10/02/2026
এমনভাবে জিকির করো, যেন লোকেরা মনে করে তুমি পাগল-
আজকাল একটি মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে- হাদীস মানার নামে হাদীস অস্বীকার করা। বিশেষত যেসব হাদীস তাদের সীমিত বোঝাপড়ার সাথে খাপ খায় না, সেগুলোকে কোনো গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিসের বক্তব্য ছাড়া খুব সহজেই “জাল”, “মওজু” বলে ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ এটি দ্বীনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি ফিতনা।
এই প্রেক্ষাপটেই আল্লাহর যিকির সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ হাদীস নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, যা বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন,
عن أبي سعيد الخدري عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: أكثروا ذكر الله عز وجل حتى يقال إنه مجنون
অর্থাৎ "তোমরা আল্লাহ তা‘আলার যিকির অধিক পরিমাণে করো- এমনকি (লোকদের দৃষ্টিতে) যেন বলা হয়, সে পাগল হয়ে গেছে।"
এই হাদীসটি একক কোনো দুর্বল সূত্রে নয় বরং একাধিক নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আব্দ ইবন হুমাইদে (মুসনাদে আবু সাঈদ খুদরী, হাদীস নং ৯২৫), সহীহ ইবনু হিব্বানে (হাদীস নং ৮১৭), মুসনাদে আহমাদে (হাদীস নং ১১৬৫৩) এবং শু‘আবুল ঈমানে (হাদীস নং ৫২৩) এই হাদীস বিদ্যমান।
শুধু তাই নয়, ইমাম ইবনু হিব্বান রহঃ ও ইমাম হাকেম রহঃ স্পষ্টভাবে এই হাদীসকে সহীহ বলেছেন। কাশফুল খাফা ও মুযীলুল ইলবাস গ্রন্থে (বর্ণনা নং ৪৯৭) বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো- কোনো গ্রহণযোগ্য মুহাদ্দিসই এই হাদীসকে মওজু তথা জাল বা বানোয়াট বলেননি। এমনকি যাদেরকে কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা অত্যন্ত মান্যবর মনে করেন, সেই শায়খ আলবানী রহঃ পর্যন্ত কোথাও এই হাদীসকে জাল বলেননি।
তাহলে প্রশ্ন হলো- যিনি আজ এই হাদীসকে মওজু বলছেন, তিনি কোন মুহাদ্দিসের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলছেন? না কি নিজের মনগড়া ধারণা ও ব্যক্তিগত অপছন্দকেই দ্বীনের মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছেন?
সহীহ বা হাসান হাদীসকে দলিল ছাড়া অস্বীকার করা কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। এটি সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর বাণীকে অস্বীকার করার শামিল। উম্মাহর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসগণ শত শত বছর ধরে যে আমানত রক্ষা করে এসেছেন, সেটিকে এভাবে অবজ্ঞা করা মূলত “হাদীস মানি” বলেও বাস্তবে হাদীস বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হাদীসের উপর আমলের নামে হাদীস অস্বীকারকারীদের ফিতনা থেকে হিফাযত করুন।
এখন হাদীসটির সঠিক ব্যাখ্যার দিকে আসা যাক। এই হাদীসের অর্থ কখনোই এই নয় যে, মানুষ উন্মত্তের মতো চিৎকার করে, অশালীনভাবে বা শরীয়তবিরোধী কায়দায় যিকির করবে। বরং এর উদ্দেশ্য হলো- সারাক্ষণ আল্লাহর স্মরণে রত থাকা। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখিই, কোনো ব্যক্তি যদি সারাদিন একই কথা বলতে থাকে, তখন মানুষ রূপকভাবে বলে, “লোকটা কি পাগল হয়ে গেছে নাকি, সারাদিন একই কথাই বলছে?” ঠিক তেমনই, একজন মুমিন যখন সর্বক্ষণ আল্লাহর যিকিরে ডুবে থাকে হাঁটতে, বসতে, উঠতে, শুতে তখন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে তাকে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। এই স্তরের যিকিরেই উৎসাহ দেওয়া হয়েছে উক্ত হাদীসে।
কুরআন মাজীদও এই অর্থের সমর্থন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো।”
অতএব, এই হাদীস আকীদা বিরোধী নয়, শরীয়াহ বিরোধী নয় এবং কুরআন-সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী তো নয়ই বরং তা পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
------ কথিত সালাফিদের জবাবটাও দিয়ে দেয় -------
উক্ত হাদীস সম্পর্কে কিছু মুহাদ্দিস সহীহ বলেছেন, আর কিছু মুহাদ্দিস যঈফ বলেছেন। এটা হাদীস শাস্ত্রে নতুন কিছু নয়। বরং এটাই হাদীস বিজ্ঞানের স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু সমস্যাটা তৈরি হয় তখন, যখন কেউ যঈফ মতামতটাকেই চূড়ান্ত ধরে নিয়ে হাদীসটাকে একেবারে বাতিল করে দিতে চায়, অথচ সহীহ বলার পক্ষে শক্তিশালী ইমামদের বক্তব্য উপেক্ষা করে।
এই হাদীসটির ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই করা হচ্ছে। একদল মুহাদ্দিস যেমন ইমাম ইবনু হিব্বান রহঃ ও ইমাম হাকেম রহ: ইত্যাদি ইমামগণ হাদীসটিকে স্পষ্টভাবে সহীহ বলেছেন।
আবার অন্যদিকে কেউ কেউ সনদের কিছু দিক নিয়ে কালাম করে একে যঈফ বলেছেন।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো: যারা যঈফ বলেছেন, তারাও একে মওজু বা জাল বলেননি। অর্থাৎ সর্বনিম্ন অবস্থাতেও এটি “জাল হাদীস” নয়।
হাদীস শাস্ত্রের একটি স্বীকৃত মূলনীতি হলো- যখন কোনো হাদীসকে কিছু মুহাদ্দিস সহীহ বলেন আর কিছু যঈফ বলেন, তখন সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেওয়া যায় না। বরং দেখা হয় কারা সহীহ বলেছেন, তাদের ইলমী ও তাহকীকি ওজন কী, আর যঈফ বলার কারণগুলো কতটা শক্তিশালী। বিশেষত যখন সহীহ বলার পক্ষে বড় ইমামদের স্পষ্ট তাসহীহ থাকে, তখন শুধু যঈফ মতামতের উপর ভর করে হাদীস বাতিল করা ইলমী আমানতদারির পরিপন্থী।
কথিত সালাফি মুকাল্লীদরা এখানে যে কাজটি করছে তা হলো- তারা ইচ্ছাকৃতভাবে যঈফ মতামতটাকে বেছে নিচ্ছে, কারণ এই হাদীসটি তাদের নির্দিষ্ট চিন্তাধারার সাথে খাপ খায় না। এটি কোনো নিরপেক্ষ হাদীস গবেষণা নয় বরং পূর্বনির্ধারিত মতকে টিকিয়ে রাখার জন্য দলিল বাছাই করার নামান্তর। হাদীস শাস্ত্রে এটাকে বলা হয় তালাক্কী বিল-হাওয়া মানে নিজের খেয়ালখুশির অনুসরণ।
আরও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো- যদি ধরেও নেওয়া হয় যে হাদীসটি যঈফ, তাহলেও ফযায়েলে আমলের ক্ষেত্রে যঈফ হাদীস গ্রহণযোগ্য এই নীতিতে আহলুস সুন্নাহর অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফুকাহা একমত। এখানে তো বিষয় আকীদা নয়, হালাল-হারাম নির্ধারণ নয় বরং আল্লাহর যিকিরের ফযীলত। সুতরাং “যঈফ” বললেই একে বাতিল করে দেওয়া এটা না প্রকৃত সালাফি মানহাজ, না মুহাদ্দিসদের মানহাজ।
অতএব, সারসংক্ষেপ কথা হলো- এই হাদীসকে কেউ সহীহ বলেছেন, কেউ যঈফ বলেছেন; কিন্তু কেউই একে মওজু বলেননি। সহীহ বলার পক্ষে শক্তিশালী ইমামদের বক্তব্য বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র যঈফ মতামত আঁকড়ে ধরে হাদীসটিকে বাতিল করার চেষ্টা করা স্পষ্টতই পক্ষপাতদুষ্ট ও ইলমী সততার পরিপন্থী।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হাওয়ার অনুসরণ নয় বরং হক ও ইলমের অনুসরণ করার তাওফিক দান করুক। আমিন