03/06/2026
চুঙ্কার রাজার খবর উঠলো কি পেপারে?
চুঙ্কার বনে আবার পুরনো রেওয়াজে বটবৃক্ষের পূজার আয়োজন বসেছে।
যদিও এই বনের ইতিহাসে আগে কখনো এমন নিয়ম ছিল না। কারণ, প্রকৃতির আরাধনা আর ক্ষমতার তোষামোদ এক জিনিস নয়। কিন্তু যেদিন থেকে বনের আসল রাজা, সিংহটি এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা গেল, সেদিন থেকেই বনের সব নিয়মকানুন ওলোটপালোট হয়ে গেল। সেই সমৃদ্ধ বনের রাজসিংহাসনে ঘটনার পরিক্রমায় এখন এসে বসেছে এক কাগুজে দানব। সিংহের মুখোশ পরে সে এখন বনের সর্বেসর্বা। যার মূল কাজই হলো অন্যের সম্পদ লুটে নেওয়া, সে-ই এখন সেজেছে বনের রক্ষাকর্তাদের সর্দার!
নতুন রাজা সিংহাসন তো পেয়েছে, কিন্তু রাজার মহত্ব আর শাসনভারের কিছুই তার জানা নেই। তাই নজর ঘোরাতে সে শুরু করল এই নতুন কারবার। প্রতি বছর বৈতরণি পারাপারের লোভ দেখিয়ে বনের সরল পশুদের বশীভূত করা আর এই বটপূজার আড়ম্বর—সবই সেই মেকি রাজার রাজত্ব টিকিয়ে রাখার কৌশল।
অথচ বটবৃক্ষ এক নীরব দাতা। বনের সর্বোচ্চ চূড়ায় তার সুউচ্চ বিস্তার। ঊর্ধ্বমুখী বেড়ে ওঠা আর নিজের ঝুরি নামিয়ে মাটিকে শীতল পরশে জড়িয়ে রাখাই তার স্বভাব। সে কোনো ক্ষমতার উপাসক নয়।
"জয় হোক বটপিতার!"
সভাজুড়ে কোরাস গলায় ধ্বনি ওঠে।
রাজার এই ভণ্ডামিকে আলোর মতো সত্য ও সরল প্রমাণ করার জন্য রয়েছে একদল অনুগত বানর। তারা নিজেদের শিম্পাঞ্জি বলে দাবি করে এবং মানুষের মতো বুদ্ধিমান ভেবে গর্বে বুক ফোলায়। রাজাকে তৈলাক্ত বাঁশে তেল দেওয়ার কাজটিকে তারা নিজেদের পরম কর্তব্য মনে করে।
এই বনের এক প্রখ্যাত পণ্ডিতের স্বভাবটি আবার একটু ভিন্ন রকমের। নিজের চতুরতা আর যৎসামান্য পাণ্ডিত্যই তার ছাপোষা জীবন কাটানোর সম্বল। যখনই বনে নতুন কোনো মহারথীর আবির্ভাব ঘটে, রাজাকে চমকে দিতে এই পণ্ডিত আগেভাগেই তার কোষ্ঠী হাতড়ে অতীত-ভবিষ্যতের এক কাল্পনিক খতিয়ান তৈরি করে ফেলেন। আর বনের রামছাগলেরা পণ্ডিতের সেই কেরামতি দেখে মুগ্ধ হয়ে ব্যাঁ-ব্যাঁ রবে হাততালি দেয়।
কিন্তু চুঙ্কার বনের সিংহাসনে বসা এই নকল দানব রাজা যখন সিংহের মতো হুঙ্কার ছাড়ে, তখন তার ভেতরের আসল রূপটা দিনে দিনে ঠিকই প্রকাশ পেয়ে যায়। আর তখনই মুখোশ ধরে রাখতে এই পণ্ডিত আর গণক জাতীয় অনুগত অনুচরদের কদর বাড়ে। রাজ দরবার থেকে বেশ কিছু ভালো খানাপিনা আর উপঢৌকন জোটে তাদের ভাগ্যে। বনের পশুর স্বভাব না পেলেও, সিংহের দাবিদার দানব রাজার কৃপায় তারা একেকজন একেক রূপ নিয়ে সমাজে সমাজপতি বনে যায়। এদের মধ্যে দুই-একজন আবার ডামি রাজার রাতের অন্ধকারের কারবারের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবেও বেশ প্রশংসিত।
আজ চুঙ্কার বনের বটপূজার সভায় সবাই নিজেকে জাহির করার জন্য সেজেগুজে হাজির হয়েছিল। কিন্তু গোল বাঁধল অন্য জায়গায়।
এক অতি-উৎসাহী বানর ক্ষমতার লোভে দানব রূপী রাজার ঘাড়ে চড়ে এক চরম অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে! ক্ষিপ্ত রাজা যখন সেই বানরকে তাড়াতে পিছে পিছে ছুটছে, তখন বনের এক কোণে বসে চতুর শিয়ালকে আয়েশ করে পত্রিকা পড়তে দেখল।
দানব রাজা হাঁপাতে হাঁপাতে শিয়ালকে শুধাল, "এই শিয়াল! তুই ওই বানরটাকে এদিকে যেতে দেখেছিস?"
শিয়াল পত্রিকা থেকে চোখ না তুলেই ঠাণ্ডা গলায় জানতে চাইল, "কেন মহারাজ? বানরটা কি আপনার সাথে কোনো অসামাজিক কার্যকলাপ করেছে নাকি?"
শিয়ালের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে দানব রাজার পিলে চমকে উঠল! সে ভড়কে গিয়ে ভাবল, শিয়াল কি তবে সব জেনে গেছে? কেউ কি তবে তাদের গোপন কীর্তি ফাঁস করে দিয়েছে?
রাজা আমতা আমতা করে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, "বলিস কী রে! এই... এই খবর কি পেপারেও উঠে গেছে নাকি?"
শিয়াল তখন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে, "ছ্যা! ছ্যা!" করতে করতে স্থান ত্যাগ করল। লজ্জায় আর অপমানে দানব রাজার মাথা কাটা গেল—নচ্ছার বানরটি আর তার কোনো ইজ্জত বাকি রাখল না!
লেখা Harun Ansary হারুন আনসারী