09/09/2026
#২য় পর্ব
#হত্যার পরও শেষ ঠিকানা অনিশ্চিত: হিন্দু বাবা, মুসলিম মা ও স্ত্রীর দাবিতে মর্গে শুভর লাশ-
#নারায়ণগঞ্জে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে পড়ে আছে মরদেহ, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা-
#প্রতিবেদক, কিশোর ডি কস্তা,
#গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে ও ছুরিকাঘাতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লাল হোসেন এর মৃত্যুর পরও শেষ হচ্ছে না স্বজনদের অপেক্ষা। হত্যার শিকার হওয়ার পর এবার তার মরদেহের শেষকৃত্য নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা। হিন্দু বাবা ছেলের মরদেহ সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করতে চান। অন্যদিকে মুসলিম মা ও স্ত্রী দাবি করছেন, জীবদ্দশায় শুভ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম রীতি অনুযায়ী তার মরদেহ দাফন করতে হবে। ফলে হত্যার কয়েক দিন পরও শুভর মরদেহ পড়ে আছে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার কম্পাউন্ডে থাকা অ্যাম্বুলেন্সে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লাল হোসেন নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা এবং হরি চন্দ্র দাসের ছেলে। মৃত্যুর আগে তিনি প্রায় ৮ বছরের বিবাহিত জীবনে স্ত্রী জোতি ও একমাত্র কন্যাসন্তানকে নিয়ে ভুইগর এলাকায় বসবাস করতেন। পরিবারের দাবি, শুভর মা ও পরিবারের কয়েকজন সদস্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে শুভর নামের সঙ্গে তার হিন্দু বাবার নাম ও পরিচয় বহাল রয়েছে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামন্দিরের সামনে থেকে শুভ চন্দ্র দাসের গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও ধর্মীয় পরিচয় ও শেষকৃত্য নিয়ে বিরোধের কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
#একই পরিবারের দুই ধর্ম, সিদ্ধান্তহীন শুভর শেষকৃত্য-
পরিবারের এক পক্ষের দাবি, শুভ মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, মুসলিম নারীকে বিয়ে করেছিলেন এবং মৃত্যুর আগে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে মুসলিম পরিবার হিসেবেই বসবাস করছিলেন। বিল্লাল হোসেনের স্ত্রীর দাবি শুভ নিহত হওয়ার দিন রাতে বাসা থেকে যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন সেই মোটরসাইকেলের এক সেট চাবি ও তার কাছে সংরক্ষিত আছে। সেই সাথে শুভর আশেপাশে বসবাসকারী লোকজনও শুভ মুসলিম ধর্ম পালন করতেন নামাজ রোজা সবই করতেন বলে জানিয়েছেন এই প্রতিবেদক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের। শুভর স্ত্রী জোতির দাবি শুভ যদি সত্যিই তার বাবার বাড়িতে থাকতো তাহলে শুভ কোথায় ঘুমাতেন, শুভর পরিধানের কোন কাপড় তাদের বাসায় আছে কিনা সেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তার বাবার পরিবারের প্রতি। পরিবার থেকে আরো একটি অভিযোগ করেন শুভর ভোটার আইডি কার্ড করার পিছনে একটি গল্প রয়েছে। শুভর বাবার কাকাতো ভাইয়েরা শুভর বাবার কাছ থেকে প্রতারণা করে কিছু জমি লিখে নিয়েছিলেন সেই জমি উদ্ধার করার জন্য হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলে সন্তানকে দাবিদার হতে হয় তাই শুভর ভোটার আইডি কার্ড শুভর অজান্তে করা হয়েছিল এবং তার বড় বোন এর বয়স থেকে দুই বছরের বেশি বয়স দেখানো হয়েছে বলে দাবি করেন । শুভ ফেরারি আসামি হওয়াতে পরবর্তী তে ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন করার মতো সময় হয়নি বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করেছেন। অপরদিকে তার বাবা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও জাতীয় পরিচয় পত্রে শুভ চন্দ্র দাস হওয়ায় হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলের শেষকৃত্য করার দাবি জানাচ্ছেন।এ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় একাধিকবার আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার অফিসার ইনচার্জ সহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিবারের পক্ষগুলোর বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি বলে পরিবারের দাবি।
#থানার অ্যাম্বুলেন্সেই পচন ধরছে মরদেহে-
#সবচেয়ে মানবিক ও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পরও শুভর মরদেহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কয়েক দিন ধরে থানার কম্পাউন্ডে থাকা ও অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট হওয়ায় ভেতরে মরদেহ পড়ে থাকায় পচন ধরেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
#স্বজনদের প্রশ্ন—একজন মানুষ হত্যার শিকার হওয়ার পর তার মরদেহেরও কি এমন পরিণতি হবে? ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিরোধের কারণে একজন নিহত ব্যক্তিকে দিনের পর দিন মরদেহ হিসেবে পড়ে থাকতে হবে কেন?
#হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গ্রেপ্তার তিন-
এদিকে শুভ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে।গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. সুমন, সিয়াম আহমেদ সিজান ও মো. সোহান। পুলিশের দাবি, মাদক ব্যবসার আধিপত্য ও পূর্ববিরোধের জেরে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল ও তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১০টি ইয়াবার বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীকে ব্যবহার করে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়। পরে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
#এখন প্রশ্ন—শুভ আসলে কোন ধর্মীয় পরিচয়ে শেষ বিদায় নেবেন?
একজন নিহত মানুষের মরদেহ নিয়ে পরিবারের দুই পক্ষের দাবি যখন মুখোমুখি, তখন বিষয়টি শুধু পারিবারিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আইনি ও মানবিক প্রশ্নও তৈরি করেছে।
শুভ জীবদ্দশায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কি না, সেটি প্রমাণের জন্য তার এফিডেভিট, ধর্মান্তরের কাগজপত্র, মুসলমানি করার প্রমাণ, বিয়ের কাগজপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র এবংঅন্যান্য সরকারি নথি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ও সন্তানের সঙ্গে জীবনের শেষ সময়ের বসবাস এবং সামাজিক পরিচয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
#এখন পরিবারের অপেক্ষা আদালতের সিদ্ধান্তের জন্য। আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—হত্যার শিকার শুভ চন্দ্র দাস ওরফে বিল্লাল হোসেন এর শেষ বিদায় হবে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে দাহ, নাকি মুসলিম ধর্মীয় রীতিতে দাফন।
তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— #মৃত মানুষের শেষকৃত্য নিয়েও যদি এত দীর্ঘ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে তার পরিবার ও মরদেহের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?