20/08/2026
৪ হাজার অস্থায়ী এএসআই পদ,
মেয়াদ বাড়ল আরও তিন বছর
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশ পুলিশের জনবল কাঠামোয় অস্থায়ীভাবে সৃষ্ট ৪ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) পদ সংরক্ষণের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে ২০২৯ সালের মে মাস পর্যন্ত পদগুলো বহাল রাখার সুযোগ তৈরি হলো। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত এসব পদ কবে স্থায়ী কাঠামোয় যাবে, আর পুলিশের মাঠপর্যায়ের জনবল সংকটই বা কতটা কমবে?
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-৩ শাখা থেকে গত ১৭ আগস্ট এ-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করা হয়। উপসচিব নাসরিন সুলতানা স্বাক্ষরিত পরিপত্রটি বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, পুলিশি কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে অস্থায়ীভাবে সৃষ্ট ৪ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) পদ সংরক্ষণের মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১ জুন থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মে পর্যন্ত প্রথম দফায়, এরপর ২০২৭ সালের ১ জুন থেকে ২০২৮ সালের ৩১ মে এবং সর্বশেষ ২০২৮ সালের ১ জুন থেকে ২০২৯ সালের ৩১ মে পর্যন্ত পদগুলো সংরক্ষিত থাকবে।
সরকারি সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ৪ হাজার পদকে কেবল সাময়িক প্রয়োজন হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিপত্রে বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেই প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এসব পদ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই বক্তব্যই পুরো বিষয়টির মূল প্রশ্ন সামনে আনে। কোনো পদ যদি একাধিক মেয়াদে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে এবং তার বিলুপ্তির সম্ভাবনাও না থাকে, তাহলে সেটি কতদিন অস্থায়ী থাকবে?
প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থায়ী পদ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু একটি পদ দীর্ঘ সময় ধরে বহাল রাখার প্রয়োজন দেখা দিলে সেটিকে স্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করার যৌক্তিকতা তৈরি হয়। পুলিশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এএসআই পদটি মাঠপর্যায়ের পুলিশিং ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
পুলিশের মাঠপর্যায়ে একজন এএসআই তদন্ত, মামলা-সংক্রান্ত কাজ, থানার দৈনন্দিন কার্যক্রম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এ স্তরে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে তার প্রভাব পড়ে থানার সামগ্রিক কার্যক্রমে।
বাংলাদেশে জনসংখ্যা, নগরায়ণ, অপরাধের ধরন পরিবর্তন এবং পুলিশের ওপর বাড়তে থাকা দায়িত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাঠপর্যায়ে দক্ষ জনবলের প্রয়োজনও বাড়ছে। শুধু প্রচলিত অপরাধ নয়, সাইবার অপরাধ, আর্থিক প্রতারণা, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের দায়িত্ব আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত।
এই বাস্তবতায় ৪ হাজার এএসআই পদকে আরও তিন বছর সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে কেবল প্রশাসনিক মেয়াদ বাড়ানো হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এটি পুলিশের জনবল চাহিদার একটি বড় সংকেতও বহন করছে।
অস্থায়ী পদ দীর্ঘদিন বহাল থাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এতে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে কি না। দ্বিতীয়ত, একই কাজের জন্য দীর্ঘদিন অস্থায়ী সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করা প্রশাসনিকভাবে কতটা কার্যকর।
এবারের পরিপত্রে অবশ্য বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত ব্যয় বাংলাদেশ পুলিশ অধিদপ্তরের বিদ্যমান বাজেট বরাদ্দ থেকে নির্বাহ করা হবে। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ বা দাবি করা যাবে না।
অর্থাৎ নতুন করে অতিরিক্ত বাজেট না বাড়িয়ে বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্যেই এসব পদের ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সীমিত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এই জনবল কাঠামোর স্থায়ী সমাধানের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী ৪ হাজার পদ ২০২৯ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু এরপর কী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তিন বছর পর আবার মেয়াদ বাড়ানো হবে, নাকি এর মধ্যে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় পদগুলো স্থায়ী করা হবে? এ সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে পুলিশের জনবল চাহিদা, প্রশাসনিক সংস্কার, বাজেট সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপর।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার জায়গাটিও এখানেই। কোনো পদ বাস্তবে প্রয়োজনীয় হলে সেটিকে শুধু মেয়াদ বাড়িয়ে অস্থায়ী অবস্থায় রাখার বদলে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। একই সঙ্গে প্রয়োজন নেই এমন পদ যেন শুধু প্রশাসনিক ধারাবাহিকতায় বহাল না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
৪ হাজার এএসআই পদ সংরক্ষণ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু জনবল বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একজন পুলিশ কর্মকর্তার দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, তদন্ত পদ্ধতি এবং জবাবদিহির কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত ও তদন্ত দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এএসআই পর্যায়ের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন। ফলে তাদের পেশাগত দক্ষতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আচরণগত দক্ষতা ও মানবাধিকার সম্পর্কে প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি তাই পুলিশের একটি নির্দিষ্ট পদ নিয়ে হলেও এর প্রভাব আরও বিস্তৃত। এটি প্রশ্ন তুলছে পুলিশের বর্তমান জনবল কাঠামো কতটা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোন পর্যায়ে কতজন কর্মকর্তা প্রয়োজন এবং সেই প্রয়োজন কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে পূরণ করা হবে।
৪ হাজার এএসআই পদ আরও তিন বছর সংরক্ষিত থাকছে। এতে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি নীতিগত প্রশ্নও সামনে এসেছে: প্রয়োজনীয়তা যদি এত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অস্থায়ী পদকে স্থায়ী কাঠামোয় নেওয়ার জন্য আলাদা পরিকল্পনা কেন থাকবে না?
২০২৯ সালের আগে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা শুধু পদসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজনীয় পদে পর্যাপ্ত জনবল, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, জবাবদিহি এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ই একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনীর প্রকৃত সক্ষমতার ভিত্তি।