30/08/2026
বিশাল বপুর সেই মালিকের পিঠে আরো কথা বলে যান অনেকেই। আলোচনার স্রোত গড়িয়ে চলছিল বিভিন্ন দিকে। নানা মন্তব্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার রঙ জাগতে চায় সভ্যদের মাঝে। রোগাটে গড়নের মূর্তিগুলোর মাঝে কেউ না কান উঁচিয়ে বক্তব্য বুঝতে চায়। কেউ বা আলসেমিতে পায়ের মরা চামড়া খুটে নেয়। মায়ের শীর্ণ বুকে হাল চষে সঞ্জীবনী আদায়ে ব্যর্থ কোন কোন শিশুর গলা ফাটিয়ে তাদের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা বয়ান করে।
ঝিরিঝিরি বাতাসের কম্পনে জোৎস্নার রূপালি আলো দুলতে থাকে। দূরে মেইন রোডে ছুটে চলা ট্রাকের গম্ভীর ভেঁপু শোনা যায়। দিওয়ালি রাতের প্রদীপের সলতের মত মাথার ওপর ঝুলে থাকা সূক্ষ তারে লটকে থাকা অল্প পাওয়ারের বাতি টিমটিম করে জ্বলতে থাকে।
-তা সে যে করেই পরিবর্তন আনয়ন কাম্য হোক না কেন, এই মুহুর্তে আমাদের সকলের মাঝে সবচেয়ে যেটা জরুরী তা হলো, ঐক্য। এ যাবত কাল আমাদের সকল কর্মসূচী সংশোধনগুলোকে আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি, সাংগঠনিক দিক থেকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের ধ্যানধারণার পক্ষে বহুমত ঢেলে সাজানাই বর্তমান সময়ের জন্য এক অন্যতম চ্যালেঞ্জ। একথা ভুললে চলবে না একদমও।
এখন বুর্জোয়া শ্রেণির স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা ও সম্রাজ্যবাদের সাথে দ্বন্দ্ব প্রকাশিত হচ্ছে তীব্রভাবে। নিজেদের মাঝে বিরো/ধের জন্য ও পুঁজিবাদী কায়দায় অগ্রসর হওয়ায় বুর্জোয়াদের মাঝে যে সং/কট দেখা দিয়েছে, তার দফারফা করতে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর দরকার এখন এই সব কাজগুলোকে সমাজতন্ত্র গঠণের কাজের জন্য নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসার৷
একদিকে কৃষক শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবিদের সংগ্রামে নিয়ে আসা এবং সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির কাজেও নিয়োজিত হওয়া৷ জাতীয় উন্নতি ও স্বাধীনতাকে সংহত করার জন্য প্রগতিশীল অংশের হাতকে শক্তিশালী করার কাজে পার্টিকে যথাযোগ্য উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে।
কথাটা "শতদল" লিডার সালাউদ্দিনের।
তবে সালু ভাইয়ের কথায় আলোচনার গতি ধাবিত হলো দুটো ধারায়। এক অংশ শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে বামপন্থী দলগুলোর সংযুক্ত গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠণ করে নেবার জন্য বক্তব্য দিয়ে সম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের অবশেষকে উচ্ছেদ করার জন্য বুর্জোয়া বিরো/ধী হবার আহবান জানালেন।
তো আরেক অংশ পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শক্তিশালী অংশের ওপর ভিত্তি করে তাদের সমর্থকেরা জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথী করে শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠণে সমর্থন দিলে সঠিক হবে বলে রায় দিলেন।
-আরেব্বাস! এতো দেখছি সেই ইউডিএফ-ওয়ালা আর এনডিএফ-ওয়ালাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছে।
দাঁতে দাঁত চেপে বলে মঈদুল। লড়াইয়ের বিকল্প বলে এখানে কিছু নেই। আমাদের একতা বলতে এখানে ল/ড়ে যাওয়াকেই বুঝতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে মুক্তির সাথে অশান্তিপূর্ণ ধারানাটা যদি স্পষ্ট না থাকে তবে বিপ্ল/বের সংজ্ঞা পাল্টে যাবে। আমরা অবশ্যই চাই, শ্রেণী শো/ষণ থেকে মুক্তি শান্তিপূর্ণ উপায়েই হোক। কিন্তু চাওয়া আর তা কার্যকরী হবার মাঝের গ্যাপটা অবশ্যই থাকতে হবে।
মনে রাখা দরকার, আজ অবধি পৃথিবীতে কোথাও শান্তিপূর্ণ নামের ঘোড়ায় চেপে সমাজতন্ত্রের পথে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করার ঘটনা জানা যায়নি।
মঈদুল ওর এবারের কথাগুলো গলা উঁচিয়েই বলে। জটলা বেঁধে থাকা জনতার মাঝে পিনপতন স্তব্ধতা। কারও মুখে কথা আসছিল না। প্রবল আঁধারে ডেবে থাকা এই যুবকের আচম্বিত বক্তব্যে সকলে একটু টলে যায়। সালু ভাইয়ের মুখ থমথম করছে।
- তবে সব সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, আমাদের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্যের খাতিরে অন্যদের মতামত সম্বন্ধেও আমাদের সহনশীল হতে হবে।
-'অধিক সাধনে গাঁজন নষ্ট' আর 'নানা মুনির নানা মত' কিংবা "দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা" প্রবাদ বাক্য তিনটি আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে, সালু ভাই।
ঔদ্ধত্যের সাথে বলে মঈদুল কথাটা। স্তম্ভিত সালাউদ্দিন কাঁপতে থাকেন এবারে। মঈদুল সীমা ছাড়িয়ে চলেছে ক্রমশ। ওর ক্ষাপ্যা মস্তিষ্কে খু/নে ষাড় চেপে বসেছে। একে প্রতিহত না করা গেলে সামনে কঠিণ বিপদ ঘনিয়ে আসবে নিশ্চিত। ওর সাথে আলাদা করে বসতে হবে, তেমন কিছু ঘটে যাবার আগেই।
মনেমনে ভেবে নেন, সালু ভাই৷ তবে তখনকার মত পরিস্থিতির লাগাম টেনে নিতে বলেন,
"সামলে কথা বল মঈদুল।"
ভিড়ের মাঝে আবারও গুঞ্জন। এ ওর দিকে দেখে নিজনিজ মত দিতে ব্যস্ত৷
"কিন্তু দাদা সহনশীল হতে গিয়ে যদি সব কিছুতেই আমরা ঝিমিয়ে পড়ি তবে প্রতি/বাদের ধারা কি থমকে যাবে না?"
সভ্যদের ভেতর থেকে এক তরুণ বলে ওঠে কথাটা৷ ছোট্ট বাক্য তবে তার ঝংকার এতটাই তীব্র ছিল যে, মুহুর্তের জন্য হলেও কোলাহল চট করে থমকে গেল। ঘামে ভিজে থাকা বাতাসে মাটির গন্ধ মিশেছে সুন্দর। সাঁঝের এক ছটাক শীতল হাওয়ায় এক মিশেল ঘ্রাণ আঁছড়ে পড়ছে নাকে। মশার কামড় খেয়ে নির্বিকার কিছু শ্রমিক জনতা আলসেমিতে মাখানো কান চুলকে নেওয়া নোংরা কাঠি মাটিতে ফেলে আড়মোড়া ভেঙে বসে৷ মুখে না বললেও ওদের চাহনিতেও একই কৌতুহল খেলছে।
"ঝিমিয়ে পড়েছি কে বলল? তেমন কিছু মোটেও নয়। এখানে কথা হচ্ছে, সহিং/ সতার জবাব সহিং/সতায় দিলে ক্ষতি ছাড়া কোন ফায়দা মিলবে না। বরং সেই ঝঞ্ঝাটের সুবিধা নিয়ে মাঝে ওই মুনাফাপতিরাই সুবিধা লুটবে। ফলাফল আসল বিষয় থেকে তখন আমরা নিজেরাই ছিটকে যাব। এতে করে..."
আরিফের কথা থেমে যায়। "
-এমনটা বলাও কী এক ধরনের সুবিধা আদায় করে নেওয়া নয় কী? ধরি মাছ না ছুঁই পানি টাইপ হলো না যুক্তিটা?"
এবার ডানদিকের কোণ বরাবর এক ক্ষ্যাপাটে মুখ দেখা যায়৷ হিলহিলে স্বাস্থ্য হলেও যুবকের গলার স্বরটা ততটাই বিপরীত। অনেকটা সেই কারণেই কিনা কে জানে উপস্থিত সবার মাঝে কথার তোড় শুরু হলো আবারো। এতক্ষণের আলোচনা ছাপিয়ে ফের মৃত কানু,বশির যেন জীবিত হয়ে বাতাসের পর্দায় ভাসতে থাকে।
"যেইহানে জানেরই কোন ঠেহা নাই ক্যা হেইখানে এইসব আজাইরা কতায় কী কাম হইব? এগুন সব আমগো গরু বানায়া খাটায় নেয়ার বুদ্ধি।"
মধ্যবয়স্ক এক শ্রমিকের কথায় ভিড়ের কিছু অংশ সায় দেয়। মুখ পাথরের মত শক্ত করে নেয় আরিফ৷
"শুনুন৷ বিষয়টা এমন নয়৷ সবকিছুর একটা কায়দা কানুন আছে। সেই মাফিক এগুতে হয়। আর আপনারা যে রাস্তা ধরার কথা বলছেন সেই পথ ধরে এগুনোটা পু/লিশের কাজ।"
আচমকা মুখ ফসকে বলা নিজের কথাতেই এবারে চমকে ওঠে আরিফ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তাহলে সত্যি হয়? নিজের পাতানো যুক্তিটা বহুকাল পূর্বের সেই ডা. বিধান রায়ের সুরকেই আঁকড়ে নিল কী?
উপন্যাসঃ বিপ্রতীপ (প্রকাশিতব্য)
জনরাঃ রাজনীতি ভিত্তিক সামাজিক
লেখকঃ সোনিয়া তাসনিম