10/02/2026
প্রিয় ফেনীবাসী ও দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।
আপনারা জানেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের নামে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত ও প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা একটি অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এই নির্বাচনে মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। অথচ ১৯৭০ সাল থেকেই আওয়ামী লীগ নিয়মিতভাবে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে আসছে। শুধু তাই নয়—১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচিত হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং সেই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা–বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় একটি নতুন পতাকা ও নতুন মানচিত্র। যে দলের হাত ধরে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই দলকেই আজ কলমের কালিতে নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পর দলটি চরম বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কখনো নির্বাচন বর্জন করেনি। কারণ আওয়ামী লীগ সবসময় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং জনগণের ভোটের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত ক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো আওয়ামী লীগকে পরাজিত ঘোষণা করা হলেও, জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগ সেই ফলাফল মেনে নেয়।
১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় থেকে একটি পাতানো নির্বাচন আয়োজন করলে আওয়ামী লীগ তা বর্জন করে। সেই একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও জনগণের তীব্র আন্দোলনে মাত্র ১২ দিনের মাথায় ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈদেশিক ষড়যন্ত্রে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারায় শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ২৬২টি আসনে বিজয় অর্জন করে এবং দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে বাংলাদেশ আর পেছনে ফিরে তাকায়নি।
দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং দেশের সামগ্রিক চিত্র আমূল পরিবর্তন করে—
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, রেলওয়ে ডাবল লাইন, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, ফেনীর মহিপালে ছয় লেনের ফ্লাইওভার, ফেনী জেলার গ্রামীণ সড়কের ৯৫% পাকাকরণ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, ফেনী–মিরসরাই বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা,
এছাড়াও এক লক্ষ বিশ হাজার গৃহহীন পরিবারকে ঘর প্রদান করা হয়।
এর পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ৪৫ লক্ষ পরিবারকে টিসিবি কার্ডের আওতায় স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণসহ অসংখ্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেন।বাংলাদেশ সৃষ্টি ও দেশের অগ্রযাত্রা ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তি কখনোই মেনে নিতে পারেনি।
তাই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তথাকথিত কোটা আন্দোলনের নামে মেটিকুলাস ডিজাইনে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
৫ আগস্টের আগে জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করা হলেও, ৫ আগস্টের পর দেশজুড়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের আস্ফালন,বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের তীর্থস্থান ধানমণ্ডি ৩২ ভেঙ্গে ফেলা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অপচেষ্টা, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, লুটপাট ও খুন-হত্যা যখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়, তখন জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়—জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময়েই বাংলাদেশ ভালো ছিল।
এতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বাড়তে শুরু করলে, কলমের কালিতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়—যা সরাসরি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি এবং দেশকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যত অপপ্রচারই হোক না কেন, কখনোই কোনো দলকে আইনি পথে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়নি। বরং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গণভবনে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলেন—এটাই ছিল গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
এমনকি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বেও বিএনপি–জামায়াত জোটের আন্দোলনের সময় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে জননেত্রী শেখ হাসিনা হরতাল প্রত্যাহার করে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ হত্যা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পরাজয়ের আশঙ্কায় বিএনপি জোট সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি।
কিন্তু আজ দুঃখজনকভাবে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হলেও, ভোটে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এতে প্রমাণিত হয়—জননেত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকারকে বাস্তবায়নে বিশ্বাস করে না।
আমি আমার নির্বাচনী এলাকা ফেনী সদর আসনের ৪,৩৭,০৭৮ (চার লক্ষ সাঁইত্রিশ হাজার আটাত্তর) জন ভোটার এবং ফেনী জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের মোট ১৩,৩০,৯২৪ (তেরো লক্ষ ত্রিশ হাজার নয়শ চব্বিশ) জন ভোটারসহ বাংলাদেশের সকল ভোটারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি—আপনারা এই প্রহসনমূলক ও সাজানো নির্বাচনে ভোট প্রদান থেকে বিরত থাকুন।
এই নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। আপনাদের অংশগ্রহণ দেখিয়ে এটিকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হিসেবে বিশ্বদরবারে উপস্থাপনের অপচেষ্টা করা হবে।
অতএব, ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে গণতন্ত্রের পক্ষে নীরব প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের সঙ্গে আপস নয়, প্রতিরোধই বাঙালির পরিচয়।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু।
নিজাম উদ্দিন হাজারী
সাধারণ সম্পাদক, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ
সংসদ সদস্য, ফেনী–০২