18/03/2026
আপনার ফোনটা কি আপনার পাশেই রাখা? জানেন কি, ইসরায়েলের তৈরি 'পেগাসাস ৩' নামের একটা সিস্টেম দিয়ে ৭,০০০ মাইল দূর থেকেও আপনার ফোন হ্যাক করা সম্ভব? এমনকি ফোন বন্ধ থাকলেও তারা আপনার ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন চালু করে সব দেখতে আর শুনতে পারে! জেফ বেজোসের মতো মানুষের ফোনও যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে আমাদের সাধারণ মানুষের অবস্থা কী? হ্যাকিং এর চেয়েও ভয়ংকর সব তথ্য পডকাস্টে ফাঁস করেছেন গ্যাভিন ডি বেকার।
আপনার ফোন কি আপনার কথা শুনছে? গ্যাভিন বলছেন, যদি কোনো দেশের সরকার চায় তবে আপনার ফোনের গোপনীয়তা বলতে আর কিচ্ছু থাকবে না। এই যে 'পেগাসাস ৩' এর কথা বললাম, এটা ব্যবহার করতে আপনার ফোনে কোনো লিংকে ক্লিক করারও প্রয়োজন নেই। এমনকি অ্যাপল যখনই কোনো সিকিউরিটি আপডেট দেয়, দুনিয়ার হাজার হাজার মানুষ সাথে সাথেই নতুন কোনো পথ বের করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তাই গ্যাভিন খুব পরিষ্কার করে বলেছেন যে, ফোনে আমরা কী টেক্সট করছি বা কী বলছি তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
জানেন সবচেয়ে অবাক করা বিষয় কী? অনেক প্রভাবশালী দেশ তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নেতাদের ফোনেও আড়িপাতে! জার্মানি, ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের মতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের ফোনও হ্যাক করা হয়েছে। প্রাইভেসি বা গোপনীয়তা এখনকার দুনিয়ায় আসলে একটা অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আমাদের সবার উচিত আমরা কী লিখছি বা বলছি তা নিয়ে অনেক বেশি সাবধান থাকা।
জেফরি এপস্টাইন কি আসলেই কোনো বিলিয়নেয়ার ছিলেন? গ্যাভিন বলছেন এপস্টাইন আসলে কোনো বিলিয়নেয়ার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটা 'কনস্ট্রাক্ট' বা সাজানো চরিত্র। তাকে এই বিশাল টাকা, প্রাইভেট জেট আর দ্বীপের মালিক বানানো হয়েছিল বিশেষ এক উদ্দেশ্যে। ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের মালিক লেস ওয়েক্সনার তাকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন যা দিয়ে এই সাজানো জীবন তৈরি করা হয়।
নিউ ইয়র্কের সেই অ্যাপার্টমেন্ট আর সেই দ্বীপে সবখানে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লুকানো ছিল। গ্যাভিনের মতে, এটা ছিল একটা বিশাল ব্ল্যাকমেইল অপারেশন যা হয়তো একাধিক দেশের গোয়েন্দা সংস্থার উপকারে আসত। প্রভাবশালী মানুষদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হতো এবং তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো রেকর্ড করে রাখা হতো। পরবর্তীতে সেই রেকর্ডগুলো দিয়ে তাদের সারাজীবনের জন্য কব্জা করে ফেলা হতো।
ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন দিয়ে কীভাবে প্রভাবশালী মানুষদের পকেটে ভরা হতো? ব্ল্যাকমেইল করার পদ্ধতিটা কিন্তু সরাসরি ছিল না, বরং ছিল অনেক বেশি ধূর্ত। ধরুন, আপনার একটি গোপন ভিডিও তাদের কাছে আছে। ব্ল্যাকমেইলার আপনাকে ভয় দেখাবে না, বরং সে আপনার 'ত্রাতা' বা উদ্ধারকারী হিসেবে হাজির হবে। সে বলবে, "শোনো স্টিভেন, ওই মেয়েটা তোমার একটা ভিডিও রেকর্ড করেছে, কিন্তু ঘাবড়িয়ো না, আমি এটা সামলে নিচ্ছি"।
এভাবে সেই ব্যক্তিটি আপনার আজীবনের বন্ধু হয়ে যাবে এবং আপনি তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন। অথচ পর্দার আড়ালে সেই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গ্যাভিন বলছেন, জেফরি এপস্টাইন এভাবেই অনেক দেশের সেনেটর, বিজ্ঞানী আর প্রভাবশালী মানুষদের নিজের পকেটে ভরেছিলেন এই পুরো বিষয়টি ছিল মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার একটি অপারেশন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সরকার কি আমাদের সাথে সবসময় সত্যি কথা বলে? পডকাস্টের এই অংশটা শুনলে আপনার যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যেতে পারে। গ্যাভিন বলছেন, ক্ষমতাবানরা সবসময়ই মিথ্যে বলে এবং এটা ইতিহাসের অংশ। একটা উদাহরণ দেই, জনসন অ্যান্ড জনসনের বেবি পাউডারে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী অ্যাসবেস্টস আছে এটা সরকার জেনেছিল আজ থেকে ৫২ বছর আগে! কিন্তু তারা সেটা সাধারণ মানুষকে জানায়নি, বরং দিনের পর দিন স্টাডি করার নামে সময় পার করেছে।
এমনকি ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত 'এজেন্ট অরেঞ্জ' নিয়ে ল্যাব টেস্টে ৪০টি ইঁদুরের মধ্যে ৩৮টি মারা গেলেও সেই তথ্য গোপন রাখা হয়েছিল। ২৫ বছর পর সরকার স্বীকার করেছিল যে হ্যাঁ, এটা ক্ষতিকর ছিল। গ্যাভিন খুব জোর দিয়ে বলছেন যে, কোনো বড় ঘটনা ঘটার ১ বা ৫ বছরের মাথায় সরকার কখনো সত্যিটা স্বীকার করে না, তারা অপেক্ষা করে অন্তত ২০-২৫ বছর পার হওয়ার।
কেন আমাদের সবসময় নিজেদের মধ্যে জড়িয়ে রাখা হয়? গ্যাভিন বলছেন, যেকোনো বড় শক্তির মূল অস্ত্র হলো ভয়। ভয় মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে আর এই বিভাজনই হলো ক্ষমতার জ্বালানি। আপনি যখন বামপন্থী আর ডানপন্থী কিংবা ট্রাম্প সমর্থক আর বিরোধীদের মধ্যে লড়াই করতে দেখবেন, জানবেন এতে সবচেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে দেশের নেতাদের। তারা যখন ক্যাসল বা প্রাসাদের দেয়ালের ওপর থেকে সাধারণ মানুষকে নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে দেখে, তখন তারা হাততালি দেয়।
কারণ মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, তবে তারা কখনো প্রাসাদের দেয়াল টপকে ভেতরে আসবে না। আমরা এখন যে আমেরিকান বা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন দেখছি, সেটা আসলে ইতিহাসেরই একটা অংশ। এই পতনশীল সাম্রাজ্যগুলো সবসময়ই ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে টিকে থাকতে চায়। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও প্রযুক্তি আর গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তারা এখনই এক যুদ্ধে লিপ্ত আছে।
বিপদের সংকেত আগেভাগেই বোঝার সেই অদ্ভুত শক্তিটা কি আমাদের সবার আছে? গ্যাভিনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই 'দ্য গিফট অফ ফিয়ার' (The Gift of Fear) নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এক অসাধারণ ব্যাপার বলেছেন। তিনি বলছেন, মানুষের কাছে কোনো বাঘের মতো বড় নখ বা দাঁত নেই, কিন্তু আমাদের আছে বড় মস্তিষ্ক আর ইনটুইশন বা সহজাত প্রবৃত্তি। ইনটুইশন হলো লজিক বা যুক্তি ছাড়াই কোনো বিপদের কথা আগেভাগে বুঝতে পারা।
একটা উদাহরণ শুনুন, একজন নারী যদি লিফটে উঠতে গিয়ে দেখেন ভেতরে এমন একজন মানুষ আছে যাকে দেখে তার ভয় লাগছে, তার উচিত নয় লিফটে ওঠা। কিন্তু অনেক সময় আমরা ভাবি, "লিফটে না উঠলে মানুষটা কী ভাববে? আমাকে কি বর্ণবাদী ভাববে?"। গ্যাভিন বলছেন, এই ভদ্রতা দেখাতে গিয়েই মানুষ বিপদে পড়ে। আপনার ভেতরে যদি সামান্যতম কোনো খটকা লাগে, তবে সেটাকে গুরুত্ব দিন, কারণ আপনার শরীর আপনাকে রক্ষার সংকেত দিচ্ছে।
শৈশবের আঘাতগুলো কি আমাদের পুরো জীবনটা নিয়ন্ত্রণ করে? গ্যাভিনের নিজের জীবনের গল্পটাও কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়। তার মা ছিলেন একজন হেরোইন আসক্ত এবং তিনি প্রায়ই হিংস্র হয়ে উঠতেন। গ্যাভিন যখন মাত্র ১৬ বছর বয়সী, তার মা তার চোখের সামনে সৎ বাবাকে গুলি করেছিলেন এবং পরে আত্মহত্যা করেন। গ্যাভিন বলছেন, শৈশবের এই ভয়ংকর অভিজ্ঞতাই তাকে আজ বিশ্বের সেরা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বানিয়েছে।
তিনি হিলিং বা সুস্থ হয়ে ওঠার একটা চমৎকার সংজ্ঞা দিয়েছেন। হিলিং মানে হলো যখন আপনার আর অতীতকে সামলাতে কোনো এনার্জি খরচ করতে হয় না, বরং আপনি বর্তমানে বাঁচতে পারেন। গ্যাভিন মনে করেন, জীবনের প্রতিটি কঠিন অভিজ্ঞতাই আমাদের বড় কোনো কাজের জন্য তৈরি করে। তিনি এখন আর টাকা বা বাড়ির পেছনে ছোটেন না, বরং মানুষের সেবায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন ।