21/06/2026
অনেকেই ট্রল করে বলেন, “আর্জেন্টিনা তো ১৯৩৮, ১৯৫০, ১৯৫৪ ও ১৯৭০—এই চারটি বিশ্বকাপেই সুযোগ পায়নি। তাহলে তাদের এত সমর্থন কেন?” আসুন, ইতিহাসের কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
শুরুতেই বলে রাখা ভালো, ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অনুষ্ঠিতই হয়নি।
ফিফা ১৯৯৩ সালের আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিক বিশ্ব র্যাঙ্কিং প্রকাশ শুরু করে। তার আগে ফুটবল বিশ্বে কোনো দলের শক্তিমত্তা মূল্যায়নে ইলো র্যাঙ্কিংকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হতো। সেই ইলো র্যাঙ্কিং অনুযায়ী ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন দশক আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দল ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৩৮, ১৯৫০ ও ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে তারা অংশগ্রহণই করেনি।
প্রথমত, ১৯৩৬ সালের ফিফা কংগ্রেসে অনেকের প্রত্যাশা ছিল ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আয়োজক দেশ হিসেবে ফ্রান্সকে বেছে নেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ বর্জন করে।
দ্বিতীয়ত, ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্থার সম্পর্ক তীব্রভাবে অবনতি ঘটে। ফলে বাছাইপর্বে সুযোগ পেয়েও আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। একই সময়ে আরও কয়েকটি দেশও বিভিন্ন কারণে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ভারতও সুযোগ পেয়েছিল, কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত অংশ নেয়নি।
তৃতীয়ত, ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপের বাছাই ও কোটা বণ্টন নিয়ে অসন্তোষের কারণে আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি।
এখন চিন্তা করুন, ইলো র্যাঙ্কিংয়ে টানা তিন দশক বিশ্বের অন্যতম সেরা দল হওয়া সত্ত্বেও আর্জেন্টিনা পরপর তিনটি বিশ্বকাপ খেলেনি। এর সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হওয়া দুটি বিশ্বকাপ যোগ করলে মোট পাঁচটি বিশ্বকাপে তাদের অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অনেক সমর্থকের মতে, এই সুযোগগুলো পেলে আর্জেন্টিনা অন্তত আরও কয়েকটি বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার হতে পারত।
বিশ্বকাপে অংশ না নিলেও আর্জেন্টিনা কিন্তু থেমে ছিল না। ১৯৩৭ থেকে ১৯৫৯ সালের মধ্যে তারা ৮ বার কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতেছিল। এটি প্রমাণ করে যে সেই সময়েও তারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল ছিল।
এবার আসা যাক ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে। ওই আসরে আর্জেন্টিনা মূলপর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়। অনেক সমর্থকের মতে, বাছাইপর্বের গ্রুপ বিন্যাস তাদের জন্য কঠিন হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে তারা সুযোগ হারায়।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। এরপর বিশ্ব ফুটবলে আবির্ভাব ঘটে দিয়েগো ম্যারাডোনার। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় এবং ১৯৯০ সালে রানার-আপ হয়। পাশাপাশি ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালের কোপা আমেরিকাও জেতে।
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ডোপিং-সংক্রান্ত ঘটনায় ম্যারাডোনাকে আর খেলতে দেওয়া হয়নি। অনেক আর্জেন্টিনা সমর্থকের বিশ্বাস, ম্যারাডোনা যদি আরও কয়েক বছর আন্তর্জাতিক ফুটবলে থাকতে পারতেন, তাহলে দলটি আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারত। তাঁর বিদায়ের পর আর্জেন্টিনা কিছুটা কঠিন সময় পার করলেও পরবর্তীতে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আবারও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে ফিরে আসে।
২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা তাদের তৃতীয় শিরোপা অর্জন করেছে। বর্তমান দল ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় অনেক সমর্থকই আশা করেন যে ২০২৬ বিশ্বকাপেও তারা শিরোপার অন্যতম দাবিদার থাকবে।
তাই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট না জেনে শুধু “আর্জেন্টিনা চারটি বিশ্বকাপে সুযোগ পায়নি” বা “তাদের মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ” বলে ট্রল করার আগে পুরো ইতিহাসটা জানা প্রয়োজন।