27/01/2026
কী লিখব? পুকুরে বদনা মেরে বনের বাঘ তাড়ানোর গল্প? সে তো সবাই জানে। পলকে মদিনা-ভ্রমণ? সে তো সবাই মানে। তবে মানুষ জানে না কী? মানে না কোনটা? উত্তর এলো—“যে সম্মুখে বসে আমার স্মরণ-বিচ্যুত, সে ইয়ামেন দেশে, আর যে ইয়ামেনে থেকেও আমার স্মরণে মগ্ন, সে আমার সম্মুখে।”
মানুষ ঠিক এটাই জানে না। বাণীটা সবার ঠোঁটস্থ হলেও সারটা আত্মস্থ না। আত্মস্থ মানে অন্তরে ধারণ করা। লালন করা, পালন করা৷ মুখে মুখে কালাম পড়া হয়; অন্তর আবেগশূন্য। হ্যাঁ, মাইজভান্ডারি কালাম মুখে পড়লে হয় না; অন্তর দিয়ে পড়তে হয়। ঢোলের তালে নাচা হয়; অন্তর নেচে ওঠে না। হারমোনিয়ামেন সুর, কাঁসার ঝঙ্কার— কানে বেশ লাগে; অন্তরে আঘাত করে না, বেজে ওঠে না।
হাদীর কালাম—
“মজেছি তোমার প্রেমে স্বর্গসুখ চাহি না
কী করিব স্বর্গসুখ তোর ভবেতে দিওয়ানা”
মুখে স্বর্গসুখ চাচ্ছি না; অন্তরভরা কামনা। বলছি— তোমার প্রেমে মজেছি; অন্তরে দুনিয়াপ্রীতি।
উরসে গেলাম, বিরিয়ানি খেলাম, মেলায় ঘুরলাম, মাজারের সাথে সেলফি তুলে আপলোড দিলাম; অতঃপর চলে এলাম। ব্যস্, মহান ১০ই মাঘ সফল!
“তুমি আমার চাদরের নিচে আসিয়া দেখ, তোমাকে আসমান-জমিন আরশ-কুরসি, লৌহ-কলম, বেহেশত-দোজখ একপলকে দেখাইয়া আনি।” আহ্, সেই চাদরের খোঁজ করলাম না। নিচে যেতে পারলাম না। আরশ-কুরসিও তাই দেখা হয়ে ওঠল না। একদিকে তিনি আরশ-কুরসি দেখানোর জন্য বসে, অপরদিকে আমরা চলি নানান হিসাব কষে!
আমাদের মাঝে হাদীর মতো প্রেম নাই। যে প্রেমে স্বর্গসুখও তুচ্ছ। আমরা হুরের পাগল; হুরওয়ালার পাগল না। বছরের পর বছর ভান্ডারে গিয়েও মনুষ্যত্ব এলো না; তাই মানুষও হওয়া হলো না। পশুত্ব গেল না; পশুই রয়ে গেলাম। এখানেই গ্যাপ। বিশাল ব্যবধান।
করিমের মতো আকুতি নাই। “কে তুমি হে সখা আড়ালে থাকিয়া হরিলে আমারি প্রাণ” বলে তাঁরে খুঁজি না। আমরা খুুঁজি “বাবাজান আমারে পোলা দ্যান, টাকা দ্যান, পয়সা দ্যান, বরোলোক বানাই দ্যান”।
অসীম দয়ার ভাণ্ড। যা চাচ্ছি, পাচ্ছি। টাকা-পয়সা, সন্তান-সন্ততি। আসল পাওয়া কি পাওয়া হচ্ছে? পাচ্ছি না কেন? চাইতেই যে জানি না। কী চাইতে হবে—সেটাও যে জানি না। আসল চাওয়া কি চাচ্ছি? যেভাবে ‘হাদী’ চেয়েছিলেন—
“বালাখানা হুর দলে, চাহিব না আঁখি তুলে
তোমার দামান তলে দাসগণের ঠিকানা...”
আমরা কি ডাকছি, গণী যেভাবে ডেকেছিলেন—
“এসো এসো প্রাণপতি, আর বাঁচি না তুমি বিনে
মনপ্রাণ হরে মম পুনঃ পালাইলা কেমনে...”
করিমের মতো কি করুণ সুরে বলছি—
“রক্ষা করো মাইজভান্ডারি, রক্ষা করো মাইজভান্ডারি
অসহ্য হয়েছে জ্বালা আর জ্বালা সহিতে নারি...”
সুর তুলবো কী, জ্বালা-ই তো নাই। জ্বলতেই তো পারলাম না। জ্বলার কী মর্ম, পুড়ে অঙ্গার হবার কী স্বাদ—পেলাম না তো! পেলাম না!
রমেশ কীভাবে পেলেন?
“সেই স্কুলের এমনি ধারা, বিচার নাইরে জোয়ান বুড়া
সিনাই সিনাই লেখাপড়া শিক্ষা দিতাছে”
শিখবো কী? ভর্তিই তো হতে পারলাম না এখনো৷ এখানে তো শিখতেই আসি না৷ তাঁর প্রেমে ভাসি না। তাঁর ইশকে নাচি না। হ্যাঁ, লাফাই বটে; কিন্তু ওইটুকু লাফ তো ব্যাঙেও দেয়!
হলো না। তাঁরে জানা, মানা—কোনোটাই হলো না। রসুলুল্লাহর দুই তাজের একটি যে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারির মাথায়— সে কাহিনি জানি; তবে তিনি যে বলেছেন, “কবুতরের মতো বাছিয়া খাও, হারাম খাইও না” সেটা আর মানি না।
বরং দ্বন্দ্বে মরি। এ দ্বন্দ্ব বড়োই ছন্দছাড়া। বড়োই বিদঘুটে। তিনি গাউছুল আজম কি-না? কুতুবুল আকতাব কি-না? অদ্ভুত! কে কারে মাপতে যায়, কে কারে মাপতে চায়!
অথচ আবদুল গণী কাঞ্চনপুরীর মতো যুগশ্রেষ্ঠ আলেম বলেছিলেন— “মাজহারে আসরারে কুদরত”, “আয়নায়ে আনওয়ারে ওয়াহদাত!” এরচেয়ে বড়ো পরিচয় হতে পারে?
শেষটা হাদীর সুরে করি—
“দাস হাদী শক্তিহীন, দিতে নাহি পারি চিন
আহাদ-আহমদ মাঝে মিমের দিওয়ার...”