14/09/2026
ট্রেজারার স্যার তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেন,“আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজুর সমকাল পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশিত ‘সাত কলেজ: সমাধানের নামে নতুন সমস্যার জন্ম?’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখা আমার নজরে এসেছে। পুরো লেখায় অধ্যাদেশ ও আইনের ধারা গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। কাল্পনিক অনেক অভিযোগ করা হয়েছে। সেসব বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যায় যাবো না। শুধু চলমান ব্যাচগুলোর একাডেমিক মাইগ্রেশন বিষয়ে যে ত্রুটিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাই খন্ডন করার চেষ্টা করবো।
লেখক লিখেছে, “আইনের ৫৬(২) ধারা অনুযায়ী ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শুধু ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের শর্তসাপেক্ষে সনদ প্রদান করবে। তার আগেরগুলো শেষ করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় আগের তিন সেশনের শিক্ষার্থীদেরও তাদের অধীনে আনার চেষ্টা করছে।”
আসলে হবে ৫৯(৪) ধারা যেখানে লেখা আছে, “২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীগণ (স্নাতক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত শিক্ষা কাঠামো ও কারিকুলামে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হইতে সনদ অনুমোদনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সনদপ্রাপ্ত হইবে।”
এবার আসুন দেখি কোন আইনি ব্যাখ্যায় সম্পূর্ণ বিধি সম্মতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রেজিস্ট্রেশনকৃত ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ এর শিক্ষার্থীদের ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট একাডেমিক প্রোগ্রামে একাডেমিক মাইগ্রেশন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
(১) সংসদ কর্তৃক গৃহীত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইনটি (২০২৬ সনের ৭৮ নং আইন) রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করেছে ১০ এপ্রিল ২০২৬।
(২) ধারা ১(২) “ইহা অবিলম্বে কার্যকর হইবে।”
(৩) ধারা ৪ (৩) “ঢাকা মহানগরের ৭ (সাত)টি কলেজ (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ) ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সংযুক্ত কলেজ হিসাবে থাকিবে এবং সংযুক্ত কলেজসমূহের পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও অন্যান্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ণ থাকিবে।”
(৪) ধারা ৫৭ (১) “একাডেমিক কাউন্সিলের পরামর্শক্রমে সিন্ডিকেট কোনো কলেজকে যেসকল বিষয়ে ও যে পর্যায়ের শিক্ষাদানের ক্ষমতা দান করিবে, কলেজ সেই সকল বিষয়ে এবং সেই পর্যায়ে শিক্ষাদান করিবে এবং উক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে কলেজ কোনো পর্যায়ে কোনো কোর্সে শিক্ষাদান করিতে পারিবে না।”
(৫) ধারা ৫৮(৪) “সংযুক্ত প্রতিটি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সংবিধি, বিধি, ও প্রবিধান মানিয়া চলিবে।”
তাহলে ধারা ১(২) অনুযায়ী এই আইন ১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর; ধারা ৪ (৩) অনুযায়ী সরকারি সাত কলেজ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সংযুক্ত কলেজ; ধারা ৫৭ (১) ও ৫৮(৪) অনুযায়ী ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট কলেজগুলোকে শিক্ষাদান করতে পূর্বানুমোদন দিবে। তাই ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তিকৃত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির একাডেমিক কাঠামোয় আনা আইনি ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যই অপরিহার্য!!
এজন্যই আসলে ধারা ৫৯ (রহিতকরণ ও হেফাজত) এসেছে!! “৫৯(৩) এই আইন প্রণীত হইবার অব্যবহিত পূর্বে ৭ (সাত) টি কলেজের (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ) স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত শিক্ষা কাঠামো ও অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সাময়িক ব্যবস্থার অপারেশন ম্যানুয়াল অনুযায়ী গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কার্যসমূহ বৈধভাবে করা হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।
৫৯(৪) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীগণ (স্নাতক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত শিক্ষা কাঠামো ও কারিকুলামে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হইতে সনদ অনুমোদনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সনদপ্রাপ্ত হইবে।”
ধারা ৫৯(৩) অনুযায়ী আইন প্রণীত হবার অব্যবহিত পূর্বের সিদ্ধান্ত ও কার্যসমূহ বৈধভাবে করা হয়েছে বলে গণ্য হবে। এটাকে বলে ভূতাপেক্ষভাবে (Retrospectively) বৈধতা দান। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের শুরুতেই তাই হয়। পূর্বের বিষয়গুলোকে বর্তমান আইনি কাঠামোয় বৈধতা দেয় হয়। ৫৯(৪) ধারাও অনেকটা এরকম। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীগণ (স্নাতক) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে ভর্তি হলেও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করে সনদ পাবে।
প্রশ্ন আসতে পারে কেন ২৪-২৫ সেশনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে? কেন তার আগের সেশনগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়নি? ২৪-২৫ এর কথা এজন্যই উল্লেখ করা হয়েছে যে ২৪-২৫ সেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি হয়নি। তারা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির পূর্ণাঙ্গ প্রশাসন না থাকায় ২৪-২৫ সেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামেই ভর্তি হয়েছে বলে গণ্য হবে!
২৪-২৫ এর আগের সেশনগুলোর (২০২১-২২, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪) উল্লেখ করা হয়নি এ কারণে যে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কাঠামোতে ভর্তি হয়েছে। তাদেরকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেট এর অনুমোদন লাগবে।
এজন্য ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রশাসন প্রথমেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে আলোচনা করেছে ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মতামত সংগ্রহ করেছে। তারপর বিগত ২৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সভাপতিত্বে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (শিক্ষা মন্ত্রণালয়), সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিবৃন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রশাসন এবং সংযুক্ত সরকারি ৭ (সাত) কলেজের অধ্যক্ষবৃন্দের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট একাডেমিক প্রোগ্রামে স্থানান্তরের (Academic Migration) সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, উক্ত সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তার (অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ) মতামত নেয়া হয়!!
এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবদ্ধ পর্ষদগুলোর অনুমোদন পেলেই একাডেমি মাইগ্রেশন সম্পন্ন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইনের বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি ঘটেনি।
এতক্ষণ তো আইনের কথা বললাম এবার অতীত ইতিহাস দেখি!
(১) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২ পাস হওয়ার পর- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্সের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে এক আইনের মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়।
(২) ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ৭টি সরকারি কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। তখন এমনও হয়েছে যে পরীক্ষার এক অংশ নিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাকি অংশ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়!!
(৩) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও RUET-এর মধ্যেও ঠিক একই ইতিহাস আছে। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদ হিসেবে। ১৯৮৬ সালে সরকার অধ্যাদেশ জারি করে দেশের ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে Bangladesh Institute of Technology (BIT) করে (Rajshahi Engineering College হয় BIT, Rajshahi)। এই আইনের ফলে রাবির অধীন থেকে বের হয়ে এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়। চলমান শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে BIT-এর শিক্ষার্থী হয়ে যায়। আবার ২০০৩ সালে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৩ পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে BIT, Rajshahi হয় RUET (Rajshahi University of Engineering & Technology)। এটা বাংলাদেশের ৪টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার ক্ষেত্রেই একই - BUET, CUET, KUET, RUET সবগুলোই একসময় ঢাবি, চবি, রাবির অধীনে ছিল, পরে আইন করে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে।
এছাড়াও লেখক লিখেছেন, “প্রতিবছর বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ২৩ হাজার শিক্ষার্থী এসব কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সামর্থ্য না থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এই কলেজগুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলে মাত্র হাজার দুয়েক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পাবে হয়তো। বাকিদের তখন কী হবে?”
বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, ২০২৪-২৫ সেশনে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। ইউজিসির প্রতিনিধিগণ সংযুক্ত সাতটি কলেজের ক্লাসরুম সমূহের ধারণ ক্ষমতা সুচারুরূপে নিরূপণ করেই এই সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করার অনুমতি দিয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। এর আগে ধারণ ক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো এই বলে যে সবাই ক্লাস করবে না!! একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এই ধারণা সত্যিই দুঃখজনক! আরো দুঃখজনক হচ্ছে আসন সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেককেই থাকতে দেখেছি কিন্তু দীর্ঘ ১০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের জন্য কারিকুলাম আধুনিকায়ন করা হয়নি তা নিয়ে কারো উদ্বেগ দেখলাম না। তবে নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ যেনো কোন ভাবেই সংকুচিত না হয়ে সে বিষয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রশাসন সজাগ থাকবে।
যাই হোক, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এরকম ফেডারেল ইউনিভার্সিটির ধারণা বাংলাদেশে নতুন হলেও সংশ্লিষ্ট সবাই যদি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কল্যাণ কামনায় এগিয়ে আসেন তাহলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
#ঢাকেবি