Rh story r

Rh story r আপনাকে স্বাগতম

01/08/2025

#গ্রামের কৃষি

01/08/2025

[এক]

দূরের দিগন্তে, যেখানে একটু আগে সূর্যের শেষ রক্তিম আভাটুকু মিলিয়ে গেছে, সেখানে এখন ভর করেছে অঘোর অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার কেটে কেটে, মাথায় পাটের বোঝা নিয়ে লোকালয়ে ফেরত আসছে দুটো ছায়ামূর্তি। নাজিমুদ্দিন এবং তার ছেলে মতি। বয়সের তুলনায় মতির শরীরের বাড়ন চোখে পড়ার মতো। চাষাভুষার ছেলে, প্রকৃতির নির্মল আলো-বাতাস খেয়েদেয়ে বড় হয়। মাটি আর জলের সংস্পর্শ পেয়ে এরা যেন পতিত জমির মাঝে আগাছার মতো তরতর করে বেড়ে ওঠে।

মতি নাজিমুদ্দিনের আগে আগে হাঁটছে। চারপাশের প্রকৃতির মতো তারাও চুপচাপ, শান্ত। একটু পরে কথা শুরু করে দেয় মতি। ‘জানো বাজান, আমাগো ইশকুলে নতুন যে হেডমাস্টার আইছেন, উনি কইছেন আমি নাকি বিরিত্তি পাইবার পারি।’

নাজিমুদ্দিন ক্লান্ত, কিন্তু কোমল গলায় জানতে চাইলো, এইটা আবার কী জিনিস, বাজান?’

‘একটা পরীক্ষা হয় বাজান। ইশকুলের যেই পোলা-মাইয়ারা পড়ালেহায় ভালো, তারা এই পরীক্ষা দেয়। তাগো মইধ্যে থেইকা যারা বেশি ভালো পরীক্ষা দিবার পারে, তাগোরে সরকার পুরস্কার দেয়। ম্যালা ট্যাহা দেয়।’

‘সইত্য?’, ক্লান্ত চোখে বিস্ময় জাগে নাজিমুদ্দিনের। তার ছেলে এই বয়সে টাকা পাবে, তাও আবার পড়ালেখা করে–তা যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে তার কাছে।

‘হ বাজান। আমাগো নতুন হেডমাস্টার তো এমনডাই কইছে।’

‘হেডমাস্টরে কইছে তুই এই পুরস্কার পাইবি?’

‘হ, কইছে ভালা কইরা পইড়তে। আরও মন দিয়ে পইড়লে আমি নাকি এই পুরস্কার পাইবার পারি।’

চোখমুখ ঝলমল করে ওঠে নাজিমুদ্দিনের। সন্তানের এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কাছে, চোখের সামনে থাকা ঘুটঘুঁটে অন্ধকারকে তার বিভ্রম বলে মনে হয়। কিন্তু, পরক্ষণেই আজমল ব্যাপারীর কথা মনে পড়লে নাজিমুদ্দিনের স্বপ্নভঙ্গ হয়। বেপারীর কাছে তার সমস্ত ভিটেমাটি বন্ধক দেওয়া। চড়া সুদের ঋণ শোধ করা না গেলে নাজিমুদ্দিনকে সংসার পাততে হবে খোলা আকাশের নিচে। সন্তানের কাঁধে ভর করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যে স্বপ্ন নাজিমুদ্দিনের চোখের তারায় ভেসে উঠেছিল–বেপারীর কথা মনে পড়ায় তা যেন সন্ধ্যার অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। আবার ক্লান্তি ভর করে নাজিমুদ্দিনের শরীরে। মাত্র এক ক্রোশের পথ, কিন্তু তার কাছে মনে হয়–অনন্তকাল ধরে সে এই পথে হাঁটছে। এই পথ যেন কোনোভাবে ফুরোবার নয়।

দুজনের মাঝে আবারও নীরবতা ভর করে; কিন্তু থামে না নির্জনতার গায়ে ভর করে পথ পাড়ি দেওয়ার তাদের সেই আবহমানকালের যাত্রা। এভাবেই কেটে যায় তাদের জীবন। জীবিকার অন্বেষণে কতো স্বপ্নকে তারা পায়ে মাড়িয়ে যায় এই দিগন্ত-বিস্তৃত মাঠে, কতো স্বপ্ন যে কর্দমাক্ত মাটির সাথে লেপ্টে যায়–মহাকাল তার সাক্ষী।

হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে ওঠে একটা ছোট্ট আলোর রেখা। খানিক দূরে, কেউ যেন একটি ছোট্ট পিদিম হাতে এগিয়ে আসছে এদিকে। আলোটা কাঁপছে। এই সময়ে এদিকটায় কারও আসবার কথা নয়। নাজিমুদ্দিন থমকে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে পড়ে মতিও। আগত আগন্তুককে দেখার আশায় বিলের একপাশটায় তারা অপেক্ষা করে।

অনেকক্ষণ পরে একটা ছায়ামূর্তি চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আরও কাছাকাছি আসার পরে তারা আবিষ্কার করে আগন্তুককে। পাশের গ্রামের রাসুর মা। পঞ্চাশোর্ধ এই মহিলাকে সন্ধ্যার এমন ঘোর অন্ধকারে দেখতে পেয়ে নাজিমুদ্দিন বেশ অবাক হয়। নাজিমুদ্দিনের বিস্ময়ের রেশ কাটবার আগেই রাসুর মা বলতে শুরু করে, নাজিমুদ্দিন না?’

‘হ বুজান।’, নাজিমুদ্দিনের ত্বরিত উত্তর। ‘এই রাইতের বেলা, একলা কই থেইকা আইতাছো গো বু?’

রাসুর মা জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে তার শরীর ক্লান্ত। হাতে থাকা জ্বলন্ত পিদিম মাটিতে রেখে আইলের ওপর বসে পড়লো রাসুর মা। হাত দিয়ে ইশারা করে নাজিমুদ্দিনকেও বসতে বললো। রাসুর মায়ের ইশারা পেয়ে মাথা থেকে পাটের বোঝা দুটো আইলে রেখে বসে পড়লো নাজিমুদ্দিন এবং মতি।

‘আরে শোনো নাজিমুদ্দিন, দুনিয়ার খবর কোনোকিছু রাহো?’

বিস্ময়ের রেশ যেন আরও বেড়ে যায় নাজিমুদ্দিনের। কৌতূহলী গলায় জানতে চাইলো নাজিমুদ্দিন, ‘কিছু হইছেনি বু?’

‘হইছে মানে? আমাগো কপাল খুইল্লা গেছে গা।’

নাজিমুদ্দিনেরা হাভাতে মানুষ। কপাল খোলার গল্প শুনলে তাদের আগ্রহ এবং আবেগ–দুটোই হড়বড় করে জেগে ওঠে। রাসুর মায়ের পিদিমের আলো হোক কিংবা কপাল খুলতে যাওয়ার আনন্দ এবং আগ্রহের উচ্ছ্বাস–কোনো এক বিচিত্র কারণে নাজিমুদ্দিনের চেহারা থেকে সমস্ত অন্ধকার যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। মাটিতে হাত-পা ছেড়ে বসে পড়লো নাজিমুদ্দিন। বললো, ‘বুজান, কী হইছে খুইল্লা কও তো!’

রাসুর মা খুলে বসল গল্পের ঝাঁপি। সেখান থেকে বেরিয়ে এলো এক আল্লাহওয়ালা পীর সাহেবের গল্প, যিনি গতকাল সোনারচরে আবির্ভূত হয়েছেন। উনি কোথা থেকে এসেছেন, কীভাবে এসেছেন তা সম্পর্কে কেউ ওয়াকিবহাল নয়। কারও কারও ধারণা–তিনি বাতাসে উড়ে এসেছেন, আবার কারও কারও মতে তিনি পানির ওপর হেঁটে সাগর পাড়ি দিয়ে এই সোনারচরে এসেছেন কেবল এখানকার গরিব মানুষগুলোর দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে। সবাই বলাবলি করছে–এই পীরের হাতে মাটিও সোনা হয়। পাথর হয়ে যায় বরফ। এই পীরের আবির্ভাবের পর থেকেই সোনারচরে মানুষজনের ঢল নেমেছে। দল বেঁধে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা আসছে পীর সাহেবের পায়ের ধুলো নিতে। জানা গেছে–পীর সাহেবের ফুঁ দেওয়া পানি খেয়েই ভালো হয়ে গেছে শমসু তরফদারের নাতির পেটের অসুখ। মরতে বসা ওই বাচ্চাটার জীবন বাঁচানোয় শমসু তরফদার ওই পীর সাহেবের জন্য খানকা শরীফও বানিয়ে ফেলেছে।

নাজিমুদ্দিনের আগ্রহ যেন আকাশ ছুঁতে চায়। এমন কামেল পীর কেন আরও আগে এই তল্লাটে পা রাখেনি, সেই দুঃখটাও একটুখানি ঢু মেরে গেলো খুশিতে তড়পাতে থাকা নাজিমুদ্দিনের মনে।

রাত বাড়ে, রাসুর মায়ের গল্প থামে না। জানো নাজিমুদ্দিন, পীর সাবের এক্কেবারে নূরানি ছুরত। দেখলে মনে অইবো আল্লাহর ফেরেশতা নাইমা আসছে আকাশ থেইকা। হুনছি, চোখ বাঁইধলে পীর সাবে মক্কা-শরীফ দেখতে পায়। কতো বড় কামেল পীর ভাবো তাইলে?

‘তাঁতিপাড়ার ওপরে এইডা আল্লাহর খাস রহমত গো বু৷ নইলে দুনিয়ার এতো জায়গা রাইখা এমন পীরে আমগো এদিকে আইবো ক্যান, কও?’, নাজিমুদ্দিন বলে।

‘ঠিকই কইছো তুমি। এইটা আমাগো কপালের জোর।

ঠিক হলো আগামীকাল ভোরে নাজিমুদ্দিন মতিকে নিয়ে পীর সাহেবের দর্শনে যাবে। মতির জন্য প্রাণভরে দুআ নিয়ে আসবে যাতে সে হেডমাস্টারের বলা বৃত্তিটা পেয়ে যায়। নাজিমুদ্দিনের বিশ্বাস–এই পীর মতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই সব হয়ে যাবে। যে পীরের ফুঁ দেওয়া পানি খেলে পেটের কঠিন অসুখ সেরে যায়, তার হাতের স্পর্শ পেলে যে-কারও ভাগ্যও যে বদলে যাবে–তা তো চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। কিন্তু বাধ সাধে মতি। এই এতোক্ষণ পরে সে একটা কথা বলে উঠলো। ঠিক কথা নয়, যেন প্রতিবাদ করে উঠেছে নাজিমুদ্দিনের সরলমনা ছেলেটা।

মতি বললো, ‘বাজান, আমার কাইলকা ইশকুল আছে। কতোগুলান পড়া জমা আছে তুমি জানো? আমি কোনোখানে যাবার পারুম না। তোমরা যাও গা।

মতির এমন আস্পর্ধা, এমন দুঃসাহস আর দুর্মতি দেখে সবচেয়ে বেশি অবাক হয় রাসুর মা। পীর সাহেবের সোহবতে যেতে অস্বীকার করা মতিকে একপ্রকার তিরস্কার করে রাসুর মা নাজিমুদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলে, নাজিমুদ্দিন, কী পোলা বানাইতাছো তুমি, হ্যাঁ? পোলা তো নয় যেন সাক্ষাৎ শয়তান দেখতাছি। পীরের বাড়িত যাইতে চায় না তোমার পোলায়। শয়তান না হইলে এমন কথা মুখ দিয়ে বাইর হয় ক্যামনে?

অপমানটা বেশ ভালোভাবেই গায়ে মাখে দুরন্ত কিশোর মতি। সে বলে, আমারে নিয়া তোমার এতো ভাবা লাগবো না গো ফুফু। তুমি তোমার ঘর লইয়াই ভাবো। মাঠে আসার কালে দেখলাম ফুফা কাশতে কাশতে শেষ হইয়া যাইতাছে, আর তুমি কিনা পীরের কেরামতির গল্প বিলাইতে বিলাইতে হয়রান।

আর নিতে পারলো না রাসুর মা। রাগ আর অপমানে যেন মাটির মধ্যে ঢুকে পড়তে পারলেই বেঁচে যায়। যতো বড়ো মুখ নয় ছেলের ততো বড়ো কথা! নাজিমুদ্দিনের মতো ভদ্রগোছের কারও ঘরে এমন ইবলিশ যে পয়দা হতে পারে–তা যেন রাসুর মা বিশ্বাস করতে পারে না। শেষ জামানা যে চলেই এলো, এ বুঝি তারই সাক্ষী!

মাঝখানে কথা বলে ওঠে নাজিমুদ্দিন। মতিকে থামাতে চেয়ে বলে, ‘মতি, কেমন কথা কস বড় মাইনষের লগে? তুই না গেলে না গেলি, তাই বইলা আরেকজনরে খোঁটা দিয়া কথা কইবি?’

মতি বিনীত সুরে বলে, ‘না বাজান, আমি খোঁটা দিই নাই। ফুফার শইলের যে কী অবস্থা, মাঠে আওনের সময়ে দেখলা না তুমি? কাশতে কাশতে গলা দিয়া রক্ত আওনের জোগাড়। কেউ নাই যে এক গেলাস পানি আগাইয়া দিবো। ফুফার জায়গায় তুমি হইলে, তোমারে রাইখা মা যদি এমনে পীর-বাবার গুণগান গাইয়া পাড়া বেড়াইতো, তোমার কেমন লাইগতো কও তো?’

মতির বয়স কম, কিন্তু তার যুক্তি-তর্ক দেখে নাজিমুদ্দিনের মনে হলো–ছেলের যেন বয়স অনেক বেড়ে গেছে। আষাঢ় মাসের এমনই এক গুমোট-লাগা সময়ে মতির জন্ম। যেন সেদিনকার কথা, এখনো সবটা মানসপটে জ্বলজ্বল করছে। সেই মতি আজ ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের তফাৎ করা শিখে গেছে। বুকের ভেতরে কোথায় যেন একটা আনন্দোৎসব লেগে যায় নাজিমুদ্দিনের। কিন্তু রাসুর মায়ের সামনে সেই আনন্দ উদযাপন করা যাবে না কোনোভাবে। নাজিমুদ্দিন নিজেকে সামলায়, এরপর শাসনের সুরে মতিকে পাল্টা জবাব দেয়, ‘হইছে, তোর আর এইহানে মাথা দেওন লাগবো না। তুই ইশকুলেই যাইস। পীর-বাবার কাছে যাওনের দরকার নাই তোর। আমি আর বুবু মিইল্যা যামু নে।’

কিন্তু নাজিমুদ্দিনের কথায় খুব একটা তৃপ্ত হতে পারে না রাসুর মা। রাগে গিজগিজ করতে করতে নাজিমুদ্দিনের মুখের ওপর বলে, একটা কালসাপ জন্ম দিছস রে, নাজিমুদ্দিন। পীর-বাবার কেরামতি নিয়া সন্দেহ করে তোর পোলা। আমি কইয়া গেলাম আইজ, তোর এই পোলা ঈমানহারা হইয়া মরবো।

কথাগুলো বলতে বলতে, মাটিতে রাখা পিদিম হাতে তুলে নিয়ে, অন্য আরেকটা সরু আইল ধরে হাঁটা শুরু করে রাসুর মা। নাজিমুদ্দিনদের সাথে একই আইল ধরে বাড়ি যাওয়ার কোনো ইচ্ছে হয়তো বা আর নেই। অথবা, মতির মতো এমন দুর্মতিসম্পন্ন নাবালকের সাথে যাওয়াটাকে রাসুর মা হয়তো পাপ হিশেবে গণ্য করছে।

[দুই]

সোনারচরের যে খানকায় পীর সাহেব আসর পেতেছেন, সেখানে নিত্যনিয়ত শত মানুষের ঢল নামে। কেউ ব্যবসাপাতির উন্নতির বায়না নিয়ে আসে, কেউ আসে পেটের অসুখ থেকে মুক্তি-প্রার্থনা করতে। নানান মানুষের নানান চাহিদা। এমন বাহারি পদের চাহিদা মেটানোর আশা দেখানো পীর সাহেব একদিন এক ঘোরতর বিপদের ঘোষণা দিয়ে বসলেন। জানালেন, এই তল্লাটের মানুষের ভাগ্যাকাশে চরম এক বিপদের আনাগোনা তিনি টের পাচ্ছেন। আগামীকাল এক প্রলয়ংকরী ঝড়ে লন্ডভন্ড হতে যাচ্ছে সোনারচর এবং তার আশপাশের মানুষের জানমাল। তবে তিনি ধ্যান-মারফত আরও জ্ঞাত হয়েছেন, এই ঝড় দুনিয়ার আর যা ক্ষতিই করুক, পীর সাহেবের খানকার আশপাশে ঘেঁষার দুঃসাহস সে করবে না।

পীর সাহেবের মুখে আসন্ন দুর্দিনের দুঃসংবাদ শুনে ভেঙে পড়ে খানকায় আগত সকল মানুষ। ঘরে-বাইরে কান্নার রোল পড়ে যায়। কী করে বাঁচা যাবে এই বিনাশী ঝড়ের কবল থেকে, তা জানতে ভক্তকুল উদগ্রীব হয়ে ওঠে। তাদের ধারণা–এই ঝড় যতোই শক্তিশালী হোক, যদি পীর সাহেব চান, তাহলে মুহূর্তে সেটাকে উল্টোদিকে তাড়িয়ে দিতে পারবেন। বাতাসে উড়ে যিনি চোখের পলকে এক তল্লাট থেকে আরেক তল্লাটে চলে যেতে পারেন, তার সামনে এমন কতো ঝড় শক্তি হারিয়ে বিলকুল বিলীন হয়ে যেতে বাধ্য তা নিয়েও ভক্তদের মাঝে মাতামাতির কমতি নেই।

দীর্ঘ ধ্যানমগ্নতার পরে, পীর সাহেব আসন্ন বিপদের হাত থেকে বাঁচার একটি উপায় নিয়ে হাজির হলেন সকলের সামনে। সবার মুখে মুখে ধন্যি ধন্যি রব পড়ে গেলো। আর কোনো দুশ্চিন্তা অবশিষ্ট নেই। ঝড়-তুফান এবার যা-ই আসুক, পীর সাহেবের অব্যর্থ মারণাস্ত্রের সামনে, ভয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে ব্যাটা যাবেই।

জনতার মঞ্চে উপস্থিত হলেন সুন্দর চেহারা এবং নিটোল স্বাস্থ্যের এক বৃদ্ধ। ঠিক। বৃদ্ধ নয় যদিও, কিন্তু লম্বা আলখেল্লায় তাকে বেশ অনেকখানি বয়স্ক মনে হচ্ছে। হাতে আভিজাত্যের লাঠি। তাতে ভর দিয়ে, জনতার উদ্দেশে তিনি যা বললেন তার সারমর্ম নিম্নরূপ–

‘সোনারচরের ওপর আসন্ন ঝড়ের তাণ্ডব অবশ্যম্ভাবী। তিনি হাজার রকমের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কোনোভাবে এই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ ঝড়কে পোষ মানানো গেলো না। এই ঝড়কে এবার তিনি থামাতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু পরের বার এই ঝড় আরও ভয়ংকর চেহারা নিয়ে হানা দিবে। পীর সাহেব যদি তার গোপন-অত্র এবারেই প্রয়োগ করে ফেলেন, তাহলে পরের বারের প্রলয়ংকরী ঝড়কে থামানোর আর কোনো অস্ত্র তার হাতে অবশিষ্ট থাকবে না। তাই, এবার কিছু ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে এই ঝড়কে না আটকানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। জানের ক্ষতি যদিও এড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু, একটা উপায়ে মালের ক্ষতিটা এড়ানো পুরোপুরি সম্ভব।’

সকলের কৌতূহলী চোখ দ্বিগুণ কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো, ‘কোন সে উপায়?’

পীর সাহেবের পক্ষে নিযুক্ত এক খাদেম বললো, আপনারা তো জানেন দুনিয়ায়। এমন কোনো বিপদ নাই, যা আমাদের পীর সাহেবকে স্পর্শ করতে পারে। আসন্ন ঝড়ের তাণ্ডবে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, আমাদের পীরের এই পবিত্র খানকার কোনো ক্ষতি করার দুঃসাহস বাতাসের নাই।

সকলে মাথা নেড়ে সায় দিলো, যেন এই বিশ্বাস তাদের বহুযুগ পুরোনো, বহু আদিম এই জ্ঞান।

খাদেম পুনরায় বলতে শুরু করলো, আপনারা যদি আপনাদের গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, গহনা, টাকা-পয়সা এই খানকায় এনে রাখতে চান, রাখতে পারেন। আমাদের পীর সাহেবের যদিও বা তাতে খানিকটা অসুবিধে হবে, কিন্তু আপনাদের মালের নিরাপত্তার লক্ষ্যে তিনি এই অসুবিধায় বিব্রত হবেন না। আমাদের মহান এই পীরের কাছে আপনাদের সুবিধাই সবকিছুর আগে।

এমন জনদরদি, ভক্ত-দরদি পীর পেয়ে, সোনারচরের মানুষ নিজেদের আরেকবার ধন্য মনে করলো। তারা সবাই একবাক্যে রাজি হয়ে যার যার গুরুত্বপূর্ণ মাল, গহনাগাটি, জমানো টাকা-পয়সা পীরের খানকায় এনে জমা দিতে শুরু করে দিলো। যেহেতু মাত্রই আষাঢ় ঢুকেছে, তাই আকাশের ওপর আজকাল আর ভরসা করা চলে না। রোদ আর মেঘের লুকোচুরি প্রকৃতিজুড়ে। সেদিনও, বিকেল থেকে আকাশের কোণে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কালো মেঘে ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে সোনারচরের আকাশ। আর, সাথে সাথে জনজীবনে জেঁকে বসছে এক অজানা আতঙ্ক।

[তিন]

ত্রস্ত-পায়ে, বিলের আইল ধরে এগিয়ে আসছে রাসুর মা। খানিক বাদে অন্ধকার নামবে। প্রকৃতি অন্ধকারে তলিয়ে যাবার আগে যে-করেই হোক রাসুর মাকে পীরের খানকায় গিয়ে, নিজের সারাজীবনের জমানো সম্বল, দুই ভরি সোনার গহনা জমা দিয়ে আসতে হবে। খেয়ে না-খেয়ে যে সম্বল রাসুর মা জমা করেছে, ঝড়ের তাণ্ডবে তা উড়ে বিলীন হবে–সেটা কোনোভাবে হতে দেওয়া যাবে না।

যাওয়ার পথে একবার নাজিমুদ্দিনের ঘরে ঢু মারতে এলো রাসুর মা। নাজিমুদ্দিনকে তো বিপদের সংবাদ দেওয়া হয় নাই। সুপারি গাছের খোলের দরজা সরিয়ে, ঘরের ভেতরে চোখ ফেলে রাসুর মা বললো, ‘নাজিমুদ্দিন ঘরে আছো?’

ঘরের এক কোণে বই-খাতা নিয়ে অঙ্ক কষছিল মতি। রাসুর মায়ের এমন হাঁকডাকে খাতা-কলম রেখে উঠে এসে বললো, ‘বাপজান নাই।’

এই দুর্মতিসম্পন্ন নাবালকের সাথে কথা বলার কোনো শখ রাসুর মায়ের নেই, কিন্তু নাজিমুদ্দিনকে বিপদটা সম্পর্কেও সতর্ক করে যাওয়া দরকার। অগত্যা বাধ্য হয়েই, আগের রাগ কোনোভাবে নিজের ভেতর চাপা দিয়ে রাসুর মা বললো, ‘শোন ব্যাটা, তোর বাপ আইলে কইস আইজ রাইতে কঠিন এক ঝড় আইবো দুনিয়ায়। আমাগো পীরে কইছে, ঝড়ে জান আর মালের ক্ষতি হইব। তয়, যাগো মাল পীরের খানকায় জমা থাকব, তাগো মালের কোনো কিছু হইব না। তোর বাপেরে বলবি, তোর মায়ের যদি কোনো গয়নাগাটি থাকে, তাইলে পুটলি বাঁইধা যেন পীরের খানকায় রাইখা আসে।

বুড়ির এমন অবোধ বিশ্বাসে যেন বিরক্তিই হলো মতি। মুখের ওপরেই বললো কিনা, ‘ফুফু, আমারে একটা কথা কও তো৷ ঝড় যদি আসে, ক্যান সেইটা তোমাগো পীরের খানকার ওপর দিয়া যাইব না? তোমাগো পীরের খানকা কি জাদু-মন্ত্র পড়া কোনো দালান যে ওইখানে ঝড় ধাক্কা খাইয়া পলাইবো?’

না, এখানে আর এক মুহূর্তও না। ভালো-মানুষি করে যাদের উপকার করতে এলো, তাদের কাছ থেকেই কিনা এমন ধারার অপমান! তবে চলে যাওয়ার আগে রাসুর মা মতিকে বললো, ‘তাওবা কইরা দুআ-কালেমা পইড়া নিস। তোর তো ঈমানটাই চইলা গেলো রে দুর্মতি।’

কথাগুলো জপতে জপতে পীরের খানকার উদ্দেশে হাঁটা ধরল রাসুর মা। মতি সেদিকে তাকিয়ে আছে। দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে এক অবোধ, অবুঝ বৃদ্ধার ছায়ামূর্তি।

[চার]

ভোর হলো। এক আলো ঝলমলে ভোর। সোনারচরের আকাশজুড়ে যেন আলোর মাখামাখি। গতরাতে যে বিপদ বয়ে যাওয়ার কথা ছিলো সোনারচরের ওপর দিয়ে, তা হয়তো বা কেউ টের পায়নি। কী আশ্চর্য! সবাই তো জেগেই ছিলো, তবুও ঝড়ের একটু রেশ কোথাও কেউ দেখতে পায়নি কেন? তবে কি শেষ পর্যন্ত পীর সাহেব কোনো এক গুপ্ত কৌশলে আটকে দিয়েছেন আসন্ন বিপদকে? তা-ই তো হবে’, সবাই ভাবলো। পীর সাহেবের প্রতি ভক্তি আর শ্রদ্ধায় সোনারচরের মানুষগুলোর মাথা যেন আরেকবার নুইয়ে আসে।

বিপদ কেটে গেছে। সবাই দলবেঁধে, হই-হুঁল্লোড় করতে করতে পীর সাহেবের খানকার দিকে এগুতে লাগলো। ওই ভিড়ের মাঝে, ধীরপায়ে হেঁটে আসছে একজন বয়োবৃদ্ধ মহিলাও। রাসুর মা। পীর সাহেবের উসিলায় জীবনের শেষ এবং একমাত্র সম্বলটুকু এই যাত্রায় ভীষণ বাঁচা বেঁচে গেলো’–-এই খুশিতে রাসুর মায়ের চোখ দিয়ে যেন কান্না চলে আসে।

কিন্তু, পীর সাহেবের খানকার কাছে এসে সবাই পাথর-মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। থেমে গেলো এতোক্ষণের সমস্ত হৈ-হুঁল্লোড়। এই দৃশ্য দেখার জন্যে সোনারচরবাসী কখনোই প্রস্তুত ছিলো না, প্রস্তুত ছিলো না রাসুর মাও। সবাই দেখছে–পীর সাহেবের খানকা শরিফের দুয়ারের একটা অংশ ভোলা। ভেতরে পীর সাহেব নেই। উনি ছুটেছেন অন্য কোথাও, অন্য কোনো সোনারচর এবং অন্য আরেক রাসুর মায়ের খোঁজে। নাজিমুদ্দিনের ছেলে মতির ঈমান কতোটুকু গেছে জানা যায়নি, তবে রাসুর মা জীবনের শেষ সম্বলটুকু যে খুইয়েছে, তা নিশ্চিত।

 #নাস্তিক_প্রশ্ন: ইহুদিরা(Jews) সম্পূর্ণরূপে একেশ্বরবাদী থাকা সত্ত্বেও কুরান কিসের ভিত্তিতে দাবি করে তারা বহু ঈশ্বরে বিশ...
29/07/2025

#নাস্তিক_প্রশ্ন: ইহুদিরা(Jews) সম্পূর্ণরূপে একেশ্বরবাদী থাকা সত্ত্বেও কুরান কিসের ভিত্তিতে দাবি করে তারা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাসী (Quran 9:30)?
#উত্তরঃ আল কুরআনে বলা হয়েছেঃ
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرٌ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللَّهِ ۖ ذَٰلِكَ قَوْلُهُم بِأَفْوَاهِهِمْ ۖ يُضَاهِئُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِن قَبْلُ ۚ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ ۚ أَنَّىٰ يُؤْفَكُونَ
অর্থঃ ইহুদীরা বলে “উজাইর আল্লাহর পুত্র” এবং খ্রিষ্টানরা বলে “মাসীহ [ঈসা(আ)/যিশু] আল্লাহর পুত্র”। এ হচ্ছে তাদের মুখের কথা। ওরা তো তাদের মতই কথা বলে যারা তাদের পূর্বে কাফির হয়েছে। আল্লাহ এদের ধ্বংস করুন, এরা কোন উল্টো পথে চলে যাচ্ছে!
(কুরআন, তাওবাহ ৯:৩০)
ইহুদি তথা ইস্রায়েল জাতির ইতিহাস বহু ঈশ্বরের উপাসনা ও মূর্তিপুজা দ্বারা পরিপূর্ণ। তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থই এর সাক্ষ্য দেয়।
নবী মুসা(আ) [prophet Moses] ইস্রায়েলীয়দের ছেড়ে তুর পাহাড়ে যাওয়ামাত্রই তারা গরুর বাছুরের মূর্তিপুজা শুরু করেছিল। এ জন্য ঈশ্বরের শাস্তিতে তাদের বহু লোক নিহত হয়। [দেখুন খ্রিষ্টান বাইবেল/ইহুদি তানাখ(Tanakh) এর যাত্রাপুস্তক(Exodus) ৩২:১-৯]
শেষ পর্যন্ত মুসা(আ) তাঁদেরকে আবার মূর্তিপুজা থেকে ফেরান।
ইহুদিদের কিতাবমতে তাদের একজন নবী সুলাইমান(আ)[Solomon] স্বয়ং শেষ বয়সে মূর্তিপুজক হয়ে যান এবং দেব-দেবীর মন্দির বানান! [দেখুন বাইবেল, ১ রাজাবলী(1 Kings) ১১:১-১০] {{কুরআন এইজাতীয় কথা অস্বীকার করে; কুরআনমতে কোন নবী পাপী ছিলেন না; কুরআন সরাসরি বলে যে সুলাইমান(আ) কুফরী করেননি। দেখুন বাকারাহ ২:১০২।}}
নবী দাউদ(আ)[David] এবং সুলাইমান(আ) [Solomon] এর পর পরই ইস্রায়েলীয়দের রাজ্য ২ভাগে ভাগ হয়ে যায়, ইয়াহুদা(Judah) এবং ইস্রায়েল(সামারিয়া) এই দুই রাজ্যে। প্রথমে সামারিয়ার রাজ্যের ইস্রায়েলীয়রা মূর্তিপুজা শুরু করে,ফলে ঐশ্বরিক শাস্তি আসে, আসিরিয়া সাম্রাজ্য তাদের আক্রমণ করে দাসে পরিণত করে। পরে ইয়াহুদা রাজ্যের লোকেরা মূর্তিপুজায় লিপ্ত হয় এবং ব্যাবিলোনিয়ানরা তাদের আক্রমন করে দাসে পরিণত করে। সেসব এলাকায় নবীদের দাওয়াতে ইহুদিরা আবার একত্মবাদী ইসলামে ফিরে আসে। পরে পারস্যসম্রাট সাইরাস ইহুদিদের মুক্ত করেন এবং আবার ফিলিস্তিনে যেতে দেন। বাইবেলের পুরাতন নিয়মের(Old Testament) এর প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে এইসব ইতিহাস অনেক বিস্তারিত বর্ণণা করা আছে।
ইহুদিদের মূর্তিপুজা ও বহু ঈশ্বরের উপাসনার আরো অনেক বিবরণ বাইবেলে আছে—বায়াল দেবতার উপাসনাকারী ইস্রায়েলীয়দের তাদের নবী কর্তৃক হত্যা করার ঘটনাঃ ২ রাজাবলী(2 Kings) ১০ম অধ্যায়।
নবী যিশাইয়(Isaiah) এর যুগে ইহুদিদের মূর্তিপুজা এবং নবী কর্তৃক তাদের একত্ববাদে(ইসলাম) ফিরে আসার আহ্বান বাইবেল, যিশাইয়(Isaiah) ২:৫-৯।
নবী ইয়ারমিয়া(যেরমায়া) কর্তৃক সেসময়ের মূর্তিপুজক ইহুদিদের একত্ববাদে ফিরে আসবার আহ্বানঃ বাইবেল, যিরমিয়(Jeremiah) ৩২:২৮-৩৫।
নবী হিজকিল (যিহিষ্কেল) এর ঘটনাঃ বাইবেল, যিহিষ্কেল(Ezekiel) ২০:৩১।
ইহুদি তথা ইস্রায়েল জাতির নিজ ধর্মগ্রন্থই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তাদের ইতিহাস পৌত্তলিকতা আর বহু দেবতার পুজায় ভরা। কাজেই চট করে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সময়ে “ইহুদিরা সম্পূর্ণরূপে একেশ্বরবাদী ছিল” বলে দেওয়াটা একটু কঠিন বৈকি।
কোন প্রেক্ষাপটে বা কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াতটি নাজিল হয়েছিল?
সাল্লাম ইবন মিশকাম, নু’মান ইবন আওফা, শাস ইবন কায়স ও মালেক ইবনুস সাইফ রাসুলুল্লাহ(ﷺ) এর কাছে এসে বলল, আমরা কিভাবে আপনার অনুসরণ করতে পারি, অথচ আপনি আমাদের কিবলা ত্যাগ করেছেন, আপনি উজাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নেন না? তখন আল্লাহ তাআ’লা এ আয়াত নাজিল করেন।
[তাবারী, সিরাত ইবন হিশাম ১/৫৭০]
সুতরাং আমরা ঐতিহাসিক বিবরণ পাচ্ছি যে ইহুদিরা আসলেই উজাইরকে আল্লাহর পুত্র বলত।
সুরা তাওবাহ এর ৩০নং আয়াতের তাফসিরে ইমাম কুরতুবী(র) বলেনঃ “ “ইহুদীরা বলে” এই কথাটি একটি সাধারণ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে যদিও এর মানে সুনির্দিষ্ট, কারণ সব ইহুদি এমনটি [উজাইর আল্লাহর পুত্র] বলত না।
এটা তো আল্লাহর ঐ বক্তব্যের মত “যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, ...” (আলি ইমরান ৩:১৭৩) অথচ সব লোক তা বলেনি। “ [সুরা আলি ইমরানের ১৭৩ নং আয়াত—“যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর। ...” এ আয়াতে “লোকেরা” কথাটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখানে এ দ্বারা আরবের সকল লোককে বোঝানো হয়নি বরং অল্প কিছু মুনাফিকের কথা বলা হয়েছে।]
ইমাম শাওকানী(র) এর ফাতহুল কাদিরেও অনুরূপ মত ব্যক্ত করা হয়েছে।
জি ডি নিউবাই তাঁর “আ হিস্টরি অফ দ্য জিউস অব এরাবিয়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “আমরা সহজেই ধরতে পারি যে হিজাজের[মক্কা-মদীনা] ইহুদিরা, যারা কিনা সুস্পষ্টভাবেই মোরাকাবার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মরমি ভাবধারায় আক্রান্ত ছিল, উজাইরকে সেই স্থান দিয়েছিল।
এর কারণ ছিল তার কিতাবের অনুবাদের বিবরণ, তার ধার্মিকতা।এবং বিশেষত, ঈশ্বরের অনুলেখক হিসাবে তাকে হনোক(Enoch) এর সাথে তুলনা করা হত।এ দ্বারা ঈশ্বরের পুত্রদের একজনকেও বোঝায়।এবং নিঃসন্দেহে তিনি ধর্মীয় নেতাদের সকল বৈশিষ্ট্য বহন করতেন(কুরআন ৯:৩১এ বর্ণিত ‘আহবার’), যাকে ইহুদিরা বন্দনা করত।”
[G. D. Newby, A History Of The Jews Of Arabia, 1988, University Of South Carolina Press, p. 61]
ইমাম কুরতুবী (র) ও ইমাম শাওকানী (র) এর তাফসির থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে আলোচ্য আয়াতে সকল ইহুদি সম্পর্কে এটা বলা হয়নি যে তারা উজাইরকে আল্লাহর পুত্র দাবি করে। বর্তমানকালেও ইহুদি ফির্কাগুলোর মধ্যে এমন বিশ্বাস দেখতে পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) এর সময়ে আরবের ইহুদিরা [যারা ছিল ইয়েমেনী(Yemenite) দলীয় ইহুদি] উজাইরকে আল্লাহর পু্ত্র বলে অভিহীত করত।
ইহুদিদের বহু ঈশ্বরের উপাসনার ইতিহাস, ঐতিহাসিক বিবরণ ইত্যাদি উপেক্ষা করে যারা এরপরেও কুরআনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চান, তাদের উদ্যেশ্যে বলব—সেসময়কার স্থানীয় ইহুদিদের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে যদি কুরআন আসলেই মারাত্মক ভুল কোন তথ্য দিত, তাহলে মুহাম্মাদ(ﷺ) এর অনেক সাহাবীরই সেটা চোখে পড়ত।
মদীনাবাসী সাহাবীদের ইহুদিদের ধর্মীয় বিশ্বাস খুব ভালো করেই জানা ছিল কেননা মদীনায় তখন প্রচুর ইহুদি বাস করত।কুরআন যদি সত্যিই ইহুদিদের বিশ্বাসের ব্যাপারে এমন ভুল তথ্য দিত, তাহলে সাহাবীরা বুঝতেন যে কুরআন মিথ্যা। তাহলে তাঁদের অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করতেন।কিন্তু তাঁরা আদৌ এমন কিছু করেননি। বরং নবী মুহাম্মাদ(ﷺ) ও কুরআনের উপর বিশ্বাসে অটল ছিলেন।

দুপুর থেকে বাইরে কয়লা-পোড়া রোদ। রোদের তেজ আর তাপে ঘরের ভেতরটাও উনুনের মতো গরম হয়ে আছে। মাথার ওপর অবিরাম, অবিশ্রান্তভা...
09/05/2025

দুপুর থেকে বাইরে কয়লা-পোড়া রোদ। রোদের তেজ আর তাপে ঘরের ভেতরটাও উনুনের মতো গরম হয়ে আছে। মাথার ওপর অবিরাম, অবিশ্রান্তভাবে ঘুরতে থাকা সিলিং ফ্যানের হাওয়াগুলোও যেন বিদ্রোহ করে বসেছে। গায়ে হাওয়া লাগছে না আগ্নেয়গিরির তাপ লাগছে বোঝা মুশকিল।

এরই মাঝে রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো রেবেকা। এসেই আমাকে বললো, ‘শুনছো, মাছের তরকারিতে না লবণ একটু বেশি হয়ে গেছে। পানি দিলেই কমে যেতো, কিন্তু তুমি তো অতো ঝোল পছন্দ করো না, তাই দিতে চাচ্ছি না। কোনো সমস্যা হবে তোমার?

আমি দেখলাম, কথাগুলো বলার সময় রেবেকার কপাল বেয়ে ঝরনাধারার মতো ঘাম ঝরছে। সে অভিজ্ঞ অভিনেত্রীর মতো, ওড়নার একটা অংশ দিয়ে চট করে তা মুছে নিয়ে আমার উত্তরের অপেক্ষায় দরজার কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি হাঁসফাঁস করতে করতে বললাম, ‘দরকার কী বলো তো এতো কষ্ট করার? সাধারণ কিছু একটা হলেই বেশ চলে যেতো। এই গরমের মাঝে চুলোর পাড়ে বসে হরেক পদের তরকারি রান্না করার কোনো মানে আছে?

আমার এই কথাকে খুব একটা আমলে নিলো না রেবেকা। নিজের ওড়না দিয়ে দ্বিতীয়বার কপাল বেয়ে নামা ঘাম মুছতে মুছতে বললো, ‘সপ্তাহে এই একটা দিনই তো দুপুরে বাসায় খেতে পারো। অন্যসব দিন তো সেই বাইরেই ছুটোছুটি। কী যে খাও আল্লাহ মালুম! এই একদিনই যদি তোমাকে ভালো-মন্দ কিছু বেঁধে খাওয়াতে na পারি, তাহলে আর আমার স্ত্রী হওয়ার সার্থকতা কোথায়?

‘বেশ প্যাঁচাল পাড়া শিখে গেছেন আপনি! এই যে লম্বা লম্বা লেকচার শোনাচ্ছেন, নিজের চেহারাটার দিকে একবার তাকিয়েছেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে?

‘ও আমার দেখে আর কী হবে, বলো? নতুন করে তো আর বিয়ে হবে না আমার! তোমার যদি আমাকে আর পছন্দ না হয় বলবে, আমি সোজা বাপের বাড়ি চলে যাবো।

‘হয়েছে বাবা হয়েছে! কান ধরছি! যার জন্যে চুরি করি সে-ই বলে চোর! বলতে গেলাম ভালো, হয়ে গেলাম খারাপ!

‘আমার অতো ভালো চাওয়া লাগবে না তোমার। এখন বলো তাড়াতাড়ি, খানিকটা লবণ বেশি হলে ঝামেলা হবে?

‘ঝামেলা মিটে যেতো যদি তুমি ওই গরম চুল্লি থেকে বেরোতে। বাইরে খেতে খেতে লবণ কম আর বেশি–দুটোই আমার মুখ-সওয়া হয়ে গেছে।

রেবেকা আর কোনো জবাব দিলো না। এক ভোঁ-দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।

রেবেকা আসলে সত্যিই বলেছে। কাজের সুবাদে আমাকে ছুটে বেড়াতে হয় দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। আমার কাজ হলো ফিচার লেখার উপাদান সংগ্রহ, এবং তা দিয়ে পত্রিকার জন্য ফিচার তৈরি করা। সাঁওতাল পল্লি থেকে শাপলার বন–কোথায় যাই না আমি গল্পের উপকরণ খুঁজতে? নিরন্তর ছুটতে গিয়ে দিন যে কখন রাত হয়ে যায়, রাত কেটে ভোর আসে–টেরই পাই না।

[দুই]

‘যেমন বুনো ওল তেমন বাঘা তেঁতুল’–প্রবাদ বাক্যকে সত্যি প্রমাণ করে, কটমটে সূর্যটাকে একদল দস্যি মেঘ এসে ঢেকে ফেলল৷ মুহূর্তকাল পরেই নেমে এলো অঝোর ধারার বৃষ্টি। অবিরাম ধারার বর্ষণ প্রকৃতিজুড়ে। বৃষ্টির এমন একাধিপত্য দেখে কে বুঝবে–একটু আগেও এখানে কাঠফাটা রোদ ছিলো? আকাশের বর্ষণে সবকিছু যেন এক অনুপম স্নিগ্ধতা আর শীতলতায় ভরে গেলো।

আমি দেখলাম, আমার জানালার কিনারে দুটো চড়ুই গা ঝাড়া দিয়ে বসেছে। হঠাৎ এমন ঝড়ো বৃষ্টিতে তারা সম্ভবত বিভ্রান্ত। এমন গা-শীতল করা আবহাওয়ায় নিজেকে চাঙা করে নিতে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম। আকাশ থেকে প্রকাণ্ড আকারের বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ছে। প্রচণ্ড গরমে হাহাকার করে ওঠা প্রকৃতিতে এই বৃষ্টি-জল একফালি স্বস্তি হয়ে ধরা দিলো।

বৃষ্টি আমার বরাবরই পছন্দের। এই একটা জিনিসকে নিয়েই সম্ভবত পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সাহিত্য রচিত হয়েছে। আর, সেই সাহিত্যের তিনভাগের দুইভাগ হয়েছে কেবল ভারতীয় উপমহাদেশে। বৃষ্টি নিয়েও যে এতো চমৎকার সাহিত্য রচনা করা যায়–এই কথা অনেক ইউরোপীয়রা বিশ্বাস করতো না। তাদের কাছে বৃষ্টি ছিলো নিছক বিরক্তি আর বিড়ম্বনার কারণ। অবশ্য, উত্তর-আধুনিক ইউরোপ যখন দালান আর ইমারতে ভরে গেলো, প্রকৃতির সান্নিধ্য থেকে একপ্রকার দূরেই ছিটকে পড়লো ইউরোপিয়ানরা। বৃষ্টির সময় প্রকৃতি যে মনোহরা রূপ ধারণ করে– তা অবলোকনের সুযোগ আর থাকলই বা কই তাদের? এ জন্যে বোধকরি তারা ভাবতে পারতো না যে–বৃষ্টি নিয়েও চমৎকার সাহিত্য তৈরি করা যায় এবং দুর্দান্ত সাহিত্য তৈরি হয়েও আছে।

বৃষ্টি নিয়ে আমার এমন ভাবালুতার মাঝে ছেদ ঘটালো রেবেকা। সে বেলকনিতে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললো, ‘কী সুন্দর বৃষ্টি, তাই না গো?

হু।

‘মানুষের দুআ যে এতো দ্রুত কবুল হয়, তা দেখে আমি তাজ্জব বনে গেলাম, জানো?’

আমি কৌতূহলী দৃষ্টিতে রেবেকার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বুঝিনি।

‘ওই যে, গরমে তুমি বেশ হাঁসফাঁস করছিলে না? তখন রান্নাঘর থেকে মনে মনে দুআ করছিলাম। বলছিলাম, আল্লাহ, একটা ঝুম বৃষ্টি দিয়ে চারপাশটা ঠান্ডা করে দাও। আমার জামাইটার অস্বস্তি লাগছে অনেক। এমন বৃষ্টি দাও যেন আমার জামাই বৃষ্টি নিয়ে একটা গল্পও লিখে ফেলতে পারে। হি হি হি।

‘তুমি কি সত্যিই এমন দুআ করেছিলে?

‘হ্যাঁ। এমনটাই তো জপছিলাম রান্নাঘরে। কিন্তু বিশ্বাস করো, সত্যি সত্যিই যে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামবে–তা আমার ধারণাতেই ছিলো না। আল্লাহ মাঝে মাঝে কতো দ্রুত দুআ কবুল করে ফেলেন, দেখলে?

আমি জানি রেবেকা মিথ্যে বলেনি। ও কখনোই মিথ্যে বলে না। আমাদের পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবনে কোনোদিন একটিবারের জন্যও তাকে আমি মিথ্যে বলতে দেখিনি। ও যখন এই দুআ করেছে বললো, তাহলে সেটা অবশ্যই সত্যি।

ফ্যানের নিচে বসে হাওয়া গিলতে থাকা আমার অস্বস্তি কাটাতে বৃষ্টির জন্য দুআ করেছে জ্বলন্ত চুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক রমণী! কী অবিশ্বাস্য ভালোবাসা কী অনুপম মায়ার বন্ধন!

রেবেকা আবার বললো, বৃষ্টির সময় দুআ করলে ওই দুআও কবুল হয়। চলো, আমরা দুআ করি।

‘কী দুআ করবো?

‘যা মন চায় করো।

জানালা গলে, রেবেকার হাত চলে গেলো বাইরে। রিমঝিম বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে তার হাত। আমি দেখলাম, সে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কিছু বলছে। আমি জানি, তার এই বলার অনেকটা জুড়ে আমি আছি। ও আমাকে রাখবেই।

[তিন]

রাত নেমে গেছে অনেক আগেই। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে এখন। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি ল্যাপটপ খুলে বসে পড়লাম। কালকেই আমাকে একটা ফিচার জমা দিতে হবে অফিসে। পত্রিকার ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশের সময় আর বেশি। নেই হাতে।

অনেকটুকু লেখার পরে খেয়াল করলাম, বাইরে আবার ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বাতাসে জানালার কাঁচগুলো রিনিঝিনি শব্দ তুলছে। আমি পড়ার ঘর থেকে শোবার ঘরে এলাম। আলো জ্বালিয়ে দেখি রেবেকা ঘুমিয়ে পড়েছে। সারাদিনের সাংসারিক ব্যস্ততার পরে এক শান্তির ঘুমে বেঘোর সে। তার নিষ্পাপ, মায়াময় চেহারা, তাতে কোথাও কোনো অভিযোগের রেখা ফুটে নেই। এই মেয়েটা সারাটা দিন আমাকে নিয়ে ভাবে। আমার ভালো থাকা, আমার ভালো-লাগা নিয়ে তার কতো ভাবনা-চিন্তা! মাঝে মাঝে মনে হয়–মেয়েরা বোধকরি অন্য ধাতুতে গড়া। একেবারে অপরিচিত একটা মানুষ, একটা পরিবার, একটা পরিবেশকে তারা কতো নিবিড়ভাবে আপন করে নেয়! কতো সুন্দর করে তাতে এঁকে দেয় ভালোবাসার আল্পনা!

বেলকনিতে এসে দাঁড়ালাম আমি। বৃষ্টির সময়ে দুআ করলে সেই দুআ কবুল হয়। বাইরে হাত বাড়াতেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আমার হাতে লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে, হৃদয়ের গভীর থেকে ভাষা টেনে নিয়ে, বিড়বিড় করে বললাম, ‘পরওয়ারদিগার, রেবেকাকে আমি অসম্ভব ভালোবাসি। এই দুনিয়ার মতো, জান্নাতেও আমরা এভাবে কাছাকাছি, পাশাপাশি থাকতে চাই।

08/05/2025

সৌরভ। সোহরাওয়ার্দী হলে নতুন উঠেছে। সারা দিন আমার পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকে। তার একটি ব্যাপার আমার খুব চোখে পড়ে। সে যখন আমাকে ভাইয়া বলে ডাকে, তখন তার দুই গালে খুব সুন্দর টোল পড়ে। তার গালে টোল-পড়া দেখে আমার হুমায়ুন আজাদের বিখ্যাত কবিতার দুটো লাইন মনে পড়ে যায়। কবি লিখেছিলেন—

আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাব
শিশুর গালের একটি টোলের জন্যে।

সৌরভ অবশ্য শিশু নয়, সদ্য যৌবনে পা দেওয়া তাগড়া যুবক। তবুও তার গালে টোল পড়া দেখে তাকে শিশুদের মতোই দেখায়।

তিন দিন ধরে সে আমার কাছে বায়না ধরেছে। তার খুব ইচ্ছা সে সাজিদকে দেখবে। আমার কাছে সাজিদের এত এত গল্প শুনে সে নাকি সাজিদের বিশাল বড় ফ্যান হয়ে গেছে। সেদিন ভোরবেলায় দেখি আমার রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। বলা-কওয়া ছাড়া তার এমন আগমনে বিস্মিত হয়ে বললাম, এত সকাল সকাল আমার কাছে?

সে বলল, তোমার কাছে আসিনি তো। সাজিদ ভাইয়ার কাছে এসেছি।

আমি বেশ অবাক হওয়ার মতো করে বললাম, সাজিদের কাছে যে এসেছিস, সাজিদ জানে?

সে মুখ কালো করে বলল, তা কী করে জানবে? সাজিদ ভাইয়াকে তো আমি চিনি না। ভাইয়াও আমাকে চেনে না।

আমি কঠিন চেহারায় বললাম, তাহলে বললি যে, সাজিদের কাছে এসেছিস?

সে বলল, ওমা! তুমিই তো বলেছিলে তোমরা একই রুমে থাকো। ভাবলাম হঠাৎ করেই চলে আসি। তোমাকে আর সাজিদ ভাইয়াকে, দুজনকেই চমকে দিই।

সৌরভের চমকে দেওয়ার কথা শুনে আমার নিজেরই চমকে যাওয়া উচিত। সাজিদকে ভালো করে চিনলে সে সাজিদকে চমকে দেওয়ার কথা মুখেই আনত না। যে-ছেলের পাশে বোমা ফাটলেও টনক নড়ে না, সৌরভকে দেখে সে যে চমকে যাবে, এই দৃশ্য ভাবতেই আমার হেসে কুটিকুটি হতে মন চাচ্ছে। সৌরভকে বললাম, তোর টাইমিংটা ভুল ছিল রে। এক সপ্তাহ হলো সাজিদ নেই। বাড়িতে গেছে।

সৌরভ হতাশ কণ্ঠে বলল, ওহ।

সমস্যা নেই। আমি তো আছি। বল তোর কী কী জানা লাগবে? সাজিদের চেয়ে আমি ভালো উত্তর দিয়ে থাকি আজকাল।

সৌরভ হেসে উঠে বলল, ফাজলামো কোরো না তো। সাজিদ ভাইয়াকে সেই কবে থেকেই দেখতে চাচ্ছি।

আচ্ছা, ফাজলামো বাদ। ভেতরে এসে বস। একটি সারপ্রাইজ আছে তোর জন্যে।

সারপ্রাইজের কথা শুনে সৌরভের চোখমুখ ঝলমল করে উঠল। সে বলল, সাজিদ ভাইয়া ভেতরেই আছে, তাই না?

না তো।

তার চেহারার ঝলমলে ভাবটি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। বলল, তাহলে সারপ্রাইজটি কী?

উঠতি ছেলেপিলেদের এই এক সমস্যা। ধৈর্য থাকে না মোটেও। খানিকটা কর্কশ গলায় বললাম, তোকে যখন বলেছি সারপ্রাইজ আছে, তখন তো কিছু একটি আছেই, তাই না? এত প্রশ্ন করিস কেন?

সৌরভ বেশ লজ্জিত চেহারায় বলল, সরি ভাইয়া।

ভাইয়া বলতে গিয়ে বেচারার গালে টোল-পড়া দেখে আমি হেসে দিলাম। বললাম, হয়েছে। এবার ভেতরে আয়।

সৌরভ ভেতরে এসে বসল। ছেলেটি বেশ ভদ্র। কম কথা বলে। কিছু বললে মনোযাগ দিয়ে শোনে। দ্বিমতের জায়গাগুলো খুব ধীরে-সুস্থে তুলে ধরে।

আমি তাকে বললাম, চা খাবি, সৌরভ?

সে মাথা নেড়ে বলল খাবে না। নিজের জন্যে এক কাপ চা করে নিয়ে আমি চেয়ারে এসে বসলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, সাজিদের বুক শেলফটি দেখিয়ে বললাম, এটি হচ্ছে আমাদের বিখ্যাত মি. আইনস্টাইনের বুক শেলফ।

সৌরভ আমার দিকে বেশ অদ্ভুতভাবে তাকাল।বলল, আইনস্টাইনের বুক শেলফ মানে?

কোনা-চোখে সৌরভের দিকে তাকালাম। তার চোখেমুখে বিস্ময়ের রেশ ফুটে উঠেছে। বুঝতে পারলাম সাজিদের আইনস্টাইন হয়ে ওঠার গল্পটি তার কাছে করা হয়নি। এ জন্যেই বেচারা চমকে গেছে। বললাম, সে এক লঙ্কা-কাহিনি। অন্যদিন করা যাবে।

হালকা নীরবতার পরে সৌরভ বলল, কী সারপ্রাইজ সেটি তো বললে না?

আরে তাইতো!ওকে তো একটি সারপ্রাইজ দেববলেছিলাম; কিন্তুকী যেদিই! এদিক-সেদিক তাকাতেই আমার চোখ গিয়ে আটকালো সাজিদের ড্রয়ারের দিকে। ইউরেকা! এই ড্রয়ারেই তো তার বিখ্যাত ডায়েরিটি থাকে। মান্ধাতা আমলের সেই ডায়েরি…।

উঠে গিয়ে তার ড্রয়ার খুলে ডায়েরিটি বের করলাম। সৌরভের হাতে দিয়ে বললাম, এইটাই হলো সারপ্রাইজ!

সে চোখ বড় বড় করে ডায়েরিটির দিকে তাকিয়ে বলল, এটি তো একটি ডায়েরি মনে হচ্ছে।

হ্যাঁ। ডায়েরিই তো।

এটি দিয়ে আমি কী করব?

পড়বি।

তোমার ডায়েরি পড়ে আমি কী করব?

ধুর! এটি আমার ডায়েরি না। এটি সাজিদের ডায়েরি। খুব বিখ্যাত ডায়েরি আমার মতে।

ডায়েরিটি সাজিদের এই কথা শুনে ওর মুখ ঝলমল করে উঠল। পরক্ষণেই বলল, কিন্তু সাজিদ ভাইয়ার ডায়েরি এভাবে পড়া কি ঠিক? তিনি যদি কিছু মনে করেন?

সৌরভের ব্যবহারের মতো তার কমনসেন্সটাও ভারি চমৎকার। অন্যের সামান্য ডায়েরি পড়ার ব্যাপারেও সে কতকিছু চিন্তা করে। আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এরকম কমন-সেন্সের বড়ই অভাব। আমি বললাম, শোন, এই ডায়েরিটি তার বিভিন্ন ভাবনা, ভ্রমণ-কাহিনি, অভিজ্ঞতার লেখাজোখাতে ঠাসা। সাজিদের এই ডায়েরি পড়ার অনুমতি আমার আছে। আমি তোকে অনুমতি দিলাম। তুই নিশ্চিন্তে পড়তে পারিস। মন চাইলে পড়। আমি হালকা পড়াশোনা করে নিই।

সৌরভ ডায়েরির পাতা উল্টে পড়তে লাগল। খেয়াল করলাম, সে ডায়েরির একেবারে শেষদিক থেকে শুরু করেছে। ডায়েরির পাতায় বড় বড় করে একটি শিরোনাম লেখা, গল্পে জল্পে ডারউইনিজম। সৌরভ খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করল…

ডারউইন হলেন বিবর্তনবাদের জনক। পৃথিবীতে সকল উদ্ভিদ এবং প্রাণী এসেছে একটি এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে, এই তত্ত্বকে জনপ্রিয় করার নেপথ্যনায়ক হলেন এই ডারউইন। তার ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে নানান রকম গল্প, ঘটনা জানা যায়; কিন্তু আজকে আমি ডারউইন তথা তার তত্ত্বের যে-দিকটি লিখতে যাচ্ছি, সেটি একটি বিধ্বংসী দিক। এই দিকটার কথা খুব কম বিবর্তনবাদী জানে অথবা জানলেও স্বীকার করে না।

প্রকৃতিতে প্রাণীদের টিকে থাকার ব্যাপারে যে-তত্ত্ব ডারউইন প্রস্তাব করেছিল, সেটি ছিল ন্যাচারাল সিলেকশান। অর্থাৎ প্রকৃতিই বেছে নেবে দিনশেষে প্রকৃতিতে কে টিকবে আর কে বিলুপ্ত হবে। ডারউইন তার বিখ্যাত বই, যেটিকে বিবর্তনবাদের বাইবেল বলা হয়, সেটির নামও রাখেন এটিকে মূল বিষয় ধরে। বইটির নাম Origin of species: By means of natural selection. বইটির নাম থেকেই বইটির বিষয়বস্তু সহজে অনুমেয়। কীভাবে প্রকৃতির বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রাণীর উদ্ভব হয়। বলা বাহুল্য, এই ন্যাচারাল সিলেকশান-কে অনেকে সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট হিশেবেও উল্লেখ করে থাকে। সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট মানে হলো যোগ্যতমের টিকে থাকার লড়াই। সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্টের মূল কথা হলো, প্রকৃতিতে একটি অবিরাম সংগ্রাম চলছে। এই সংগ্রাম হলো টিকে থাকার সংগ্রাম। দিনশেষে প্রকৃতিতে তারাই টিকে থাকবে, যারা যোগ্য। অযোগ্য এবং দুর্বলেরা বিলুপ্ত হবে।

আপাতদৃষ্টিতে এই কথাগুলোকে বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা মনে হলেও এই কথাগুলো দ্বারা উৎসাহিত হয়ে মানব-ইতিহাসে ঘটে গেছে এমন কিছু ঘটনা, যার দায় ডারউইনিজম কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

সৌরভ খুব অবাক হলো। বায়োলজির একজন ছাত্র হিশেবে তাকে ডারউইনিজম পড়তে হয়। পড়তে হয় ন্যাচারাল সিলেকশানের কথা, এককোষী ব্যাকটেরিয়া থেকে উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের আবির্ভাবের ব্যাপারেও তাকে পড়াশোনা করতে হয়। সে জানে এই থিওরিটি বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত একটি থিওরি। এই থিওরির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানীমহল থেকে নানান ধরনের ক্রিটিসিজম আসলেও সে সম্পর্কে খুব-একটা কনসার্ন নন অ্যাকাডেমিক সাইন্সের হর্তাকর্তারা। কোনো এক অদৃশ্য কারণে তারা মাইকেল বেহে, মাইকেল ডেন্টন, জোনাথন ওয়েলস, ডগুলাস এক্স, স্টিফেন মায়ারসহ আরও অনেক বিজ্ঞানীর বিবর্তনের বিরুদ্ধে অ্যাকাডেমিক কাজকে পাত্তা দেন না। সৌরভ কারও কারও কাছে শুনেছে, পশ্চিমা বস্তুবাদী মহল নাকি পুরোটাই টিকে আছে এই বিবর্তনবাদের ওপর ভর করে। বিবর্তনবাদ ভেঙে পড়লে তাদের সব পরিকল্পনা মুহূর্তেই ভেস্তে যাবে আর পৃথিবী ধর্মহীন করার যে-চক্রান্ত, সেটি নস্যাৎ হয়ে পড়বে। এ জন্যেই বর্তমান বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া বস্তুবাদীরা বিজ্ঞানের অন্দরমহলে কখনোই স্রষ্টাকে ঢুকতে দেবে না। ধর্মহীন পৃথিবী গড়তে একমাত্র বিবর্তনবাদই হলো তাদের তুরুপের তাস; কিন্তু এই ডায়েরিতে এমন কী লেখা আছে, যা সম্পর্কে সৌরভ জানে না? বেড়ে গেল তার কৌতূহলের মাত্রা। সে পরের পৃষ্ঠা উল্টাল। আবারও গভীর মনোযোগের সাথে পড়তে লাগল সে।

হিটলারের ঘটনা আমরা সকলেই জানি। প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদী খুন করার মাধ্যমে সে পৃথিবী থেকে ইহুদী-জাতিকে বিলুপ্ত করে দিতে চেয়েছিল। নিঃসন্দেহে, এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বর্বোরোচিত ঘটনাগুলোর অন্যতম। ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও হিটলার হয়ে ওঠে একজন বিধ্বংসী নাস্তিক। তার দৃষ্টিতে ইহুদীরা ছিল নিচু জাত, ম্লেচ্ছ। যারা ম্লেচ্ছ, তাদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার থাকতে পারে না এটাই ছিল হিটলারের চিন্তাধারা। এই চিন্তাধারার বীজ কোথায় প্রোথিত আমরা কি তা জানি? এই চিন্তাধারার বীজ প্রোথিত ছিল ডারউইনের সেই Natural selection থিওরিতে। হিটলার তার Mein Kampf তথা My Struggle নামের আত্মজীবনীতে GIC3301, If nature doesnt wish that weaker individuals should mate with the stronger, she wishes even less that a superior race should intermingle with an inferior one; because in such cases all her efforts, throughout hundreds of thousands of years, to establish an evolutionary higher stage of being, may thus be rendered futile.

But, such a preservation goes hand-in-hand with the inexorable law that it is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure. he who would live, must fight. he who doesnt wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasnt the right to exist.[১]

হিটলারের আত্মজীবনীর এই কথাগুলো খুব মনোযোগের সাথে যদি আমরা খেয়াল করি, তাহলে দেখব যে—এখানে ঠিক সেই কথাগুলোই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যা আমাদের চার্লস ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশান শেখায়। হিটলার বলেছে If nature doesnt wish, এখানে Nature বলতে হিটলার কী বুঝিয়েছে? চার্লস ডারউইনের সেই ন্যাচারাল সিলেকশান নয়তো? হিটলার খুব স্পষ্ট করেই দুটি ধারার কথা বলেছেন। একটি হলো Superior race, অন্যটি হলো Inferior race. অর্থাৎ সবল আর দুর্বলের মধ্যে একটি সংঘাত, একটি লড়াই যে প্রকৃতিতে বলবৎ, সেটি হিটলার খুব স্পষ্ট করেই লিখেছেন। ঠিক একই কথাগুলো আমরা ন্যাচারাল সিলেকশান তথা প্রকৃতির বাছাইকরণ পদ্ধতির মধ্যেও দেখতে পাই।

হিটলার আরও লিখেছেন, It is the strongest and the best who must triumph and that they have right to endure. হিটলার বলতে চেয়েছেন সবলরাই প্রকৃতিতে টিকে থাকবে এবং এটাই হওয়া উচিত। অন্যদিকে, দুর্বলদের ক্ষেত্রে কী হবে সে ব্যাপারে বলতে গিয়ে হিটলার লিখেছেন He who doesnt wish to fight in this world, where permanent struggle is the law of life, hasnt the right to exist.

খুবই স্পষ্ট কথা। হিটলার বলেছে, সংগ্রামই যেখানে law of life, সেখানে যারা এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে না, তাদের প্রকৃতিতে টিকে থাকার কোনো অধিকার নেই।

হিটলারের উদ্ধৃত কথাগুলো ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশানের সাথে খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি, হিটলার Evolutionary higher stage এর কথাও উল্লেখ করেছেন।

হিটলার ভাবত ইহুদীরা যেহেতু ম্লেচ্ছ এবং প্রকৃতিতে সংগ্রাম করে টিকে থাকার যোগ্য নয়, তাই সে প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করে বসে।

সৌরভ খুব অবাক হলো। সে এতদিন ভাবত হিটলার একজন গোঁড়া খ্রিষ্টান হয়ে পড়েছিল, যার কারণে সে ইহুদীদের প্রতি চরম বিদ্বেষী হয়ে ওঠে; কিন্তু ঘটনার পরম্পরা যে এত গভীরে সে আসলে কখনো ভাবতেও পারেনি। সৌরভ ভাবল, আচ্ছা, হিটলার কি সত্যিই ডারউইনিয়ান এভুলুশান পড়েই এতদূর এগিয়েছে? সে ডায়েরিটার পরের পৃষ্ঠা উল্টাল। পরের পাতাগুলোও বেশ ভর্তি। সে খুব মনোযোগ দিয়ে আবার পড়া শুরু করে দেয় :

এখানে কেবল হিটলারের ঘটনা দিয়ে ইতি টেনে দিলে ব্যাপারটির প্রতি অন্যায় করা হবে। শুধু হিটলারকেই নয়, ডারউইন প্রভাব ফেলেছিলেন আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির ওপরেও। এই তালিকায় আছে কার্ল মার্ক্স, লেলিন এবং স্ট্যালিন।

কার্ল মার্ক্সকে সমাজতন্ত্রের জনক হিশেবে গণ্য করা হয়। সমাজতন্ত্র হিশেবে আমাদের যা বলা হয় বা যা শেখানো হয় তা হলো, সমাজতন্ত্র সমাজের শ্রেণি-বৈষম্য নিয়ে কাজ করে। আদতে, এখানেও একটি শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। সমাজতন্ত্রের আগাগোড়াজুড়ে রয়েছে ডারউইনিজম। আর ডারউইনিজম সম্পর্কিত নাস্তিকতার সাথে। সুতরাং, সমাজতন্ত্রকে বলতে গেলে নাস্তিকতার প্রতিরূপ হিশেবে কল্পনা করা যায়।

যাই হোক, কার্ল মার্ক্সের সাথে ডারউইনিজমের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় আসা যাক। মূলত, কমিউনিজম তথা সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হলেন দুজন। কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস। কমিউনিজমের ওপরে কার্ল মার্ক্সের লিখিত বিখ্যাত একটি বই আছে। এটিকে সমাজতন্ত্রের বাইবেল বলা যেতে পারে। বইটির নাম Das Capital. খুবই মজার ব্যাপার হচ্ছে, কার্ল মার্ক্স নিজে এই বইটি উৎসর্গ করেছিলেন বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনকে। ডারউইনকে দুজনে এত বেশিই পরিমাণে পছন্দ করতেন যে, ডারউইনের প্রথম বই Origin of species বের হলে ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এক চিঠিতে কার্ল মার্ক্সকে লেখেন, Darwin, whom I am just now reading, is splendid.[২]

এঙ্গেলসের চিঠির প্রত্যুত্তরে মার্ক্স লিখেছেন, This is the book which contains the basis of natural history of our view.[৩]

মার্ক্স বলেছেন যে, তারা ন্যাচারাল হিস্ট্রি সম্পর্কে যে-ধারণা পোষণ করে থাকে, সেটার পূর্ণ প্রতিফলন আছে ডারউইনের বইতে। সুতরাং, ডারউইনিজম আর মার্ক্সিজম তথা সমাজতন্ত্র যে—মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কাহিনির এখানেই অবশ্য শেষ নয়। লেসাবেল নামের এক বন্ধুকে কার্ল মার্ক্স চিঠিতে Foto 362a, Darwins book is very important and serves me as a basis in natural science for the class strugle in history.[৪]

শ্রেণি-সংগ্রামের যে-ভিত্তি এবং প্রকৃতির সবখানে যে সেটি বলবৎ, ডারউইনের রচনাবলি পড়ার পরে সেটি কার্ল মার্ক্স আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করেন। এই কথার সত্যতা পাওয়া যায় কার্ল মার্ক্সের বধু এঙ্গেলস লিখিত একটি বইয়ে। এঙ্গেলস ডারউইন এবং কার্ল মার্ক্সকে একই সমান্তরালে এনে লেখেন, Just as Darwin discovered the law of Evolution in organic nature, so Marx discovered the law of nature in human history. [৫]

অর্থাৎ ডারউইন উদ্ভিদ এবং প্রাণীর অর্গানিক ফিল্ডের যে ল আবিষ্কার করেছেন, মার্ক্স সে রকম ল আবিষ্কার করেছেন মানবজাতির ইতিহাসের। আরও সহজভাবে, ডারউইন যে-শ্রেণি-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে উদ্ভিদ এবং প্রাণিজগতের আবির্ভাবের কথা বলেছেন, ঠিক সেই একই শ্রেণি-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে মানবজাতির ইতিহাসের বিবর্তনের কথা বলেছেন মার্ক্স।

ডারউইনিজম এবং কমিউনিজমের মধ্যকার সুগভীর সম্পর্ক বোঝাতে কার্ল মার্ক্সের একটি জীবনীতে লেখা হয়েছে, Darwinism presented a whole string of truth supporting Marxism and proving and developing the truth of it. The spread of Darwinist evolutionary ideas created a fertile ground for Marxist ideas as a whole to be taken on board by the working class… Marx, Engels, and Lenin attached great value to the ideas of Darwin and pointed to their scientific importance and in this way the spread of these ideas was accelerated.[৬]

অর্থাৎ মার্ক্সিজম তথা কমিউনিজম যে একটি অন্যটির পরিপূরক, সে-কথা এই বক্তব্যগুলোতে একদম সুস্পষ্ট। আরও বলা হয়েছে, ডারউইনের আইডিয়া থেকে মার্ক্স, এঙ্গেলস এবং লেনিনরা উপকৃত হয়েছে এবং সেগুলো কাজে লাগিয়েছে।

সৌরভ যেন খুব চিন্তায় পড়ে গেল। এই তো কয়েকদিন আগে সৌরভদের ডিপার্টমেন্টের এক বড়ভাই তার কাছে কমিউনিজমের দাওয়াত নিয়ে এসেছিল। রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবার থেকে উঠে আসা ধার্মিক যুবক সৌরভ তখন মাত্র ক্যাম্পাসে পা দিয়েছে। তার কাছে বিভাস মণ্ডল নামের একজন কমিউনিস্ট ছাত্র আন্দোলনের নেতা কমিউনিজমের ব্যাপারে একথা-সেকথা বলতে এলে সৌরভ প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা, কমিউনিজম কি নাস্তিকতা-ঘেঁষা কোনো কিছু?

সেদিন বিভাস মণ্ডল বেশ সুন্দরভাবেই সৌরভের এই প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়েছিল। আজ সৌরভ বুঝতে পারছে আসলে কমিউনিজম আর এথেইজম তথা ডারউইনিজমের মধ্যে কী সম্পর্ক। সে আবার পড়া শুরু করে দেয় সাজিদের ডায়েরি :

কার্ল মার্ক্সের ফিলোসফিকে যে-ব্যক্তি বাস্তব রূপ দান করে, তার নাম লেনিন। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই নামটির সাথে পরিচিত। Communist Bolsheviks Movement নামের একটি ইতিহাস বিখ্যাত আন্দোলনের মাধ্যমে লেনিন রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। বলাই বাহুল্য, এই আন্দোলন রাশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ছিল। এই আন্দোলনে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ এবং বাস্তুহারা হয়েছিল অনেক মানুষ। মার্ক্সের অন্যতম শিষ্য, কমিউনিজমের ঝাণ্ডাবাহী এই লেনিনও ছিল ডারউইনের গুণমুগ্ধ ভক্ত। ডারউইন সম্পর্কে সে লিখেছে, Darwin put an end to the belief that the animal and vegetable species bear no relation to one another, except by chance, and that they were created by God, and hence immutable.[৭]

মানে, ধর্মবাদী ধার্মিকরা উদ্ভিদ এবং প্রাণীর ব্যাপারে যে প্রথাগত বিশ্বাস রাখে, সেই বিশ্বাসের ইতি ঘটিয়েছেন ডারউইন। লেনিনের পরে রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে আরেক নাস্তিক, বস্তুবাদী কমিউনিস্ট স্ট্যালিন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, স্ট্যালিন হত্যা করেছিল প্রায় এক মিলিয়ন মানুষকে এবং ঘরবাড়ি ছাড়া করেছিল বিশ মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে। এই স্টালিনও ছিল ডারউইনের একজন তুখোড় ভক্ত। ডারউইন সম্পর্কে স্ট্যালিন লিখেছে, There are three things that we do to disabuse the minds of our seminary students. We had to teach them the age of the earth, the geologic origin, and Darwins teachings.

ছোটবেলা থেকেই স্ট্যালিন ডারউইনের ফ্যান হয়ে পড়ে। স্ট্যালিনের এক বাল্যবন্ধু স্ট্যালিনের জীবনী লিখেছিল। সেখানে তিনি জানিয়েছেন যে, স্ট্যালিন মূলত ডারউইনের বইপত্র পড়েই নাস্তিক হয়ে পড়ে এবং তার সেই বন্ধুকে ডারউইনের বইপত্র পড়ার জন্যে চাপ প্রয়োগ করত। তিনি লেখেন, At a very early age, while still a pupil in the ecclesiastical school, Comrade Stalin developed a critical mind and revolutionary sentiments. He began to read Darwin and became an atheist. [৮]

হিটলার, মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেলিন এবং স্ট্যালিন। পৃথিবীর ইতিহাসে কেউ ঘটিয়েছে হত্যাকাণ্ড, কেউ বপন করেছে নাস্তিকতার বীজ। এদের সবার মূল গিয়ে পৌঁছেছে। একটি জায়গায়—ডারউইন এবং ডারউইনিজম; কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে আমাদের ইতিহাস কিংবা বিজ্ঞানের কোনো পাঠ্যতালিকায় আমরা এই ইতিহাসগুলো খুঁজে পাই না। সবখানে একটা আবছা অন্ধকার!

সাজিদের ডায়েরিতে এই পর্যন্তই লেখা। সৌরভ ডায়েরিটি বন্ধ করল। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি না বলেছিলে সাজিদ ভাইয়ার কোনো এক স্যার তাকে কী একটি নামে ডাকে?

আমি বললাম, হু। মফিজুর রহমান স্যার। সাজিদকে মি. আইন্সটাইন বলে ডাকে, ব্যঙ্গ করে।

তিনি কিন্তু খুব একটা খারাপ বলেন না।

সৌরভের কথা শুনে আমার চোখ কপালে উঠে গেল। বললাম, মানে?

সৌরভ মুচকি হেসে বলল, সাজিদ ভাইয়া হলো আমাদের আইনস্টাইন। হা-হা-হা-হা…।

আমি সৌরভের চেহারার দিকে তাকালাম ভালো করে। ছেলেটি তখনো হাসছে। তার গালে সুন্দর একটি টোল পড়েছে। ভারি সুন্দর!

Address

Chirirbandar
Dinajpur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Rh story r posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share