29/08/2026
হিংসা এক নীরব ব্যাধি-
হিংসা (আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন) এমন এক ব্যাধি, যা শরীরকে দুর্বল করে, সম্পর্কের ভালোবাসা নষ্ট করে এবং যার চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন। হিংসুক মানুষ নিজের ভেতরেই এক অদৃশ্য আগুন বহন করে বেড়ায়। প্রকাশ্য হিংসার চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও অন্তরের গোপন হিংসা দূর করা আরও কঠিন; কারণ তার চিকিৎসককেও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে পূর্ববর্তী জাতিগুলোর একটি ব্যাধি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে হিংসা ও বিদ্বেষ।
একবার কিছু লোককে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কম অমনোযোগী কে?
কেউ বলল, যে রাত কাটিয়ে সকাল হওয়ার অপেক্ষায় থাকে।
কেউ বলল, মুসাফির; তার চিন্তা কেবল কখন সফর শেষ হবে।
কিন্তু তাদের বলা হলো, না, বরং সবচেয়ে কম অমনোযোগী মানুষ হলো হিংসুক। কারণ তার একমাত্র চিন্তা, আল্লাহ আপনার ওপর যে নিয়ামত দিয়েছেন, তা কীভাবে আপনার কাছ থেকে চলে যাবে। তাই সে কখনোই এ চিন্তা থেকে গাফেল হয় না।
হাসান আল-বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত আছে, শুকনো কাঠে আগুন যত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, হিংসা তার চেয়েও দ্রুত মানুষের দ্বীনের ক্ষতি করে।
একজন মানুষ সাধারণত অন্যের প্রতি তখনই হিংসা করে, যখন সে তার ওপর আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও নিয়ামত দেখতে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা কি মানুষের প্রতি এ কারণে হিংসা করে যে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন? অথচ আমি ইবরাহিমের বংশধরদের কিতাব ও হিকমত দিয়েছিলাম এবং তাদেরকে বিশাল রাজত্বও দিয়েছিলাম। সূরা আন-নিসা: ৫৪।
হিংসা কেবল একটি মানসিক দুর্বলতা নয়; এটি সত্যের বিপরীত, বিদ্বেষের সহচর এবং মানুষের ঈমান ও নৈতিকতার জন্য এক বিপজ্জনক ব্যাধি। আল্লাহ তাআলা আহলে কিতাবের একটি অংশের নিন্দা করেছেন তাদের হিংসার কারণে, আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, ঈমান আনার পর তারা যেন আপনাদের পুনরায় কাফির করে দিতে পারে, তাদের অন্তরের হিংসার কারণে। সূরা আল-বাকারা: ১০৯।
হিংসা থেকেই জন্ম নেয় শত্রুতা। এটি সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ হয়, ভালোবাসার জায়গায় দূরত্ব তৈরি করে, একটি দলকে বিভক্ত করে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে এবং বন্ধু ও সহচরদের মধ্যেও বিদ্বেষের বীজ বপন করে। এটি বুকের ভেতর এমনভাবে লুকিয়ে থাকে, যেভাবে পাথরের মধ্যে আগুন সুপ্ত অবস্থায় থাকে।
হিংসুকের জন্য এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে যে, তাকে সারাক্ষণ অন্যের নিয়ামত নিয়ে পুড়তে হয়!
হৃদয়ে দুশ্চিন্তা জমতে থাকে, বুকে বিষণ্নতা বাসা বাঁধে, অন্তরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে, জীবন তিক্ত হয়ে ওঠে, মন অশান্ত হয় এবং নিজের জীবনও তার কাছে নীরস ও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অথচ এই সমস্ত কষ্টের মূল কারণ হলো—অন্যের ওপর আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত দেখে সে নিজের রবের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারে না।
সে যেন মনে মনে চায়, আল্লাহ অন্যকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, তা ফিরিয়ে নিন; অন্য কেউ যেন সেই অনুগ্রহ না পায়। যদি হিংসুকের এই অন্তর্দহন ছাড়া আর কোনো ক্ষতি না থাকত, তাহলেও বুদ্ধিমান মানুষের কাছে তার জন্য করুণা করার যথেষ্ট কারণ থাকত। কারণ বাহ্যিকভাবে সে অন্যায় করতে চাইলেও বাস্তবে সে নিজেই নিজের ওপর সবচেয়ে বড় জুলুম করছে।
একজন বেদুঈন সুন্দরভাবে বলেছিলেন, আমি হিংসুকের চেয়ে এমন কোনো জালিম দেখিনি, যে একই সঙ্গে এতটা মজলুম।
কারণ তার নিঃশ্বাস ভারী, হৃদয় অস্থির, আর দুঃখ তার নিত্যসঙ্গী।
হিংসুক শেষ পর্যন্ত পরাজিত ও গুনাহগার হয়; আর যার প্রতি হিংসা করা হয়, সে মানুষের ভালোবাসা ও সহানুভূতি পায়। হিংসুক দুঃখে পুড়ে এবং মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায়; আর মজলুম ব্যক্তি মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান লাভ করে।
হিংসার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, হিংসুক অন্যের নিয়ামত কেড়ে নিতে চায়, অথচ সেই নিয়ামত দেওয়ার মালিকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই যেন তার অন্তর বিদ্রোহ করে।
তাই অন্যের প্রাপ্তি দেখে কষ্ট না পেয়ে বলুন, আল্লাহুম্মা বারিক লাহু, হে আল্লাহ, তাকে এতে বরকত দিন।
কারণ অন্যের নিয়ামত আপনার রিজিক কমিয়ে দেয় না; বরং আল্লাহর ভাণ্ডার অসীম। আপনার জন্য যা নির্ধারিত, তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।