20/08/2026
ভয়েস অব মাদ্রিদে
ইউরোর ওপারে
পর্ব ৯ : ফেসবুকের দেশ,বাস্তবের স্পেন
স্পেনে আসার পর প্রথম পনেরো দিনের হোমওয়ার্কটা রাশেদের কাছে প্রথমে বেশ অদ্ভুত মনে হয়েছিল।
কাজ নেই।
পরিচিত মানুষ নেই।
ভাষা নেই।
অথচ সুমু তাকে বলেছে,
“কাজ খুঁজবে না।আগে মাদ্রিদকে খুঁজে বের করো।”
প্রথম দিন বাসে উঠেছিল ভয়ে ভয়ে।
তৃতীয় দিন আর জানালার পাশে বসে শহর দেখছিল না।
চোখ তখন খুঁজছিল,
মানুষ কোথায় বেশি?
দোকান কোথায় বেশি? কোন এলাকায় ব্যবসা বেশি? কোন রাস্তায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ততা?
কারণ সুমু তাকে একটা জিনিস শিখিয়েছিল,
“চাকরি খুঁজতে গেলে শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা স্পেনভিত্তিক ফেইসবুক গ্রুপের জব পোস্ট দেখো না। যেখানে মানুষ কাজ করে,সেই মানুষগুলোকে দেখো।”
⸻
সেদিন দুপুরে রাশেদ একটা বাস থেকে নামল।
জায়গাটা তার ভালো লাগল।
একটার পর একটা দোকান।
ক্যাফে।
রেস্টুরেন্ট।
ছোট ব্যবসা।
মানুষের আনাগোনা।
সে খাতায় লিখল,
“এই এলাকাটা মনে রাখতে হবে।”
ঠিক তখন পাশের একটা দোকান থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে তাকে কিছু একটা বলল।
রাশেদ কিছুই বুঝল না।
লোকটা আবার বলল।
রাশেদ এবার নিজের শেখা স্প্যানিশের ভাণ্ডার খুলে বলল,
“Hola.”
লোকটা তাকিয়ে রইল।
রাশেদ আরও সাহস নিয়ে বলল,
“Buenos días.”
লোকটা এবার হাসল।
তারপর দ্রুত কিছু একটা বলল।
রাশেদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে শুধু বলল,
“Sorry…”
লোকটা ভেতরে চলে গেল।
রাশেদ ফোন বের করল।
তৌফিক মাস্টারকে মেসেজ করল,
“ভাই, আজকে বুঝলাম ‘Hola’ দিয়ে জীবন চলে না।”
তৌফিক ভাই উত্তর দিল,
“এখনও দেরি হয়নি। জীবন শুরুই হয়নি। অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত আসো।”
রাশেদ হাসল।
খাতায় আরেকটা লাইন লিখল।
“আজকের শিক্ষা: ভাষা না জানলে শহরটা সুন্দর, কিন্তু শহরের দরজা বন্ধ।”
⸻
এদিকে সুমু বসেছিল ইউরোপ চাচার সঙ্গে।
সঙ্গে আফ্রিদি।
তিনজনের সামনে কফি।
আফ্রিদি ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করছে।
হঠাৎ সে বলল,
“চাচা!”
হারুন ভাই বললেন,
“কী হইছে?”
“আমাদের এক ভাই সুইডেনে থাকে।”
“ভালো।”
“কিন্তু আজকে দেখলাম, সে মাদ্রিদে!”
হারুন ভাই কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,
“ফেসবুকে?”
“জি।”
“তাহলে সে সুইডেনে নেই।”
আফ্রিদি অবাক।
“কীভাবে?”
হারুন ভাই বললেন,
“ফেসবুকে যারা থাকে, তারা পৃথিবীর সব দেশেই থাকে।”
সুমু হেসে ফেলল।
আফ্রিদি বলল,
“মানে?”
হারুন ভাই ফোনটা হাতে নিলেন।
“দেখ, লোকটা ছবি দিয়েছে মাদ্রিদের একটা রাস্তায়। ক্যাপশনে লিখেছে, ‘Missing Sweden.’”
আফ্রিদি বলল,
“তাহলে?”
“তাহলে লোকটা স্পেনে বসে সুইডেনকে মিস করছে।”
“কিন্তু তার প্রোফাইলে তো এখনো লেখা, ‘Lives in Sweden’!”
হারুন ভাই গম্ভীর হয়ে বললেন,
“ওটাই আসল ব্যাপার।মানুষ শরীর নিয়ে স্পেনে চলে এসেছে,কিন্তু ফেসবুকের ঠিকানাটা এখনো সুইডেনে ভাড়া থাকে।”
সুমু এবার আর হাসি থামাতে পারল না।
⸻
আফ্রিদি বলল,
“চাচা, শুধু সুইডেন কেন? ডেনমার্ক, নরওয়ে,ফিনল্যান্ড থেকেও অনেকে এখানে আসে।”
হারুন ভাই মাথা নাড়লেন।
“আসে।”
“পরিবার নিয়েও আসে।”
“আসে।”
“কিন্তু ফেসবুক খুললে মনে হয় এখনো ওখানেই আছে।”
হারুন ভাই বললেন,
“এটা হলো প্রবাসীর আরেক ধরনের নাগরিকত্ব।”
“কী?”
“বাস্তবে এক দেশ।ফেসবুকে আরেক দেশ।”
আফ্রিদি হেসে কফিতে চুমুক দিল।
“তাহলে আমি কী?”
হারুন ভাই বললেন,
“তুই এখনো কোনো দেশের না।”
“কেন?”
“তোর ফেসবুকে তুই প্রতিদিন নতুন দেশ আবিষ্কার করিস।”
সুমু বলল,
“আফ্রিদি,গতকাল তো দেখলাম তুই ফেইসবুকে লিখেছিস, ‘Living my best life in Madrid.’”
আফ্রিদি গম্ভীর হয়ে বলল,
“সেটা সত্যি।”
চাচা মাথা নেড়ে বললেন,
“তাহলে তোর মাদ্রিদটা আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি।”
আবার হাসির রোল উঠল।
⸻
কিন্তু হাসির আড়ালে কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে ছিল না।
স্পেনে বসবাসকারী বিদেশিদের সংখ্যা কম নয়। সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের শেষে স্পেনে বৈধ আবাসন নথি থাকা বিদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন।
অর্থাৎ ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়।
তবে প্রতিটি মানুষের স্পেনে আসার কারণ এক নয়।
কেউ কাজের জন্য।
কেউ পরিবারের জন্য।
কেউ ব্যবসার জন্য।
কেউ জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য।
আর কেউ হয়তো শুধু এমন একটা জায়গা খুঁজতে আসে, যেখানে তার আগামীকালটা গতকালের মতো না হয়।
তাই ইউরো চাচার কথাটা ছিল ঠাট্টা।
কিন্তু ঠাট্টার ভেতরে একটা সত্যি লুকিয়ে ছিল।
মানুষ কখনো কখনো দেশ বদলায়, কিন্তু নিজের পুরোনো পরিচয়টা বদলাতে চায় না।
⸻
আফ্রিদি হঠাৎ বলল,
“চাচা, একটা কথা বলি?”
“বল।”
“আচ্ছা এরা স্পেনেই রেসিডেন্সি পেতে চায় আবার স্পেনকে একটু খাটো মনে করে কেন?”
ব্যাপারটা কেমন না??
চাচা কফির কাপটা নামিয়ে রাখলেন।
“কারণ তারা ইউরোপকে দেশ দিয়ে মাপে।”
“মানে?”
“সুইডেন দেখলে বলে উন্নত। ডেনমার্ক দেখলে বলে উন্নত। নরওয়ে দেখলে বলে উন্নত। ফিনল্যান্ড দেখলে বলে উন্নত।”
“আর স্পেন?”
হারুন ভাই হেসে বললেন,
“স্পেনকে দেখে বলে, ‘ওখানে তো গরম বেশি।’”
সুমু বলল,
“চাচা, আপনি তো স্পেনে থাকেন।”
“এই জন্যই তো জানি।”
“তাহলে স্পেনের সমস্যা কী?”
চাচা বললেন,
“সমস্যা স্পেনের না।”
“তাহলে?”
“সমস্যা আমাদের চোখের।”
আফ্রিদি চুপ করে গেল।
হারুন ভাই আবার বললেন,
“আমরা অনেক সময় দেশের উন্নতি দেখি গাড়ির দাম দিয়ে, বাড়ির উচ্চতা দিয়ে, শীতের তীব্রতা দিয়ে। কিন্তু মানুষ কতটা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে, সেটা দেখি না।”
সুমু চুপচাপ শুনছিল।
চাচা বললেন,
“যে মানুষটা আজ সকালে মেট্রোতে উঠে কাজে গেল, দুপুরে কফি খেল, সন্ধ্যায় সন্তানকে পার্কে নিয়ে গেল, রাতে বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমাল… তার জীবনও তো উন্নত।”
আফ্রিদি বলল,
“তাহলে ফেসবুক?”
চাচা হেসে বললেন,
“ফেসবুককে থাকতে দে।ওর নিজের কোনো দেশ নেই।”
⸻
ঠিক তখন সুমুর ফোনে মেসেজ এল।
রাশেদ।
“ভাই, আজ একটা উবিকাসিয়ন পেয়েছি। কাজের সম্ভাবনা মনে হচ্ছে।”
সুমু উত্তর দিল,
“কোথায়?”
রাশেদ এলাকার নাম পাঠাল।
সুমু একটু অবাক হলো।
এটাই সেই এলাকা,যেটা রাশেদ গত কয়েকদিন ধরে বাসে ঘুরে চিনেছে।
সে লিখল,
“ভালো। কাল আবার যাও। এবার শুধু রাস্তা দেখবে না। দোকানগুলো দেখবে। কোনটা বড়, কোনটা ছোট, কোনটায় কর্মচারী বেশি, কোন ব্যবসা কীভাবে চলে, খেয়াল করবে।”
রাশেদ লিখল,
“কাজের আগে আবার পড়াশোনা?”
সুমু লিখল,
“হ্যাঁ। কারণ কাজ পেলে কাজ করবে। কিন্তু শহর চিনে ফেললে সুযোগ চিনতে পারবে।”
কিছুক্ষণ পর রাশেদের উত্তর এল,
“বুঝতে পারছি ইউরো ভাই।”
সুমু ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তার নিজের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।
এই ছিল তার আসল কাজ।
সে কাউকে সারাজীবন ধরে টেনে নিয়ে যাবে না।
শুধু প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে সাহায্য করবে।
তারপর মানুষটাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেবে।
কারণ অতিরিক্ত সাহায্য কখনো কখনো মানুষের হাত শক্ত করে না।
বরং নিজের হাতের ওপর বিশ্বাস কমিয়ে দেয়।
⸻
রাত গভীর হলো।
সুমু বাসায় ফিরল।
দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই থেমে গেল।
নীল ব্যাগটা যেখানে ছিল, সেখানে নেই।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগল।
সে ঘরটা ভালো করে দেখল।
তারপর বিছানার পাশে একটা কাগজ।
তাতে লেখা:
“তুমি শহর চিনতে মানুষকে পাঠাচ্ছ।”
সুমুর চোখ আটকে গেল।
নিচে আরেকটা লাইন।
“কিন্তু তুমি কি নিজেই জানো, এই শহরের কতটা এখনো তোমার অচেনা?”
তারপর তৃতীয় লাইন।
“শুক্রবার বিকেল পাঁচটা। প্লাজা মেয়র।”
সুমু কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
নীল ব্যাগ নেই।
কিন্তু রহস্যটা যেন আরও কাছে চলে এসেছে।
ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।
অচেনা নম্বর।
সুমু ধরল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।
তারপর খুব শান্ত একটা কণ্ঠ বলল,
“ইউরো ভাই?”
সুমু বলল,
“জি।”
“রাশেদকে কাজের ব্যবস্থা করে দিয়ো না।”
সুমুর কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।
“আপনি কে?”
ওপাশ থেকে মৃদু হাসি।
“যে মানুষটা চায়, সে যেন নিজের কাজটা নিজেই খুঁজে পায়।”
সুমু চুপ।
লোকটা আবার বলল,
“আপনি তো সেটাই শেখাচ্ছেন, তাই না?”
কল কেটে গেল।
সুমু কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
মাদ্রিদের আলো আজ অন্যরকম লাগছে।
হয়তো শহরটা সত্যিই তাকে চিনতে শুরু করেছে।
কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছে।
কে ফোন করেছিল?
আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন…
নীল ব্যাগটা গেল কোথায়?
চলবে.....