04/07/2025
তোমার রবের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে পাঁচটি গুণ অর্জন করো।
--------------------
|| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
শাইখে মুহতারাম, আমরা আপনার কাছে জানতে চাই: এমন কী কী জিনিস রয়েছে যা আমাদের মৃত্যুর আগেই অর্জন করা উচিত—যাতে আমরা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি এবং তিনি আমাদের কবুল করে নেন ? অনুগ্রহ করে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিন, যা আমাদের পথ দেখাবে।
আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
|| উত্তর:
হে প্রিয় ভাই, আমি তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, তবে তা কোনো ঠান্ডা মাথার উপদেশ হিসেবে নয়, কিংবা এমন কিছু কথা নয় যা কেবল মুখে মুখে ঘোরে, অথচ হৃদয়ে তার কোনো ছোঁয়া লাগে না, জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না। বরং আমি হৃদয় থেকে হৃদয়ের ভাষায় তোমার সঙ্গে কথা বলছি—একটি সত্যবাদী আত্মনিবেদনের মতো, যা আলোক পায় কুরআনের নূর থেকে, ইমানের দীপ্তি থেকে, আর এ ক্ষণস্থায়ী জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে—এক জীবন, যেখানে কিছুই চিরস্থায়ী নয়, কেউই স্থায়ী নয়, শুধু সেই ব্যক্তি ছাড়া যার হৃদয় তার প্রভুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, এবং যে তাঁর সান্নিধ্যের পথ ধরে এগিয়েছে—একটি এমন পথ, যাকে দুনিয়ার লোভ, নফসের খাহেশ বা সময়ের ঝঞ্ঝা ঠেকাতে পারেনি।
তাই মনোযোগ দিয়ে শুনো, ভাই আমার, কেবল কান দিয়ে নয়, বরং তোমার হৃদয় দিয়ে। আমি তো তোমাকে এমন কোনো জিনিস সম্পর্কে বলছি না যা কেনা-বেচা হয়, বা এমন কোনো অবস্থান বা সম্পদ নিয়ে বলছি না যা জোগাড় করা যায়; বরং আমি বলছি এমন এক উচ্চতর মর্যাদা সম্পর্কে, যা দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে একজন মানুষ অর্জন করতে পারে—প্রভুর সান্নিধ্যের মর্যাদা, যেখানে নেই কোনো কষ্ট বা ভয়, ক্লান্তি বা দুশ্চিন্তা; বরং রয়েছে শান্তি, প্রশান্তি, সন্তুষ্টি আর এমন এক জান্নাতি সুখ—যার স্বাদ কেবল সেই জানে, যে কখনো আল্লাহর কুরবতের মাধুর্য পেয়েছে, পবিত্রতার ঝর্ণা থেকে তৃপ্ত হয়েছে, আর যার বাহ্য ও অন্তর পুরোপুরি তাঁর জন্য নির্ভেজাল হয়েছে।
এই মর্যাদা স্বপ্ন বা কল্পনার দ্বারা অর্জিত হয় না, কিংবা মনমতো কামনা-বাসনার মাধ্যমে লাভ হয় না; বরং এর একমাত্র পথ হলো—পবিত্রতা। হ্যাঁ, পবিত্রতা—তবে তা কেবল দেহ বা পোশাকের পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং এর চেয়েও গভীর, বিস্তৃত ও গভীরতর পবিত্রতা—একটি পবিত্রতা, যা উৎসারিত হয় হৃদয় থেকে:
যা হৃদয়কে শুদ্ধ করে—হিংসা, ঘৃণা, ক্রোধ, লোভ ও নোংরা খাহেশ থেকে,
তারপর তা প্রবাহিত হয় চিন্তায়—সন্দেহ, শঙ্কা ও কুশঙ্কা থেকে মুক্ত করে,
তারপর তা পৌঁছায় মুখে—যেখানে মুখ শুধু ভালো কথা বলে, সত্য কথা বলে,
তারপর তা পূর্ণতা পায় কাজে—যেখানে রিয়া থাকে না, খাঁটি হয় শুধু আল্লাহর জন্য।
তখনই একজন মানুষ হয় প্রকৃত অর্থে পবিত্র, তখনই সে হয় তার রবের সান্নিধ্যের উপযুক্ত, তখনই সে প্রস্তুত হয় তাঁর সামনে দাঁড়ানোর জন্য।
আল্লাহ বলেছেন তাঁর কিতাবে—যেটিতে নেই কোনো মিথ্যা, নেই কোনো মিশ্রতা:
“তোমার পোশাককে পবিত্র রাখো, আর অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো” (সূরা মুদ্দাসসির)
আর বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যাঁরা পবিত্রতা অবলম্বন করেন তাঁদের ভালোবাসেন”।
তাহলে এর চেয়ে অধিক স্পষ্ট বাণী আর কী হতে পারে? এর চেয়ে বেশি সত্য কোনো কথা কি হয় ?
হে প্রিয়জন, যাঁরা এ পথে চলেছেন, আত্মশুদ্ধির পথ চিনেছেন, তাঁরা একবাক্যে বলেছেন—এই মর্যাদা (আল্লাহর সান্নিধ্য) অর্জিত হয় পাঁচটি গুণের মাধ্যমে। এই পাঁচটি গুণ হলো—সান্নিধ্যের চাবিকাঠি, নৈকট্যের সিঁড়ি।
যে একটিও হারায়, সে যেন ভাঙা ডানা নিয়ে আকাশে ওড়ার চেষ্টা করছে। আর যার মধ্যে এই পাঁচটি পূর্ণ হয়, সে পৌঁছে যায় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে, এবং হয়ে ওঠে তাঁর প্রিয় বান্দাদের একজন।
১. আত্মশুদ্ধি (التزكية):
এটা মুখের বুলি নয়, বা কেবল একটি স্লোগান নয়—এটি হলো এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, সহনশীল ধৈর্য, ও এক নিরন্তর আমল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি তার হৃদয়কে সব অপবিত্রতা থেকে পরিশুদ্ধ করে, আর তাতে বিন্দু বিন্দু করে সংযোজন করে পবিত্রতার বীজ। তখন তার অন্তর হয় সকালের নির্মল পানির মতো—যেখানে নেই রিয়া, নেই হিংসা, নেই অহংকার।
আল্লাহ বলেন: “সে-ই সফল, যে তার নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে; আর ব্যর্থ সে-ই, যে একে কলুষিত করেছে।” (সূরা শামস)
২. ফেরত আসা (الإنابة):
এটি হলো হৃদয়ের আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া—প্রতিবার যখন দুনিয়া তাকে দূরে সরিয়ে দেয়, যখন নফস তাকে ভুল পথে নিয়ে যায়, বা খাহেশ তাকে টানে—তখন সে ফিরে আসে ঠিক যেন একটি শিশু তার মায়ের বুকে ফিরে আসে—একা একটিই আশ্রয়, একটিই শান্তি—আল্লাহর নৈকট্য।
এই إنابة কেবল এক মুহূর্তের অনুশোচনা নয়, কেবল এক ফোঁটা চোখের পানি নয়—বরং এটি একটি জীবনব্যাপী যাত্রা, এক চিরন্তন অঙ্গীকার।
আল্লাহ বলেন: “তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে ফিরে এসো, আর তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো।” (সূরা যুমার)
৩. আত্মনির্ভরতা (الاستغناء):
এটি সেই উচ্চ মর্যাদা, যা কেবল তারাই অর্জন করে, যারা আল্লাহকে চিনেছে সত্যিকারের পরিচয়ে। সে জানে—সব সৃষ্টিই অভাবগ্রস্ত, আর একমাত্র আল্লাহই নিঃস্বার্থভাবে ধনবান।
এই استغناء ধন-সম্পদের মধ্যে নয়, কিংবা পদমর্যাদায় নয়—বরং এটি হলো অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস, অন্তঃশান্তি, আর সৃষ্টির ওপর নির্ভরতা ত্যাগ করে একমাত্র স্রষ্টার ওপর নির্ভর করা।
৪. আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা (الاستعانة):
এটি হলো সেই গভীর অনুভব—যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতাকে উপলব্ধি করে, এবং পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে আসমানের দরজায় কড়া নাড়ে—সাহায্যের জন্য, সেই সত্তার কাছে, যাঁর কিছুই অসম্ভব নয়।
তখন সে কারো কাছে অভিযোগ করে না, কেবল আল্লাহর কাছেই ফরিয়াদ করে।
তুমি কি ভাবো—যে ব্যক্তি খাঁটি করে আল্লাহর সাহায্য চায়, তাকে দুনিয়ার বোঝা বহনের জন্য একা ছেড়ে দেওয়া হয়?
৫. তাওয়াক্কুল (التوكل):
এটি সব গুণের শিখর, নৈকট্যের চূড়ান্ত ধাপ।
এটি হলো আল্লাহর ওপর নির্ভরতা—দুর্বলতার কারণে নয়, বরং নিশ্চিত আস্থার কারণে।
অসহায়ত্বের বশে নয়, বরং পূর্ণ বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের কারণে।
তখন মানুষ চেষ্টা করে, পরিশ্রম করে, যথাসাধ্য প্রয়াস চালায়—তারপর সমস্ত বিষয় আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়—এক শান্ত হৃদয় নিয়ে, এক প্রশান্ত অন্তর নিয়ে।
আল্লাহ বলেছেন: “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট।” (সূরা ত্বালাক)
হে ভাই, যদি এই পাঁচটি গুণ পূর্ণতা পায় তোমার মধ্যে, তবে তুমি হয়ে যাবে নৈকট্যের যোগ্য—এক নির্মল হৃদয়, এক পবিত্র আত্মা, এক সুদৃঢ় পদক্ষেপের মানুষ—
এই দুনিয়াতেই তুমি আল্লাহর কুরবতের আনন্দে সিক্ত হবে,
আর আখেরাতে তুমি পাবে এমন জান্নাত, যা কোনোদিন শেষ হবে না,
এক এমন সন্তুষ্টি, যার প্রকৃত স্বাদ কেবল তারাই পায়—যাদের আল্লাহ ভালোবাসেন, আপন করে নেন,
আর সম্মানিত বাসভূমিতে স্থান দেন—
যেখানে নেই ভয়, দুঃখ, কষ্ট, নেই ক্লান্তি।
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি—এই মুহূর্তগুলোতে, যখন কথাগুলো হৃদয় থেকে নিঃসৃত হয়ে আসে—
তিনি যেন আমাদের অন্তরকে পবিত্র করেন,
আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করেন,
এবং আমাদেরকে তাঁর সেই বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন,
যারা দুনিয়ার ভাঁওতা দ্বারা পথভ্রষ্ট হয় না,
যারা এর চাকচিক্যে মোহিত হয় না,
বরং যারা একনিষ্ঠভাবে, আস্থার সঙ্গে,
তাঁর সান্নিধ্যের আশায়,
তাঁর দয়ার প্রত্যাশায়,
আর তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে
তাঁর দিকে এগিয়ে চলে।
যাতে করে যখন সাক্ষাতের দিন আসবে,
আমরা তাঁর সামনে উপস্থিত হতে পারি
একটি নির্মল মুখ,
একটি বিশুদ্ধ হৃদয়
এবং এক আন্তরিক প্রত্যাশা নিয়ে।
--------------------
✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড ইউকে।