22/08/2026
❖ মিলাদুন্নবী ﷺ কে ‘ঈদ’ বলা প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيمِ
نَحْمَدُهُ وَنُصَلِّي وَنُسَلِّمُ عَلَى رَسُولِهِ الْكَرِيمِ، وَبَعْدُ.
মহান আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী ও রাসুল হলেন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা ﷺ। তাঁর শুভাগমন সমগ্র মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসামান্য রহমত ও নিয়ামত। তাই তাঁর জন্ম ও জীবনকে কেন্দ্র করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, তাঁর সীরাত আলোচনা এবং তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করা মুসলমানদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে মিলাদুন্নবী ﷺ কে ‘ঈদ’ বলা হলে এর দ্বারা কী বোঝানো হয়, এ বিষয়টি কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং বিজ্ঞ আলিমদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন।
▪ ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ ও কুরআনের দৃষ্টান্ত:
মহান আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে হযরত ঈসা عَلَيْهِ السَّلَامُ-এর একটি দু’আ উল্লেখ করে ইরশাদ করেন,
قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
অর্থ: মারইয়ামের পুত্র ঈসা عَلَيْهِ السَّلَامُ বললেন, “হে আল্লাহ, হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ একটি দস্তরখান নাযিল করুন; তা আমাদের প্রথম ও পরবর্তী সকলের জন্য ঈদের দিন হবে এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হবে। আর আমাদের রিযিক দান করুন; আপনিই শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।”
• কুরআন মাজিদ, সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত ১১৪
উক্ত আয়াতে হযরত ঈসা عَلَيْهِ السَّلَامُ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ একটি বিশেষ নিয়ামতের দিনকে ‘ঈদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ আয়াত থেকে আলিমগণ ইস্তিদলাল করেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো বিশেষ নিয়ামত লাভের কারণে আনন্দ ও শুকরিয়ার উপলক্ষ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَٰلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
অর্থ: “বলুন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমতের কারণে, এতেই তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে, তার চেয়ে এটিই উত্তম।”
• কুরআন মাজিদ, সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৮
উক্ত আয়াতের তাফসিরে হযরত ইবনু আব্বাস رَضِيَ اللهُ عَنْهُ থেকে বর্ণিত হয়েছে,
رَحْمَتُهُ: مُحَمَّدٌ ﷺ
অর্থ: “তাঁর রহমত দ্বারা মুহাম্মদ ﷺ কে বোঝানো হয়েছে।”
মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় নবী ﷺ সম্পর্কে আরও ইরশাদ করেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
অর্থ: “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”
• কুরআন মাজিদ, সূরা আল আম্বিয়া, আয়াত ১০৭
সুতরাং রাসুলুল্লাহ ﷺ'র শুভাগমন যে মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত ও নিয়ামত, এ বিষয়টি কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট।
▪ ইমাম সুয়ূতী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর বক্তব্য:
মাওলিদ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ আলিম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ তাঁর গ্রন্থ ‘হুসনুল মাকসাদ ফি আমালিল মাওলিদ’-এ বলেন,
أصل عمل المولد بدعة لم تنقل عن أحد من السلف الصالح من القرون الثلاثة، ولكنها مع ذلك قد اشتملت على محاسن وضدها، فمن تحرى في عملها المحاسن وتجنب ضدها كان بدعة حسنة وإلا فلا.
অর্থ: “মাওলিদ পালনের মূল রূপটি এমন একটি নতুন প্রচলন, যা পূর্ববর্তী তিন যুগের কোনো নেককার সালাফ থেকে বর্ণিত হয়নি। তবে এর মধ্যে কিছু ভালো দিক এবং তার বিপরীত কিছু দিকও রয়েছে। সুতরাং যে ব্যক্তি মাওলিদ পালনের ক্ষেত্রে ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ করবে এবং মন্দ বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকবে, তার মাওলিদ পালন একটি উত্তম বিদ’আত হবে; অন্যথায় তা উত্তম হবে না।”
• ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, আল হাবী লিল ফাতাওয়া, ‘হুসনুল মাকসাদ ফি আমালিল মাওলিদ’
▪ ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর ইস্তিদলাল:
ইমাম সুয়ূতী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ মাওলিদের পক্ষে ইস্তিদলাল করতে গিয়ে ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর একটি বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,
وقد ظهر لي تخريجها على أصل ثابت، وهو ما ثبت في الصحيحين من أن النبي صلى الله عليه وسلم قدم المدينة فوجد اليهود يصومون يوم عاشوراء، فسألهم فقالوا: هو يوم أغرق الله فيه فرعون ونجى موسى، فنحن نصومه شكراً لله تعالى.
অর্থ: “আমার কাছে এর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতির ওপর ভিত্তি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, নবী ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এটি সেই দিন যেদিন আল্লাহ ফিরআউনকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন এবং মূসা عَلَيْهِ السَّلَامُ-কে রক্ষা করেছিলেন। তাই আমরা আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে এ দিনে রোজা রাখি।”
এরপর তিনি বলেন,
فيستفاد منه فعل الشكر لله تعالى على ما منَّ به في يوم معين من إسداء نعمة أو دفع نقمة، ويعاد ذلك في نظير ذلك اليوم من كل سنة، والشكر لله تعالى يحصل بأنواع العبادة كالسجود والصيام والصدقة والتلاوة، وأي نعمة أعظم من النعمة بظهور نبي الرحمة صلى الله عليه وسلم في ذلك اليوم.
অর্থ: “এ থেকে বোঝা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নিয়ামত লাভ করা অথবা কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা যায়। প্রতিবছর অনুরূপ দিনে তা পুনরায় করা যেতে পারে। আর আল্লাহর শুকরিয়া বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে আদায় করা যায়, যেমন সিজদা, রোজা, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় নিয়ামত আর কী হতে পারে যে, সেই দিনে রহমতের নবী ﷺ পৃথিবীতে আগমন করেছেন!”
• ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, আল হাবী লিল ফাতাওয়া, ‘হুসনুল মাকসাদ ফি আমালিল মাওলিদ’।
এখানে মূল বিষয় হলো, আল্লাহর কোনো বিশেষ নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করা এবং সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করা।
▪ ইবনু আব্বাদ আল মালিকী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর বক্তব্য:
মাওলিদ প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাদ আল মালিকী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর নামে বর্ণিত হয়েছে,
وأما المولد فالذي يظهر لي أنه عيد من أعياد المسلمين وموسم من مواسمهم.
অর্থ: “মাওলিদ সম্পর্কে আমার কাছে যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, এটি মুসলমানদের ঈদসমূহের একটি এবং তাদের আনন্দের একটি উপলক্ষ।”
• ইবনু আব্বাদ আল মালিকী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, রাসায়িলু ইবনি আব্বাদ।
▪ ইমাম কাস্তালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ-এর বক্তব্য:
ইমাম শিহাবুদ্দীন কাস্তালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ নবী ﷺ'র জন্মরজনীর মর্যাদা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন,
إِنَّ لَيْلَةَ مَوْلِدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَفْضَلُ مِنْ لَيْلَةِ الْقَدْرِ
অর্থ: “নিশ্চয়ই নবী ﷺ'র জন্মরজনী শবে কদরের চেয়েও উত্তম।”
• ইমাম শিহাবুদ্দীন কাস্তালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ বিল মিনাহিল মুহাম্মাদিয়্যাহ।
তাঁর গ্রন্থে আরও এসেছে,
فرحم الله امرأً اتخذ ليالي شهر مولده المبارك أعيادًا.
অর্থ: ”আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে তাঁর নবী ﷺ'র বরকতময় জন্মমাসের রাতগুলোকে আনন্দ ও উৎসবের উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে।
• ইমাম শিহাবুদ্দীন কাস্তালানী رَحْمَةُ اللهِ عَلَيْهِ, আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ বিল মিনাহিল মুহাম্মাদিয়্যাহ।
▪ মিলাদুন্নবী ﷺ কে ‘ঈদ’ বলা কী অর্থে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। মিলাদুন্নবী ﷺ'র মাহফিলকে ‘ঈদ’ বলা হলে এর দ্বারা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো শরিয়ত নির্ধারিত ও স্বতন্ত্র ঈদ বোঝানো হয় না। বরং ‘ঈদ’ শব্দটি এখানে লুগাবি বা ভাষাগত অর্থে, আনন্দ, খুশি, স্মরণ এবং কোনো উপলক্ষের পুনরাবৃত্তি, এই অর্থে ব্যবহৃত হয়।
অর্থাৎ, ‘ঈদ’ শব্দটির ইস্তিলাহি বা শরিয়ত নির্ধারিত অর্থ এবং লুগাবি বা ভাষাগত অর্থ এক নয়। তাই মিলাদুন্নবী ﷺ কে ‘ঈদ’ বলা হলে সেটিকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতো শরিয়ত নির্ধারিত ঈদ হিসেবে বোঝানো হয় না; বরং নবী ﷺ'র শুভাগমনকে কেন্দ্র করে আনন্দ, ভালোবাসা, স্মরণ ও শুকরিয়ার একটি পুনরাবৃত্ত উপলক্ষ বোঝানো হয়।
▪ মিলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে কী করা যেতে পারে?
মিলাদুন্নবী ﷺ উপলক্ষে কেউ কুরআন তিলাওয়াত করলে, রাসুলুল্লাহ ﷺ'র প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করলে, তাঁর সীরাত ও জীবনাদর্শ আলোচনা করলে, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করলে, গরিব দুঃখীদের খাবার খাওয়ালে, দান সদকা করলে এবং আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় করলে, এসব আমল স্বতন্ত্র নেক আমল ও ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
তবে কোনো মাহফিলের নামে হারাম ও অশ্লীলতা, বেপর্দা, অপচয়, মিথ্যা বা জাল বর্ণনা কিংবা অন্য কোনো শরিয়তবিরোধী কাজ করা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কারণ নবী ﷺ'র প্রতি ভালোবাসার নামে তাঁরই শরিয়তের বিরোধিতা করা কখনোই কাম্য হতে পারে না।
লেখা: মুহাম্মাদ মেহেদী হাসান;
শিক্ষার্থী, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
#তাসাউফ_মাজলিস