03/12/2025
শহরের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা একটি শান্ত গ্রাম ছিল। সেই গ্রামের একপ্রান্তে ছিল ছোট্ট একটি মাটির বাড়ি, যেখানে থাকত অপুর্ব আর তার বাবা, প্রশান্ত।
অপুর্ব ছিল খুবই চঞ্চল, ঠিক যেন ছোট নদীর স্রোত—সবসময় ছুটে চলতে চায়, নতুন কিছু দেখতে চায়। আর প্রশান্ত ছিলেন ঠিক তার উল্টো, বিশাল এক বটগাছের মতো শান্ত, স্থির, আর অভিজ্ঞতায় পূর্ণ।
অপুর্বর সবথেকে প্রিয় জায়গা ছিল তাদের বাড়ির পেছনের টিলাটা। সেখান থেকে দূরের পাহাড় দেখা যেত, আর সন্ধ্যেয় আকাশটা হয়ে উঠত হাজার রঙের ক্যানভাস। সে প্রায়ই সেখানে গিয়ে বসত আর আকাশ দেখত।
এক গ্রীষ্মের দুপুরে, অপুর্ব মন খারাপ করে বাবার কাছে এসে বলল, "বাবা, আমার এই গ্রাম ভালো লাগে না। এখানে সবকিছু এত ধীরে চলে! আমি শহরের বড় বড় বিল্ডিং, দ্রুত গতির ট্রেন আর ঝলমলে আলো দেখতে চাই।"
প্রশান্ত তার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, "এসো বাবা, আজ তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।"
বাবা-ছেলে মিলে গেল তাদের বাড়ির পেছনের ছোট নদীটির কাছে। নদীটি তখন গ্রীষ্মের কারণে প্রায় শুকিয়ে কাঠ। ছোট ছোট নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে জল ক্ষীণ ধারায় বয়ে যাচ্ছিল।
প্রশান্ত একটি শুকিয়ে যাওয়া নদীখাত দেখিয়ে বললেন, "দেখো অপুর্ব, এই নদীটা এখন কত ছোট আর শান্ত। কিন্তু বর্ষার সময় এটার চেহারা পাল্টে যায়। তখন এটা হয়ে ওঠে খরস্রোতা, আর এর শক্তি এতটাই বেশি যে বড় বড় পাথরও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সব জল কি সমুদ্রে মিশে যায়?"
অপুর্ব কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইল।
প্রশান্ত উত্তর দিলেন, "না, সব জল যায় না। এই নদীটা যখন পাহাড় থেকে নেমে আসে, তখন তার অনেকটা জল ছোট ছোট জমিতে, পুকুরে জমা হয়। এই জলই আমাদের গ্রামকে বাঁচিয়ে রাখে। যদি এই নদীটা শুধু দ্রুত গতিতে ছুটে যেত আর কোনোদিকে না থামত, তাহলে এই গ্রাম শুকিয়ে যেত।"
তারপর প্রশান্ত অপুর্বকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, "তুমি হলে এই ছোট নদীটির মতো—তোমার গতি আছে, উচ্ছ্বাস আছে, তুমি অনেক কিছু জয় করতে চাও। আর আমি? আমি হলাম এই মাটির বটগাছটির মতো। আমার হয়তো গতি নেই, কিন্তু আমি স্থির থেকে তোমাকে ছায়া দিতে পারি। আমি শিকড়ের মতো এই মাটির সঙ্গে যুক্ত, যা তোমাকে তোমার পথের জল আর শক্তি জোগাবে।"
"শহর হয়তো ঝলমলে আলো দেখাবে, কিন্তু এই গ্রাম, এই মাটি তোমাকে ধৈর্য, শান্তি আর তোমার সত্যিকারের পরিচয় দেবে। নদী যেমন চলতে চলতে অনেক জায়গা থেকে জল নিয়ে আসে, তুমিও চলতে চলতে জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করবে। কিন্তু মনে রাখবে, তোমার শিকড় যেন সব সময় এই শান্তির বটগাছটার নিচে থাকে।"
অপুর্ব বাবার কথা বুঝল। সে দেখল, স্থির থাকা মানে পিছিয়ে পড়া নয়, বরং সব কিছুর ভিত্তি হওয়া। তার চোখে এখন আর শুধু শহরের দ্রুত গতির স্বপ্ন ছিল না, ছিল গ্রামের সবুজ আর নদীর ধৈর্যশীল গতির প্রতি এক নতুন শ্রদ্ধা।
সেই দিন থেকে অপুর্ব তার গ্রামের সৌন্দর্য নতুন চোখে দেখতে শুরু করল। সে বুঝল, গতি এবং স্থিতি, ছেলে এবং বাবা—দু'জনের ভূমিকা নিয়েই জীবন পূর্ণতা পায়।