03/10/2026
স্ত্রী চলে গেল অন্যের হাত ধরে
বড়দের বিচ্ছেদ, মায়ের অপেক্ষায় কাঁদছে নিষ্পাপ রুফাইদ
‘মা কোথায়?’—পাঁচ বছরের ছোট্ট রুফাইদের কাছে হয়তো এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই তার কাছে। যে মা প্রতিদিন তাকে আদর করতেন, খাওয়াতেন, ঘুম পাড়াতেন, সেই মা হঠাৎ নেই। মায়ের অনুপস্থিতির কারণ বোঝার বয়সও হয়নি তার। তাই কখনো মাকে খুঁজছে, কখনো নানুকে দেখে আবেগে কেঁদে উঠছে। স্বজনদের সান্ত্বনাতেও যেন থামছে না তার কান্না।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের কামাল্লা গ্রামের এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, প্রায় ছয় বছর সংসার করার পর মারিয়া আক্তার তার পাঁচ বছরের সন্তান ও স্বামীকে রেখে পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের এক যুবকের সঙ্গে চলে গেছেন। পরিবারের ভাষ্য, সংসারে অভাব-অনটন ছিল না এবং স্ত্রী-সন্তানের প্রয়োজন পূরণে স্বামী তার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছেন।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর মারিয়া আর ফিরে আসেননি। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর ফুলগাজী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডির নম্বর ১০৪৪।
পরিবারের অভিযোগ, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মারিয়ার কাছে আনুমানিক চার ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ দুই লাখ টাকা ছিল। পরে স্বজনরা জানতে পারেন, তিনি পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের জমিয়ারগাঁও গ্রামের মো. ফারুকের ছেলে মোহাম্মদ একরামের সঙ্গে চলে গেছেন বলে তারা ধারণা করছেন।
তবে ঘটনার বিষয়ে মারিয়া আক্তারের বক্তব্য ভিন্ন। নিখোঁজ হওয়ার পর দেওয়া একটি ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, তাকে আগে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি স্বামীকে তালাক দিয়েছেন এবং কয়েক দিনের মধ্যে তার সাবেক স্বামী তালাকনামা পেয়ে যাবেন। বর্তমানে তিনি যেখানে আছেন, সেখানে ভালো আছেন বলেও ভিডিও বার্তায় দাবি করেন তিনি।
এই পারিবারিক টানাপোড়েনের কিছুই বোঝার বয়স হয়নি রুফাইদের। বিচ্ছেদ কী, অভিযোগ কী কিংবা বড়দের সম্পর্কের জটিলতা কী—এসব তার অজানা। তার ছোট্ট পৃথিবীতে এখন শুধু মায়ের অনুপস্থিতি।
‘পরশুরামের চোখ’-এর হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মায়ের জন্য কান্না করছে শিশুটি। নানুকে দেখেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছে সে। আপনজনেরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে রুফাইদ।
সন্তানের এমন অবস্থায় আবেগঘন একটি খোলা চিঠি লিখেছেন তার বাবা। সন্তানের উদ্দেশে তিনি লিখেছেন—“এই বিচ্ছেদে তোমার কোনো ভুল ছিল না।”
চিঠিতে বাবা আরও লিখেছেন, স্ত্রীর প্রতি তার যত অভিযোগ, ক্ষোভ কিংবা কষ্টই থাকুক না কেন, সন্তানের কাছে তার মা সবসময়ই মা। তাই সন্তানের মনে মায়ের প্রতি কোনো নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি করতে চান না তিনি।
স্ত্রী চলে যাওয়ার পর সন্তানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন বাবা। মায়ের অভাব কখনো পুরোপুরি পূরণ করতে পারবেন না—এ কথা স্বীকার করেও সন্তানের ভালোবাসা ও যত্নে কোনো কমতি না রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। জীবনের প্রতিটি হাসি-কান্না, প্রতিটি সাফল্য ও প্রতিকূলতায় সন্তানের পাশে থাকার কথাও বলেছেন।
একটি শিশুর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়গুলোর একটি তার মা-বাবা। সেই আশ্রয়ের এক অংশ হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে গেলে শিশুর মনে কী ঝড় ওঠে, রুফাইদের কান্না যেন তারই নীরব সাক্ষ্য।
যে বয়সে তার মায়ের হাত ধরে খেলতে খেলতে দিন কাটানোর কথা, যে বয়সে রাতে মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ার কথা—সেই বয়সেই এখন তার চোখে অপেক্ষা, মুখে একটাই প্রশ্ন—“মা কোথায়?”
বড়দের সিদ্ধান্তের ভার যেন এসে পড়েছে ছোট্ট একটি শিশুর কাঁধে। আর সেই শিশুটির কান্নার মধ্যেই বারবার ফিরে আসছে এক নির্মম বাস্তবতা—বড়দের সম্পর্কের টানাপোড়েনের সবচেয়ে গভীর আঘাত অনেক সময় গিয়ে লাগে নিষ্পাপ সন্তানটির হৃদয়েই।