয়।** ‘আমি বেশি জানি’, ‘আমি বেশি বুঝি’—এই আত্মতুষ্টি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। অন্যের ভুল খোঁজার আগে নিজের ভুলগুলো খুঁজে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হয়।
আমরা সামান্য কিছু জানলেই অনেক সময় নিজেদের মহাজ্ঞানী ভাবতে শুরু করি। আর মানুষের অধঃপতনের সূচনাটা অনেক সময় সেখান থেকেই হয়।
জ্ঞান মানুষকে বড় করে, কিন্তু **বিনয় মানুষকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়।**
চরকা মাল্টিমিডিয়ার আজকের পথচলাও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ছোট-বড় অসংখ্য প্রতিযোগিতা ও আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সামান্য কিছু শেখার ও বোঝার সুযোগ মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন।
সেই সামান্য অভিজ্ঞতা, সাহস ও বিশ্বাসকে সম্বল করেই **চরকা মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশব্যাপী আয়োজনের স্বপ্ন দেখেছি।**
সফলতা একমাত্র মহান আল্লাহর।
আমি কেবল তাঁর ইচ্ছায় একজন উসিলা হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
আজ **চরকা মাল্টিমিডিয়া** ও **সি-টিউন ডিজিটাল রেকর্ডিং স্টুডিও** সেই স্বপ্নেরই একটি বাস্তব রূপ। এখানে মানসম্মত গান রেকর্ডিং, অডিও-ভিজ্যুয়াল নির্মাণ, নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ভয়েসওভার, জিঙ্গেল, বিজ্ঞাপন ও নির্বাচনী প্রচারণামূলক গান-মিউজিকসহ বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজ করা হয়। রয়েছে FX3 ক্যামেরা সেটআপ, দক্ষ DOP ও কালার এডিটর—মিউজিক ভিডিও ও নাটক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও সৃজনশীল সহযোগিতার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে সত্যি বলতে কী—এসব কিছুই আমার একার নয়।
**আপনারাই আমার সহযাত্রী।
আপনারাই আমার সহযোদ্ধা।
আপনারাই আমার শুভাকাঙ্ক্ষী।
আপনারাই আমার প্রেরণা।**
আপনারা না থাকলে আমার এই আয়োজনের কোনো মূল্যই থাকত না।
চরকা মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বিচারক, প্যানেল মেম্বার, কমিটির সদস্য এবং প্রত্যেক সহযোগীর প্রতি রইল আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, গভীর শ্রদ্ধা ও সালাম।
আপনারা প্রত্যেকেই **চরকা মাল্টিমিডিয়া নামের দেহের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।** আপনারাই সি-টিউন ও চরকা মাল্টিমিডিয়াকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
আমি একা এগোতে চাই না।
**সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চাই।**
আপনারা থাকবেন, পাশে থাকবেন, ভুল হলে ধরিয়ে দেবেন, ভালো কাজের প্রশংসা করবেন, আর প্রয়োজন হলে কঠিন সত্যটুকুও বলবেন। আপনাদের সুন্দর ও গঠনমূলক পরামর্শই আমাদের পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।
আজ পুরোনো ছবির দিকে তাকিয়ে তাই মনে হচ্ছে—সেদিনের সেই তরুণ আর আজকের আমি আসলে আলাদা কেউ নই। শুধু সময়ের নদী আমাকে একটু দূরে এনে দাঁড় করিয়েছে।
স্বপ্নটি সেই একই আছে।
সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত আর সৃষ্টিশীলতার হাত ধরে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।
**ছবির ফ্রেম বদলেছে, সময় বদলেছে—
কিন্তু পথচলার মানুষটি এখনো শিখছে।**
আর যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন শিখেই যাব।
কারণ আমি জানি—
**আমি এখনো ছাত্র।
আপনারাই আমার শিক্ষক।
আর আমাদের পথচলা—এখনো অনেক বাকি।**
ইনশাআল্লাহ, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আরও দূর যাব। একদিন আমাদের এই ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই বড় কোনো সাফল্যের গল্প হয়ে উঠবে।
**সেই দিনের অপেক্ষায়—
সহযাত্রীদের হাত ধরে, স্বপ্নকে বুকে নিয়ে,
চলছি… চলব।**