08/08/2026
আস্তিক বনাম নাস্তিক: বিশ্বাসের স্বাধীনতা, অবিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং মানুষের মর্যাদা
পৃথিবীতে যত মানুষ, তত রকম চিন্তা। কেউ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, কেউ ভগবানকে, কেউ ঈশ্বর বা গডকে। আবার কেউ মনে করেন, এই মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তায় বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। এই ভিন্নতা কোনো সমস্যা নয়; বরং মানুষের চিন্তার স্বাভাবিক বৈচিত্র্য।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা অনেক সময় একজন মানুষকে তাঁর চরিত্র দিয়ে নয়, তাঁর বিশ্বাস দিয়ে বিচার করি। কেউ যদি ধর্মে বিশ্বাস না করেন, অনেকেই ধরে নেন তিনি নিশ্চয়ই নৈতিকতাহীন, ধর্মবিদ্বেষী বা খারাপ মানুষ। আবার কেউ ভিন্ন ধর্ম অনুসরণ করলে, তাঁকে অনেক সময় এমনভাবে দেখা হয় যেন তিনি "ভুল মানুষ"।
আমার কাছে এই দুই ধারণাই ভুল।
একজন মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করেন—এটি তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাস। আরেকজন মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করেন না—এটিও তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থান। এই দুইয়ের কোনোটিই নিজে নিজে একজন মানুষকে ভালো বা খারাপ বানিয়ে দেয় না।
আমরা প্রায়ই "নাস্তিক" শব্দটিকে এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন এটি কোনো অপরাধের পরিচয়। অথচ নাস্তিক হওয়ার অর্থ কেবল এতটুকুই—তিনি কোনো ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না। এর অর্থ এই নয় যে তিনি সততায় বিশ্বাস করেন না, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ নন, ভালোবাসা বোঝেন না বা ন্যায়বিচারের মূল্য দেন না।
একজন নাস্তিকও নিজের পরিবারকে ভালোবাসতে পারেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন, সত্য কথা বলতে পারেন এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকতে পারেন। ঠিক যেমন একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষও মানবিক, সৎ এবং মহান হতে পারেন।
তাই একজন মানুষের পরিচয় তাঁর বিশ্বাস দিয়ে নয়, তাঁর আচরণ দিয়ে হওয়া উচিত।
একজন দুর্নীতিবাজ, প্রতারক বা নিষ্ঠুর মানুষ যদি ধর্মীয় পরিচয় বহন করেন, তাহলে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় তাঁকে ভালো মানুষ বানিয়ে দেয় না। আবার একজন সৎ, ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক মানুষ যদি নাস্তিক হন, তাহলে তাঁর অবিশ্বাস তাঁকে খারাপ মানুষ বানিয়ে দেয় না।
আমাদের উচিত মানুষের বিচার তাঁর কাজ দিয়ে করা—তাঁর বিশ্বাস দিয়ে নয়।
একইভাবে, একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষের বিশ্বাসকে উপহাস করাও যেমন অন্যায়, তেমনি একজন নাস্তিককে শুধু তাঁর অবিশ্বাসের কারণে ঘৃণা করা, অপমান করা বা সমাজের জন্য বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে তুলে ধরাও অন্যায়। সম্মান যদি চাই, তাহলে সেই সম্মান সবার জন্যই হতে হবে।
আরেকটি বিষয় নিয়ে আমার ব্যক্তিগত একটি উপলব্ধি আছে।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি ধর্মের অনুসারীই বিশ্বাস করেন, একমাত্র তাঁদের ধর্মই সত্যের পথ। এটি তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস, এবং সেই বিশ্বাস ধারণ করার পূর্ণ অধিকার তাঁদের আছে। কিন্তু সেই বিশ্বাস প্রকাশের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় আমরা এমনভাবে কথা বলি—"যারা আমার ধর্মে বিশ্বাস করে না, তারা সবাই জাহান্নাম/নরকে যাবে", "তারা কখনো মুক্তি পাবে না।"
আমি মনে করি, এই ধরনের বাক্য অন্য মানুষের বিশ্বাসকে অস্বীকার করে এবং তাঁদের সম্পর্কে এমন একটি চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেয়, যেটি দেওয়ার অধিকার আমাদের কারও নেই।
যদি কেউ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলতে চান, তাহলে তিনি বলতে পারেন—
"আমার ধর্ম আমাকে শিক্ষা দেয়, আমি যদি এই বিশ্বাস থেকে সরে যাই, তাহলে আমার জন্য এমন পরিণতি হতে পারে। তাই আমি এই বিশ্বাস অনুসরণ করি।"
এখানে নিজের বিশ্বাসের কথা বলা হচ্ছে, অন্যের ভাগ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে না। আমার কাছে এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু সম্মান হওয়া উচিত সর্বজনীন।
আমরা সবাই যদি নিজের বিশ্বাসকে সম্মান করতে চাই, তাহলে অন্যের বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাসের অধিকারকেও একইভাবে সম্মান করতে হবে। স্বাধীনতা কখনো একপাক্ষিক হতে পারে না। আমি আমার বিশ্বাস প্রকাশ করব, কিন্তু অন্যের ভিন্ন বিশ্বাস প্রকাশের অধিকার অস্বীকার করব—এটি স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে যায় না।
আমরা সবাই একইভাবে ভাবব—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, যুক্তি থাকবে। কিন্তু সেখানে যেন অপমান না থাকে, বিদ্বেষ না থাকে, ব্যক্তিগত আক্রমণ না থাকে। কারণ যুক্তি মানুষকে ভাবতে শেখায়, আর ঘৃণা শুধু মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নই। আবার নাস্তিকতার পক্ষেও কোনো প্রচারণা করছি না।
আমি শুধু বলতে চাই—ধর্মবিশ্বাসী হওয়া যেমন অপরাধ নয়, তেমনি নাস্তিক হওয়াও অপরাধ নয়। এই দুটোই মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। একজন মানুষের চরিত্রের সনদ নয়।
শেষ পর্যন্ত একজন মানুষকে মূল্যায়ন করা উচিত তাঁর সততা, ন্যায়বোধ, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং অন্য মানুষের প্রতি তাঁর আচরণ দিয়ে। আমরা হয়তো কোনো দিন একই বিশ্বাসে পৌঁছাতে পারব না। কিন্তু আমরা যদি একে অপরের ভিন্ন বিশ্বাসকে সম্মান করতে শিখি, যদি একজন মানুষকে তাঁর বিশ্বাসের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখি, তাহলে সমাজে ঘৃণা কমবে, সহনশীলতা বাড়বে, আর আমাদের ভবিষ্যৎ হবে আরও সুন্দর।
সবশেষে, আমার একটি বিশ্বাস আছে।
ঈশ্বরে বিশ্বাস করা একজন মানুষের অধিকার। ঈশ্বরে বিশ্বাস না করাও একজন মানুষের অধিকার। কিন্তু একজন মানুষকে শুধু তাঁর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের কারণে ছোট করা—কোনোটিই আমাদের অধিকার নয়।
কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম নয়, তার অধর্মও নয়।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে কতটা মানুষ।
- এমএনএইচ টুটুল
゚