07/08/2025
জুলাই ঘোষণাপত্র: এক বিজয়ের পথে, অসম্পূর্ণ প্রতিফলন
বিজয়ের আরেক ধাপে উত্তরণে রইলো অভিনন্দন। জুলাই ঘোষণাপত্র প্রণয়নের মতো কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত সকল দেশপ্রেমিককে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ। আপনাদের অবদানের জন্য বাংলাদেশ আপনাদের কাছে চিরঋণী থাকবে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ঘোষণাপত্র কি জাতির বহুদিনের পুঞ্জিভূত আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে?
দুঃখজনকভাবে, উত্তরটি—‘না’। আরও শুদ্ধ, বাস্তবঘনিষ্ঠ এবং অন্তর্দৃষ্টিময় হতে পারতো এই দলিল। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। সম্ভবত এর পেছনে রয়েছে দুটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা—
১. প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত, চিন্তাশীল ‘ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটি’-এর ঘাটতি,
২. বিপ্লবের অন্তর্নিহিত চেতনাকে ধারণ করার ব্যর্থতা।
এই পর্যায়ে এসে বলা প্রয়োজন—যদি প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন শক্তির উত্থান অনিবার্য। সেই প্রেক্ষিতে নিচে আলোচিত সাতটি মূল সীমাবদ্ধতা, যেগুলো এই ঘোষণাপত্রকে এক পরিপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হতে বিরত রেখেছে।
১. কর্তাসত্তা ও ইতিহাসের বিকৃতি
ঘোষণাপত্রে উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের উল্লেখ থাকলেও, ১৯৪৭-এর পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা অর্জনের তাৎপর্য উপেক্ষিত। ১৯৫২-কে ইতিহাসের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ একটি কৌশলগত ‘জাতীয়তাবাদী বয়ান’, যা পূর্বপুরুষদের আত্মত্যাগকে অবমাননা করে।
২০২৪ সালে জনগণই রাজনৈতিক কর্তাসত্তা পুনর্দখল করেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আসনে বসেছে সাধারণ মানুষ। এই ইতিহাস অস্বীকার মানে একটি গণ-জাগরণের চেতনাকে মুছে ফেলা।
২. ইতিহাসের অসম্পূর্ণ চিত্রায়ন
৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতা বিপ্লবের উল্লেখ থাকলেও, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর ঘটনাবলী নেই। সেই পরিবর্তন একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অবস্থান ছিল, যা মুছে ফেলা মানে ইতিহাসকে অর্ধেক করা। একইভাবে, ১৯৯০-এ স্বৈরাচার পতনের পর গণতন্ত্র পুনর্গঠনে ব্যর্থতা কিংবা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি প্রসঙ্গও উপেক্ষিত। একটি দায়শূন্য পাঠ।
৩. রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের স্বীকারোক্তির অভাব
গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, বিশেষত সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে নির্মম নিপীড়ন চলেছে—"আয়নাঘর", হেলিকপ্টার থেকে গুলি, ইন্টারনেট বন্ধ, গুম, ক্রসফায়ার। ঘোষণাপত্রে এই ভয়াবহতার কোনো সরাসরি স্বীকৃতি নেই। সেনাবাহিনীকে “ইতিবাচক” বলার চটকদার প্রচেষ্টাই সেখানে লক্ষ্যণীয়।
৪. ইসলামোফোবিয়া ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন
২০১৩ সালের ৫ মে আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা ছাত্রদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ—রাষ্ট্রীয় ইসলামোফোবিয়ার একটি নির্মম নজির। অথচ এই ঘটনার কোনো স্বীকৃতি নেই ঘোষণাপত্রে। ইসলামী সমাজচেতনার অবদান ছাড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র নির্মাণের চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
৫. শ্রমজীবী মানুষ ও নারীর স্বীকৃতির অভাব
২০২৪-এর গণআন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন শ্রমজীবী শ্রেণি ও নারী সমাজ। তাদের আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব এবং সংগ্রামের কথা ঘোষণাপত্রে প্রায় অনুল্লেখিত। অথচ রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বুনিয়াদে তাদেরই স্থান হওয়া উচিত ছিল।
৬. ভারতের ভূমিকাঃ এক প্রতিবেশী, এক আধিপত্যবাদী শক্তি
ভারত বারবার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে গণতন্ত্র ধ্বংসে ভূমিকা রেখেছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের মতো নাটকীয় পরিণতি এবং আওয়ামী সরকারের পাশে দাঁড়ানো ভারতীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকাকে একবারের জন্যও উল্লেখ করা হয়নি।
ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা তৈরি করা এখন আর গোপন নয়। জনগণ এখন সজাগ—কে বন্ধু, কে আগ্রাসী—তারা জানে। ঘোষণাপত্রে এই প্রসঙ্গের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক দ্ব্যর্থতার পরিচায়ক।
৭. পিলখানা হত্যাকাণ্ডঃ এক নিখুঁত ষড়যন্ত্র
২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত। ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যাতে সেনাবাহিনীকে একটি নির্ভীক, দেশপ্রেমিক শক্তি থেকে একনায়কতন্ত্রের অনুগত বাহিনীতে পরিণত করা যায়।
ঘোষণাপত্রে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, বিচার কিংবা শহীদদের স্মরণ—কিছুই নেই। এই নীরবতা কেবল লজ্জাজনকই নয়, বরং আত্মঘাতীও।
উপসংহার: ইতিহাস শুধু লেখা নয়, রক্ষা করাও জরুরি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড উপেক্ষা মানে—সেনাবাহিনীর আত্মমর্যাদাকে পদদলিত করা।
ভারতের ভূ-রাজনৈতিক নীতিকে পাশ কাটানো মানে—আগামী প্রজন্মকে দখলদারিত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া।
দেশপ্রেমিক অফিসারদের হত্যার বিষয়ে নীরব থাকা মানে—নিজের ইতিহাসকেই হত্যা করা।
আমরা চাই—একটি স্বাধীন, ইনসাফপূর্ণ, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে ইতিহাস ভুলে যাওয়া হবে না, যেখানে ভবিষ্যতের পথ তৈরি হবে অতীতের শিক্ষা ও আত্মত্যাগের ভিত্তিতে।
শেষ কথা: এক খসড়া, শেষ কথা নয়
জুলাই ঘোষণাপত্র এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, কিন্তু এটি শেষ গন্তব্য নয়। এটি কেবল একটি খসড়া—জনগণের সামনে উন্মুক্ত এক চিঠি। জনগণের শক্তি, চেতনা ও আত্মত্যাগের আলোকে এই ঘোষণাপত্রের ভাষা নতুন করে লেখা হবে।
যদি প্রচলিত নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়, তবে জনগণই নতুন নেতৃত্ব ও চেতনার জন্ম দেবে। কারণ ইতিহাস অপেক্ষা করে না—সে চলতে থাকে। যারা সাহসী নয়, তারা পিছনে পড়ে যায়।
আসুন, এই ঘোষণাপত্রকে একটি চলমান কাহিনি হিসেবে দেখি।
গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন জনগণ শুধু ভোটার নয়—রাষ্ট্রের নির্মাতা, ইতিহাসের লেখক হয়ে ওঠে।
আমরাই সেই ভবিষ্যতের নির্মাতা।
বর্ষা বিপ্লব শেষ নয়—এটি শুরু।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
ইনসাফের বাংলাদেশ অবশ্যম্ভাবী।
#জুলাইঘোষণাপত্র
#গণতন্ত্র
#ইতিহাস
#পিলখানাহাটাকাণ্ড
#ভারতীয়হস্তক্ষেপ
#গণআন্দোলন
#স্বাধীনবাংলাদেশ
#ইনসাফপূর্ণরাষ্ট্র
#রাষ্ট্রনির্মাণ
#নতুননেতৃত্ব
#সেনাশহীদ
#ইসলামোফোবিয়া
#জনগণেরশক্তি
#গণঅভ্যুত্থান
#বর্ষাবিপ্লব
#ইনকিলাব_জিন্দাবাদ
#সামাজিকবিচার
#বিপ্লবেরচেতনা
#রাষ্ট্রীয়নিপীড়ন
#নতুনবাংলাদেশ
#ফিফথ_কলাম