Moli Akter

Moli Akter শব্দ আর ভাবনার রাজ্যে আমার বসবাস। কলম যার স্থায়ী সঙ্গী, আর পাঠকের ভালোবাসাই যার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।

আসসালামু আলাইকুম আমাদের পেইজে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

01/09/2026

#রহস্যময়_মানব
#পর্ব৮৩
ি_আক্তার

গাজীপুর থেকে ঢাকা—পুরোটা পথ গাড়িতে পারুল একটা টু শব্দও করেনি। পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে সে শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। পাশে বসা আবির তাকে কতকিছু বোঝানোর চেষ্টা করল, নিজের ভালোবাসার দোহাই দিল, কিন্তু পারুলের কানে তার একটা কথাও পৌঁছায়নি। আবির পারুলকে সরাসরি নিয়ে এলো আরিয়ানদের সেই বিলাসবহুল রাজপ্রাসাদ 'খান ভিলা'-তে।
​খান ভিলার বিশাল ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় এসে যখন পারুল বসল, তখন তার মনের ভেতর তীব্র এক ঘৃণার আগুন জ্বলছে। এতদিনের চেনা আবির আর আরিয়ানের আসল কুৎসিত সত্যটা জানার পর থেকে এই রাজপ্রাসাদের প্রতিটি দেওয়ালকে তার একেকটা নরকের টুকরো মনে হচ্ছে।
​পারুলের বড্ড হাসি পেল আবিরের 'ভালোবাসা' শব্দটা শুনে। মনে মনে এক তীব্র উপহাসের হাসি হেসে সে ভাবল—এই আমানুষগুলো, এই পিশাচগুলোও আবার ভালোবাসার কথা বলে? যারা শত শত অবুজ শিশুর জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে, যাদের কিডনি কেটে বিক্রি করে দিয়েছে এই আবির ওরফে 'মি. এক্স'! যে শিশুদের দিয়ে রাস্তায় ভিক্ষাবৃত্তি করায়, যাদের বুক খালি করে মা-বাবার কোল থেকে কিডন্যাপ করে আনে! শুধু তা-ই নয়, মাদক কারবার দিয়ে দেশের যুবসমাজকে শেষ করছে, অবৈধ অস্ত্র পাচার করে দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে আর অসহায় মেয়েদের বিক্রি করে দিচ্ছে অন্ধকারের বাজারে! কত কত পরিবার তাদের আপন মানুষকে হারিয়ে আজীবন ডুকরে কাঁদছে এই সিন্ডিকেটের কারণে—আর সেই সিন্ডিকেটের মূল মাথা আবির তাকে এসে ভালোবাসা বোঝায়?
​পারুল মনে মনে ভাবল, "খোদা হয়তো এই আমানুষগুলোকে ধ্বংস করার জন্যই 'ভালোবাসা' নামের এই পবিত্র অস্ত্রটা বানিয়েছেন। মায়ার ভালোবাসা যেমন আরিয়ানকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি এই আবিরের ভালোবাসাই আজ ওর কাল হবে।"
​পারুল আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। আবির তখন ড্রয়িংরুমের অন্য পাশে পারুলের জন্য কফি আনার কথা বলে একটু ব্যস্ত ছিল। পারুল অত্যন্ত সাবধানে নিজের ফোনটা বের করল। হাত কিছুটা কাঁপলেও তার চোখ দুটোতে তখন প্রতিশোধের তীব্র জেদ। সে সোজা আরাফাতের নম্বরে গিয়ে মেসেজ বক্সটা খুলল।
​সে তার ফোনে থাকা সেই গোপন ও অকাট্য ভিডিও ক্লিপগুলো সিলেক্ট করল, যা সে কোনোভাবে জোগাড় করেছিল। ক্লিপগুলোতে আরিয়ানের চেহারা অতটা স্পষ্ট না বোঝা গেলেও, আবির যে নিজেই সেই কুখ্যাত আন্তর্জাতিক অপরাধী 'মি. এক্স'—সেটার ১০০% স্পষ্ট প্রমাণ সেখানে রয়েছে।
​ভিডিওগুলো সেন্ড করে পারুল নিচে দ্রুত টাইপ করে লিখে পাঠাল:
​"আরাফাত ভাই, আপনি এখনই আপনার পুরো স্পেশাল পুলিশ ফোর্স নিয়ে খান ভিলাতে আসুন। মি. এক্স-এর আসল প্রমাণ এগুলো। ও এখন খান ভিলাতে ওর নিজের বাড়িতেই আছে। ওকে আজ রাতেই গ্রেপ্তার করুন!"
​মেসেজটা সাকসেসফুলি 'সেন্ট' হতেই পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। ঠিক তখনই পায়ের আওয়াজ পেয়ে সে ড্রয়িংরুমের সদর দরজার দিকে তাকাল।
​সে দেখল, আবির এক হাত দুটো সামনে গুটিয়ে, অত্যন্ত অসহায় আর অপরাধী একটা মুখ করে ধীর পায়ে পারুলের দিকেই এগিয়ে আসছে। পারুলের মুখে জমে থাকা সেই তীব্র ঘৃণা আর অবহেলার মাঝে আবির যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। সে পারুলকে সান্ত্বনা দিতে বা নিজের সাফাই গাইতে কিছু একটা বলতে মুখ খুলল…
আবির: "আমাকে মাফ করে দে পারুল! খোদার কসম, আমি নিজের ইচ্ছায় এই জঘন্য অপরাধ জগতে আসিনি। আমাকে আরিয়ান এই পথে টেনে এনেছে। আমি ওর বড় ভাই, অথচ আমি এই বাড়িতে ওর একজন গোলাম মাত্র! তুই ভাবিস না আমি লোভের জন্য, টাকার জন্য এসব করি... আসলে—"
​আবিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই পারুল সোফা থেকে ছিটকে দাঁড়িয়ে তীব্র চিৎকারে তার কথা কেড়ে নিল—
​পারুল: "আসলে মানে কী, আবির? আসলে কী? এই জঘন্য পাপ, এই রক্ত আর কান্নার ব্যবসা... এগুলোর সাথে তোমাদের বাড়ির প্রত্যেকটা পুরুষ জড়িত! শুধু টাকার জন্য, ক্ষমতার অহংকারে তোমরা পিশাচ হয়ে গেছ!"
​আবির দুই হাত বাড়িয়ে পারুলকে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, "না পারুল, তুই বিশ্বাস কর! আমি একটা মাত্র ভুল করে এই পাপের রাজ্যে পা বাড়িয়েছিলাম, তারপর আর বের হতে পারিনি।"
​পারুল নিজের ভেতরের কাঁপনটা লুকিয়ে একটু থমকে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, আবির এখন মানসিকভাবে দুর্বল। এই সুযোগে ওর মুখ থেকে সব সত্যি বের করে আনা সম্ভব। পারুল অত্যন্ত কৌশলে সোফার ওপরে রাখা ফোনের ভয়েস রেকর্ডারটা অন করে দিল। তারপর নিজের গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল—
​পারুল: "হুম শুনব... বলো, তোমার সব কথা আজ আমি শুনব।"
​পারুলের গলায় এই প্রথম রাগ বা ঘৃণার বদলে একটুখানি আশার আলো পেয়ে আবির যেন আকুল হয়ে উঠল। সে মরীচিকার পেছনে ছোটা তৃষ্ণার্ত মানুষের মতো বলতে লাগল—
​আবির: "আমি এসব নরক থেকে বের হয়ে যেতে চাই পারুল। তোকে নিয়ে অনেক দূরে, কোথাও পালিয়ে চলে যাব। আমার চাই না এই পাপের রাজত্ব, চাই না এত টাকা-পয়সা! তুই তো আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলি, বল? চল আমরা সব ছেড়েছুড়ে চলে যাই।"
​আবিরের এই অসহায় আকুতি শুনে পারুলের মনটা হঠাৎ কেমন যেন নরম হয়ে গেল। এক বুক হাহাকার তার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এত ঘৃণা, এত কুৎসিত সত্য জানার পরেও সে যে আবিরকে ভালোবেসে ফেলেছিল, সেই মনটা তো মিথ্যে ছিল না! কিন্তু আবির তার সেই ভালোবাসার বিন্দুমাত্র মর্যাদা রাখেনি। পারুল নিজের চোখের জল আড়ালে চেপে ধরে এক অদ্ভুত মায়াবী ও শক্ত গলায় বলল—
​পারুল: "তুমি তো চাইতে আমি তোমাকে বিয়ে করি? করব তোমায় আমি বিয়ে। তোমার সাথে সংসারও করব, তোমার হাত ধরে অনেক দূরে কোথাও চলেও যাব। কিন্তু তার আগে... তার আগে তোমাকে পবিত্র হতে হবে আবির। সব সত্যি বলে পাপের বোঝা নামাতে হবে।"
​আবির যেন এক স্বর্গীয় আলো দেখতে পেল পারুলের চোখে। সে ব্যাকুল হয়ে বলল, "কী করতে হবে বল? তুই যা বলবি আমি সব করব তোর জন্য!"
​পারুল সোফায় বসে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "শুরু থেকে সবটা বলতে শুরু করো। কীভাবে এই নরকের মি. এক্স তৈরি হলো?"
​আবির ড্রয়িংরুমের মেঝের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত অতীতে ফিরে গেল। তার চোখের সামনে যেন ৯ বছর আগের সেই কালো রাতটা জীবন্ত হয়ে উঠল। সে এক ভারী গলায় বলতে শুরু করল—
​আবির: "তখন আমার বয়স মাত্র ১৭ বছর। এসএসসি রেজাল্ট পেয়ে আমি খুশিতে একদম আতহারা হয়ে গিয়েছিলাম। সেই আনন্দের খবরটা বাবাকে দেওয়ার জন্য আমি সোজা বাবার অফিসে যাই। আরিয়ানের বয়স তখন মাত্র ১৫। অফিসের বেজমেন্টে আমার সাথে আমার এক বন্ধু ছিল—মাসুদ। আমরা যখন ভেতরে যাচ্ছিলাম, তখন পথেই মাসুদের সাথে আমার হঠাৎ করেই এক তুমুল মারামারি লেগে যায়।"
​পারুল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "কেন? মারামারি কেন হয়েছিল?"
​আবির একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল:
​আবির: "কারণ মাসুদ এসে আমাকে বলেছিল, আমার বাবা নাকি প্রতি রাতে ওর মায়ের ঘরে যায়। ওর বাবা নাকি এই দৃশ্য দেখেও টাকার লোভে কিচ্ছু বলে না। মাসুদ এই নোংরা কথার কৈফিয়ত চাইতে এসেছিল আমার কাছে। আমি আমার বাবা আর চাচাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতাম, দেবতা ভাবতাম। তাই বাবার নামে এই কলঙ্ক শুনে আমার মাথা ঠিক ছিল না। ওর সাথে আমার মারাত্মক ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এক পর্যায়ে ও যখন বলল ও আমার বাবাকে মেরে ফেলবে, তখন আমি রাগের মাথায় ওকে একটা জোরে ধাক্কা দিই। ধাক্কা খেয়ে ও ছিটকে গিয়ে পড়ে এবং ওর মাথা বেজমেন্টের দেওয়ালের ধারালো একটা লোহার কোণায় লেগে যায়। চোখের পলকে... ঠিক ওই জায়গাতেই মাসুদ মারা যায়।"
​কথাটা বলতেই আবিরের হাত দুটো কাঁপতে লাগল। সে কপালে জমা ঘাম মুছে বলল:
​আবির: "আমার জীবনের মোড়টা ঠিক ওখানেই ঘুরে যায় পারুল। আমি ভয়ে, আতঙ্কে পাগলের মতো 'বাবা বাবা' করে চিৎকার করতে থাকি। আমার চিৎকার শুনে তখন বাবা, চাচা আর আরিয়ান—ওরা তিনজন একসাথে বেজমেন্টে ছুটে আসে। ওরা আমাকে শান্ত করে আর বলে কিচ্ছু হয়নি। এরপর ওরা নিজেদের ক্ষমতা দিয়ে ওই লাশ আর মারামারির ঘটনাটা পুরো ধামাচাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু ওই ঘটনার পর আমি দিন দিন আমার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছিলাম। অপরাধবোধ আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। ঠিক তখনই আরিয়ান আমার কাছে আসলো। ও আমাকে একটা নতুন রূপ শেখালো... ও আমাকে 'শিল্প' শেখালো।"
​পারুল স্তম্ভিত হয়ে মাঝপথেই আবিরকে থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল:
​পারুল: "শিল্প? কিসের শিল্প? আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনি তখনও ভালো ছিলেন, আর ১৫ বছরের আরিয়ান আপনাকে এই অপরাধের শিল্প শিখিয়েছে?"
​আবির পারুলের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল, তার চোখে তখন এক অদ্ভুত অন্ধকার সত্যের ছায়া।
​আবির: "হুম…”

31/08/2026

#রহস্যময় মানব
#​পর্ব ৮২
ি_আক্তার
​আরিয়ান ফোনটা কাটতেই ঘরের ভেতরের থমথমে নীরবতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে মায়া হঠাৎ হেসে উঠল। সে এক অদ্ভুত, বুক কাঁপানো হাসি! যে হাসির পেছনে কোনো আনন্দ নেই, আছে কলিজা ছিঁড়ে যাওয়া কষ্ট, তীব্র উপহাস আর চোখে জমা এক সমুদ্র নোনা জল। মুখে তার সেই মরণজয়ী হাসি, কিন্তু চোখ দুটো বেয়ে তখন টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। মায়া নিজের বুকের ওপর হাত চেপে ধরে এক অদ্ভুত, চড়া সুরে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল—
​মায়া: "দেখছেন আপনি? দেখছেন আমার ভাই আরাফাত আপনার এই অন্ধকার আস্তানা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য কতটুকু সময় নিলো? মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা! আরিয়ানের শ্যাডো ম্যানের সাম্রাজ্য খুঁজে পেতে আমার ভাইয়ের চার ঘণ্টাও সময় লাগেনি! কিন্তু আরিয়ান... যেদিন আমার ভাই এই সত্যটা জানতে পারবে যে, আপনার এই নোংরা হাতে আমার আরেকজন পবিত্র ভাইয়ের রক্ত লেগে আছে... আপনি নিজের হাতে খুন করেছেন আমার কলিজার টুকরো রিয়ান ভাইয়াকে... সেদিন কী হবে ভেবেছেন? যেদিন আরাফাত ভাই জানবে আপনিই রিয়ানের হত্যাকারী, সেদিন সে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে আপনাকে! ধ্বংস করে দেবে আপনার এই নরকের রাজত্ব!"
​মায়ার এই তীব্র আক্ষেপ আর চিৎকারের জবাবে আরিয়ান একটুও চমকে গেল না। উল্টো সে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আরও জোরে হেসে উঠল। কিন্তু সেই হাসির রেশ কাটতে না কাটতেই তার কণ্ঠস্বর একদম শান্ত, শীতল আর গভীর হয়ে গেল। সে মায়ার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল—
​আরিয়ান: "আরাফাত এখনো বেঁচে আছে শুধু তোমার জন্য মায়াপরী! এই শ্যাডো ম্যানের দিকে কেউ আঙুল তুললে তার লাশ গুম হতে সময় লাগে না, কিন্তু আরাফাত তোমার ভাই বলেই সে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ধ্বংসের কথা বলছ? এই আরিয়ানকে পৃথিবীর কোনো শক্তি, কোনো আইন ধ্বংস করতে পারবে না মায়া। আমাকে যদি ধ্বংস করতে পারে, তবে সে শুধু তুমি! তুমি ছাড়া কারও সেই ক্ষমতা নেই।"
​মায়া চোখের জল মুছে, আরিয়ানের চোখের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত অনমনীয় ও ধারালো গলায় বলল—
​মায়া: "তাহলে না হয় তা-ই হোক আরিয়ান! আমার হাতেই না হয় আপনার এই পাপের সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়টা লেখা হবে। আমি নিজেই আপনাকে ধ্বংস করব!"
​আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে মায়ার এই চরম ঘৃণাকে যেন নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হিসেবে মেনে নিল। সে শান্ত গলায় জবাব দিল—
​আরিয়ান: "তুমি যদি পারো মায়া, তবে আমি সানন্দে ধ্বংস হবো তোমার হাতে। তোমার দেওয়া ধ্বংসেই আমার মুক্তি।"
​আরিয়ানের এই নিস্পৃহ, ভালোবাসায় জড়ানো আত্মসমর্পণ মায়ার ভেতরের সমস্ত শক্ত বাঁধ ভেঙে দিল। এতক্ষণ যে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে হঠাৎ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। মায়া দুই হাতে মুখ ঢেকে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার কণ্ঠ দিয়ে এতদিনের জমাট বাঁধা সব কষ্ট আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে এল—
​মায়া: "কেন জড়ালেন আরিয়ান? কেন আমার এই সাধারণ, নিষ্পাপ জীবনে নিজের এই নোংরা অন্ধকার অধ্যায়টা টেনে আনলেন? আপনার এই রূপ... আপনার এই পিশাচ রূপ আমি সহ্য করতে পারছি না! আমাকে ভেতরে-বাইরে একদম ভেঙে চুরমার করে দিলেন আপনি। আপনার পরিচয় লুকিয়ে, আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়ে, আজ আবার এভাবে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিলেন কেন? কেন করলেন এমন?"
​মায়ার এই বুক ফাটানো কান্না আর আর্তনাদ আরিয়ানের বুকের ভেতর তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। এত বড় শ্যাডো ম্যান, যার এক ইশারায় আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপে, সে মায়ার এই কান্নার সামনে এসে একদম অসহায় হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা এক তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগল, ঠিক যেন একটা ছোট বাচ্চা তার প্রিয় জিনিসটা হারিয়ে ফেলার ভয়ে ছটফট করে। আরিয়ান অস্থির হয়ে মায়ার হাত দুটো ধরতে চাইল, তার কণ্ঠস্বরে এক বুক ভাঙা আকুতি—
​আরিয়ান: "বিশ্বাস করো মায়াপরী, আমি তোমাকে কখনো কষ্ট দিতে চাইনি! খোদার কসম, আমি চাইনি আমার এই অন্ধকারের ছায়া কোনোদিন তোমার গায়ে লাগুক। আর সেই কারণেই তো আমি নিজের এই কুৎসিত জীবনটা তোমার থেকে এতকাল লুকিয়ে রেখেছিলাম! রিয়ানের সেই ইনসিডেন্টের পর আমি প্রথম তোমাকে দেখি মায়া... তার আগে যদি একটা বারও আমি তোমাকে দেখতাম, তবে আমি কখনোই রিয়ানকে মারতাম না! আজ আরাফাতের ওপর আমার এত রাগ, সে আমার এত বড় ক্ষতি করার পরেও আমি কাউকে ওর গায়ে একটা টোকা পর্যন্ত দিতে দিইনি, শুধু তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে। আমি যদি তোমাকে আগে চিনতাম, তবে তোমার চারপাশের প্রতিটি প্রিয় মানুষকে আমি নিজের জীবন দিয়ে আগলে রাখতাম মায়া! আমার এই জঘন্য ভুলের জন্য... আমার এই পাপের জন্য আমি সব শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি। বলো আমাকে, তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব... আমাকে ঠিক কী করতে হবে বলো?"
​কিন্তু মায়া তখন আর কোনো যুক্তি, কোনো অনুশোচনা শোনার মতো অবস্থায় ছিল না। আরিয়ানের প্রতিটি কথা তার কানে রিয়ানের রক্তের দাগ মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিল। আরিয়ান মায়ার এই আকস্মিক ধাক্কায় ঘরের বাইরে ছিটকে যেতেই মায়া সশব্দে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল এবং ভেতর থেকে লক করে দিল।
​বদ্ধ ঘরের ওপাশ থেকে মায়ার বুক ফাটা চিৎকারের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। সে দরজা ধরে মেঝেতে বসে পড়ে আপন মনে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল—যে কান্নায় মিশে আছে এক অদ্ভুত ভালোবাসার সমাধি আর এক প্রিয় ভাই হারানোর আজীবনের ক্ষত। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে শ্যাডো ম্যান আরিয়ান নিজের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দেওয়ালের মাথায় কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যার চোখের কোণ দিয়েও তখন গড়িয়ে পড়ছে তপ্ত অশ্রু।

বন্ধ দরজার ওপাশে মায়ার ডুকরে কাঁদার শব্দটা আরিয়ানের বুকের ভেতরটা তিরের মতো বিঁধছিল। কিন্তু ঘরের ভেতরের মায়ার মনের ভেতর তখন চলছিল এক প্রলয়ংকরী ঝড়। মেঝের ওপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে মায়া কাঁদছিল আর তার অবশ মস্তিস্কে একের পর এক দৃশ্যপট ভেসে উঠছিল।
​সে কি পারবে আরিয়ানকে ধ্বংস করতে? সে কি পারবে নিজের হাতে এই মানুষটাকে শেষ করে দিতে?
​মায়া চোখ বন্ধ করতেই রিয়ান ভাইয়ের রক্তাক্ত মুখটা যেমন ভেসে উঠছে, ঠিক তার পাশেই ভেসে উঠছে আরিয়ানের সেই মায়াবী, যত্নশীল চোখ দুটো। যে চোখ দিয়ে আরিয়ান তাকে আগলে রেখেছিল, যে হাত দিয়ে মায়ার চোখের জল মুছে দিয়েছিল। মায়া তীব্র এক যন্ত্রণায় নিজের চুল খামচে ধরল। সে বুঝতে পারল, ঘৃণা যতই থাকুক, এই খুনি আরিয়ানকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছে! এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ ভালোবাসার মায়ায় সে জড়িয়ে গেছে, যা সে চাইলেও ছিঁড়ে ফেলতে পারছে না।
​আর আরিয়ান? সে তো স্পষ্ট বলে দিল, এই সাম্রাজ্য সে ছাড়তে পারবে না। যে পাপের শিকড় এত গভীরে, তা আরিয়ান কখনো ছাড়বে না—ছাড়ার হলে অনেক আগেই ছাড়ত। একদিকে ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ, অন্যদিকে নিজের জীবনের সবচেয়ে পবিত্র ভালোবাসা—এই দুই চরম সত্যের মাঝখানে পিষে যাচ্ছিল মায়ার চূর্ণ-বিচূর্ণ হৃদয়।
​এত বড় আঘাত, এত তীব্র মানসিক চাপ আর এই দমবন্ধ করা অপরাধবোধ সহ্য করার মতো শক্তি মায়ার ওই ছোট্ট বুকে আর ছিল না। তার চারপাশের দেয়ালগুলো যেন তাকে গিলে খেতে আসছিল। মায়ার চোখ আচমকা গিয়ে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা আরিয়ানের সেই চকচকে ধারালো ছুরিটার ওপর।
​মায়ার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, শান্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। চোখের জল তখনো গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তার হাত কাঁপল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ছুরিটা হাতে তুলে নিল। নিজের হাতের কবজির দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বলল—
​"আমি তোমাকে শাস্তিও দিতে পারলাম না আরিয়ান, আবার তোমার এই পাপের অংশীদার হয়ে বেঁচেও থাকতে পারলাম না। আমার এই ভালোবাসার শেষ অধ্যায়টা আমি নিজের রক্ত দিয়েই লিখে গেলাম..."
​একটুও দ্বিধা না করে মায়া ধারালো ছুরিটা নিজের হাতের রগে বসিয়ে এক টানে কেটে ফেলল।
​এদিকে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের ছটফটানি তখন চরমে পৌঁছেছে। ভেতর থেকে মায়ার কান্নার আওয়াজ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতেই আরিয়ানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। সে দরজায় উপর্যুপরি ধাক্কা দিতে দিতে চিৎকার করতে লাগল—
​আরিয়ান: "মায়া! মায়াপরী, কথা বলো! প্লিজ একটা বার সাড়া দাও! তুমি যা বলবে আমি তা-ই শুনব। মায়া, দরজা খোলো!"
​কোনো সাড়া নেই। চারদিক এক ভুতুড়ে নীরবতায় ঢেকে গেছে। আরিয়ান যখন পাগলের মতো দরজায় আঘাত করছে, ঠিক তখনই তার নজর গেল দরজার নিচের সরু ফাঁকা অংশটার দিকে।
​সেখানে সাদা মেঝের ওপর দিয়ে এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা করে গাঢ় লাল রক্ত গড়িয়ে বাইরের দিকে চলে আসছে। রক্তের সেই লাল স্রোত দেখে আরিয়ানের চোখের মণি দুটো এক নিমেষে স্থির হয়ে গেল। তার চেনা পৃথিবীটা যেন চোখের সামনে দুলতে লাগল। শ্যাডো ম্যানের সমস্ত অহংকার, ক্ষমতা আর নিষ্ঠুরতা এক সেকেন্ডে ধুলোয় মিশে গেল।
​আরিয়ান তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভয়ার্ত চিৎকার দিয়ে উঠল—
​আরিয়ান: "মায়aaa! নাাা!"
​সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তার গলার আওয়াজ শুনে ছুটে আসা বিশ্বস্ত লোকজনকে লক্ষ্য করে সে পাগলের মতো গর্জে উঠল—
​আরিয়ান: "ভেঙে ফেলো! এই দরজা এখনই ভেঙে ফেলো! যদি মায়ার কিছু হয়, আমি তোদের সবাইকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! ভাঙ এটা!"
​আরিয়ানের হুকুমে চার-পাঁচজন লোক একসাথে এসে পুরো শক্তি দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। আরিয়ান নিজেও নিজের কাঁধ দিয়ে দরজায় আঘাত করতে লাগল, তার চোখ দিয়ে তখন অবাধ্য অশ্রু ঝরছে। কয়েকটা প্রচণ্ড ধাক্কার পর সশব্দে লক ভেঙে দরজাটা ভেতরের দিকে খুলে গেল।
​ভেতরে ঢুকেই আরিয়ানের বুকটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের মেঝেতে রক্তের পুকুরে ভেসে মায়া নিথর হয়ে পড়ে আছে, তার সেই ফর্সা হাতটা কেটে রক্ত তখনো টপ টপ করে ঝরছে। আরিয়ান এক লাফে গিয়ে মায়ার সেই রক্তাক্ত দেহটা নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। মায়ার ক্ষতবিক্ষত হাতটা নিজের বুকে চেপে ধরে সে বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল—
​আরিয়ান: "তুমি এটা কী করলে মায়াপরী? কেন নিজেকে এই শাস্তি দিলে? চোখ খোলো মায়া, তোমার আরিয়ান ডাকছে... চোখ খোলো!"
​আরিয়ানের চোখের জল আর মায়ার রক্ত একাকার হয়ে গেল সেই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে। শ্যাডো ম্যান আজ তার নিজের তৈরি করা নরকের সবচেয়ে বড় পরাজয়টার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মায়ার জ্ঞানহীন মুখের দিকে তাকিয়ে আকুল আকুতি জানাতে লাগল।

30/08/2026

#রহস্যময়_মানব
#পর্ব৮১
ি_আক্তার
আরিয়ানের একের পর এক হাড়হিম করা স্বীকারোক্তি শোনার পর মায়ার মনের ভেতর আরও হাজারটা প্রশ্ন দলা পাকিয়ে উঠল। কিন্তু এই মুহূর্তে সেইসব প্রশ্ন করার মতো শক্তি বা মানসিক অবস্থা তার ছিল না। মায়া আর কোনো কথা না বলে পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে রইল। মায়াকে এভাবে শান্ত হয়ে যেতে দেখে আরিয়ান আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে আলতো হাতে মায়ার হাত আর পায়ের সেই শক্ত দড়ির বাঁধনগুলো একে একে খুলে দিল। বাঁধনমুক্ত হতেই মায়া নিজের অবশ হয়ে যাওয়া হাত দুটো চেপে ধরল।
​আরিয়ান দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও যত্নশীল গলায় বলতে শুরু করল—
​আরিয়ান: "এখনো নিশ্চয়ই তোমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে মায়াপরী? সেসব না হয় পরেই হবে। দেখো, রাত ৩টা বেজে গেছে। তুমি চুপচাপ ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নাও, আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।"
​মায়া নিজের হাত ঘষে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে করতে অত্যন্ত শীতল ও অনমনীয় গলায় জবাব দিল—
​মায়া: "আমি কিচ্ছু খাব না। আর... ওই বন্দি মেয়েগুলো কোথায় এখন?"
​আরিয়ান মায়ার এই অবাধ্যতায় কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেও নিজের রাগ প্রকাশ করল না। সে নরম গলায় বলল, "না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে মায়া। আগে ফ্রেশ হও, তারপর..."
​মায়া: (আরিয়ানের কথা কেড়ে নিয়ে, তীব্র চোখে তাকিয়ে) "আমি বলেছি আগে বলুন ওই মেয়েগুলো কোথায়?"
​আরিয়ান এক মুহূর্ত মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে নিস্পৃহ গলায় বলল, "ওরা পাশের ঘরেই আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের ট্রাকে তোলা হবে, ঘাটে পাঠানোর জন্য।"
​ট্রাকে তোলার কথা শুনতেই মায়ার বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল। সে নিজের সমস্ত ঘৃণা আর অভিমান একপাশে সরিয়ে রেখে আরিয়ানের সামনে দুই হাত জোড় করল। তার কণ্ঠ দিয়ে এক আকুল মিনতি বেরিয়ে এল।
​মায়া: "না আরিয়ান! প্লিজ, এমন অন্যায় করবেন না। একটা বার নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন, ওরাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান, কারো বোন, কিংবা কারো পবিত্র ভালোবাসা! ওদের এভাবে নরকে পাঠিয়ে দেবেন না, ছেড়ে দিন আজ ওদের! এই একটা বার আমার কথা রাখুন। ওদের জায়গায় আজ আমিও তো থাকতে পারতাম, আমাকে তো আপনি আপনার ভালোবাসা বলে ফিরিয়ে এনেছেন। তাহলে ওদের কেন এই শাস্তি? ছেড়ে দিন ওদের, প্লিজ!"
​মায়ার এই আকুল মিনতি শুনে আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে এক বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল।
​আরিয়ান: "ওদের ছেড়ে দেওয়া এত সহজ নয় মায়াপরী! ওদের ছেড়ে দিলে ওপর মহল থেকে, বাইরের ক্লায়েন্টদের থেকে চরম চাপ আসবে। তখন আমার এই রাজত্ব তো দূর, আমাদের নিজেদের জীবনের ওপরও হামলা হতে পারে। তাছাড়া, এই মেয়েগুলোর জন্য মোটা অঙ্কের টাকা অ্যাডভান্স নেওয়া হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।"
​আরিয়ানের এই ব্যাবসায়িক যুক্তি শুনে মায়ার পুরো মন বিষিয়ে উঠল। সে তীব্র ক্ষোভে আর ঘৃণায় চিৎকার করে উঠল—
​মায়া: "কী করবেন আপনি এত এত পাপের টাকা দিয়ে? মানুষের জীবন বিক্রি করা রক্তে ভেজা টাকা দিয়ে কোন সুখটা কিনবেন আপনি?"
​মায়ার এই প্রশ্নের জবাবে আরিয়ানের চোখে-মুখে এক নির্মম ও কঠিন বাস্তবতার ছায়া ফুটে উঠল। সে মায়ার দিকে এক পা এগিয়ে এসে অত্যন্ত গম্ভীর ও ভারী গলায় বলল—
​আরিয়ান: "এই পৃথিবীতে টাকাই শেষ কথা মায়া, টাকা আর ক্ষমতাই এখানে আসল! আজ আমার কাছে যদি এই অগাধ টাকা আর ক্ষমতা না থাকত, তবে ওই অন্ধকার জগতের মানুষগুলো কবেই আমার নিজের বাপ-চাচাদের দিয়ে আমাকে খুন করিয়ে লাশ গুম করে দিত! আমি এই সিংহাসনে টিকে আছি বলেই আজ বেঁচে আছি, আর তোমাকে আমার পাশে আগলে রাখতে পারছি।"
​আরিয়ানের এই শেষ কথাটি শুনে মায়া স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, আরিয়ানের এই অপরাধের শিকড় কতটা গভীরে এবং কতটা অন্ধকার এক পারিবারিক নৃশংসতার ওপর ভিত্তি করে এই 'শ্যাডো ম্যান' গড়ে উঠেছে।
​আরিয়ানের মুখ থেকে তার নিজের বাবা-চাচার খুনের হুমকির কথা শুনে মায়ার পায়ের তলার মাটি যেন আরও একবার সরে গেল। এই অন্ধকার জগতের পেছনে যে নিজের আপন রক্ত জড়িত থাকতে পারে, তা মায়ার কল্পনারও বাইরে ছিল। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে, প্রায় তোতলামো গলায় জিজ্ঞেস করল—
​মায়া: "আপনার... আপনার নিজের বাবা আর চাচাও এই জঘন্য পাপের সাথে জড়িত?"
​মায়ার এই প্রশ্ন শুনে আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চরম আক্ষেপ, উপহাস আর তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে এক ঝটকায় মায়ার দিকে ঘুরে দাঁড়াল, তার চোখের মণি দুটো এবার ক্ষোভে আর অপমানে জ্বলজ্বল করছে।
​আরিয়ান: (একটু জোরে হেসে, তীব্র ক্ষোভের সাথে) "জড়িত? জড়িত বলছ কী মায়াপরী! ওরাই তো এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের আসল মাথা। ওরাই তো এখন আমাকে প্রতিনিয়ত ফোর্স করে এই সব নোংরা কাজগুলো করতে! আমি চাইলেও এই সিংহাসন ছাড়তে পারি না ওদের জন্য।"
​কথাটা বলেই আরিয়ান দুই হাত মুঠো করে দেওয়ালের দিকে তাকাল। তার কন্ঠস্বরে এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব ও তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল।
​আরিয়ান: "কারণ আমি যদি আজ এই কাজ করা বন্ধ করে দিই, তবে যে ওদের সেই বিলাসবহুল জীবনের 'টাকার মেশিন' চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে! আমার নিজের বাবা আর চাচা আমাকে তাদের সন্তান বা ভাইপো ভাবেনি কোনোদিন, আমি ওদের কাছে কেবলই একটা টাকার মেশিন! আর এই মেশিনের চাকা সচল রাখার জন্য ওরাই আমাকে এই নরকের আগুনে পুড়িয়ে মারছে। আমি যদি ওদের ওপর কথা বলি, তবে আমার নিজের রক্তই সবার আগে আমার বুকে বুলেট চালিয়ে দেবে। এবার বোঝো মায়া, আমি কোন নরকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তোমাকে ভালোবেসে আগলে রাখার লড়াইটা লড়ছি!"
​আরিয়ানের এই হাড়হিম করা সত্যটা শোনার পর মায়া সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, আরিয়ান কেবল একজন অত্যাচারী পিশাচই নয়, সে নিজেই তার নিজের পরিবারের তৈরি করা এক অন্ধকার খাঁচার সবচেয়ে হিংস্র বন্দি।
আরিয়ানের মুখে পরিবারের দোহাই শুনে মায়ার ভেতরের ক্ষোভ আর ঘৃণা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে আরিয়ানের এই আত্মপক্ষ সমর্থনের নোংরা চেষ্টা বিন্দুমাত্র মেনে নিতে পারল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে চোখ রেখে অত্যন্ত কঠোর ও ধারালো গলায় বলল—
​মায়া: "নিজের সব অপরাধের দায় এখন পরিবারের ওপর চাপাবেন না আরিয়ান! আপনি নিজে না চাইলে, আপনার ভেতরে যদি এই লোভ আর হিংস্রতা না থাকত, তবে দুনিয়ার কেউ কোনোদিন আপনাকে এভাবে ব্যবহার করতে পারত না। আপনি নিজেই এই নরকের রাজা হতে চেয়েছিলেন!"
​মায়ার এই চাবুকের মতো সত্য কথার আঘাতে আরিয়ানের মুখের সেই অসহায়ত্বের মুখোশটা আবার ভেঙে গেল। সে মাথা নিচু করে এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর এক অদ্ভুত, নির্লজ্জ ও সততার সাথে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—
​আরিয়ান: "হ্যাঁ মায়াপরী, তোমার এই কথাটা একদম ঠিক। আমি অস্বীকার করব না। একদম শুরুতে... শুরুতে আমি এই ক্ষমতা, এই অগাধ টাকা আর অন্ধকার রাজত্ব বেশ উপভোগই করেছি। শ্যাডো ম্যানের এক ইশারায় যখন পুরো শহর কাঁপত, তখন আমার অহংকার হতো।"
​বলতে বলতে আরিয়ানের চোখ দুটো আবার লাল হয়ে উঠল, সে মায়ার আরও কাছে এসে আকুল হয়ে বলল—
​আরিয়ান: "কিন্তু বিশ্বাস করো মায়া, আমার জীবনে তুমি আসার পর... ঠিক যখন থেকে আমি তোমাকে ভালোবাসতে শুরু করলাম, তখন থেকেই আমি এই নরক থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম! আমি এই কুৎসিত রূপটা ধুয়ে একদম সাধারণ হয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা... আমার ওই পরিবার আর এই জগতের মানুষগুলো আমাকে আর মুক্তি দিল না! তারা আমার চারপাশের শিকল আরও শক্ত করে দিল।"
​হঠাৎ আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, তার চোখের মণি দুটোতে এক আদিম হিংস্রতা আর খুনের নেশা জেগে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল—
​আরিয়ান: "মাঝে মাঝে আমার মন চায়... আমার এই বুকের ভেতর এমন আগুন জ্বলে ওঠে যে ইচ্ছা করে ওই সব কটাকে নিজের হাতে কেটে টুকরো টুকরো করে মেরে ফেলি! কিন্তু... কিন্তু তা করেও কোনো লাভ নেই মায়া। এই সাম্রাজ্যের পেছনে শুধু আমার বাবা-চাচা নয়, আরও অনেক বড় বড় ওপর মহলের মাস্টারমাইন্ডরা জড়িয়ে আছে। ওরাই আসল খেলাটা খেলে। আজ যদি আমি ওদের বিরুদ্ধে যাই, তবে ওদের মাত্র একটা ইশারায় আমি তো শেষ হবই... সাথে ওরাই আমার বুক থেকে তোমাকে কেড়ে নিয়ে তোমাকেও চিরতরে শেষ করে দেবে! আমি নিজের জীবন দিতে পারি মায়াপরী, কিন্তু কোনো মাস্টারমাইন্ডের ইশারায় তোমার ক্ষতি হতে দিতে পারি না!"
​আরিয়ানের এই হাড়হিম করা সত্য আর ভয়ের কথাগুলো শোনার পর মায়া এক অদ্ভুত শীতলতায় জমে গেল। সে বুঝতে পারল, সে কেবল একটা খুনি বা পিশাচের সামনে দাঁড়িয়ে নেই, সে আসলে এমন এক বিশাল ও অন্ধকার চক্রবূহের মাঝখানে এসে পড়েছে, যেখান থেকে জীবন্ত বেরিয়ে যাওয়ার পথটা দিন দিন আরও বেশি দুর্গম হয়ে উঠছে।
যখন আরিয়ানের সেই গোপন আস্তানার বদ্ধ ঘরে মায়ার জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসের দেয়ালটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখন বাইরের আলো ঝলমলে শহরের বুকে এক ভিন্ন ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। বোনকে উদ্ধারের জন্য আরাফাত তখন ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো হন্যে হয়ে খুঁজছে শ্যাডো ম্যানের ঠিকানা।
​গোপন সোর্সের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আরাফাত তার পুরো স্পেশাল ফোর্স টিম নিয়ে সেই নিষিদ্ধ পল্লীসহ আবিরের বেশ কয়েকটি আস্তানায় একযোগে চিরুনি অভিযান চালায়। ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশ যখন একের পর এক ডেরার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে, তখন চারদিকের অন্ধকার অপরাধের কুৎসিত চেহারাটা বেরিয়ে আসে।
​সেদিনের সেই রুদ্ধশ্বাস অপারেশনে আরাফাতের টিম বিপুল পরিমাণ অবৈধ আধুনিক অস্ত্র, বিপুল মাদক এবং পাচারের উদ্দেশ্যে বন্দি করে রাখা বেশ কিছু শিশু ও অসহায় নারীকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। অপরাধের এত বড় একটা চক্রকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েও আরাফাতের চোখে-মুখে কোনো জয়ের আনন্দ ছিল না। প্রতিটি ঘরের অন্ধকার কোণে, প্রতিটি বন্দি নারীর মুখের দিকে সে শুধু একটি মুখই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিল—তার আদরের ছোট বোন মায়া। কিন্তু পুরো আস্তানা ওলটপালট করেও যখন মায়ার কোনো হদিস মিলল না, তখন আরাফাতের বুকের ভেতরটা এক নিমিষে খালি হয়ে গেল।
​এত বড় ডেরা গুঁড়িয়ে দিয়েও বোনকে না পাওয়ার এই ব্যর্থতা আরাফাতকে ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে চুরমার করে দিল। সে তার হাতের রাইফেলটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে, দুই হাতে মুখ ঢেকে এক কোণে ধপ করে বসে পড়ল। একজন শক্ত মনের পুলিশ অফিসারের সমস্ত অহংকার আজ তার বোনের নিখোঁজ থাকার বেদনার কাছে হেরে গেছে। তার চোখ দিয়ে তখন টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।
​আরাফাতকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে তার পাশে এসে দাঁড়াল সায়েম। সে আরাফাতের কাঁধে একটা সান্ত্বনার হাত রাখল। সায়েমের নিজের বুকেও তখন মায়াকে হারানোর তীব্র যন্ত্রণা, কিন্তু এই মুহূর্তে আরাফাতকে শক্ত রাখাটা বড্ড বেশি প্রয়োজন। সায়েম তার নিজের চোখের জলটুকু আড়ালে লুকিয়ে অত্যন্ত ভারী ও শান্ত গলায় আরাফাতকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করল—
​সায়েম: "নিজেকে এভাবে ভেঙে পড়তে দিয়ো না আরাফাত ভাই। শান্ত হও। দেখো, আজ তোমার জন্যই অন্তত এই এতগুলো নিরীহ শিশু আর নারীদের জীবন নরকবাস থেকে বেঁচে গেল। সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আমাদের মায়াকেও কোনো না কোনোভাবে ভালো রেখেছেন। শ্যাডো ম্যান যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে মায়াকে আমাদের কাছ থেকে বেশিদিন আড়ালে রাখতে পারবে না। আমরা ঠিক ওর পর্যন্ত পৌঁছাব। এই ভেঙে পড়ার সময় নয় ভাই, আমাদের আরও শক্ত হতে হবে।"
​সায়েমের এই সান্ত্বনা বাক্যগুলো আরাফাতের কানে পৌঁছালেও তার অবশ মস্তিস্ক তখন কেবলই মায়ার সেই নিষ্পাপ মুখটার কথা ভাবছিল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, শ্যাডো ম্যানের এই পুরো সাম্রাজ্যকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে হলেও সে তার বোনকে এই নরক থেকে ফিরিয়ে আনবেই।
আরাফাত গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন হয়ে পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। মনের ভেতরের কোনো এক অদৃশ্য ইশারা বা সন্দেহের বশেই সে সোজা আরিয়ানের নম্বরে ডায়াল করে বসল।
​ওদিকে, সেই বদ্ধ ঘরের থমথমে অন্ধকারের মাঝে আরিয়ানের পকেটের ফোনটা হঠাৎ সশব্দে কেঁপে উঠল। আরিয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল—'আরাফাত ভাই'। সে এক পলক মায়ার দিকে তাকাল। মায়া তখনো ঠিক আগের মতোই এক অদ্ভুত, অনুভূতিহীন আর শূন্য দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে তখন কোনো জল নেই, রাগ নেই, যেন এক জীবন্ত লাশ হয়ে সে আরিয়ানের প্রতিটি রূপ দেখছে। আরিয়ান ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে ধরল।
​ফোনের ওপাশ থেকে আরাফাতের ক্লান্ত, বিপর্যস্ত অথচ উত্তেজিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
​আরাফাত: "আরিয়ান! মায়াকে আমরা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু আজ আমরা এক বিরাট সত্য জানতে পেরেছি। তোমার ভাই আবিরই হচ্ছে সেই কুখ্যাত 'মি. এক্স'! ওর কয়েকটা গোপন আস্তানায় আমি আমার ফোর্স নিয়ে এখনই হামলা করেছি, অনেক কিছু উদ্ধারও হয়েছে... কিন্তু মায়াকে কোথাও পাওয়া যায়নি। তুমি যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা ব্যাক করো আরিয়ান, আমাদের মায়াকে খুঁজতে হবে!"
​আরাফাত ভেবেছিল এই খবরটা শুনে আরিয়ান হয়তো চমকে উঠবে বা ভেঙে পড়বে। কিন্তু আরিয়ান তার সেই চিরচেনা, শীতল আর বরফ জমা গলায় অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল—
​আরিয়ান: "আমি ঢাকাতেই আছি আরাফাত ভাই। আর মায়াকে তোমাদের আর খুঁজতে হবে না... মায়া এই মুহূর্তে আমার কাছেই আছে। আর আবির? ও পারুলকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেছে।"
​আরিয়ানের মুখে মায়ার কথা শুনে আরাফাত যেন কিছুটা স্বস্তি পেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ানের পরের কথাটা তাকে স্তব্ধ করে দিল। আরিয়ান অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় যোগ করল—
​আরিয়ান: "আর আবির যে 'মি. এক্স'—সেটা আমি অনেক আগে থেকেই জানি!"
​আরিয়ানের এই অতি স্বাভাবিক ও ঠাণ্ডা মাথার কথাগুলো ফোনের ওপাশ থেকে শুনে আরাফাত যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। পুরো শহর ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, মায়া নিখোঁজ, আবির এক আন্তর্জাতিক অপরাধী—আর আরিয়ান এসব কিছু জেনেও এতটা নির্বিকার? এই অস্বাভাবিক শান্ত ভাবটা আরাফাত কোনোভাবেই সহজভাবে নিতে পারল না। তার অভিজ্ঞ পুলিশ মস্তিস্কের কোণে হঠাৎ করেই তীব্র এক সন্দেহের বিদ্যুৎ চমকে উঠল। এতদিনের চেনা, ভদ্র আর ডাক্তার আরিয়ানকে আজ তার কেন যেন বড্ড অচেনা আর রহস্যময় মনে হতে লাগল।
​আরাফাত নিজের গলার স্বর শক্ত আর গম্ভীর করে ফোনের ওপাশ থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল—
​আরাফাত: "মি. এক্স যে আবির... এটা তুমি আগে থেকেই জানতে আরিয়ান?! আর মায়া তোমার কাছে কীভাবে এল?"
​ফোনের ওপাশে আরাফাতের এই তীক্ষ্ণ প্রশ্ন আর সন্দেহের বাণী যখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তখন আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় শ্যাডো ম্যানের চিলতে হাসিটা ফুটে উঠল, আর মায়া একইভাবে অনুভূতিহীন চোখে সেই খুনি রাজপুত্রের দিকে চেয়ে রইল।

29/08/2026

#রহস্যময়_মানব
#পর্ব৮০
ি_আক্তার
আরিয়ানের মুখে একের পর এক হাড়হিম করা সত্য শুনতে শুনতে মায়ার অবশ মস্তিস্ক যেন হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল। তার মনের কোণে জমা থাকা সবচেয়ে বড় গোলকধাঁধাটার জট এবার খুলতে শুরু করল। মায়া হঠাৎ তীব্র এক কৌতুহল আর বিস্ময় নিয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে তখন কান্নার চেয়েও রহস্য উদঘাটনের তীব্র আকুলতা।
​মায়া: (একটু ঝুঁকে এসে, নিচু স্বরে) "আচ্ছা আরিয়ান... আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেবেন? আপনি যদি নিজেই এই পুরো পৈশাচিক সাম্রাজ্যের রাজা হন, তবে যাদের সাথে মিলে আপনি রিয়ান ভাই আর আরুশি আপুকে শেষ করার এই জঘন্য কাজটা করেছিলেন... সেই অপরাধীদের আপনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কেন ফাঁসি কাষ্ঠে ঝোলালেন? কেন নিজে সেজেছিলেন আইনের রক্ষক?"
​মায়ার এই আচমকা প্রশ্ন শুনে আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে আবার সেই পরিচিত, ক্রূর ও তাচ্ছিল্যের হাসিটা ফুটে উঠল। সে যেন মায়ার এই সরলতায় মনে মনে বেশ কৌতুক বোধ করল। সে মাথাটা সামান্য বাঁকিয়ে মায়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
​আরিয়ান: (অত্যন্ত শীতল ও শান্ত গলায়) "হাহ্! মায়াপরী, তুমি আসলেই বড্ড সরল! তুমি সত্যিই ভেবেছ আমি আমার নিজের বিশ্বস্ত লোকদের আইনের হাতে তুলে দিয়ে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়েছি? না মায়া, আমি ওদের ফাঁসি দিইনি!"
​কথাটা বলেই আরিয়ান ঘর জুড়ে এক পৈশাচিক অট্টহাসি দিয়ে উঠল। সেই হাসির শব্দে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাক্সারি বেডরুমের দেয়ালগুলোও যেন কেঁপে উঠল।
​আরিয়ান: "আমি ওদের শুধু কিছুদিন আড়ালে গিয়ে একদম চুপচাপ থাকতে বলেছিলাম। আমার সেই আসল লোকদের একটি চুলও স্পর্শ করার ক্ষমতা এই দেশের আইনের নেই। তারা আজ অন্য দেশে, আমারই দেওয়া রাজকীয় আশ্রয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে! আর ফাঁসি? ওখানকার ওই অন্ধকার সেলে আমারই সাজানো অন্য কিছু ছায়ামূর্তির ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। পুরো মিডিয়া, প্রশাসন আর দেশের মানুষকে টাকার জোরে আর ক্ষমতার ইশারায় যেভাবে নাচানো দরকার, আমি ঠিক সেভাবেই নাচিয়েছি। মিডিয়ায় জোরেশোরে ছড়ানো হয়েছিল যে আসল অপরাধীদের ফাঁসি হয়ে গেছে, যেন দেশের মানুষ সান্ত্বনা পায় আর তোমার ওই ভাই আরাফাত কেসটা ফাইলবন্দি করে শান্ত হয়ে বসে থাকে!"
​আরিয়ানের এই চরম সত্যের কথাগুলো শোনার পর মায়ার চোখের মণি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার পাপের শিকড় শুধু এই বেজমেন্টেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার এই নোংরা ক্ষমতার জাল ছড়ানো। নিজের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রূপী জানোয়ারটার প্রতি মায়ার ঘৃণা এবার যেন কয়েক হাজার গুণ বেড়ে গেল।
আরিয়ানের মুখ থেকে ক্ষমতার সেই কুৎসিত সত্যটা শোনার পর মায়ার চোখ দুটো যেন বিস্ময় আর ঘৃণায় অবশ হয়ে গেল। সে আর সহ্য করতে পারছিল না এই বদ্ধ ঘরের দমবন্ধ করা পরিবেশ। দড়িতে বাঁধা হাত দুটো যতখানি সম্ভব শক্ত করে চেপে ধরে মায়া তার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠ দিয়ে এবার এক বুকফাটা আর্তি আর তীব্র আক্ষেপ বেরিয়ে এল।
​মায়া: (চেঁচিয়ে, কান্নাভেজা গলায়) "কিন্তু কেন? কেন করলেন আপনি এত কিছু?কি ক্সতি করেছিলাম আমি?কেন আমার মনটা নিয়ে এমন খেলা খেললেন?এতো এতো খুন করে ও আপনার মন ভরলো না আপনি আমার মনটাকে ও খুন করলেন? কেন আরিয়ান?
​মায়ার এই আর্তনাদে আরিয়ানের ভেতরের সেই পৈশাচিক অহংকারটা এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেল। সে আবার মায়ার সামনে এসে ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার চোখ দুটো এবার লাল হয়ে উঠেছে, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তীব্র এক আকুলতার জল। সে মায়ার বাঁধা হাত দুটোর ওপর নিজের কাঁপাকাঁপা হাতটা রাখল।
​আরিয়ান: (চরম পাগলামি আর ব্যাকুলতা নিয়ে) "তোমাকে পাওয়ার জন্য মায়াপরী! শুধু তোমাকে পাওয়ার জন্য! আমি জানতাম, সরাসরি শ্যাডো ম্যান সেজে তোমার সামনে এলে তুমি আমাকে কোনোদিন মেনে নিতে না, আমার ছায়াও স্পর্শ করতে না। তাই তোমার সেই অটুট বিশ্বাসটা অর্জন করে, তোমাকে চিরতরে আমার নিজের করে রাখার জন্যই আমি এই পুরো খেলাটা খেলেছি!আমি তোমার মন নিয়ে খেলি নি।"
​কথাগুলো বলতে বলতে আরিয়ানের গলার স্বর বুজে এল। সে মায়ার আরও কাছে এসে প্রায় অনুনয় করার মতো করে বলতে লাগল—
​আরিয়ান: "বিশ্বাস করো মায়া, আমি যে সত্যিই তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি! এই পৃথিবীর যে কোনো কিছুর চাইতেও তোমাকে আমি বেশি ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া একটা মুহূর্তও যেন আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে! তোমাকে এক নজর না দেখলে আমার এই পুরো বুকটা যন্ত্রণায় ফেটে যেতে চায়। আর সেই কারণেই... শুধু তোমার পাশে থাকার কারণেই আমি আমার এই বিশাল অপরাধের সাম্রাজ্য, শ্যাডো ম্যানের এই অগাধ ক্ষমতা—সবকিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে, নিজের পরিচয় লুকিয়ে এক সামান্য ডাক্তার হয়ে বন্ধুর মতো সবসময় তোমার পাশে ছায়ার মতো জড়িয়ে ছিলাম। চেয়েছিলাম আমার অতীত ভুলে তোমার ওই পবিত্র ভালোবাসার আলোয় নিজেকে ধুয়ে নিতে!"
​আরিয়ানের এই অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর অথচ তীব্র ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে মায়ার পুরো শরীর ঘৃণায় শিউরে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই লোকটার ভালোবাসার গভীরতা যতখানি, তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি ধ্বংসাত্মক তার এই আসক্তি। এক রাজপুত্রের মুখোশ পরা জল্লাদের সামনে বসে মায়ার মনে হলো, তার নিজের পবিত্র ভালোবাসাটাই আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরিয়ানের মুখে এই তীব্র ভালোবাসার দাবি শুনে মায়ার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো বিষাক্ত ও তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। চোখের জল মুছে সে এক অদ্ভুত, শীতল চাউনিতে আরিয়ানের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে এবার আরিয়ানের প্রতি কোনো অধিকারবোধ ছিল না, ছিল কেবলই এক সুতীক্ষ্ণ প্রশ্ন।
​মায়া: (খুব ধীর কিন্তু স্পষ্ট স্বরে) "আমার ভালোবাসার আলোয় যদি আপনি আপনার জীবনের সব পাপ ধুয়েই নিতে চেয়েছিলেন আরিয়ান... তবে কেন? কেন আবার এই কুৎসিত, অন্ধকার জগতে ফিরে এলেন? কেন নিজেকে আবার এই নরকের রাজা বানালেন?"
​মায়ার এই প্রশ্নে আরিয়ানের ভেতরের সেই শ্যাডো ম্যান যেন এক লহমায় ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল। সে মায়ার সামনে থেকে আলতো করে মুখ নামিয়ে নিল। তার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সে এক গভীর, বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল—
​আরিয়ান: "এটা যে পাপের জগত, মায়াপরী! এই অন্ধকার গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। আমি নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে এই জগতটা ছাড়তে চাইলেও, এই জগতের অন্ধকার আমাকে কোনোদিন ছাড়বে না!"
​কথাটা বলেই আরিয়ান আবার মায়ার অবশ, বাঁধা হাত দুটোর দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক আদিম ছটফটানি।
​আরিয়ান: "আমি অনেক চেষ্টা করেছি মায়া, বিশ্বাস করো আমি অনেক চেষ্টা করেছি এই নরক থেকে চিরতরে দূরে সরে যেতে। কিন্তু যতবার আমি সব কিছু ছেড়েছুড়ে দিয়ে তোমার ওই পবিত্র আলোয় সাধারণ একটা মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছি, ততবার... ঠিক ততবার এই অন্ধকারের কোনো না কোনো শত্রু তোমার ওপর হামলা করেছে! তোমার অজান্তেই বারবার তোমার জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে তারা। আমি শুধু তোমার সুরক্ষার জন্যই, তোমাকে এই হিংস্র নেকড়েগুলোর হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই আজও এই পাপের মুকুট মাথায় পরে বসে আছি!"
​আরিয়ান মায়ার আরও কাছে এসে প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে নিজের ভেতরের আসল সত্যটা উগরে দিল।
​আরিয়ান: "তা না হলে... স্রষ্টার কসম মায়া, রিয়ানের ওই মৃত্যুর পর এই অপরাধের জগত, এই অগাধ ক্ষমতা আর রাজসিংহাসন—কোনো কিছুই আমাকে আর টানে না। তোমাকে যখন আমি আমার জীবনে নিজের করে পেয়েছিলাম, তখন আমি সত্যি সত্যি সবকিছু ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম একটা ছোট্ট ঘরে তোমাকে নিয়ে আমার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। কিন্তু আমার অতীত আমাকে শান্তিতে বাঁচতে দিল না মায়া। আজ আমি যা কিছু করছি, এই যে পিশাচ সেজে আবার সিংহাসনে বসেছি—এসব কিছু শুধু তোমার জন্য, তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য!"
​আরিয়ানের এই ক্ষ্যাপাটে, ব্যাকুল অথচ নির্মম সত্যের স্বীকারোক্তি শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা এক অজানা যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, সে এক এমন মায়াজালে বন্দি হয়ে গেছে, যার একপাশে তার ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ, আর অন্যপাশে এক বিকারগ্রস্ত মানুষের তার প্রতি সীমাহীন, আত্মঘাতী ভালোবাসা।
আরিয়ানের মুখে নিজের সুরক্ষার অজুহাত শুনে মায়ার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য ফাঁকা হয়ে গেল। সে এক অদ্ভুত, শূন্য দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। যে বিয়েটাকে সে তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র আর সুন্দর অধ্যায় বলে ভাবত, যেখানে সে আরিয়ানের মাঝে নিজের পরম আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল—আজ সেই স্মৃতিটাও কেমন যেন ধোঁয়াটে আর বিষাক্ত মনে হতে লাগল। মায়া এক বুক ভাঙা কষ্ট চেপে রেখে, চোখের স্থির মণি দুটো আরিয়ানের চোখের ওপর রাখল।
​মায়া: (অত্যন্ত কাঁপা, কিন্তু থমথমে স্বরে) "একটা শেষ সত্যি কথা বলবেন আরিয়ান? আমাদের সেই বিয়েটা... আমাদের সেই চার হাত এক হওয়া, ওটাও কি আপনার কোনো কুৎসিত পরিকল্পনা ছিল? যা আপনি নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছেন?"
​মায়ার এই প্রশ্নে আরিয়ানের মুখে কোনো অপরাধবোধ ফুটে উঠল না। বরং সে মায়ার খুব কাছে এগিয়ে এসে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে এক ঝটকায় নিজের সমস্ত মুখোশটা খুলে দিল। তার কণ্ঠে তখন এক আদিম, হিংস্র অধিকারবোধ।
​আরিয়ান: (একটুও দ্বিধা না করে, সোজাসুজি) "হ্যাঁ মায়াপরী! আমাদের বিয়েটাও আমারই একটা মাস্টারপ্ল্যান ছিল। সুন্দরবনে যা যা ঘটেছিল—তোমার হারিয়ে যাওয়া, আমার তোমাকে খুঁজে পাওয়া, আর পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে ওই গভীর বনে তোমাকে আপন করে নেওয়া—সবকিছু, সবটা পূর্বপরিকল্পিত ছিল!"
​কথাটা বলেই আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তার চোখে ফুটে উঠল এক তীব্র ক্ষোভ আর হিংসার আগুন, যা সে এত বছর ধরে নিজের বুকের ভেতর পুষে রেখেছিল।
​আরিয়ান: (দাঁতে দাঁত চেপে) "কারণ সে ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না মায়া! আমি যদি সুন্দরবনের বুকে ওই নাটকটা না করতাম, তবে এই সমাজ, এই আইন কিংবা ওই সিয়াম তোমাকে আমার কাছ থেকে চিরতরে কেড়ে নিত! সিয়াম যেভাবে তোমার দিকে হাত বাড়াচ্ছিল, যেভাবে তোমার মন জয় করার চেষ্টা করছিল—তা আমি সইতে পারছিলাম না। তোমাকে অন্য কারও বুকে দেখার চেয়ে আমি পুরো পৃথিবীটা ধ্বংস করে দিতে পারতাম! তাই তোমাকে চিরতরে অন্য সবার জন্য নিষিদ্ধ করতেই আমি আমাদের বিয়ের ওই সুন্দর ফাঁদটা পেতেছিলাম।"
​আরিয়ানের এই শেষ স্বীকারোক্তিটি শোনার পর মায়ার মনে হলো, তার মাথার ওপর যেন আকাশটা ভেঙে পড়ল। যে ভালোবাসাকে সে এতকাল পুজো করেছে, তা আসলে একটা নির্মম, পরিকল্পিত খাঁচা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। মায়ার সমস্ত শরীর অপমানে আর তীব্র ঘৃণায় রি রি করে উঠল, আর আরিয়ান এক উন্মাদ প্রেমিকের মতো তার সেই ধ্বংসস্তূপের দিকে চেয়ে রইল।
সিয়ামের নামটা আরিয়ানের মুখে শোনা মাত্রই মায়ার মনের কোণে লুকিয়ে থাকা আরেকটি পুরোনো, রক্তাক্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। সেদিন সিয়ামের ওপর হওয়া সেই অতর্কিত এবং মারাত্মক হামলার দৃশ্যটা তার চোখের সামনে ভেসে এল। মায়া আর নিজের ভেতরের বিস্ময়কে চেপে রাখতে পারল না। সে অবিশ্বাস্য চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে জিজ্ঞেস করল—
​মায়া: "তার মানে... সেদিন সিয়ামের ওপর যে অতর্কিত হামলা হয়েছিল, ওটাও আপনি করিয়েছিলেন? সিয়ামকে আপনিই মেরেছিলেন, তাই না? আপনিই তাকে ওভাবে রক্তাক্ত, মৃতপ্রায় করে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলেন... শুধু আমার জন্য?"
​মায়ার এই প্রশ্নে আরিয়ানের মুখে কোনো অনুশোচনা বা লুকোছাপার বালাই দেখা গেল না। বরং সে এক পৈশাচিক তৃপ্তি আর অহংকার নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটোতে তখন এক নির্মম, হিংস্র ভালোবাসার আলো জ্বলজ্বল করছে। সে এক অদ্ভুত শীতল গলায় জবাব দিল—
​আরিয়ান: "হ্যাঁ মায়াপরী! ওটা আমারই লোক ছিল। ওটা ছিল সিয়ামের জন্য আমার দেওয়া একটা ছোট্ট শাস্তি! আমার পবিত্র ভালোবাসার দিকে, আমার মায়াপরীর দিকে হাত বাড়ানোর চূড়ান্ত শাস্তি!"
​কথাটা বলেই আরিয়ান মায়ার আরও কাছে ঝুঁকে এল, তার কণ্ঠস্বরে এক আদিম হিংস্রতা খেলা করতে লাগল।
​আরিয়ান: "যে পুরুষ তোমার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস করবে, যে তোমার মন জয় করার স্বপ্ন দেখবে—তার পরিণতি এর চেয়ে ভালো হতেই পারে না মায়া। সিয়াম বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছিল, সে নিজেকে তোমার খুব বড় শুভাকাঙ্ক্ষী ভাবা শুরু করেছিল। আমি শুধু ওকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিইনি তোমার ওই কান্নার মুখের কথা ভেবে, কারণ ও তোমার বন্ধুর মতো ছিল। ওকে শুধু একটা চরম শিক্ষা দিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছিলাম, যেন সে আজীবন মনে রাখে যে আরিয়ান যাকে নিজের বলে মনে করে, তার দিকে নজর দেওয়ার খেসারত কতটা ভয়ংকর হতে পারে!"
​আরিয়ানের এই হাড়হিম করা স্বীকারোক্তি শোনার পর মায়ার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এল। সে বুঝতে পারল, এই লোকটা ভালোবাসার নামে আসলে একটা বিষাক্ত মায়াজাল তৈরি করেছে, যেখানে যে-ই পা বাড়িয়েছে, সে-ই ধ্বংস হয়ে গেছে।

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Moli Akter posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share