24/09/2026
ইউরোর ওপারে
পর্ব ২০: সুমু, তুমি যাবে, যাবে মোর গাঁয়
মাদ্রিদের সকালগুলো বড় অদ্ভুত।
একই রাস্তায় প্রতিদিন হাজার মানুষ হাঁটে, অথচ প্রত্যেকের বুকের ভেতর আলাদা আলাদা একটা দেশ থাকে।
কারও দেশে মা অপেক্ষা করে।
কারও দেশে স্ত্রী।
কারও দেশে সন্তান বড় হয়ে যায়, অথচ বাবা তাকে বড় হতে দেখে না।
আর কারও দেশে থাকে শুধু একটা নদী।
যে নদীটার কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য মানুষ কখনো কখনো অর্ধেক পৃথিবী পেরিয়ে আসে।
সেদিন সকালে সুমুর ফোনটা কয়েকবার বেজে উঠল।
Feroz 2.0 ফিরোজ।
সুমু ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে হাসির শব্দ।
“কী রে?”
“তুই ঘুম থেকে উঠছিস?”
“হ্যাঁ।”
“আজ আমার দিন।”
সুমু একটু থেমে বলল,
“কী হয়েছে?”
ফিরোজ এমনভাবে হাসল, যেন কথাটা বলার জন্য সে অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিল।
“আজ আমার রেসিডেন্ট কার্ড হাতে পাব।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
এই একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের কার্ডের জন্য কত মানুষ কত রাত ঘুমায়নি।
কতবার অফিসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেবেছে,
“আজ হয়তো হবে।”
কতবার একটা চিঠির খাম খুলতে গিয়ে হাত কেঁপেছে।
কতজনের ফোনে ‘favorable’ শব্দটা আসার পর মনে হয়েছে, পৃথিবীটা বুঝি একটু সহজ হলো।
কার্ডটা দেখতে ছোট।
কিন্তু প্রবাসীর কাছে কিছু ছোট জিনিসের ওজন অনেক বেশি।
একটা রেসিডেন্ট কার্ড কখনো কখনো শুধু পরিচয়পত্র নয়।
এটা কয়েক বছরের অপেক্ষার একটা উত্তFeroz 2.0 বলল,
“সুমু, জানিস আজ কার কথা মনে পড়ছে?”
“কার?”
“আবাবিল ঘাট।”
সুমু হাসল।
“তুই তো এখনও নদী ভুলিস নাই।”
“নদীকে কেউ ভুলতে পারে?”
ফিরোজের গলার স্বরটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল।
“মাদ্রিদের রাস্তা সুন্দর, সুমু। কিন্তু আমার গ্রামের নদীর পাড়ে যে বাতাস, ওই বাতাসের কোনো কাগজ লাগে না।”
সুমু কিছু বলল না।
ফিরোজ নিজেই বলতে লাগল,
“কার্ডটা হাতে নিয়ে প্রথমে আমি একটা ছবি তুলব।”
“তারপর?”
“তারপর তোকে পাঠাব।”
“শুধু ছবি?”
“না।”
“তাহলে?”
ফিরোজ হেসে উঠল।
তারপর হঠাৎ কবিতার মতো করে বলল,
“সুমু তুমি যাবে, যাবে মোর গাঁয়,
নদীর ধারে বসব দুজন, সন্ধ্যা নামবে নীরব ছায়ায়।
আবাবিল ঘাট চিনবে তোকে,
জলের ঢেউও ডাকবে তোকে,
বলবে, এতদিন কোথায় ছিলি,
মাদ্রিদের কোন পরদেশে?”
সুমু হেসে বলল,
“তুই কবি হয়ে গেলি কবে?”
“রেসিডেন্ট কার্ড পেলে মানুষ অনেক কিছু হয়ে যায়।”
“কী কী?”
“কেউ কবি হয়, কেউ ব্যবসায়ী হয়, কেউ দেশের মন্ত্রী হয়, আর কেউ গ্রামে গিয়ে সবাইকে বলে, ‘ইউরোপ থেকে এসেছি।’”
দুজনেই হেসে উঠল।
প্রবাসের হাসির মধ্যেও কখনো কখনো একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে থাকে।
যে দীর্ঘশ্বাসের ভাষা কোনো অনুবাদকের জানা নেই।
⸻
সুমু সেদিন ফিরোজের সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
মাদ্রিদের অফিসের দিকে যেতে যেতে ফিরোজ বারবার পকেটটা হাত দিয়ে দেখছিল।
যদিও কার্ডটা তখনও হাতে আসেনি।
সুমু বলল,
“এতবার পকেট দেখছিস কেন?”
“কার্ডটা হারিয়ে ফেলব না তো?”
“কার্ড তো এখনও তোর কাছেই আসে নাই।”
ফিরোজ বলল,
“তবু মনে হচ্ছে আছে।”
সুমু জানালার বাইরে তাকাল।
মাদ্রিদের পুরোনো ভবনগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছিল।
তার মনে হলো, মানুষের জীবনে কিছু জিনিস আগে আসে মনে, পরে আসে হাতে।
রেসিডেন্ট কার্ডও হয়তো তেমনই।
আগে মানুষ স্বপ্নে নাগরিক হয়, পরে কাগজে।
⸻
অফিসের সামনে গিয়ে অনেক পরিচিত মুখ দেখা গেল।
কেউ নতুন কার্ড নিতে এসেছে।
কেউ স্বামীকে নিয়ে এসেছে।
কেউ বন্ধুকে।
কেউ আবার একা।
কিন্তু সবার মুখে একই ধরনের অপেক্ষা।
যে অপেক্ষা প্রবাসীরা খুব ভালো চেনে।
দরজা খুলল।
নাম ডাকা শুরু হলো।
একজন বের হয়ে এসে কার্ড হাতে নিয়ে এমনভাবে তাকালেন, যেন বহুদিন পর নিজের মুখ আয়নায় দেখেছেন।
আরেকজন কার্ডটা বুকে চেপে ধরে ফোন করলেন দেশে।
“হ্যাঁ মা, হয়ে গেছে।”
ওপাশ থেকে কী বলা হলো, শোনা গেল না।
কিন্তু লোকটার চোখ দেখে বোঝা গেল, কথাগুলো খুব সাধারণ নয়।
ফিরোজ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখে তখন মাদ্রিদের অফিস নেই।
সে হয়তো দেখছিল একটা কাঁচা রাস্তা।
একটা নদী।
একটা ঘাট।
কয়েকটা আবাবিল।
আর দূরে তার গ্রামের বিকেল।
⸻
“ফিরোজ।”
নামটা ডাকল ভেতর থেকে।
ফিরোজ একবার সুমুর দিকে তাকাল।
“যাই।”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“যা।”
কয়েক মিনিট পর ফিরোজ বেরিয়ে এল।
তার হাতে ছোট্ট একটা কার্ড।
কিন্তু তার চোখে তখন একটা বিশাল আকাশ।
সে কার্ডটা সুমুর হাতে দিয়ে বলল,
“ধর।”
সুমু কার্ডটা দেখল।
তারপর ফিরোজের দিকে তাকাল।
“খুশি?”
ফিরোজ বলল,
“খুশি না।”
“তাহলে?”
“মুক্তির মতো লাগছে।”
সুমু কার্ডটা ফেরত দিয়ে বলল,
“এটা যত্ন করে রাখিস।”
ফিরোজ কার্ডটা পকেটে রাখল।
তারপর বলল,
“এখন দেশে যাব।”
“কবে?”
“যেদিন টিকিট কেটে ফেলব, সেদিন।”
“আর আবাবিল ঘাট?”
“ওটা তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
⸻
সেদিন বিকেলে তারা একটা ছোট কফিশপে বসেছিল।
ফিরোজ কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জানিস সুমু, মানুষ ভাবে সে দেশ ছেড়ে আসে।”
“আসলে?”
“আসলে দেশটা মানুষের ভেতর থেকে যায় না।”
সুমু হাসল।
“এই কথাটা তুই কোথায় শিখলি?”
ফিরোজ বলল,
“আবাবিল ঘাটে।”
দুজনেই চুপ করে গেল।
কিছু কথা উত্তর চায় না।
⸻
কিন্তু সেদিনের আনন্দের মাঝেও একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
সুমুর ফোনে একটা মেসেজ এল।
কোনো নাম নেই।
শুধু একটা ছবি।
ছবিতে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল।
তার ওপর রাখা একটি নীল ব্যাগ।
কিন্তু এবার ব্যাগটা একা নয়।
তার পাশে রাখা একটি পুরোনো রেসিডেন্ট কার্ডের ফটোকপি।
ছবিটা এত পুরোনো যে লেখা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না।
সুমু ছবিটা বড় করল।
তারপর থেমে গেল।
কার্ডের নামটা পড়া যাচ্ছে না।
শুধু শেষের কয়েকটা অক্ষর দেখা যাচ্ছে।
…LAIMAN
সুমুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সুলাইমান?
অসম্ভব।
সুমু আবার ছবিটা বড় করল।
নীল ব্যাগটার ওপর একটা ছোট কাগজ রাখা।
স্প্যানিশ ভাষায় মাত্র তিনটি শব্দ।
“No lo abras.”
খুলবে না।
সুমু কিছুক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ফোনে আরেকটা মেসেজ এল।
এবার লেখা,
“আজ ফিরোজ কার্ড পেল।
সবাই ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু কেউ কেউ ঘরে ফেরার আগে জানতে পারে, সে আসলে কী রেখে গিয়েছিল।”
সুমু মেসেজটা কয়েকবার পড়ল।
তারপর ফিরোজের দিকে তাকাল।
ফিরোজ তখন নিজের রেসিডেন্ট কার্ড বের করে হাসতে হাসতে বলছে,
“দেখ, এবার আমি সত্যিই বৈধ মানুষ!”
সুমু হাসল।
কিন্তু তার চোখের ভেতর হাসি এল না।
কারণ সে জানত, মাদ্রিদে কিছু গল্প কাগজে শুরু হয় না।
কিছু গল্প শুরু হয় একটা পুরোনো ব্যাগ দিয়ে।
আর কিছু ব্যাগ মানুষের জিনিস বহন করে না।
বহন করে মানুষের ফেলে আসা জীবন।
⸻
সন্ধ্যায় সুমু একা হাঁটছিল।
মাদ্রিদের বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে।
রাস্তার আলো একে একে জ্বলছে।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সুমু ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব শান্ত একটা পুরুষ কণ্ঠ বলল,
“সুমু।”
“কে?”
“আজ ফিরোজ কার্ড পেয়েছে, তাই না?”
সুমু চুপ।
লোকটা বলল,
“ওকে দেশে যেতে দিস।”
“কেন?”
“কারণ কিছু মানুষকে ঘরে ফিরতে হয়।”
একটু বিরতি।
“আর কিছু মানুষকে ফিরতে হয় সেই জায়গায়, যেখানে তারা কখনো ছিল না।”
সুমুর গলা শুকিয়ে গেল।
“আপনি কে?”
ওপাশ থেকে এবার একটা প্রশ্ন এল।
“চৌধুরী সাহেব কি তোকে কখনো বলেছে, সুলাইমানের প্রথম রেসিডেন্ট কার্ড কোথায় তৈরি হয়েছিল?”
সুমু উত্তর দেওয়ার আগেই কল কেটে গেল।
সে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
মাদ্রিদ তার চারপাশে আগের মতোই চলছে।
বাস যাচ্ছে।
মানুষ হাঁটছে।
কফিশপে আলো জ্বলছে।
কেউ জানে না, একটা ফোনকল কখনো কখনো মানুষের পরিচিত পৃথিবীর ভেতর একটা অচেনা দরজা খুলে দেয়।
সুমু ধীরে ধীরে ফোনটা পকেটে রাখল।
তার মনে হলো,
ফিরোজ আজ রেসিডেন্ট কার্ড পেয়েছে।
আর ঠিক সেই দিনই, সুমুর সামনে খুলে গেল অন্য এক রেসিডেন্টের পুরোনো জীবন।
একজনের কার্ড তাকে ঘরে ফেরার রাস্তা দেখাচ্ছে।
অন্যজনের কার্ড হয়তো খুলে দেবে এমন এক দরজা,
যার ওপাশে আছে নীল ব্যাগ।
সুলাইমান।
চৌধুরী সাহেব।
আর এমন একটি সত্য,
যেটা এতদিন ধরে কেউ কারও কাছে পুরোপুরি বলেনি।
চলবে.......