17/08/2026
এক বিঘা জমির প্রতিশ্রুতিতে সংসার, ১০ বছর পর স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ
একটি প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করে সংসার শুরু করেছিলেন মোছাঃ মোস্তারিনা খাতুন। বিয়ের আগে থেকেই তিনি জানতেন, তার সন্তান হবে না। বিষয়টি জানতেন হবু স্বামী আব্দুল মোতালেব সরদারও। এরপরও তাকে বিয়ে করেন মোতালেব। শুধু তাই নয়, সন্তান না হওয়ার বিষয়টি জেনেও তাকে এক বিঘা জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে দাবি মোস্তারিনার।
সেই প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে কেটে যায় এক-দুই বছর নয়, প্রায় ১০ বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জমি আর পাননি তিনি। বরং স্বামীর ছেলে-মেয়েদের আপত্তির কারণে জমি না দিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে।
মোছাঃ মোস্তারিনা খাতুনের বাবার বাড়ি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার খামারপাড়া ইউনিয়নের নেউলা আদর্শ গ্রামে। তার স্বামী আব্দুল মোতালেব সরদার পার্বতীপুর উপজেলার খোড়াখাই সরদারপাড়া এলাকার মৃত ইসহাক সর্দারের ছেলে।
মোস্তারিনার ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের আগে আব্দুল মোতালেব তার সন্তান না হওয়ার বিষয়টি জানতেন। বিষয়টি জানার পরও তিনি তাকে বিয়ে করতে রাজি হন এবং বলেন, ‘তোমার যেহেতু সন্তান হবে না, আমি তোমাকে এক বিঘা জমি দেব।’ স্বামীর সেই কথাকে বিশ্বাস করেই সংসারে আসেন তিনি।
এরপর কেটে যায় প্রায় এক দশক। স্বামী হজে যান, হজ করে ফিরে আসেন। সময়ের সঙ্গে বয়স বাড়তে থাকে মোস্তারিনার। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে তিনি বারবার স্বামীর কাছে সেই জমির কথা বলতে থাকেন। স্বামীও বিভিন্ন সময়ে ‘দেব’ বলে আশ্বাস দেন বলে দাবি তার।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ততই অনিশ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ মোস্তারিনার।
তার দাবি, একপর্যায়ে স্বামীর ছেলে-মেয়েরা জমি দেওয়ার বিরোধিতা শুরু করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, বাবার কাছ থেকে তাকে জমি দেওয়া হলে তাদের সম্পত্তির অংশ কমে যাবে। ছেলে-মেয়েদের এমন আপত্তির পর স্বামীও আর জমি দিতে রাজি হননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মোস্তারিনা বলেন, তিনি কখনো স্বামীর সব সম্পত্তি চাননি। তিনি শুধু সেই জমিটুকুই চেয়েছেন, যেটি স্বামী নিজে তাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
কিন্তু পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মোস্তারিনার অভিযোগ, স্বামীর এক ছেলে তাকে উদ্দেশ করে বলেন, তাকে নাকি সম্পত্তির জন্য নয়, কাজ করার জন্য বাড়িতে আনা হয়েছিল। এমনকি বাবার মৃত্যুর পর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।
অভিযোগের সময় স্বামী আব্দুল মোতালেব ঘরে উপস্থিত থাকলেও ছেলের কথার প্রতিবাদ করেননি বলে দাবি মোস্তারিনার।
এরপর একপর্যায়ে স্বামীর ছোট ছেলে তার গায়ে হাত তোলেন এবং তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ১৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মোস্তারিনা বলেন, পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে তাকে চুল ধরে টানাহেঁচড়া করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এ সময় তিনি শুধু পরনের কাপড়টুকু নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। সঙ্গে নেওয়ার মতো আর কিছুই ছিল না বলে দাবি তার।
বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার পরও বিষয়টির সমাধানের আশায় ছিলেন মোস্তারিনা। তার দাবি, স্বামীর বড় ছেলে একপর্যায়ে ‘দেখি কী করা যায়’ বলে আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাড়িতে রাখার ব্যাপারে পরিবারের অন্য সদস্যরা রাজি হননি।
এদিকে, স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যাংক ভেঙে ১০ লাখ টাকা এবং লকার থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার গহনা নিয়ে আসার অভিযোগ করা হয়েছে বলে জানান মোস্তারিনা। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তিনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে মোস্তারিনা বলেন, ‘আমি যদি এত টাকা-পয়সা আর গহনা নিয়ে আসতাম, তাহলে আজ অন্যের আশ্রয়ে থাকতাম না। ওই টাকা দিয়ে নিজের জন্য ঘরবাড়ি করতে পারতাম। আমার বাবা-মায়েরও তেমন সামর্থ্য নেই।’
এরই মধ্যে তার হাতে তালাকনামার কাগজ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে তিনি নিজে ওই কাগজ গ্রহণ বা স্বাক্ষর করেননি। তার বাবা কাগজটি গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেন মোস্তারিনা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বাক্ষর নিয়ে ওই কাগজ তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন মোস্তারিনা।
সবশেষে স্বামীর কাছে ফিরে গিয়ে সংসার করার আকুতিও জানিয়েছেন তিনি। মোস্তারিনা বলেন, ‘আমি এখনো সংসার করতে চাই। আমার বয়স হয়েছে। আমি আর নতুন করে বিয়ে করতে চাই না। আমি আমার স্বামীকে বারবার বলেছি, আমাকে ছেড়ে দেবেন না। আমি তো বেশি কিছু চাইনি। তিনি নিজে যে জমি দেওয়ার কথা বলেছিলেন, আমি শুধু সেটুকুই চেয়েছি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সন্তান দিতে পারব না—এ কথা জেনেই তিনি আমাকে বিয়ে করেছিলেন। তখন যদি এই বিষয়টি সমস্যা হতো, তাহলে আমাকে বিয়ে করতেন না। এখন এত বছর সংসার করার পর আমাকে এভাবে বের করে দেওয়া কেন?’
মোস্তারিনার দাবি, স্বামী ও তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকলেও তাকে তার প্রাপ্য জমি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি তার পাওনা ও আইনগত অধিকার ফিরে পেতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছেন।
একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে টাকা ও গহনা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘আমি কারও সম্পত্তি ছিনিয়ে নিতে চাই না। আমাকে যে অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, আমি শুধু সেই ন্যায্য অধিকারটুকু চাই।’
তবে জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, তালাকের বৈধতা, নির্যাতন এবং টাকা-গহনা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ—এসব বিষয়ে আব্দুল মোতালেব সরদার ও তার পরিবারের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং মোস্তারিনার আইনগত অধিকার নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।