10/02/2026
ক্ষমতায় আরোহণ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে চরমোনাই ও হেফাজত এর মত ভিন্নমতাদর্শের দলগুলোকে জামায়াত কিভাবে সামলাবে এই বিষয়কে দুটি আঙ্গিককে আলোচনা করা যায়।
প্রথমত, কৌশলগত মিত্রতা, আসন ভাগাভাগি ও নীতিনির্ধারণী সমঝোতার মাধ্যমে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা; এবং দ্বিতীয়ত, রাজপথ, মাদ্রাসা ও মসজিদকেন্দ্রিক যে ‘ভেটো-পাওয়ার’ বা তাৎক্ষণিক জনসমাগম করার সক্ষমতা এই গোষ্ঠীগুলোর রয়েছে, তাকে সংঘাতহীনভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই দুই মানদণ্ডে বিচার করলে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির দিকে অনেক দূর এগোলেও চরমোনাই ও হেফাজতের মতো সমান্তরাল ইসলামি শক্তির ব্যবস্থাপনা প্রশ্নে তাদের অবস্থান এখনও ভঙ্গুর। এর মূল কারণ—উভয় পক্ষই এখন ইসলামি রাজনীতির ময়দানে জামায়াতকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
চরমোনাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবর্তনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৭ সালে সৈয়দ ফজলুল করিমের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত এবং ২০০৬ সাল থেকে সৈয়দ রেজাউল করিমের নেতৃত্বে পরিচালিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মূলত পীর-মুরিদ ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক সংমিশ্রণ। জামায়াতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ ভোটার ও কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক জনভিত্তিতে উভয় দলের লক্ষ্য অভিন্ন। ফলে চরমোনাইকে ‘সহজে বশ করা’ মানে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও দরকষাকষির ক্ষমতা বিলীন করে দেওয়া, যা তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিরোধ করবে।
এই ভঙ্গুরতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে ২০২৬-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে চরমোনাইয়ের এককভাবে লড়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট থেকে তাদের সরে আসা ইঙ্গিত দেয় যে, জামায়াতের ‘কো-অপ্টেশন’ বা অভ্যন্তরীণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় ক্ষমতায় গিয়ে জামায়াত যদি প্রশাসনিক কড়াকড়ির মাধ্যমে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে তা দ্রুত ‘ধর্মীয় দমন-পীড়ন’ হিসেবে তকমা পেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
হেফাজতে ইসলামের বিষয়টি আরও জটিল। নিজেদের অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দাবি করলেও তারা বর্তমানে দেশের রাজনীতির অন্যতম বড় ‘স্ট্রিট-লিভার’। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর থেকে শুরু করে ২০২১ সালের মোদি-বিরোধী আন্দোলন প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের মোবিলাইজেশন ক্ষমতা বা জনসমাবেশ করার সামর্থ্য প্রমাণিত। যদিও রাষ্ট্রীয় ক্র্যাকডাউনের মুখে তারা বারবার সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু সংঘাত সৃষ্টির সক্ষমতা তাদের হাতেই থেকে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের শাসনতান্ত্রিক দমননীতি সব ইসলামি শক্তিকে সমানভাবে আঘাত করেনি। কোনো কোনো গোষ্ঠী ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে। জামায়াত যখন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবে, তখন এই ‘অসম সুযোগ’ বা স্পেসের বাস্তবতা ইসলামি ময়দানে পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দেবে এবং জামায়াতের জন্য ‘ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বী’দের চেনা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
এখানেই হেফাজত আমীর মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাম্প্রতিক বক্তব্যটি এক গভীর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সমীকরণ তৈরি করে। জামায়াতকে ভোট দেওয়া ‘অনুমোদনযোগ্য নয়’ মর্মে তাঁর প্রকাশ্য অবস্থান সরাসরি জামায়াতের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা বা ‘লিজিটিমেসি’র মূলে আঘাত করেছে। জামায়াত যেখানে নিজেদের ইসলামি রাজনীতির প্রধান অংশীদার দাবি করতে চায়, সেখানে হেফাজতের মতো শক্তিশালী কেন্দ্রের এই ধর্মীয় বয়ান তাদের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে ক্ষমতায় গিয়ে হেফাজতকে সামলানো মানে শুধু রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং ধর্মীয় কর্তৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করাও এক বিশাল পরীক্ষা।
সার্বিক বিচারে, জামায়াত নির্বাচনী কৌশল ও প্রশাসনিক ইমেজ তৈরিতে বেশি মনোযোগী হলেও চরমোনাই ও হেফাজতকে সহাবস্থানে রাখার বাস্তব রূপরেখা তাদের কাছে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। চরমোনাই এখন জোটের বাইরে গিয়ে নিজস্ব দরকষাকষির স্পেস বাড়িয়েছে, আর হেফাজত জামায়াতকে ধর্মীয়ভাবে অগ্রহণযোগ্য ফ্রেমে ঠেলে দেওয়ার নজির দেখিয়েছে। শেষ পর্যন্ত জামায়াত কি সংঘাত এড়িয়ে সংলাপ ও আইনের মাধ্যমে এই দুই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, নাকি প্রতিযোগিতার চাপে ইসলামি মাঠ আরও মেরুকরণের দিকে যাবে তা-ই এখন দেখার বিষয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের শাসনক্ষমতার স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।