Voice of Madrid

Voice of Madrid Información de contacto, mapa y direcciones, formulario de contacto, horario de apertura, servicios, puntuaciones, fotos, videos y anuncios de Voice of Madrid, Medio de comunicación/noticias, Avenida De Nuestra Señora De Valvanera, 91, Madrid.

Madrid,Spain's central capital,is a city of elegant boulevards and expansive,manicured parks such as the Buen Retiro.It’s renowned for its rich repositories of European art.It’s mostly renowed for Football clubs including Real Madrid FC.🇪🇸🇪🇺🇪🇸

21/08/2026

বারেক ভাইয়ের ফেবারেবল আসছে!!
এমন আনন্দের সংবাদে ভরে যাক আমাদের চারিধার🇪🇸🇪🇸

20/08/2026

ভয়েস অব মাদ্রিদে

ইউরোর ওপারে

পর্ব ৯ : ফেসবুকের দেশ,বাস্তবের স্পেন

স্পেনে আসার পর প্রথম পনেরো দিনের হোমওয়ার্কটা রাশেদের কাছে প্রথমে বেশ অদ্ভুত মনে হয়েছিল।

কাজ নেই।

পরিচিত মানুষ নেই।

ভাষা নেই।

অথচ সুমু তাকে বলেছে,

“কাজ খুঁজবে না।আগে মাদ্রিদকে খুঁজে বের করো।”

প্রথম দিন বাসে উঠেছিল ভয়ে ভয়ে।

তৃতীয় দিন আর জানালার পাশে বসে শহর দেখছিল না।

চোখ তখন খুঁজছিল,

মানুষ কোথায় বেশি?
দোকান কোথায় বেশি? কোন এলাকায় ব্যবসা বেশি? কোন রাস্তায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ততা?

কারণ সুমু তাকে একটা জিনিস শিখিয়েছিল,

“চাকরি খুঁজতে গেলে শুধু চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা স্পেনভিত্তিক ফেইসবুক গ্রুপের জব পোস্ট দেখো না। যেখানে মানুষ কাজ করে,সেই মানুষগুলোকে দেখো।”



সেদিন দুপুরে রাশেদ একটা বাস থেকে নামল।

জায়গাটা তার ভালো লাগল।

একটার পর একটা দোকান।

ক্যাফে।

রেস্টুরেন্ট।

ছোট ব্যবসা।

মানুষের আনাগোনা।

সে খাতায় লিখল,

“এই এলাকাটা মনে রাখতে হবে।”

ঠিক তখন পাশের একটা দোকান থেকে একজন লোক বেরিয়ে এসে তাকে কিছু একটা বলল।

রাশেদ কিছুই বুঝল না।

লোকটা আবার বলল।

রাশেদ এবার নিজের শেখা স্প্যানিশের ভাণ্ডার খুলে বলল,

“Hola.”

লোকটা তাকিয়ে রইল।

রাশেদ আরও সাহস নিয়ে বলল,

“Buenos días.”

লোকটা এবার হাসল।

তারপর দ্রুত কিছু একটা বলল।

রাশেদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

সে শুধু বলল,

“Sorry…”

লোকটা ভেতরে চলে গেল।

রাশেদ ফোন বের করল।

তৌফিক মাস্টারকে মেসেজ করল,

“ভাই, আজকে বুঝলাম ‘Hola’ দিয়ে জীবন চলে না।”

তৌফিক ভাই উত্তর দিল,

“এখনও দেরি হয়নি। জীবন শুরুই হয়নি। অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত আসো।”

রাশেদ হাসল।

খাতায় আরেকটা লাইন লিখল।

“আজকের শিক্ষা: ভাষা না জানলে শহরটা সুন্দর, কিন্তু শহরের দরজা বন্ধ।”



এদিকে সুমু বসেছিল ইউরোপ চাচার সঙ্গে।

সঙ্গে আফ্রিদি।

তিনজনের সামনে কফি।

আফ্রিদি ফোনে ফেসবুক স্ক্রল করছে।

হঠাৎ সে বলল,

“চাচা!”

হারুন ভাই বললেন,

“কী হইছে?”

“আমাদের এক ভাই সুইডেনে থাকে।”

“ভালো।”

“কিন্তু আজকে দেখলাম, সে মাদ্রিদে!”

হারুন ভাই কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন,

“ফেসবুকে?”

“জি।”

“তাহলে সে সুইডেনে নেই।”

আফ্রিদি অবাক।

“কীভাবে?”

হারুন ভাই বললেন,

“ফেসবুকে যারা থাকে, তারা পৃথিবীর সব দেশেই থাকে।”

সুমু হেসে ফেলল।

আফ্রিদি বলল,

“মানে?”

হারুন ভাই ফোনটা হাতে নিলেন।

“দেখ, লোকটা ছবি দিয়েছে মাদ্রিদের একটা রাস্তায়। ক্যাপশনে লিখেছে, ‘Missing Sweden.’”

আফ্রিদি বলল,

“তাহলে?”

“তাহলে লোকটা স্পেনে বসে সুইডেনকে মিস করছে।”

“কিন্তু তার প্রোফাইলে তো এখনো লেখা, ‘Lives in Sweden’!”

হারুন ভাই গম্ভীর হয়ে বললেন,

“ওটাই আসল ব্যাপার।মানুষ শরীর নিয়ে স্পেনে চলে এসেছে,কিন্তু ফেসবুকের ঠিকানাটা এখনো সুইডেনে ভাড়া থাকে।”

সুমু এবার আর হাসি থামাতে পারল না।



আফ্রিদি বলল,

“চাচা, শুধু সুইডেন কেন? ডেনমার্ক, নরওয়ে,ফিনল্যান্ড থেকেও অনেকে এখানে আসে।”

হারুন ভাই মাথা নাড়লেন।

“আসে।”

“পরিবার নিয়েও আসে।”

“আসে।”

“কিন্তু ফেসবুক খুললে মনে হয় এখনো ওখানেই আছে।”

হারুন ভাই বললেন,

“এটা হলো প্রবাসীর আরেক ধরনের নাগরিকত্ব।”

“কী?”

“বাস্তবে এক দেশ।ফেসবুকে আরেক দেশ।”

আফ্রিদি হেসে কফিতে চুমুক দিল।

“তাহলে আমি কী?”

হারুন ভাই বললেন,

“তুই এখনো কোনো দেশের না।”

“কেন?”

“তোর ফেসবুকে তুই প্রতিদিন নতুন দেশ আবিষ্কার করিস।”

সুমু বলল,

“আফ্রিদি,গতকাল তো দেখলাম তুই ফেইসবুকে লিখেছিস, ‘Living my best life in Madrid.’”

আফ্রিদি গম্ভীর হয়ে বলল,

“সেটা সত্যি।”

চাচা মাথা নেড়ে বললেন,

“তাহলে তোর মাদ্রিদটা আমরা এখনো আবিষ্কার করতে পারিনি।”

আবার হাসির রোল উঠল।



কিন্তু হাসির আড়ালে কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে ছিল না।

স্পেনে বসবাসকারী বিদেশিদের সংখ্যা কম নয়। সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের শেষে স্পেনে বৈধ আবাসন নথি থাকা বিদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন।

অর্থাৎ ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা কোনো অদ্ভুত ঘটনা নয়।

তবে প্রতিটি মানুষের স্পেনে আসার কারণ এক নয়।

কেউ কাজের জন্য।

কেউ পরিবারের জন্য।

কেউ ব্যবসার জন্য।

কেউ জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য।

আর কেউ হয়তো শুধু এমন একটা জায়গা খুঁজতে আসে, যেখানে তার আগামীকালটা গতকালের মতো না হয়।

তাই ইউরো চাচার কথাটা ছিল ঠাট্টা।

কিন্তু ঠাট্টার ভেতরে একটা সত্যি লুকিয়ে ছিল।

মানুষ কখনো কখনো দেশ বদলায়, কিন্তু নিজের পুরোনো পরিচয়টা বদলাতে চায় না।



আফ্রিদি হঠাৎ বলল,

“চাচা, একটা কথা বলি?”

“বল।”

“আচ্ছা এরা স্পেনেই রেসিডেন্সি পেতে চায় আবার স্পেনকে একটু খাটো মনে করে কেন?”
ব্যাপারটা কেমন না??

চাচা কফির কাপটা নামিয়ে রাখলেন।

“কারণ তারা ইউরোপকে দেশ দিয়ে মাপে।”

“মানে?”

“সুইডেন দেখলে বলে উন্নত। ডেনমার্ক দেখলে বলে উন্নত। নরওয়ে দেখলে বলে উন্নত। ফিনল্যান্ড দেখলে বলে উন্নত।”

“আর স্পেন?”

হারুন ভাই হেসে বললেন,

“স্পেনকে দেখে বলে, ‘ওখানে তো গরম বেশি।’”

সুমু বলল,

“চাচা, আপনি তো স্পেনে থাকেন।”

“এই জন্যই তো জানি।”

“তাহলে স্পেনের সমস্যা কী?”

চাচা বললেন,

“সমস্যা স্পেনের না।”

“তাহলে?”

“সমস্যা আমাদের চোখের।”

আফ্রিদি চুপ করে গেল।

হারুন ভাই আবার বললেন,

“আমরা অনেক সময় দেশের উন্নতি দেখি গাড়ির দাম দিয়ে, বাড়ির উচ্চতা দিয়ে, শীতের তীব্রতা দিয়ে। কিন্তু মানুষ কতটা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারে, সেটা দেখি না।”

সুমু চুপচাপ শুনছিল।

চাচা বললেন,

“যে মানুষটা আজ সকালে মেট্রোতে উঠে কাজে গেল, দুপুরে কফি খেল, সন্ধ্যায় সন্তানকে পার্কে নিয়ে গেল, রাতে বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমাল… তার জীবনও তো উন্নত।”

আফ্রিদি বলল,

“তাহলে ফেসবুক?”

চাচা হেসে বললেন,

“ফেসবুককে থাকতে দে।ওর নিজের কোনো দেশ নেই।”



ঠিক তখন সুমুর ফোনে মেসেজ এল।

রাশেদ।

“ভাই, আজ একটা উবিকাসিয়ন পেয়েছি। কাজের সম্ভাবনা মনে হচ্ছে।”

সুমু উত্তর দিল,

“কোথায়?”

রাশেদ এলাকার নাম পাঠাল।

সুমু একটু অবাক হলো।

এটাই সেই এলাকা,যেটা রাশেদ গত কয়েকদিন ধরে বাসে ঘুরে চিনেছে।

সে লিখল,

“ভালো। কাল আবার যাও। এবার শুধু রাস্তা দেখবে না। দোকানগুলো দেখবে। কোনটা বড়, কোনটা ছোট, কোনটায় কর্মচারী বেশি, কোন ব্যবসা কীভাবে চলে, খেয়াল করবে।”

রাশেদ লিখল,

“কাজের আগে আবার পড়াশোনা?”

সুমু লিখল,

“হ্যাঁ। কারণ কাজ পেলে কাজ করবে। কিন্তু শহর চিনে ফেললে সুযোগ চিনতে পারবে।”

কিছুক্ষণ পর রাশেদের উত্তর এল,

“বুঝতে পারছি ইউরো ভাই।”

সুমু ফোনটা নামিয়ে রাখল।

তার নিজের অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

এই ছিল তার আসল কাজ।

সে কাউকে সারাজীবন ধরে টেনে নিয়ে যাবে না।

শুধু প্রথম ধাক্কাটা সামলাতে সাহায্য করবে।

তারপর মানুষটাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দেবে।

কারণ অতিরিক্ত সাহায্য কখনো কখনো মানুষের হাত শক্ত করে না।

বরং নিজের হাতের ওপর বিশ্বাস কমিয়ে দেয়।



রাত গভীর হলো।

সুমু বাসায় ফিরল।

দরজা খুলে ঘরে ঢুকেই থেমে গেল।

নীল ব্যাগটা যেখানে ছিল, সেখানে নেই।

তার বুকের ভেতর কেমন একটা ধাক্কা লাগল।

সে ঘরটা ভালো করে দেখল।

তারপর বিছানার পাশে একটা কাগজ।

তাতে লেখা:

“তুমি শহর চিনতে মানুষকে পাঠাচ্ছ।”

সুমুর চোখ আটকে গেল।

নিচে আরেকটা লাইন।

“কিন্তু তুমি কি নিজেই জানো, এই শহরের কতটা এখনো তোমার অচেনা?”

তারপর তৃতীয় লাইন।

“শুক্রবার বিকেল পাঁচটা। প্লাজা মেয়র।”

সুমু কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

নীল ব্যাগ নেই।

কিন্তু রহস্যটা যেন আরও কাছে চলে এসেছে।

ঠিক তখন ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

সুমু ধরল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।

তারপর খুব শান্ত একটা কণ্ঠ বলল,

“ইউরো ভাই?”

সুমু বলল,

“জি।”

“রাশেদকে কাজের ব্যবস্থা করে দিয়ো না।”

সুমুর কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল।

“আপনি কে?”

ওপাশ থেকে মৃদু হাসি।

“যে মানুষটা চায়, সে যেন নিজের কাজটা নিজেই খুঁজে পায়।”

সুমু চুপ।

লোকটা আবার বলল,

“আপনি তো সেটাই শেখাচ্ছেন, তাই না?”

কল কেটে গেল।

সুমু কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

মাদ্রিদের আলো আজ অন্যরকম লাগছে।

হয়তো শহরটা সত্যিই তাকে চিনতে শুরু করেছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরছে।

কে ফোন করেছিল?

আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন…

নীল ব্যাগটা গেল কোথায়?

চলবে.....

18/08/2026

ভয়েস অব মাদ্রিদে

ইউরোর ওপারে

পর্ব ৮ : মাদ্রিদকে আগে চিনে নাও

বিদেশে নতুন আসা মানুষদের একটা অদ্ভুত তাড়া থাকে।

বিমান থেকে নামার পরদিনই তারা কাজ খোঁজে।

তারপর বাসা।

তারপর কাগজপত্র।

তারপর দেশে টাকা পাঠানোর চিন্তা।

সবকিছু যেন একসঙ্গে করতে হবে।

কিন্তু সুমুর ধারণা ছিল একটু ভিন্ন।

বিদেশে এসে প্রথম কাজ টাকা উপার্জন নয়।

প্রথম কাজ হলো,

নিজেকে দাঁড় করানো।

কারণ যে মানুষটা শহর চেনে না, ভাষা বোঝে না, যাতায়াত জানে না, নিজের প্রয়োজন নিজে মেটাতে পারে না, তাকে ভালো একটা চাকরি দিলেও সে হয়তো বেশিদিন টিকতে পারবে না।

সুমু তাই নতুনদের একটা কথা প্রায়ই বলত,

“কাজ পাওয়ার আগে শহরটাকে চিনে নাও। তারপর শহরের কাছে নিজের দাম তৈরি করো।”



সেদিন সন্ধায় সুমুর ফোন বেজে উঠল।
এখনো সে কাজেই আছে

অপরিচিত নম্বর।

“হ্যালো?”

ওপাশে একটা কাঁপা কণ্ঠ।

“ভাই… আপনি কি সুমু ভাই?”

“জি।”

“আমি মাদ্রিদে নতুন আসছি। একটু বিপদে পড়েছি। আপনার নম্বরটা বাংলাদেশে থাকা একজন পরিচিতের কাছ থেকে পেলাম।”

“আপনি কোথায়?”

“আতচা।”

সুমু কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

“ওখানেই থাকেন। আমি কাজে আছি।”
কাজ শেষ করে আসতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগবে।

“ভাই…”

“জি?”

“আপনি আসবেন তো?”

সুমু হেসে বলল,

“ফোন করে তো আর আপনাকে মাদ্রিদের মানচিত্র পাঠাতে পারি না। আসছি অপেক্ষা করুন।”


সন্ধা ৮ টার পর কাজ শেষে
আতচা যাওয়ার পথে সুমু Villaverde Alto-তে পরিচিত একজনকে ফোন দিল।

“ভাই, একটা ছেলে এসেছে। থাকার ব্যবস্থা দরকার।”

“কত বাজেট?”

“বাজেট তো বলতে পারবো না কিন্তু সিট লাগবেই।যেহেতু নতুন আসছে কমের মধ্যে হলে ভালো।”

ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর,

“একটা সিট আছে।”

“কোথায়?”

“Villaverde Alto।”

“কত?”

“থাকা-খাওয়া মিলিয়ে ৪৫০।”

সুমু একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
তাহলে তো সোনায় সোহাগা।

“রুমে কয়জন?”

“চারজন।”

“সিট?”

“দোতলার খাটে একটা আছে।”

সুমু বলল,

“আমি ছেলেটাকে নিয়ে আসছি।”



আতচায় পৌঁছে সুমু ছেলেটাকে চিনতে খুব একটা কষ্ট পেল না।

একটা ছোট ব্যাগ।

হাতে ফোন।

চোখে উদ্বেগ।

সুমুকে দেখেই এগিয়ে এল।

“সুমু ভাই?”

“জি। আপনি?”

“রাশেদ।”

“কেমন আছেন?”

রাশেদ মৃদু হাসল।

“এখন মনে হচ্ছে একটু ভালো আছি।”

সুমু বলল,

“চলুন।”

কিছুদূর হাঁটার পর রাশেদ হঠাৎ বলল,

“ভাই, একটা কথা বলি?”

“বলুন।”

“আমি আসার আগেই মুন্না নামে একটা ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল।”

“কেন?”

“বলেছিল, থাকার জন্য একটা সিট দেবে।”

সুমু চুপ করে শুনছিল।

“আগেই ৪০০ ইউরো নিয়ে নিয়েছে।”

“তারপর?”

“এখন ফোন বন্ধ।”

সুমু থেমে গেল।

“কোনো রসিদ?”

রাশেদ মাথা নাড়ল।

“না।”

“ঠিকানা?”

“একটা দিয়েছিল। পরে দেখি ভুল।”

সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

প্রবাসে নতুন মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার অজ্ঞতা।

আর কিছু মানুষ সেই অজ্ঞতাকেই ব্যবসা বানিয়ে ফেলে।

সুমু শুধু বলল,

“যা হয়েছে হয়েছে। এখন থেকে একটা জিনিস মনে রাখবেন।”

“কী?”

“কাউকে টাকা দেওয়ার আগে যাচাই করবেন। শুধু পরিচিত কারও কথা শুনে নয়।”

রাশেদ মাথা নাড়ল।

“আর একটা কথা।”

“জি?”

“আমার ওপরও অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না।”

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

সুমু হেসে বলল,

“নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে শিখবেন। আজ আমি আপনাকে একটা সিটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কাল থেকে আপনাকেই নিজের পথ খুঁজতে হবে।”

রাশেদের মুখে প্রথমবার একটু আত্মবিশ্বাসের ছাপ দেখা গেল।



Villaverde Alto পৌঁছে সুমু তাকে সেই বাসায় নিয়ে গেল।

চারজনের জন্য একরুম।

দোতলার খাটে একটা খালি সিট।

রান্না, থাকা, দৈনন্দিন কিছু সুবিধা মিলিয়ে মাসে ৪৫০ ইউরো।

রাশেদ ঘরটা দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“ভাই, আমার তো মনে হচ্ছে আমি বেঁচে গেলাম।”

সুমু হেসে বলল,

“না।”

রাশেদ অবাক।

“কী?”

“আপনি শুধু একটা জায়গা পেলেন। বাঁচাটা আপনাকেই শিখতে হবে।”

রাশেদও এবার হেসে ফেলল।



সুমু যাওয়ার সময় বলল,

“আগামী পনেরো দিনের একটা হোমওয়ার্ক আছে।”

রাশেদ অবাক হয়ে তাকাল।

“হোমওয়ার্ক?”

“জি।”

“মনে মনে ভাবলো রাশেদ স্কুলে ভর্তি করলেন নাকি?”

“স্পেনে এসে সবাইকে আবার ছাত্র হতে হয়।”

“কী করতে হবে?”

সুমু বলল,

“প্রথমে একটা মেট্রো কার্ড করতে হবে। আমি আপনাকে সেটা করার পদ্ধতি বুঝিয়ে দেব।”

“তারপর?”

“তারপর শুরু হবে আসল পড়াশোনা।”

রাশেদ আগ্রহী হয়ে উঠল।

সুমু বলল,

“আগামী পনেরো দিন কাজ খোঁজার আগে মাদ্রিদকে চিনবেন।”



রাশেদ অবাক।

“শুধু ঘুরব?”

“ঘুরবেন না। শিখবেন।”

“কীভাবে?”

সুমু বলল,

“মেট্রো আপনাকে মাদ্রিদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাবে। কিন্তু মাদ্রিদকে দেখাবে না।”

“মানে?”

“মেট্রো বেশিরভাগ না প্রায় সবগুলো মেট্রোই মাটির নিচ দিয়ে যায়। দুই-তিনটা মেট্রো লাইন চিনলেই আপনি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন, কিন্তু শহরটা চিনবেন না।”

তারপর সুমু রাস্তার দিকে ইশারা করল।

“বাসে উঠবেন।”

“কোথায় যাব?”

“যেদিকে বাস যায়, সেদিকে।”
তবে মনে রাখবেন প্রায় সব বাসই আতচায় যায়।আতচা অথবা Cibilis কে কেন্দ্র করেই বাস গুলো মাদ্রিদের বিভিন্ন এরিয়ায় ছড়িয়ে যায়।

রাশেদ একটু ভয়ার্ত হয়ে বলল,

“এভাবে হারিয়ে গেলে?”

সুমু বলল,

“হারাবেন।”

“তাহলে?”

“হারিয়ে গিয়েই শহর চিনবেন।”



সুমুর চিন্তাভাবনা খুব সহজ।

প্রথম পনেরো দিন মাদ্রিদকে বাসে করে দেখো।

Zona A-র ভেতর যতটা সম্ভব বিভিন্ন রুটে যাতায়াত করো।

যে এলাকায় বাস যাচ্ছে, সেখানে নেমে পড়ো।

দেখো।

হাঁটো।

মানুষ দেখো।

দোকান দেখো।

সুপারমার্কেট দেখো।

রেস্টুরেন্ট দেখো।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখো।

কোন এলাকায় মানুষের আনাগোনা বেশি, কোথায় দোকানপাট বেশি, কোথায় শিল্পাঞ্চল, কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাংলাদেশি বা ল্যাটিনদের বসতি বেশি, কোথায় সকালটা ব্যস্ত, কোথায় সন্ধ্যাটা জীবন্ত…

সবকিছু চোখে রাখো।

কারণ কাজ শুধু চাকরির বিজ্ঞাপনে থাকে না।

কাজ মানুষের চলাফেরার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে।



সুমু বলল,

“একটা খাতা রাখবেন।”

রাশেদ বলল,

“কী লিখব?”

“যে এলাকাগুলো ভালো লাগছে, লিখবেন।”

“আর?”

“যে দোকানগুলোতে লোক বেশি, লিখবেন।”

“আর?”

“যে ব্যবসাগুলো আপনার আগ্রহের, লিখবেন।”

“আর?”

“কোন জায়গায় কাজের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে, লিখবেন।”

রাশেদ বলল,

“ভাই, এত কিছু মনে থাকবে?”

সুমু বলল,

“মনে রাখার দরকার নেই। লিখে রাখবেন।”

তারপর একটু থেমে যোগ করল,

“আমি আপনাকে কাজ খুঁজে দিতে পারি। কিন্তু নিজের চোখে কাজ চিনতে শেখাতে পারলে আপনার জীবনটাই বদলে যাবে।”

রাশেদ এবার মাথা নাড়ল।



পরদিন সকাল।
সুমু রাশেদকে কল দিয়ে SOL এর লোকেশন পাঠালো।
কিভাবে মেট্রো কার্ড করতে হবে সবকিছু বলে দিলো।
রাশেদ VILLAVERDE ALTO থেকে ৩ নং মেট্রো ধরে সলে গেলো।
সুমু তাকে একটি টিউটোরিয়াল ভিডিও পাঠিয়ে বলে এই ভিডিও টি দেখে মেট্রো কার্ড করে ফেলুন।
খুব কঠিন বিষয় হলেও মেট্রো কার্ড করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।

মেট্রো কার্ড হাতে নিয়ে রাশেদ সুমু কে কল দিয়ে বলে ভাই পেরেছি।
সুমু মুচকি হাসলো কিন্তু রাশেদকে কিছুই বুঝতে দিলো না।
রাশেদের কাছে বিষয়টি নতুন হলেও সুমুর কাছে এটা অহরহ কাজের একটি ধারাবাহিকতা।

মেট্রো কার্ড এক মাসের জন্য রিফিল করে
রাশেদ প্রথম বাসে উঠল।

জানালার পাশে বসেছে রাশেদ।

মাদ্রিদের রাস্তা একটার পর একটা পিছিয়ে যাচ্ছে।

মেট্রোতে যে শহরটা তার কাছে শুধু স্টেশন আর সাইনবোর্ড ছিল, বাসে সেই শহরটা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল।

মানুষ।

দোকান।

ক্যাফে।

স্কুল।

অফিস।

বৃদ্ধ মানুষ।

শিশু।

ল্যাটিন দোকান।

স্প্যানিশ বেকারি।

ছোট ছোট ব্যবসা।

আর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য Parada।

রাশেদ খাতাটা বের করল।

প্রথম পাতায় লিখল:

“আজ মাদ্রিদ আমাকে প্রথমবার নিজের মতো করে দেখাল।”



দুপুরে তৌফিকের অনলাইন স্প্যানিশ ক্লাস।

সাকিবও সেখানে।

রাশেদও যোগ দিল।

তৌফিক বলল,

“আজকের প্রথম শব্দ?”

সাকিব বলল,

“Hola!”

রাশেদ একটু সাহস করে বলল,

“Buenos días.”

তৌফিক বলল,

“খুব ভালো।”

আফ্রিদিও অনলাইনে ঢুকে পড়েছে।

তৌফিক বলল,

“আফ্রিদি, আপনি আজ কী শিখেছেন?”

আফ্রিদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,

“Gracias.”

তৌফিক বলল,

“আর?”

আফ্রিদি বলল,

“একটা আছে।”

“কী?”

আফ্রিদি খুব গম্ভীরভাবে বলল,

“Cerveza.”

তৌফিক কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল,

“আপনার স্প্যানিশ শিক্ষার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।”

সুমু হেসে ফেলল।

রাশেদও।



সন্ধ্যায় রাশেদ আবার সুমুকে ফোন করল।

“ভাই।”

“জি?”

“আজকে অনেক কিছু দেখলাম।”

“কী দেখলেন?”

“একটা এলাকায় অনেক রেস্টুরেন্ট। আরেক জায়গায় গাড়ির গ্যারেজ। একটা জায়গায় ছোট ছোট দোকান অনেক।”

“ভালো।”

“আর একটা ব্যাপার বুঝলাম।”

“কী?”

“আমি এতদিন ভাবছিলাম স্পেনে এসে আমাকে একটা কাজ খুঁজে নিতে হবে।”

“এখন?”

“এখন মনে হচ্ছে আমাকে আগে বুঝতে হবে, আমি কী কাজ করতে পারি আর এই শহরের কোথায় সেই কাজের দরকার আছে।”

সুমু মৃদু হাসল।

“এটাই আপনার প্রথম দিনের আসল লাভ।”



রাতের দিকে সুমু নিজের ঘরে ফিরে এল।

মাদ্রিদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে।

দিনভর মানুষের ফোন।

কাজের কথা।

বাসার কথা।

ভাষার কথা।

নতুনদের সংগ্রাম।

সবকিছু মিলিয়ে মাথাটা ভারী।

কিন্তু ঘুমানোর আগে তার চোখ আবার গিয়ে পড়ল সেই নীল ব্যাগটার ওপর।

ব্যাগটা যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।

নীরব।

অচল।

রহস্যময়।

সুমু এবারও ব্যাগ খুলল না।

শুধু দূর থেকে তাকিয়ে বলল,

“তোমার পালা আসবে।”

ঠিক তখন ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“রাশেদকে কাজ খুঁজে দিতে তাড়াহুড়ো কোরো না।”

সুমুর ভ্রু কুঁচকে গেল।

দ্বিতীয় মেসেজ।

“তাকে মাদ্রিদ চিনতে দাও।”

সুমু স্থির হয়ে গেল।

তৃতীয় মেসেজটা আসতে একটু সময় নিল।

তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল:

“কারণ যে মানুষ শহরকে চেনে, একদিন শহরও তাকে চিনে ফেলে।”

সুমু জানালার বাইরে তাকাল।

মাদ্রিদ তখনও জেগে।

হয়তো কোথাও রাশেদ তার খাতায় আজকের নতুন রাস্তার নাম লিখছে।

হয়তো সাকিব স্প্যানিশ উচ্চারণ অনুশীলন করছে।

হয়তো রাকিব আবার চৌদ্দ ঘণ্টার শিফটে দাঁড়িয়ে আছে।

হয়তো আফ্রিদি “Cerveza” শব্দটাকে নিজের ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করছে।

আর হয়তো…

কেউ একজন নীল ব্যাগটার রহস্য জানে।

কিন্তু সে এখনো অপেক্ষা করছে।

কারণ ইউরোর ওপারে গল্পটা শুধু একজন সুমুর নয়।

এটা তাদের সবার।

যারা একদিন অচেনা একটা শহরে নেমে ভেবেছিল,

“এখানে আমি কীভাবে টিকে থাকব?”

আর কয়েক বছর পর নিজেরাই অন্য নতুন মানুষকে বলেছে,

“ভয় পেও না। আগে শহরটাকে চিনে নাও। তারপর দেখবে, শহরটাও একদিন তোমাকে চিনে ফেলেছে।”

চলবে…

16/08/2026

ইউরোর ওপারে

পর্ব ৭ : স্পেনিশে প্রথম সকাল

স্পেনে নতুন আসার পর প্রথম যে জিনিসটা মানুষ হারায়, সেটা টাকা নয়।

আত্মবিশ্বাস।

কারণ বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর হঠাৎ মনে হয়, এতদিন যে পৃথিবীটাকে নিজের মতো করে চিনতাম, সেটা বুঝি অন্য কোনো গ্রহ।

রাস্তার নাম বোঝা যায় না।

বাসের রুট বোঝা যায় না।

কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে শব্দ আটকে যায়।

দোকানে গিয়ে নিজের প্রয়োজনের জিনিসটাও বোঝাতে না পারার যে অসহায়ত্ব, সেটা ক্ষুধার চেয়েও বেশি কষ্টের।

আর তখনই মানুষ বুঝতে পারে,

বিদেশে পকেটে টাকা থাকা আর নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক জিনিস নয়।



সেদিন সকালে সুমুর ফোনে একটা কল এলো।

“ইউরো ভাই?”

“জি, বলেন।”

“ভাই, আমি নতুন আসছি।”

“কতদিন হলো?”

“চার দিন।”

সুমু একটু হেসে বলল,

“তাহলে এখনো স্পেন আপনাকে পর্যটক হিসেবেই দেখছে।”

ওপাশে ছেলেটা হাসল না।

বরং খুব অসহায় গলায় বলল,

“ভাই, আমি কিছুই বুঝতেছি না।”

“কী হয়েছে?”

“কাল বাসে উঠছিলাম। ড্রাইভার কী যেন বলল। আমি কিছু বুঝি নাই। শেষে সবাই আমার দিকে তাকায়।”

“তারপর?”

“আমি নেমে গেছি।”

সুমু হেসে ফেলল।

“বাস থেকে?”

“জি।”

“কোথায়?”

“জানি না।”

এবার সুমু আর হাসল না।

কারণ এই গল্পটা সে বহুবার শুনেছে।

শুধু চরিত্রগুলো বদলেছে।



প্রবাসে নতুন মানুষদের প্রথম কয়েকটা দিন অনেকটা সদ্য জন্মানো শিশুর মতো।

হাঁটতে পারে।

কথা বলতে পারে না।

দিক চিনতে পারে না।

কোথায় গেলে কী পাওয়া যায় জানে না।

শুধু একটা পার্থক্য আছে।

শিশুর পাশে কেউ থাকে।

নতুন প্রবাসীর পাশে থাকে না।

সে নিজেকেই নিজের হাত ধরে হাঁটতে শেখে।



সুমু ছেলেটাকে একটা ঠিকানা দিল।

“আজ বিকেলে এখানে আসেন।”

“কী হবে?”

“আগে কফি খাবেন। তারপর কথা হবে।”

“কাজ হবে?”

“কাজের আগে মানুষটাকে বাঁচানো দরকার।”

ফোন রেখে সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

তার নিজের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ল।

স্পেন তখন তার কাছে একটা সুন্দর দেশ ছিল।

পরে বুঝেছিল,

সুন্দর দেশ আর সহজ দেশ এক জিনিস নয়।



বিকেলে ছেলেটা এল।

নাম সাকিব।

হাতে ছোট ব্যাগ।

চোখে ঘুমহীনতা।

মুখে হাজারটা প্রশ্ন।

সুমু বলল,

“কফি খাবেন?”

সাকিব বলল,

“আমি কফি খাই না।”

“আজ থেকে খাবেন।”

“কেন?”

“স্পেনে টিকে থাকতে হলে কিছু জিনিস পছন্দ না হলেও শিখতে হয়।”

সাকিব কফির কাপ হাতে নিল।

প্রথম চুমুক দিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,

“এটা মানুষ খায়?”

সুমু হেসে বলল,

“একদিন আপনি এই কফির জন্যও নস্টালজিক হবেন।


কিছুক্ষণ পর সাকিব বলল,

“ভাই, একটা সমস্যা।”

“কী?”

“ভাষা।”

এই একটা শব্দই যেন তার চার দিনের সব কষ্টকে একসঙ্গে প্রকাশ করল।

ভাষা।

স্পেনে নতুন আসা মানুষের কাছে এটা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়।

এটা একটা দেয়াল।

দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল।

চাকরির ইন্টারভিউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল।

এমনকি কখনো কখনো ভালোবাসার সামনেও দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল।

সুমু বলল,

“শিখবেন।”

“কোথা থেকে?”

“একজনকে চিনি।”

“কে?”

সুমু ফোন বের করল।

একটা নম্বরে কল করল।

“Taufiqur Rahman তৌফিক,কেমন আছোস?”

ওপাশ থেকে হাসির শব্দ।

“বেঁচে আছি।”

“তুই এখন কী করিস?”

“মানুষকে ‘Hola’ থেকে ‘¿Cómo estás?’ পর্যন্ত নিয়ে যাই।”

সুমু হেসে বলল,

“একজন ছাত্র আছে।”

“নতুন?”

“চার দিন।”

তৌফিক বলল,

“তাহলে আগে ওকে স্প্যানিশ শেখাব না।”

সুমু অবাক।

“কেন?”

“আগে ওকে শেখাব, ভুল করতে লজ্জা পাওয়া যাবে না।”

সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

কথাটা তার ভালো লাগল।

তৌফিক এখন অনলাইনে স্প্যানিশ শেখায়।

দেশে বসে কেউ শিখছে।

কেউ মাদ্রিদে বসে শিখছে।

কেউ রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ক্লাস করছে।

কেউ মেট্রোতে বসে হেডফোন কানে দিয়ে উচ্চারণ করছে।

কেউ আবার ক্লাসে ক্যামেরা বন্ধ রেখে শুধু শুনছে।

কারণ প্রবাসীর জীবনে শেখারও একটা আলাদা কায়দা আছে।

জীবন থামে না বলে শিক্ষা থেমে থাকে না।



তৌফিক সাকিবকে প্রথম ক্লাসেই বলল,

“আমার সঙ্গে বলুন,

Hola.”

সাকিব বলল,

“হোলা।”

“ভালো। এবার বলুন,

¿Cómo estás?”

সাকিব থেমে গেল।

“এইটা কীভাবে বলব?”

তৌফিক হাসল।

“ভাই, প্রথম দিনেই স্প্যানিশকে বিয়ে করতে হবে না। আগে পরিচয় হোক।”

সুমু হেসে ফেলল।

সাকিবও হাসল।

অনেকদিন পর ছেলেটার মুখে হাসি দেখা গেল।



পরের সপ্তাহে সুমু তাকে আবার দেখল।

সাকিব এবার একটা দোকানে কাজ করছে।

হাতে কাজের দাগ।

কিন্তু চোখে আগের সেই ভয় নেই।

সুমু বলল,

“স্প্যানিশ কেমন চলছে?”

সাকিব গর্ব করে বলল,

“দুইটা বাক্য পারি।”

“কী?”

সাকিব আঙুল তুলে বলল,

“Buenos días.”

তারপর আরেকটা,

“¿Cuánto cuesta?”

সুমু বলল,

“এই দুইটা দিয়ে জীবন চালাতে পারবেন?”

সাকিব বলল,

“আগে দাম জিজ্ঞেস করতে শিখি, পরে জীবন চালানো যাবে।”

সুমু হেসে উঠল।

প্রবাসে হাসিটা অনেক সময় বিলাসিতা নয়।

বেঁচে থাকার কৌশল।



সেদিন সন্ধ্যায় রাকিবও এল।

চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করে।

চোখ লাল।

হাতে একটা ছোট খাম।

“ইউরো ভাই।”

“কী?”

“দেশে টাকা পাঠাব।”

“আজ?”

“হ্যাঁ।”

“রেট দেখেছিস?”

রাকিব বলল,

“দেখেছি। আজ একটু কম।”

“তাহলে কাল পাঠাবি?”

রাকিব মাথা নাড়ল।

“না।”

“কেন?”

“মা অপেক্ষা করছে।”

সুমু আর কিছু বলল না।

এই একটা বাক্যের কাছে পৃথিবীর সব এক্সচেঞ্জ রেট ছোট হয়ে যায়।



রাত বাড়ার আগে সবাই চলে গেল।

সুমু একা বসে ছিল।

ফোনে তৌফিকের মেসেজ এল।

“আজ সাকিব প্রথমবার পুরো একটা বাক্য বলেছে।”

তার নিচে আরেকটা মেসেজ।

“বলেছে, আমি পারব।”

সুমু মেসেজটা পড়ে মৃদু হাসল।

হয়তো এটাই প্রবাস।

প্রথমে মানুষ বলে,

“আমি কিছুই পারি না।”

তারপর একদিন বলে,

“আমি চেষ্টা করছি।”

তারপর,

“আমি পারব।”

আর একদিন পিছনে তাকিয়ে দেখে,

সে সত্যিই পেরে গেছে।



রাত সাড়ে এগারোটা।

সুমু বাসায় ফিরল।

দরজা খুলে টি-শার্ট খুলতে গিয়ে আবার থেমে গেল।

আজও সেই নীল ব্যাগটা তার ঘরের এক কোণে।

সে ব্যাগটার দিকে তাকাল।

গত কয়েকদিনে ব্যাগটা যেন তার জীবনের সবচেয়ে নীরব মানুষ হয়ে গেছে।

কথা বলে না।

শুধু তাকিয়ে থাকে।

সুমু কাছে গেল।

হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা ছুঁল।

ঠিক তখন ফোনে একটা মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

“তুমি নতুন মানুষদের সাহায্য করছ। ভালো।”

সুমুর ভ্রু কুঁচকে গেল।

আরেকটা মেসেজ।

“কিন্তু মনে রেখো, একদিন তোমারও সাহায্যের প্রয়োজন হবে।”

তারপর তৃতীয় মেসেজ।

“সেদিন তোমার পাশে কে থাকবে?”

সুমু কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে নীল ব্যাগটার দিকে তাকাল।

ব্যাগটা আগের মতোই নিশ্চুপ।

কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো,

ব্যাগটা হয়তো কোনো রহস্য লুকিয়ে রাখেনি।

হয়তো লুকিয়ে রেখেছে…

কোনো মানুষের অপেক্ষা।



সুমু জানালা খুলে বাইরে তাকাল।

মাদ্রিদ তখন আলোয় ভাসছে।

হাজার হাজার জানালা।

হাজার হাজার মানুষ।

কেউ নতুন এসেছে।

কেউ দশ বছর ধরে আছে।

কেউ Feroz Alam এর মতোই দেশে ফিরতে চায়।

কেউ আর ফিরতে চায় না।

কেউ টাকা পাঠিয়ে পরিবারের নায়ক।

কেউ টাকা পাঠিয়েও পরিবারের কাছে অপরাধী।

কেউ ভাষা শিখছে।

কেউ এখনও “Hola” বলতেই লজ্জা পায়।

কেউ চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করে।

কেউ কাজ খুঁজছে।

আর কেউ…

একটা নীল ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছে।

সুমু জানত না সামনে কী আছে।

শুধু জানত,

প্রবাসের গল্পে কোনো সকালই শেষ সকাল নয়।

কারণ ইউরোর ওপারে…

প্রতিটি মানুষের পেছনে একটা গল্প থাকে।

আর প্রতিটি গল্পের সামনে থাকে আরেকটা অচেনা রাস্তা।

চলবে…

এক কাপ কফি,ভুল বিলে ৩১ ইউরো আর মায়ের সতর্কবাণীগতকাল দুপুর থেকেই মাথাটা ভীষণ ভার হয়ে ছিল। ব্যথাটা এমন, মনে হচ্ছিল কপালের ...
14/08/2026

এক কাপ কফি,ভুল বিলে ৩১ ইউরো
আর মায়ের সতর্কবাণী

গতকাল দুপুর থেকেই মাথাটা ভীষণ ভার হয়ে ছিল। ব্যথাটা এমন, মনে হচ্ছিল কপালের ভেতর কেউ যেনো অবিরাম হাতুড়ি ঠুকছে। কাজ শেষে বাসায় ফিরেই তাই আর কিছু ভাবিনি, ইচ্ছে মতো ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিলাম।

স্পেনের গরম এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাইরে থেকে ফিরে ঠান্ডা পানির শাওয়ারটা যেনো বিলাসিতা নয়, বেঁচে থাকার ছোট্ট এক আয়োজন। ইউরোপজুড়ে গ্রীষ্ম তার সমস্ত উত্তাপ নিয়ে নেমেছে। ঘরের এসির শীতল বাতাসও কখনো কখনো মনে হয় সেই উত্তাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই ভোর পাঁচটারও আগে ঘুম ভেঙে গেল।

রোজার পর শেষ কবে ফজরের নামাজ ওয়াক্তমতো পড়েছি, মনে করতে একটু লজ্জাই লাগল। অন্ধকার ভোরে উঠে ওজু করলাম। তারপর নামাজ শেষ করে ড্রয়িংরুমের জানালার পাশে গিয়ে বসলাম।

আমার জানালার পাশে দুটো সাদা হট সিট। একটিতে আমি বসলাম। অন্যটিতে কেউ নেই।

মনে হলো, পাশে কেউ থাকলে সকালটা হয়তো আরও সুন্দর হতো।

স্পেনের সূর্য তখনও ওঠেনি। সূর্যোদয় হবে সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে। অথচ শহর জেগে উঠেছে অনেক আগেই। জানালার ওপারে পরিচিত সুপারশপ DIA। দোকান খোলার সময় এখনও হয়নি, কিন্তু ভেতরের আলো জ্বলছে। কর্মীরা মেঝে পরিষ্কার করছে। একটু দূরের বাসস্ট্যান্ডে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ২৪ নম্বর বাসের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ পরপর বাস আসছে, আর প্রতিটি বাস যেনো ঘুমজড়ানো শহরের বুক থেকে মানুষ তুলে নিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মস্থলের দিকে।

আমি জানালার পাশে বসে সেই ব্যস্ততা দেখছিলাম।

কেউ জানে না, এই শহরে আমার মতো আরও কত মানুষ ভোরে উঠে নিজের ভেতরের শহরটাকেও একটু একটু করে জাগানোর চেষ্টা করে।

আধঘণ্টার মতো বসে নাস্তা করলাম। তারপর বেডে গিয়ে আম্মুকে WhatsApp-এ সালাম দিয়ে লিখলাম, “সকালের জুমা মোবারক।”

মা সঙ্গে সঙ্গে কল দিলেন।

“আজকে তো তোমার ছুটির দিন। এত সকালে উঠে গেলে কেন?”

আমি কিছু বলার আগেই মা বললেন,

“ঘুমিয়ে পড়ো আবার।”

মায়ের কথার মধ্যে এমন এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে শুনলেও মনে হয় আমি এখনও সেই পুরোনো ঘরেই আছি।

ফোন রেখে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়লাম।

দুপুর বারোটায় উঠে দেখি, সর্দি আমাকে বেশ আপন করে নিয়েছে। মাথাব্যথা, সর্দি, কাশি সব মিলে ছুটির দিনটাকে যেনো বিছানায় বন্দি করে রাখার আয়োজন করছে।

বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই। তবু ব্যাংকের একটা কাজ ছিল। নিচে নেমে DIA থেকে কিছু গ্রোসারি কিনে আবার বাসায় ফিরে এলাম।

বিদেশে এসে মানুষ অনেক কিছু শিখে। কেউ ভাষা শেখে, কেউ নতুন সংস্কৃতি, কেউ একাকিত্ব। আর আমি শিখেছি টুকটাক রান্না।

শুরুর দিকে রান্না করার সময় আম্মু ভিডিও কলে থেকে নির্দেশ দিতেন।

“এবার পেঁয়াজ দাও।”

“মরিচ একটু কম দিও।”

“না না, এত লবণ দিও না!”

এখন অবশ্য নিজের মতো করে রান্না করতে পারি। যদিও মাঝে মাঝে রান্না শেষ হওয়ার পর নিজেই বুঝতে পারি না, এটা রান্না হয়েছে, নাকি রান্না আমার ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে!

রান্নার ফাঁকে ফোনে কথা হলো কয়েকজনের সঙ্গে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ফোন দিলাম সাবেক কলিগ সুমিতকে।

অনেকদিন পর কথা।

একসময় সে বলল,

“ভাই, প্রবাস জীবন এত কষ্টের! আগে কেন বলেন নাই?”

হেসে বললাম,

“বললে তো দেশে বসে এই উপলব্ধি হতো না।”

সুমিতও হেসে বলল,

“ঠিকই কইছেন। তখন যদি বলতেন, আপনাকেই শত্রু মনে করতাম।”

দুজনেই হাসলাম।

হাসির আড়ালে অবশ্য প্রবাসের দীর্ঘশ্বাস ছিল। দূরদেশে থাকা মানুষগুলো বোধহয় এভাবেই নিজেদের কষ্টকে গল্প বানিয়ে একে অন্যকে শোনায়।

দক্ষিণ কোরিয়াতেও নাকি এবার ভয়াবহ গরম। পৃথিবী যেনো একই সময়ে দুই প্রান্ত থেকে গ্রীষ্মের আগুনে পুড়ছে।

রান্না শেষ করে ফ্রেশ হয়ে জুমার নামাজে গেলাম। ভাগ্য ভালো, বাসার পাশেই একটা মরোক্কান মসজিদ আছে। মাদ্রিদের মতো শহরে বাসার কাছেই মসজিদ পাওয়া প্রবাসী মুসলমানের কাছে ছোট কোনো আনন্দ নয়। এটা অনেকটা মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ এক টুকরো ছায়া খুঁজে পাওয়ার মতো।

নামাজ শেষে বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে প্যারাসিটামল খেলাম। ঘুমানোর আগে আবার আম্মুর সঙ্গে ফোনে কিছুক্ষণ বকবক করলাম।

মা বললেন,

“ঘুমাও। ছুটির দিন উপভোগ করো।”

মায়ের কথায় ঘুমিয়ে গেলাম।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের দিকে হঠাৎ আম্মুর ফোনে ঘুম ভাঙল।

“উঠো। বাইরে যাও। পার্কে গিয়ে একটু হাত-পা নাড়াও। ব্যায়াম করো। তোমার যে বদ অভ্যাস, দিনে ঘুমাইছো মানে রাতে আর ঘুমাবে না!”

মায়ের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। উঠলাম।

ফ্রেশ হয়ে আসরের নামাজ পড়লাম। মাগরিবের আজান হবে ৯টা ১৪ মিনিটে। আজান দিয়ে নামাজ শেষ করে বাসার নিচের ক্যাফেতে গিয়ে বসলাম।

সারাদিনের গরমের পর সন্ধ্যার বাতাসটা যেনো অন্য এক পৃথিবী।

কিছুক্ষণ আগেও যে শহরটা আগুনের চাদরে ঢাকা ছিল, এখন সেই শহরের বুক দিয়ে বাতাস ছুটছে। মনে হচ্ছে কালবৈশাখী নেমেছে। অথচ আকাশে কোনো ঝড় নেই। শুধু বাতাসের মধ্যে এমন এক স্বস্তি, যেনো দিনের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে যাচ্ছে।

ক্যাফেটার বিশাল টেরেসে টেবিল সাজানো। চারদিকে মানুষ। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, কেউ কফি খাচ্ছে, কেউ নিঃশব্দে বসে আছে। রাত বাড়বে, কিন্তু এই টেবিলগুলোর গল্পের শেষ হবে না।

হঠাৎ ফিরোজ ভাইয়ের কথা মনে পড়ল। স্প্যানিশ ভাষার মাস্টার তৌফিক ভাইয়ের কথাও।

এদের সঙ্গে বসলে আড্ডা জমে যায়।

কিন্তু প্রবাসে সবার ছুটি একদিনে হয় না। বিশেষ করে বাঙালি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে। স্প্যানিশ কোম্পানিতে কাজ করলে সাধারণত শনিবার-রবিবার ছুটি। আর আমাদের ছুটির হিসাব কখনো কখনো নিজের জীবনের মতোই জটিল।

আমি নিরাপদ পানীয় হিসেবে কাফে কন লেচে অর্ডার করলাম।

স্পেনের ক্যাফেতে কী অর্ডার করছি, সেটা নিয়ে আমি বরাবরই সতর্ক। কারণ ভাষা বুঝতে ভুল হলে কফির বদলে এমন কিছু চলে আসতে পারে, যার সঙ্গে আমার জীবনের কোনো পরিচয়ই নেই!

কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আম্মুকে ফোন দিলাম।

দেশের গরম, গ্যাস-বিদ্যুতের অবস্থা, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে মায়ের সঙ্গে আমার যথারীতি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনা শুরু হলো।

এর মধ্যেই ওয়েটার এলো।

আমি মাকে ফোনে রেখেই বললাম,

“মা, বিলটা দিয়ে নেই।”

ওয়েটার হাতে পেমেন্ট মেশিন নিয়ে বলল,

“ত্রেইন্তা উনো কন দিয়েস সেন্তিমুস।”

৩১ ইউরো ১০ সেন্ট!

আমি ভাবলাম, হয়তো ভুল শুনেছি। একটা কফির দাম তিন ইউরো হতে পারে। কিন্তু ৩১ ইউরো?

মোবাইল ওয়ালেট মেশিনে ধরতেই পেমেন্ট হয়ে গেল।

ফোনের নোটিফিকেশন দেখে আমার চোখ কপালে।

৩১.১০ ইউরো!

আমি ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে বললাম,

“আমি তো শুধু এক কাপ কফি খেয়েছি!”

সে বিল দেখে একটু থমকালো।

তারপর বলল,

“মনে হয় ভুল হয়েছে। আপনি অপেক্ষা করুন।”

আমি মাকে বললাম ঘটনাটা।

ওপাশ থেকে মায়ের স্বভাবসিদ্ধ উত্তর,

“তুমি আর শুধরাবে না। আর কবে সতর্ক হইবা?”

আমি হেসে বললাম,

“মা, আপনার কখনো এমন হয়েছে যে রেস্টুরেন্টে ওয়েটার ভুল করে বেশি বিল করেছে?”

মা বললেন,

“অনেকবার হয়েছে। কিন্তু তোমার মতো পে করার আগে না দেখে কখনো দিইনি!”

মায়ের কথার মধ্যে অভিযোগ ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল মায়া।

কিছুক্ষণ পর ওয়েটার ফিরে এলো। হাতে ২৯.১০ ইউরো।

“Lo siento.”

দুঃখিত।

তারপর হাসিমুখে বলল,

“Y gracias para todos.”

আমি টাকাটা হাতে নিলাম।

মা তখনও ফোনে।

মা বললেন,

“কফি খাওয়ার আরামের সঙ্গে আজকের এই অভিজ্ঞতাটাও মনে রাখো। ভবিষ্যতে জীবনের প্রতিটি জায়গায় একটু সতর্ক হইও।”

আমি কিছু বললাম না।

শুধু হাসলাম।

কারণ মা জানেন, আমি বরাবরই এমন।

অসতর্ক, একটু এলোমেলো, কখনো কখনো শিশুর মতো সরল।

জীবনও বোধহয় এমনই।

কখনো প্রচণ্ড গরমের দুপুর, যেখানে এসির শীতলতাও পরাজিত। কখনো ভোরের নরম আলো, যখন জানালার পাশে বসে মনে হয় পৃথিবী এখনও সুন্দর। কখনো প্রবাসের নিঃসঙ্গতা, কখনো দূরদেশের বন্ধুর সঙ্গে হাসতে হাসতে বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট ভাগ করে নেওয়া।

কখনো মায়ের ফোন, যেখানে হাজার মাইল দূরত্বও হার মেনে যায়।

আর কখনো এক কাপ কফি, যার দাম ভুল করে ৩১ ইউরো হয়ে যায়।

তারপরও শেষ পর্যন্ত ২৯ ইউরো ফেরত আসে।

হয়তো জীবনও ঠিক এমন।

দিনের শেষে সব হিসাব মেলে না, কিছু ভুল থেকে যায়, কিছু টাকা বেশি কেটে যায়, কিছু মানুষ পাশে থাকে না, কিছু সকাল একা কাটে।

তবু সন্ধ্যা নামে।

গরমের পর বাতাস আসে।

কোনো এক জানালার পাশে দুটো সাদা চেয়ার পড়ে থাকে।

একটিতে কেউ বসে থাকে, অন্যটি খালি।

আর দূরদেশে থাকা একজন মানুষ কফির কাপে শেষ চুমুক দিতে দিতে ভাবে,

জীবন আসলে পুরোপুরি সুন্দর নয়।
তবু তার ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্তগুলোকে ভালোবাসতে পারাটাই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

14/08/2026

ইউরোর ওপারে

পর্ব ৬ : ইউরো ভাই

প্রবাসে একটা সময় আসে, যখন নিজের নামটা নিজের কাছে আর খুব গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।

মানুষ আপনাকে আপনার কাজ দিয়ে ডাকতে শুরু করে।

কেউ হয় “মিস্ত্রি ভাই”।

কেউ “ড্রাইভার ভাই”।

কেউ “রেস্টুরেন্টের ভাই”।

কেউ আবার সবার কাছে শুধু…

“ভাই, একটা কাজ ছিল।”

সুমুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।

মাদ্রিদে তার আসল নাম খুব কম মানুষ জানে।

অনেকে তাকে চেনে শুধু,

ইউরো ভাই।

কেন এই নাম?

সেটা সুমু নিজেও জানে না।

সম্ভবত কোনো একদিন কারও ইউরো দরকার ছিল।

সে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

তারপর আরেকজন বলেছিল,

“ইউরো ভাইকে ফোন করেন।”

তারপর নামটা ছড়িয়ে গেল।

বিদেশে নাম কখনো কখনো মানুষ রাখে না।

পরিস্থিতি রাখে।



সকাল সাতটা।

সুমুর ফোন বেজে উঠল।

“হ্যালো?”

ওপাশ থেকে ঘুমঘুম গলা।

“ভাই, বিরক্ত করলাম?”

সুমু চোখ খুলে ঘড়ির দিকে তাকাল।

৭:০২।

“না। বলেন।”

“একটা কাজ ছিল।”

সুমু মনে মনে বলল,

সকাল সাতটায় যার ‘একটা কাজ’ থাকে, তার কাজ কখনো একটা হয় না।

“কী কাজ?”

“আমার এক বন্ধু বাংলাদেশ থেকে আসছে।”

“ভালো।”

“ওর একটা রুম লাগবে।”

“কবে?”

“আগামীকাল।”

“আগামীকাল?”

“জি।”

“ভাড়া কত দিতে পারবে?”

“ভাই, ওইটা একটু সমস্যা।”

“কী সমস্যা?”

“ওর বাজেট কম।”

“কত?”

ওপাশ থেকে একটু নীরবতা।

“দুইশো।”

সুমু বিছানায় উঠে বসল।

“মাদ্রিদে?”

“জি।”

“দুইশো ইউরোতে?”

“জি।”

“রুম?”

“জি।”

সুমু বলল,

“ভাই, দুইশো ইউরোতে মাদ্রিদে রুম না, আপনি দরজার সামনে দাঁড়ানোর জায়গা পাবেন।”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর লোকটা বলল,

“তাহলে তিনশো?”

সুমু হাসল।

“আমি জাদুকর না।”



সাড়ে আটটার মধ্যে আরও ছয়টা ফোন।

কারও কাজের দরকার।

কারও বাসা।

কারও NIE নিয়ে তথ্য দরকার।

কেউ জানতে চায় কোন এলাকায় সস্তা ঘর।

কেউ জানতে চায় দেশে টাকা পাঠানোর জন্য আজ কোন রেটে ইউরো পাওয়া যাচ্ছে।

একজন আবার খুব গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল,

“ভাই, ব্যাংকে টাকা পাঠালে বেশি রেট পাব নাকি দোকানে?”

সুমু বলল,

“রেট দেখেন।”

“আপনি বলেন।”

“আপনি নিজে দেখেন।”

“আপনি দেখলে তো ভালো হয়।”

সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

প্রবাসীদের একটা অদ্ভুত বিশ্বাস আছে।

কেউ যদি দুটো জিনিস জানে, তাকে তারা তৃতীয়টারও বিশেষজ্ঞ ধরে নেয়।

আপনি কাজ জানেন?

তাহলে ভাষাও জানবেন।

ভাষা জানেন?

তাহলে চাকরিও পাবেন।

চাকরি করেন?

তাহলে কাগজপত্রও জানবেন।

কাগজপত্র জানেন?

তাহলে নিশ্চয়ই বিয়ের ভালো সম্বন্ধও জানেন।

সুমু একবার এমনও শুনেছে,

“ভাই, একটা ভালো মেয়ে চেনেন?”

সে বলেছিল,

“চাকরির জন্য?”

লোকটা বলেছিল,

“না, বিয়ের জন্য।”

সুমু সেদিন প্রথম বুঝেছিল,

প্রবাসে মানুষ আপনাকে একবার বিশ্বাস করলে আপনার ওপর জীবনের সব বিভাগের দায়িত্ব দিয়ে দিতে পারে।



শুক্রবার ছুটির দিন সুমু গেল মাদ্রিদের বাঙালিপাড়ায় এক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে।

সেখানে দেখা হলো রিয়াদের সঙ্গে।

ছেলেটার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি।

চোখের নিচে কালো দাগ।

হাতের তালু শক্ত।

নখের ভেতরে কাজের ময়লা।

সুমু জিজ্ঞেস করল,

“কেমন আছিস?”

রাকিব হাসল।

“ভালো।”

প্রবাসীদের সবচেয়ে প্রচলিত মিথ্যাটা হলো,

“ভালো আছি।”

সুমু জিজ্ঞেস করল,

“কত ঘণ্টা কাজ করিস?”

রিয়াদ কাঁধ ঝাঁকাল।

“চৌদ্দ।”

“প্রতিদিন?”

“প্রায়।”

“ঘুমাস কখন?”

“রাতে।”

“কত ঘণ্টা?”

রিয়াদ একটু ভেবে বলল,

“ঘুমানোর আগে যতটুকু সময় থাকে।”

সুমু আর কিছু বলল না।

রিয়াদ পকেট থেকে ফোন বের করল।

স্ক্রিনে বাংলাদেশের একটা ছবি।

একটা ছোট্ট বাড়ি।

সামনে তার মা দাঁড়িয়ে।

“এই মাসে টাকা পাঠাব।”

“কত?”

“এক হাজার।”

“বাড়িতে?”

“মা, বাবা, ছোট ভাই।”

তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল,

“ভাই, আজ ইউরোর রেট একটু কম। কাল পাঠালে কি বেশি পাব?”

সুমু হেসে ফেলল।

“তুই চৌদ্দ ঘণ্টা কাজ করিস, তারপরও তোর সবচেয়ে বড় চিন্তা ইউরোর রেট!”
রিয়াদও হাসল।

“ভাই, এক ইউরো কম বেশি মানে দেশে এক কাপ চা কম বেশি।”

কথাটা বলেই সে আবার ফোনের দিকে তাকাল।

“কিন্তু ভাই…”

“কী?”

“মা যদি বলে, ‘আজ টাকা পাঠাসনি কেন?’ তখন রেটের কথা বলতে পারব?”

সুমু চুপ করে গেল।

এই প্রশ্নের কোনো এক্সচেঞ্জ রেট নেই।



পরদিন সন্ধ্যায় রিয়াদ টাকা পাঠাল।

তার মা ফোন করলেন।

“পেয়েছি।”

রিয়াদের মুখে হাসি।

“সব ঠিক আছে?”

“হ্যাঁ।”

“বাবার ওষুধ কিনো।”

“হুম।”

“ভাইয়ের পড়ার টাকা দিও।”

“হুম।”

“আর…”

মা একটু থামলেন।

“তুই নিজের জন্য কিছু রাখিস।”

রিয়াদ হাসল।

“আচ্ছা।”

ফোন কেটে গেল।

সুমু পাশে বসে ছিল।

সে জানে, রিয়াদ নিজের জন্য কিছু রাখবে না।

কারণ প্রবাসীর নিজের জন্য টাকা রাখা অনেক সময় অপরাধবোধের মতো লাগে।

দেশে টাকা পৌঁছালে পরিবারের মুখে হাসি আসে।

নিজের পকেটে টাকা থাকলে আসে হিসাব।



রাতের দিকে সুমুর ফোন আবার বেজে উঠল।

এবার ইউরোপ চাচা।

“কই?”

“বাইরে।”

“খাইছিস?”

“না।”

“চল।”

“কোথায়?”

“খাবি।”

“কী খাব?”

চাচা বললেন,

“যা সামনে পাবি।”

“আপনি আজ রান্না করেছেন?”

“না।”

“তাহলে?”

“আমি প্রবাসী। রান্না করার সময় পাই না।”

সুমু হাসল।

দুজন একটা ছোট রেস্টুরেন্টে বসে পড়ল।

হারুন ভাই খাবার আসার আগেই বললেন,

“জানিস, দেশে গেলে আমি মেহমান।”

সুমু চুপ করে শুনছিল।

“নিজের বাড়িতে?”

“হ্যাঁ।”

“কীভাবে?”

চাচা হাসলেন।

“আমি গেলে সবাই বলে, ‘চাচা, এটা আনছেন?’”

“কী আনেন?”

“চকলেট। পারফিউম। ফোন। টাকা।”

“আর আপনি?”

“আমি?”

চাচা একটু থামলেন।

“আমি শুধু বিমানবন্দরের ট্রলি।”

সুমু হেসে ফেলল।

হারুন ভাইও হাসলেন।

কিন্তু তার হাসির ভেতরে একটা শুকনো শব্দ ছিল।

যেমন পুরোনো দরজা খুললে হয়।



ঠিক তখন আফ্রিদি ঢুকল।

হাতে একটা কফির কাপ।

“ইউরো ভাই!”

“কী?”

“আমার ব্যবসা চলছে।”

চাচা বললেন,

“কী ব্যবসা?”

“কফি।”

“লাভ?”

আফ্রিদি গর্ব করে বলল,

“আজ তিন ইউরো।”

চাচা বললেন,

“খরচ?”

আফ্রিদি চুপ।

সুমু বলল,

“আবার হিসাব করিস নাই?”

“হিসাব করলে আনন্দ কমে যায়।”

হারুন ভাই হেসে বললেন,

“এই ছেলেটা প্রবাসে টিকে থাকবে।”

সুমু বলল,

“কীভাবে?”

“কারণ লোকসানকেও লাভ মনে করার ক্ষমতা আছে।”

তিনজনই হেসে উঠল।



রাত বাড়ল।

রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার আগে সুমু বেরিয়ে এল।

ফোনে একটা মেসেজ।

অচেনা নম্বর।

“নীল ব্যাগটা খুলবেন না।”

সুমু থেমে গেল।

কয়েক সেকেন্ড পর দ্বিতীয় মেসেজ।

“এটা আপনার জন্য নয়।”

তারপর তৃতীয়টি।

“কিন্তু একদিন আপনাকেই এটা পৌঁছে দিতে হবে।”

সুমু ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

নীল ব্যাগের কথা সে কাউকে বলেনি।

তাহলে?

কে জানে?

আর কেনই বা তাকে বলা হচ্ছে?

সে ফোনটা পকেটে রাখল।

ঠিক তখন পেছন থেকে ইউরোপ চাচার গলা,

“কী হয়েছে?”

সুমু ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।

“কিছু না।”

চাচা কিছু বললেন না।

শুধু কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“সব ‘কিছু না’ একদিন ‘অনেক কিছু’ হয়ে যায়।”

সুমু অবাক হয়ে চাচার দিকে তাকাল।

চাচা হাসলেন।

“চল। রাত হয়েছে।”

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।

মাদ্রিদের আলো তাদের ছায়া লম্বা করে দিচ্ছিল।

সুমু ভাবছিল…

প্রবাসে মানুষ আসলে কী রেখে যায়?

বাড়ি?

জমি?

ব্যাংক ব্যালেন্স?

নাকি কিছু মানুষ?

হয়তো উত্তরটা সহজ।

প্রবাসী মানুষ নিজের জীবনটা একটু একটু করে অন্যদের মধ্যে রেখে যায়।

কাউকে চাকরি দিয়ে।

কাউকে বাসা দিয়ে।

কাউকে একটা ফোন নম্বর দিয়ে।

কাউকে দেশে টাকা পাঠানোর সঠিক পথ দেখিয়ে।

কাউকে শুধু একটা কথা বলে,

“ভাই, চিন্তা কইরেন না। আমি আছি।”

সেই “আমি আছি” কথাটাই একদিন সুমুকে ইউরো ভাই বানাবে।

সে জানে না।

চৌধুরী সাহেব জানেন।

আফ্রিদি জানে না।

রিয়াদও জানে না।

কিন্তু মাদ্রিদ ধীরে ধীরে জানছে।



রাতের শেষে সুমু বাসায় ফিরে দরজা বন্ধ করল।

শার্ট খুলতে গিয়ে পকেটে হাত দিল।

একটা কাগজ।

সে অবাক হয়ে কাগজটা বের করল।

পুরোনো কাগজ।

কোনো লেখা নেই।

শুধু নীল কালিতে একটা সংখ্যা।

17

সুমু জানে না কাগজটা তার পকেটে কে রেখেছে।

জানালার বাইরে মাদ্রিদ তখনও জেগে।

আর বহু দূরে কোথাও…

একটা নীল ব্যাগও হয়তো তার পরবর্তী মালিকের অপেক্ষায়।

চলবে…

Dirección

Avenida De Nuestra Señora De Valvanera, 91
Madrid
28025

Notificaciones

Sé el primero en enterarse y déjanos enviarle un correo electrónico cuando Voice of Madrid publique noticias y promociones. Su dirección de correo electrónico no se utilizará para ningún otro fin, y puede darse de baja en cualquier momento.

Contacto La Empresa

Enviar un mensaje a Voice of Madrid:

Atajos

Compartir