14/06/2026
আমরা মুসলিম। পৃথিবীতে আমাদের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। অথচ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আমাদের অসংখ্য ভাই-বোনদের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। মনে হয়, আমরা যেন একটি আহত উম্মাহ—যার ক্ষতস্থান হতে অনবরত তাজা রক্ত ঝরছে।
আজ বাংলাদেশের সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে দিনের পর দিন অনাহারে-অর্ধাহারে পড়ে আছে হিন্দুত্ববাদী ভারত থেকে বিতাড়িত মুসলিমরা। পৃথিবী তাদের জন্য এতটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে যে, এক টুকরো নিরাপদ আশ্রয় কোথাও নেই। হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে আর আমরা মুসলিমরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, যেন কিছুই করার নেই।
অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "মুমিনরা পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতায় একটি দেহের ন্যায়। যখন তার একটি অঙ্গ ব্যথিত হয়, তখন সমগ্র দেহ জ্বর ও নিদ্রাহীনতার মাধ্যমে তার সাড়া দেয়।" [সহীহ বুখারী (৬০১১), সহীহ মুসলিম (২৫৮৬)]
বাংলাদেশের সীমান্ত মানেই নিপীড়ন, নির্যাতন ও রক্ত। এদেশের মুসলিমরাই ফেলানি হয়ে কাঁটাতারে ঝুলতে থাকে। হিন্দুত্ববাদী বিএসএফ-এর বন্দুকের নল সবসময় সীমান্তবর্তী মুসলিমদের দিকেই তাক করা থাকে। তারা গুলি করে মুসলিমদের লাশ ফেলে, আর অথর্ব বিজিবি সেই লাশ হাসিমুখে বহন করে নিয়ে আসে। যেন নূন্যতম লজ্জাও নেই তাদের। অপরদিকে এই ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে না এদেশের তথাকথিত বলদ নেতারা।
আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশে বাস করি, অথচ আমরাই নিরাপদ নই এদেশে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আমাদের মুসলিম বোনদের “ভাগোয়া লাভ ট্র্যাপে” ফেলেও পার পেয়ে যাচ্ছে। আইনজীবী আলিফকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করেও বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না ইসকন সন্ত্রাসীদের। এদেশের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে? হিন্দুত্ববাদীদের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাদের হাতে? অথচ এদেশ মুসলিমদের, এখানে রয়েছে অসংখ্য আলীমে দ্বীন, গবেষক ও ইসলামী নেতৃত্ব। কি দায়িত্ব পালন করছি আমরা?
অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।” [(সহীহ বুখারী (৭১৩৮), সহীহ মুসলিম (১৮২৯)]
প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সামনে খবর আসে, “জয় শ্রী রাম” শ্লোগান দিয়ে কোন না কোন মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। কোন মুসলিম বোনকে রাস্তার উপর অপমান করছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শয়তানেরা। নিরাপরাধ কাশ্মীরি মুসলিমদের পাইকারি হারে হত্যা করা হচ্ছে শতাব্দীকাল ধরে। অথচ আমরা পার্শ্ববর্তী মুসলিমরা একেবারেই নিরব। আমাদের বলদ নেতারা বলে “এটা পার্শ্ববর্তী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমাদের কিছুই করার নেই।”
বাংলাদেশের আরেকদিকে রয়েছে চির নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার অপরাধেই যাদেরকে পৈশাচিক কায়দায় গণহত্যা করা হচ্ছে যখন-তখন। তারা আজ আশ্রয় খুঁজে ফিরছে। এত এত মুসলিম দেশ থাকা সত্ত্বেও তারা আজ পরবাসী। সবাই মিলে যেন আজ তামাশা দেখছে। চরম নিপীড়ন থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের অনেকেই আজ উত্তাল সাগরে পাড়ি জমায়, কিন্তু তীরে পৌঁছানোর আগেই লাশ হয়ে ঢেউয়ের সাথে মিশে যায়। এ কেমন পরিণতি আজ মুসলিমদের? এসবের কি জবাব দিব আমরা মহান রবের সামনে?
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:"তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করছো না, যারা বলে হে আমাদের রব! আমাদেরকে এ অত্যাচারিত জনপদ থেকে বের করে নিন।"— (সূরা আন-নিসাঃ ৭৫)
রোহিঙ্গা মুসলিমদের মূল অংশটিই আজ শরণার্থী। যাদের কোন মানবিক মূল্যবোধ ও মর্যাদা নেই। রয়েছে কেবল একরাশ হতাশা। এখানে এমন অনেক শিশু রয়েছে, যারা জন্মের পর থেকে শুধু শরণার্থী শিবিরই দেখেছে। তারা জানে না তাদের গ্রামের রাস্তা কেমন ছিল, তাদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি কোথায় ছিল। তারা ঘুমাতে যায় উদ্বাস্তু হিসেবে, আবার জেগেও ওঠে উদ্বাস্তু হিসেবেই।
এই লজ্জা কার? অবশ্যই আমাদের। আমরা কি এই শিশুদের জন্য উত্তম কোন বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছি? আমরা কি তাদের জন্য কোন আদর্শিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি? আমরা কি এই নিপীড়িত মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছি? তাদের স্বাধীনতার জন্য কোন উদ্যোগ নিয়েছি? তাহলে কিভাবে তারা আরাকানে ফিরে যাবে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে?
অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না।” [সহীহ বুখারী (২৪৪২), সহীহ মুসলিম (২৫৬৪)]
আমরা দেশের সম্মানিত আলীমগণকে বলতে চাই, উম্মাহ যখন রক্তাক্ত, তখন আমরা মসজিদের মিম্বার ও মাদ্রাসার দারস থেকে শুধু ব্যক্তিগত নেক আমল ও ক্যারিয়ার ভিত্তিক আলোচনা না করে, উম্মাহর ক্ষত তথা মজলুমদের উদ্ধারের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিন। আজ যদি আপনাদের পক্ষ থেকে এমন পদক্ষেপ না আসে, তবে অচিরেই এই জাতি আপনাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। যা হবে অত্যন্ত লজ্জাজনক।
এব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে-বুঝে সত্য গোপন করো না।” (সূরা আল-বাকারাঃ ৪২)
অপরদিকে এদেশে আমরা বড় বড় অনেকগুলো ইসলামিক দল দেখতে পাই। আমাদের প্রশ্ন হল, তারা কি কাজ করছে? তারা তো প্রতিনিয়তই বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে হরক রকম শ্লোগান, মানববন্ধন ও মিছিল করার পাশাপাশি বিবৃতি দিয়ে থাকে। কিন্তু মজলুম এবং উম্মাহর সংকট নিয়ে কি তাদের কোন দায়িত্ব নেই?
তারা কি আল্লাহ্র সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহিতা করাকে ভয় করছেন না? কি হবে এসব তথাকথিত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পেছনে পড়ে থেকে যদি ধীরে ধীরে উম্মাহ হারিয়ে যায় কালের গর্ভে? দয়া করে মজলুমদের ব্যাপারে আল্লাহ্কে ভয় করুন, নয়তো আপনাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত করুণ।
এছাড়াও আমাদের দেশে রয়েছে হাজারো লেখক, গবেষক ও বক্তা! কিন্তু উম্মাহর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত নিরাময়ে তাদের কোন কাজটি চোখে পড়ার মত? তারা বরং এমন সব গিবত ও বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত, যা উম্মাহকে আরো বড় খাদের কিনারায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তাইতো মজলুম আজ কারো উপরেই আস্থা রাখতে পারছে না। একমাত্র মহান আল্লাহ্ ব্যতীত এই এই এতিম উম্মাহর যেন কেউই নেই। সবাই আজ প্রচন্ড ব্যস্ত নিজেদের ব্যক্তিগত অথবা দলীয় স্বার্থ নিয়েই।
হে মুসলিম উম্মাহ! আর কত মজলুমের আহাজারি শুনলে তুমি জেগে উঠবে? আর কত বোন অপমানিত হলে তোমার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগবে? আর কত মুসলিম উদ্বাস্তু হলে তোমার রক্তে শিহরণ জাগবে? উঠে দাঁড়াও, তোমাকেই তো মজলুমের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। আজ যদি তুমি না জাগো, তবে অচিরেই নব্য তাতারিদের হাতেই তুমি বেঘোরে মারা পড়বে। সেইসাথে তোমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সম্পদ সবই তোমার চোখের সামনেই বিলীন হয়ে যাবে। আর হাশরের মাঠে চরমভাবে লজ্জিত হবে তুমি শেষ বিচারক মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের সামনে।
সুতরাং আপনি যেই হোন না কেন, আজ আপনার সামনে কেবল ২টি পথ খোলা রয়েছে। হয় মজলুমদের উদ্ধারকারী হয়ে ইতিহাস রচনা করবেন, নয়তো অধঃপতিত হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবেন।
তবে আপনাকে মনে রাখতে হবে যে, মুসলিমরা এই অঞ্চলে চিরকাল পরাভূত হয়ে থাকবে না; তারা বিজয়ী হবেই ইনশাআল্লাহ্। হয় আপনাকে নিয়ে, অথবা আপনাকে ছাড়াই...