08/06/2026
আহত বাঘ মোস্তাকিমে স্বস্তি পেয়েছিলাম সেদিন গ্যালারি থেকে দেখা এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি।
জালাল হোসেন লাইজু | কুড়িগ্রাম
বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, আবেগ, নাটকীয়তা আর স্মৃতির কারণে আজও সমর্থকদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। তেমনই একটি ম্যাচ ছিল ফেডারেশন কাপের ফাইনালে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীর মুখোমুখি লড়াই।
গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার সেই দিনটির কথা এখনও স্পষ্ট মনে আছে। মীরপুর স্টেডিয়াম (বর্তমান শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম) কানায় কানায় পূর্ণ। চারদিকে উত্তেজনা, উদ্বেগ আর প্রত্যাশার ঢেউ। একজন নিবেদিতপ্রাণ মোহামেডান সমর্থক হিসেবে আমার মনেও তখন একটাই প্রশ্ন—আজ কি আমাদের সম্মান রক্ষা হবে?
কিন্তু শুরুটা মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। ম্যাচের এক পর্যায়ে পেনাল্টি পেয়ে গোল করে আবাহনীকে এগিয়ে দেন রুমি। পুরো গ্যালারিজুড়ে তখন হতাশার ছায়া। কিছুক্ষণ পর মোহামেডানও পেনাল্টি পেল। সমর্থকদের চোখে তখন সমতায় ফেরার স্বপ্ন। কিন্তু কায়সার হামিদের শট লক্ষ্যে না পৌঁছাতেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। খেলা শেষ হতে তখন আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ঠিক সেই মুহূর্তে যেন বজ্রপাতের মতো আবির্ভাব ঘটল উত্তরের গর্ব মোস্তাকিমের। মনে হলো যুদ্ধবিমান বোমা ফেলতে নেমেছে! দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে এসে তিনি এমন এক শট নিলেন, যা মুহূর্তেই আবাহনীর জালে আশ্রয় নিল।
গোল! স্কোরলাইন ১-১।
গ্যালারি তখন আনন্দে বিস্ফোরিত। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। কিন্তু নাটক তখনও বাকি। অতিরিক্ত সময়ে মোস্তাকিমকে মারাত্মকভাবে আঘাত করা হয়। অনেকেই ভেবেছিল, আহত এই ফুটবলার হয়তো আর ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারবেন না। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি—আহত বাঘ আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
আবাহনীর রক্ষণভাগ যখন তাকে গুরুত্ব দিতে ভুল করল, তখনই গর্জে উঠলেন মোস্তাকিম। মোহামেডান সমর্থকদের গগনবিদারী চিৎকারের মাঝে তিনি করলেন জয়সূচক গোল। সেই গোলের পর মাঠে কী ঘটেছিল, তা দেখার সময় ছিল না আমাদের। আমরা তখন উল্লাসে মেতে উঠেছি। গ্যালারিজুড়ে নাচ, গান, চিৎকার—শুধুই বিজয়ের আনন্দ।
শেষ বাঁশি বাজতেই মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ফেডারেশন কাপের শিরোপা জয় করল। আর সেই বিজয়ের অন্যতম নায়ক মোস্তাকিমের চোখে দেখা গেল আনন্দাশ্রু। তাকে ঘিরে ধরেছিলেন সতীর্থ, কর্মকর্তা ও সমর্থকেরা। কিন্তু যেন কেউই থামাতে পারছিল না সেই আবেগঘন কান্না।
সেদিনের পর মোস্তাকিম শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন হাজারো মোহামেডান সমর্থকের হৃদয়ের মানুষ। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি তার ভদ্রতা, নম্রতা ও ব্যক্তিত্ব তাকে আরও বড় করে তুলেছে।
বিকেএসপির মোস্তাকিম, মোহামেডানের মোস্তাকিম, দুই গোলের সেই নায়ক—আজও তিনি সমর্থকদের হৃদয়ে অমর। ব্যক্তিগতভাবে যখনই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, তার আন্তরিকতা ও সম্মান প্রদর্শনে মনে হয়েছে, তিনি শুধু বড় ফুটবলার নন, একজন সত্যিকারের ভদ্রলোকও।
ফুটবলের অনেক স্মৃতি সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু মোস্তাকিমের সেই দুটি গোল, আহত অবস্থায় ফিরে এসে দলকে জয় উপহার দেওয়া এবং বিজয়ের আবেগঘন কান্না—এসব স্মৃতি আজীবন বেঁচে থাকবে মোহামেডান সমর্থকদের হৃদয়ে।
ভালো থাকবেন, মোস্তাকিম ভাই। আপনার সেই লড়াকু মানসিকতা ও অমর কীর্তি কখনও ভুলবে না বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা।