19/09/2026
ইতিহাসের পাতায় ঘটে যাওয়া অত্যন্ত মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক একটি অধ্যায় হলো কারমাতিদের দ্বারা পবিত্র মক্কা শরিফ আক্রমণ এবং হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা।
উক্ত ঘটনা কে কেন্দ্র করে অনেকেই শিয়াদের অপবাদ দিয়ে থাকে যে এই ঘটনার পিছনে শিয়াদের হাত রয়েছে।
প্রথমত যারা এই অপবাদ দিয়ে থাকে তাদের গবেষনা করা উচিত শিয়াদের কিছু (উপদল) রয়েছে। 👇
১. ইথনা আশারিয়া বা ১২ ইমামি শিয়া 👇
এটি শিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান ধারা।
এরা রাসূল সা: এর হাদীস অনুযায়ী ১২ জন ইমাম এর অনুসারী/শিয়া যাদের নাম সহ রাসূল (সা.) বলে গিয়েছেন।
ইমাম আলী (রা.) থেকে শুরু করে মোট ১২ জন ইমামের নেতৃত্ব ধারায় বিশ্বাস করে।
২. ইসমাইলি শিয়া 👇
ষষ্ঠ ইমাম জাফর আস-সাদিক (আঃ) এর ইন্তেকালের পর তাঁর বড় ছেলে (ইসমাইল) এর অনুসারী/শিয়া এই দল গঠন করে।
ঐতিহাসিক (ফাতিমীয় খেলাফত) এই উপদলের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল। বর্তমান যুগের বিশ্বখ্যাত এদের নেতা (আগা খান) এই ধারার অনুসারীদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।
(অর্থাৎ এরা রাসূল (সা.) যে ১২ জন ইমাম আঃ দের অনুসরণ করার কথা বলে গিয়েছেন তাঁদের অনুসরণ থেকে বিচ্ছিন্ন।)
৩. জায়েদি শিয়া 👇
চতুর্থ ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) এর পুত্র (জায়েদ) এর অনুসারী/শিয়া নিয়ে এই দল গঠিত হয়েছে।
(অর্থাৎ এরা রাসূল (সা.) যে ১২ জন ইমাম আঃ দের অনুসরণ করার কথা বলে গিয়েছেন তাঁদের অনুসরণ থেকে বিচ্ছিন্ন।)
নোট:- ইমাম বানানোর একমাত্র অধিকার (আল্লাহ্) এর অন্য কারোর নয় যেমন টি ইসমাইলি এবং জায়েদি শিয়ারা করেছে তারা অন্যদের কে নিজের মন মত ইমাম বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহর সে ১২ জন মনোনীত ইমাম আঃ দের কে বাদ দিয়ে। তাই উক্ত দল ২ টি প্রকৃত শিয়া অর্থাৎ ১২ ইমামী শিয়াদের দৃষ্টিকোন থেকে (বাতিল) তাদের কোনো কর্ম কান্ড প্রকৃত শিয়াদের উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
চলেন এখন দেখে নেওয়া যাক হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) চুরি করার পিছনে কাদের হাত ছিল। ⚡
ইতিহাসে শিয়াদের মূলধারার বাইরে যেসব উগ্র ও চরমপন্থী দল আত্মপ্রকাশ করেছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত দলটি হলো (কারমাতি)।
কারমাতিরা মূলধারার কোনো শিয়া দল ছিল না। বরং তারা মূলত (ইসমাইলি শিয়াদের) একটি শাখা থেকে বের হয়ে পরবর্তীতে ইসলামি শরিয়তের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ খারিজ হয়ে যাওয়া একটি স্বতন্ত্র ও চরমপন্থী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১) চুরির পিছনে মূল কারণ কী ছিল?
তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী শরিয়াহ ও প্রচলিত হজের বিধানের অবসান ঘটানো। তারা চেয়েছিল মানুষ যেন মক্কার কাবা শরিফের পরিবর্তে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল বাহরাইনের (তৎকালীন আল-হাসসা অঞ্চল) দিকে আকৃষ্ট হয় এবং সেখানে হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করে নতুন তীর্থকেন্দ্র বা কেবলা বানাতে পারে। তাদের নেতা আবু তাহির বিশ্বাস করত যে, দুনিয়ায় নতুন যুগের সূচনা হয়েছে এবং সে পুরাতন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ভেঙে দিতে চায়।
এই ঘটনার মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী ছিল পূর্ব আরবের বাহরাইন ও লসা অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্বাধীন ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আবু তাহির আল-কারামাতি। সে তার ভাই আবু সাঈদ হাসান ইবনে বাহরামের মৃত্যুর পর কারমাতি রাজ্যের ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল।
তাদের এই বাহিনীতে কট্টর মতাদর্শে বিশ্বাসী কারমাতি মিলিশিয়া ও ভাড়াটে সৈন্যরা অংশ নিয়েছিল, যারা আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছিল।
২) কিভাবে চুরি হয়েছে?
৯৩০ খ্রিস্টাব্দ (৩১৭ হিজরি) সালের জিলহজ মাস তথা হজের মৌসুম চলছিল। কারমাতিরা এর আগেও বিভিন্ন হাজি কাফেলায় হামলা চালিয়ে লুটতরাজ করেছিল।
৩১৭ হিজরির ৮ জিলহজ (অন্য মতে ১০ জিলহজ বা হজের ঠিক প্রাক্কালে) আবু তাহির তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কা নগরীতে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রথমে মক্কার গভর্নর বা স্থানীয়রা তাদের বাধা দিলে তারা শান্তিচুক্তির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে এবং আমরা নিরাপদে ইবাদত করতে এসেছি এই কথা বলে শহরে প্রবেশ করে।
শহরে প্রবেশ করার সাথেই তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ ও হাজিদের হত্যা শুরু করে।
ঐতিহাসিকদের মতে, সেবার মসজিদুল হারাম ও মক্কার অলিগলিতে প্রায় ৩০,০০০ হাজিকে হত্যা করা হয়। অনেক হাজির লাশ জমজম কূপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর আবু তাহির নিজ হাতে হাতুড়ি বা শাবল দিয়ে আঘাত করে পবিত্র হাজরে আসওয়াদ কাবাঘরের দেওয়াল থেকে খুলে ফেলে এবং উটের পিঠে চাপিয়ে বাহরাইনে নিজের রাজ্যে নিয়ে যায়।
৩) পাথর টি বর্তমানে কোথায় আছে?
হাজরে আসওয়াদ দীর্ঘ ২৩ বছর কারমাতিদের দখলে বাহরাইনে বন্দি ছিল।
আব্বাসীয় খলিফারা এবং ফাতিমীয় খলিফারা বারবার অনুরোধ ও চাপ সৃষ্টি করলেও এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বা সোনা দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও কারমাতিরা দীর্ঘদিন তা ফেরত দেয়নি।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপ, সামরিক হুমকি এবং বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে (অথবা ফাতেমি খলিফা মনসুরের কড়া চিঠির চাপে বাধ্য হয়ে) তারা পাথরটি ফেরত দিতে রাজি হয়।
ঐতিহাসিক আল-জুওয়াইনি ও অন্যান্য সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হিজরি ৩৩৯ সনে (মতান্তরে ৩৩২ বা ৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে) পাথরটি একটি বস্তায় মুড়িয়ে অত্যন্ত রহস্যজনক ও নাটকীয়ভাবে ইরাকের কুফার জামে মসজিদে ফিরিয়ে এনে রাখা হয়। এর সাথে একটি নোটে লেখা ছিল (আদেশক্রমে আমরা এটি নিয়েছিলাম এবং আদেশ দ্বারাই আমরা এটি ফিরিয়ে দিলাম।)
চুরি করার পর যখন আবার পাথরটি ফিরিয়ে আনা হয়, ততদিনে এটি আঘাতের কারণে ভেঙে কয়েকটি টুকরো হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ কারিগররা সেগুলোকে বিশেষ কেমিক্যালের সাহায্যে জোড়া লাগিয়ে রুপার ফ্রেমে আবদ্ধ করে দেন। বর্তমানে পবিত্র কাবা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রূপার ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় এই পাথরটি পূর্বের মতোই সংরক্ষিত রয়েছে।
৪) চুরি করার কারণে ভয়াবহ শাস্তি কি ছিল?
মূল হোতা আবু তাহির আল-কারামাতি তার জীবনের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক পরিণতির শিকার হয়। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, সে পচনশীল বা গায়ে পোকা ধরার মতো কোনো এক ভয়ঙ্কর ও সংক্রামক রোগে (যেমন বসন্ত বা কুষ্ঠ সদৃশ বা উকুনে আক্রান্ত হয়ে পচে মারা যাওয়া) ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করে।
পরবর্তী সময়ে কারমাতি রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আব্বাসীয় ও অন্যান্য স্থানীয় শক্তির লাগাতার সামরিক অভিযানের মুখে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। একাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তাদের শক্তি সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় এবং তাদের ভূখণ্ডগুলো অন্যান্য মুসলিম শক্তির অধিকারে চলে আসে।
🔹প্রচারেঃ মক্তবে সাকালাইন
✍🏻 Sheikh Jahid Ali