01/09/2026
#রহস্যময়_মানব
#পর্ব৮৩
ি_আক্তার
গাজীপুর থেকে ঢাকা—পুরোটা পথ গাড়িতে পারুল একটা টু শব্দও করেনি। পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। পাশে বসা আবির তাকে কতকিছু বোঝানোর চেষ্টা করল, নিজের ভালোবাসার দোহাই দিল, কিন্তু পারুলের কানে তার একটা কথাও পৌঁছায়নি। আবির পারুলকে সরাসরি নিয়ে এলো আরিয়ানদের সেই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ 'খান ভিলা'-তে।
খান ভিলার বিশাল ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় এসে যখন পারুল বসল, তখন তার মনের ভেতর তীব্র এক ঘৃণার আগুন জ্বলছে। এতদিনের চেনা আবির আর আরিয়ানের আসল কুৎসিত সত্যটা জানার পর থেকে এই রাজপ্রাসাদের প্রতিটি দেওয়ালকে তার একেকটা নরকের টুকরো মনে হচ্ছে।
পারুলের বড্ড হাসি পেল আবিরের 'ভালোবাসা' শব্দটা শুনে। মনে মনে এক তীব্র উপহাসের হাসি হেসে সে ভাবল—এই আমানুষগুলো, এই পিশাচগুলোও আবার ভালোবাসার কথা বলে? যারা শত শত অবুজ শিশুর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে, যাদের কিডনি কেটে বিক্রি করে দিয়েছে এই আবির ওরফে 'মি. এক্স'! যে শিশুদের দিয়ে রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি করায়, যাদের বুক খালি করে মা-বাবার কোল থেকে কিডন্যাপ করে আনে! শুধু তা-ই নয়, মাদক কারবার দিয়ে দেশের যুবসমাজকে শেষ করছে, অবৈধ অস্ত্র পাচার করে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে আর অসহায় মেয়েদের বিক্রি করে দিচ্ছে অন্ধকারের বাজারে! কত কত পরিবার তাদের আপন মানুষকে হারিয়ে আজীবন ডুকরে কাঁদছে এই সিন্ডিকেটের কারণে—আর সেই সিন্ডিকেটের মূল মাথা আবির তাকে এসে ভালোবাসা বোঝায়?
পারুল মনে মনে ভাবল, "খোদা হয়তো এই আমানুষগুলোকে ধ্বংস করার জন্যই 'ভালোবাসা' নামের এই পবিত্র অস্ত্রটা বানিয়েছেন। মায়ার ভালোবাসা যেমন আরিয়ানকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি এই আবিরের ভালোবাসাই আজ ওর কাল হবে।"
পারুল আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। আবির তখন ড্রয়িংরুমের অন্য পাশে পারুলের জন্য কফি আনার কথা বলে একটু ব্যস্ত ছিল। পারুল অত্যন্ত সাবধানে নিজের ফোনটা বের করল। হাত কিছুটা কাঁপলেও তার চোখ দুটোতে তখন প্রতিশোধের তীব্র জেদ। সে সোজা আরাফাতের নম্বরে গিয়ে মেসেজ বক্সটা খুলল।
সে তার ফোনে থাকা সেই গোপন ও অকাট্য ভিডিও ক্লিপগুলো সিলেক্ট করল, যা সে কোনোভাবে জোগাড় করেছিল। ক্লিপগুলোতে আরিয়ানের চেহারা অতটা স্পষ্ট না বোঝা গেলেও, আবির যে নিজেই সেই কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী 'মি. এক্স'—সেটার ১০০% স্পষ্ট প্রমাণ সেখানে রয়েছে।
ভিডিওগুলো সেন্ড করে পারুল নিচে দ্রুত টাইপ করে লিখে পাঠাল:
"আরাফাত ভাই, আপনি এখনই আপনার পুরো স্পেশাল পুলিশ ফোর্স নিয়ে খান ভিলাতে আসুন। মি. এক্স-এর আসল প্রমাণ এগুলো। ও এখন খান ভিলাতে ওর নিজের বাড়িতেই আছে। ওকে আজ রাতেই গ্রেপ্তার করুন!"
মেসেজটা সাকসেসফুলি 'সেন্ট' হতেই পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। ঠিক তখনই পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে ড্রয়িংরুমের সদর দরজার দিকে তাকাল।
সে দেখল, আবির এক হাত দুটো সামনে গুটিয়ে, অত্যন্ত অসহায় আর অপরাধী একটা মুখ করে ধীর পায়ে পারুলের দিকেই এগিয়ে আসছে। পারুলের মুখে জমে থাকা সেই তীব্র ঘৃণা আর অবহেলার মাঝে আবির যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। সে পারুলকে সান্ত্বনা দিতে বা নিজের সাফাই গাইতে কিছু একটা বলতে মুখ খুলল…
আবির: "আমাকে মাফ করে দে পারুল! খোদার কসম, আমি নিজের ইচ্ছায় এই জঘন্য অপরাধ জগতে আসিনি। আমাকে আরিয়ান এই পথে টেনে এনেছে। আমি ওর বড় ভাই, অথচ আমি এই বাড়িতে ওর একজন গোলাম মাত্র! তুই ভাবিস না আমি লোভের জন্য, টাকার জন্য এসব করি... আসলে—"
আবিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই পারুল সোফা থেকে ছিটকে দাঁড়িয়ে তীব্র চিৎকারে তার কথা কেড়ে নিল—
পারুল: "আসলে মানে কী, আবির? আসলে কী? এই জঘন্য পাপ, এই রক্ত আর কান্নার ব্যবসা... এগুলোর সাথে তোমাদের বাড়ির প্রত্যেকটা পুরুষ জড়িত! শুধু টাকার জন্য, ক্ষমতার অহংকারে তোমরা পিশাচ হয়ে গেছ!"
আবির দুই হাত বাড়িয়ে পারুলকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, "না পারুল, তুই বিশ্বাস কর! আমি একটা মাত্র ভুল করে এই পাপের রাজ্যে পা বাড়িয়েছিলাম, তারপর আর বের হতে পারিনি।"
পারুল নিজের ভেতরের কাঁপনটা লুকিয়ে একটু থমকে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, আবির এখন মানসিকভাবে দুর্বল। এই সুযোগে ওর মুখ থেকে সব সত্যি বের করে আনা সম্ভব। পারুল অত্যন্ত কৌশলে সোফার ওপরে রাখা ফোনের ভয়েস রেকর্ডারটা অন করে দিল। তারপর নিজের গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল—
পারুল: "হুম শুনব... বলো, তোমার সব কথা আজ আমি শুনব।"
পারুলের গলায় এই প্রথম রাগ বা ঘৃণার বদলে একটুখানি আশার আলো পেয়ে আবির যেন আকুল হয়ে উঠল। সে মরীচিকার পেছনে ছোটা তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো বলতে লাগল—
আবির: "আমি এসব নরক থেকে বের হয়ে যেতে চাই পারুল। তোকে নিয়ে অনেক দূরে, কোথাও পালিয়ে চলে যাব। আমার চাই না এই পাপের রাজত্ব, চাই না এত টাকা-পয়সা! তুই তো আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলি, বল? চল আমরা সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই।"
আবিরের এই অসহায় আকুতি শুনে পারুলের মনটা হঠাৎ কেমন যেন নরম হয়ে গেল। এক বুক হাহাকার তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত ঘৃণা, এত কুৎসিত সত্য জানার পরেও সে যে আবিরকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সেই মনটা তো মিথ্যে ছিল না! কিন্তু আবির তার সেই ভালোবাসার বিন্দুমাত্র মর্যাদা রাখেনি। পারুল নিজের চোখের জল আড়ালে চেপে ধরে এক অদ্ভুত মায়াবী ও শক্ত গলায় বলল—
পারুল: "তুমি তো চাইতে আমি তোমাকে বিয়ে করি? করব তোমায় আমি বিয়ে। তোমার সাথে সংসারও করব, তোমার হাত ধরে অনেক দূরে কোথাও চলেও যাব। কিন্তু তার আগে... তার আগে তোমাকে পবিত্র হতে হবে আবির। সব সত্যি বলে পাপের বোঝা নামাতে হবে।"
আবির যেন এক স্বর্গীয় আলো দেখতে পেল পারুলের চোখে। সে ব্যাকুল হয়ে বলল, "কী করতে হবে বল? তুই যা বলবি আমি সব করব তোর জন্য!"
পারুল সোফায় বসে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "শুরু থেকে সবটা বলতে শুরু করো। কীভাবে এই নরকের মি. এক্স তৈরি হলো?"
আবির ড্রয়িংরুমের মেঝের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত অতীতে ফিরে গেল। তার চোখের সামনে যেন ৯ বছর আগের সেই কালো রাতটা জীবন্ত হয়ে উঠল। সে এক ভারী গলায় বলতে শুরু করল—
আবির: "তখন আমার বয়স মাত্র ১৭ বছর। এসএসসি রেজাল্ট পেয়ে আমি খুশিতে একদম আতহারা হয়ে গিয়েছিলাম। সেই আনন্দের খবরটা বাবাকে দেওয়ার জন্য আমি সোজা বাবার অফিসে যাই। আরিয়ানের বয়স তখন মাত্র ১৫। অফিসের বেজমেন্টে আমার সাথে আমার এক বন্ধু ছিল—মাসুদ। আমরা যখন ভেতরে যাচ্ছিলাম, তখন পথেই মাসুদের সাথে আমার হঠাৎ করেই এক তুমুল মারামারি লেগে যায়।"
পারুল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "কেন? মারামারি কেন হয়েছিল?"
আবির একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল:
আবির: "কারণ মাসুদ এসে আমাকে বলেছিল, আমার বাবা নাকি প্রতি রাতে ওর মায়ের ঘরে যায়। ওর বাবা নাকি এই দৃশ্য দেখেও টাকার লোভে কিচ্ছু বলে না। মাসুদ এই নোংরা কথার কৈফিয়ত চাইতে এসেছিল আমার কাছে। আমি আমার বাবা আর চাচাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতাম, দেবতা ভাবতাম। তাই বাবার নামে এই কলঙ্ক শুনে আমার মাথা ঠিক ছিল না। ওর সাথে আমার মারাত্মক ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ও যখন বলল ও আমার বাবাকে মেরে ফেলবে, তখন আমি রাগের মাথায় ওকে একটা জোরে ধাক্কা দিই। ধাক্কা খেয়ে ও ছিটকে গিয়ে পড়ে এবং ওর মাথা বেজমেন্টের দেওয়ালের ধারালো একটা লোহার কোণায় লেগে যায়। চোখের পলকে... ঠিক ওই জায়গাতেই মাসুদ মারা যায়।"
কথাটা বলতেই আবিরের হাত দুটো কাঁপতে লাগল। সে কপালে জমা ঘাম মুছে বলল:
আবির: "আমার জীবনের মোড়টা ঠিক ওখানেই ঘুরে যায় পারুল। আমি ভয়ে, আতঙ্কে পাগলের মতো 'বাবা বাবা' করে চিৎকার করতে থাকি। আমার চিৎকার শুনে তখন বাবা, চাচা আর আরিয়ান—ওরা তিনজন একসাথে বেজমেন্টে ছুটে আসে। ওরা আমাকে শান্ত করে আর বলে কিচ্ছু হয়নি। এরপর ওরা নিজেদের ক্ষমতা দিয়ে ওই লাশ আর মারামারির ঘটনাটা পুরো ধামাচাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু ওই ঘটনার পর আমি দিন দিন আমার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিলাম। অপরাধবোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। ঠিক তখনই আরিয়ান আমার কাছে আসলো। ও আমাকে একটা নতুন রূপ শেখালো... ও আমাকে 'শিল্প' শেখালো।"
পারুল স্তম্ভিত হয়ে মাঝপথেই আবিরকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল:
পারুল: "শিল্প? কিসের শিল্প? আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনি তখনও ভালো ছিলেন, আর ১৫ বছরের আরিয়ান আপনাকে এই অপরাধের শিল্প শিখিয়েছে?"
আবির পারুলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, তার চোখে তখন এক অদ্ভুত অন্ধকার সত্যের ছায়া।
আবির: "হুম…”