07/06/2025
সুহাসিনী
একটি গ্রামীণ কন্যার আলোর পথে যাত্রা
অধ্যায় ১: ছোট্ট গ্রাম, বড় স্বপ্ন
বাঁশবাগানের ছায়া পেরিয়ে ছোট্ট কাঁচা পথ ধরে হেঁটে গেলেই পড়ে সুন্দরপুর—একটা নিরিবিলি গ্রাম, যেখানে সময় যেন একটু ধীরে চলে। এখানেই থাকে সুহাসিনী। বাবা হরিপদ একজন দিনমজুর, মা লক্ষ্মী মাটি দিয়ে হাঁড়ি-পাতিল বানিয়ে বিক্রি করেন। অভাব ছিল, কিন্তু মায়া ছিল আরও বেশি।
সুহাসিনী ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা। সে অন্য দশজন মেয়ের মতো শুধু খেলাধুলা করে না, বই পড়ে, আকাশ দেখে, প্রশ্ন করে। তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ছিল একটি পুরোনো বাংলা ব্যাকরণ বই—তার কাকিমা দিয়েছিলেন, যিনি একসময় স্কুলে পড়াতেন।
স্কুলে সুহাসিনীর উপস্থিতি চোখে পড়ে সবার। ক্লাসে শিক্ষক প্রশ্ন করলে সব আগে হাত তোলে, অথচ কণ্ঠে শান্ত ভরাট আত্মবিশ্বাস। প্রধান শিক্ষক মধুসূদন স্যার তাকে বলতেন,
— “তুই একদিন অনেক বড় হবি, মা। শুধু লড়াইটা ছাড়িস না।”
অধ্যায় ২: বাঁধার পাহাড়
কিন্তু সব স্বপ্নের পথে কাঁটা থাকে। সুহাসিনী যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে, তখন একদিন হরিপদ বাবার জমানো কিছু টাকাও চুরি হয়ে যায়। সংসারে চুলো জ্বলে না ঠিকমতো। মা বলেন,
— “মেয়েটাকে তো এবার বিয়ে দিতে হবে। মেয়েমানুষের আবার স্কুল!”
তবে সুহাসিনী হাল ছাড়েনি। প্রতিবেশী মীনাদি, যিনি স্বামীহারা হয়েও নিজের মেয়েকে মানুষ করছেন, তিনি পাশে দাঁড়ালেন। বললেন,
— “লক্ষ্মীদি, তোদের যা অবস্থা, আমি চাইলে আমার মেয়ে পড়াতাম না। কিন্তু যদি তোর মেয়েটা পারে, তাহলে কেন থামাবি?”
ধীরে ধীরে কিছু লোক পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। স্কুলের শিক্ষকরাও টাকা তুলে তার ফি মাফ করান।
অধ্যায় ৩: এক নতুন দরজা
একদিন গ্রামে আসে একটি NGO—"আলো দিয়ে যাই" নামে একটি শহুরে সংস্থা। তারা মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে কাজ করে। সুহাসিনী তখন নবম শ্রেণির ছাত্রী, স্বচ্ছ চোখে ভবিষ্যৎ দেখে। NGO-র এক কর্মী, নীলাঞ্জনা দিদি, তার সঙ্গে কথা বলেন,
— “তুমি কি শহরে গিয়ে কলেজে পড়তে চাও?”
সে বলে,
— “চাই। তবে আমার স্বপ্ন শুধু আমার নয়। আমি শিক্ষিকা হতে চাই—আমার গ্রামের প্রতিটা মেয়েকে পড়াতে চাই, যেন কেউ থেমে না যায়।”
নীলাঞ্জনা মুগ্ধ হন। সংস্থা তার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে, কলকাতার একটি কলেজে ভর্তি করায়, হোস্টেলে থাকার সুযোগ দেয়।
অধ্যায় ৪: শহরের আলোছায়া
কলকাতা এক ভিন্ন জগৎ। সুহাসিনী প্রথমদিকে হাঁপিয়ে উঠলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নেয়। সে বইয়ের পাতায় ডুবে যায়, লাইব্রেরি, কলেজের আলোচনায় ব্যস্ত থাকে। মাঝে মাঝে তার বুক হুহু করে ওঠে গ্রামের কথা ভেবে, মা-বাবা কেমন আছে, গ্রামের কুয়াশা, সকালের স্কুলবেলাগুলো...
একদিন কলেজের এক অনুষ্ঠানে সে তার জীবনের গল্প বলে। হল ভর্তি মানুষ মুগ্ধ হয়ে শোনে। এক অধ্যাপক উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,
— “এই মেয়েটা শুধু শিক্ষার্থী নয়, ভবিষ্যতের আলোর বাহক।”
অধ্যায় ৫: ফিরে আসা
চার বছর পর, শিক্ষকতার ডিগ্রি হাতে, সুহাসিনী ফিরে আসে সুন্দরপুরে। এবার আর কাঁচা চপ্পল পায়ে নয়—চোখে নতুন আত্মবিশ্বাস। সে নিজের গ্রামে একটি ছোট স্কুল খোলে, যেখানে মেয়েরা টিউশন ফি ছাড়াই পড়তে পারে। শহর থেকে বই পাঠায়, অনলাইন ক্লাস চালু করে। গ্রামের মানুষ তাকে আজ 'সুহাসিনী দিদিমণি' বলে ডাকেন।
সে শুধু শিক্ষক নয়—একটি আন্দোলনের নেত্রী। মেয়েদের বাল্যবিবাহ ঠেকায়, তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়।
শেষ কথা
সুহাসিনীর গল্প শুধু এক মেয়ের নয়, এক স্বপ্নের জয়। যেখানে অভাব ছিল, সেখানে ছিল বিশ্বাস। যেখানে বাঁধা ছিল, সেখানে ছিল সাহস। আর সবচেয়ে বড় কথা—সেখানে ছিল ভালোবাসা, নিজের গ্রামের, নিজের মাটির।