Ahassn Habib

Ahassn Habib social worker

বাবার মৃ**ত্যুর পর উইল খুলে দেখা গেল, পুরো সম্পত্তির মালিক একজন অচেনা মেয়ে।​টেবিলের চারপাশে আমরা চার ভাইবোন স্তব্ধ হয়ে ...
22/08/2026

বাবার মৃ**ত্যুর পর উইল খুলে দেখা গেল, পুরো সম্পত্তির মালিক একজন অচেনা মেয়ে।
​টেবিলের চারপাশে আমরা চার ভাইবোন স্তব্ধ হয়ে বসে আছি। আমাদের পারিবারিক আইনজীবী মিস্টার রহমান চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে গম্ভীর গলায় উইলের শেষ লাইনটি পড়লেন। ঘরের ভেতরের সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দে ঘুরছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল চারপাশের বাতাস একদম জমে বরফ হয়ে গেছে।
​আমার বড় ভাই আসাফ সাহেব, যিনি নিজেকে সবসময় এই পরিবারের অঘোষিত সম্রাট মনে করতেন, তিনি হুট করে দাঁড়িয়ে গেলেন। তার মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছে। টেবিল চাপড়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন, "ইম্পসিবল! রহমান সাহেব, আপনি নিশ্চয়ই কোথাও ভুল করছেন! বাবা তার পৈতৃক সম্পত্তি, এই আলিশান বাড়ি, ফ্যাক্টরি—সব একজন অচেনা মেয়ের নামে লিখে দিয়ে গেছেন? কে এই আরিশা রহমান? আমরা তো কোনোদিন এই নামের কাউকে চিনিই না!"
​রহমান সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে উইলের কাগজগুলো ফাইলে পুরলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আসাফ, আমি তোমার বাবার দীর্ঘদিনের বন্ধু আর এই পরিবারের আইনি সাহায্যে করি। এই উইলে চৌধুরী মোতাহের হোসেনের নিজের দস্তখত আছে, আর দুজন নিরপেক্ষ সাক্ষীও আছেন। আইনগতভাবে এই উইলে কোনো খুঁত নেই। তোমার বাবা তার সম্পূর্ণ সচেতন জ্ঞান থাকা অবস্থায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।"
​মেজো বোন তানিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, "তার মানে আমরা রাস্তায় বসে গেলাম? সারা জীবন আমরা বাবার সেবা করলাম, আর শেষ বয়সে এসে বাবা আমাদের এভাবে ঠকালেন? একটা বাইরের মেয়ের জন্য?"
​আমি, রাইয়ান, পরিবারের ছোট ছেলে। চুপচাপ কোণায় বসে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। বাবার প্রতি রাগ বা সম্পত্তির প্রতি ক্ষো*ভের চেয়ে আমার ভেতরে এক তীব্র কৌতূহল কাজ করছিল। বাবা মানুষটা আমুদে ছিলেন, কিন্তু তার ভেতরে একটা বিশাল রহস্যের দেয়াল ছিল, যা আমরা কোনো ভাইবোন কখনো ভা*ঙতে পারিনি। তিন মাস আগে যখন হসপিটালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তার শেষ কথাটা ছিল, "রাইয়ান, আলমারির নিচের ড্রয়ারটা..."। তখন তিনি কথা শেষ করতে পারেননি। আজ বুঝলাম, বাবা আসলে কী ইঙ্গিত করতে চেয়েছিলেন।
​"উইলের একটা শর্ত আছে," রহমান সাহেবের কথায় সবার মনোযোগ আবার তার দিকে ফিরল।
​"কী শর্ত?" বড় ভাইয়া দাঁত কিড়মিড় করে জিজ্ঞেস করলেন।
​"আগামীকাল সকাল ১০টায় আরিশা রহমান এই বাড়িতে আসবে। উইলের শর্তানুযায়ী, সে এই বাড়িতেই থাকবে। আর তোমরা যদি এই সম্পত্তির অংশ বা মাসিক কোনো খরচ দাবি করতে চাও, তবে আগামী এক বছর তোমাদের এই বাড়িতেই আরিশার সাথে মিলেমিশে থাকতে হবে। এক বছর পর আরিশা নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে সে সম্পত্তির কোনো অংশ তোমাদের দেবে কি না। আর যদি তোমরা এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও, তবে তোমরা আইনত এক পয়সাও পাবে না।"
​রহমান সাহেবের কথা শুনে পুরো ড্রয়িংরুমে যেন একটা বো**মা ফাটল। আসাফ ভাইয়া আর তানিয়া আপা ক্ষো**ভে ফেটে পড়লেন। সেজো ভাই ফাহিম, যে এতক্ষণ মোবাইল টিপছিল, সেও এবার নড়েচড়ে বসল।
​রাতটা আমাদের কারো ঘুমিয়ে কাটল না। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—কে এই আরিশা? বাবার সাথে তার সম্পর্ক কী ছিল? বাবা কি গোপনে কোনো বিয়ে করেছিলেন? নাকি এই মেয়ে বাবার কোনো অ''বৈধ সন্তান? নানা নোংরা ও কুৎ*সিত চিন্তায় ভাইয়াদের মুখ বিষিয়ে উঠল। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, ঘটনা এতটাও সস্তা নয়। বাবা আর যাই হোন, একজন নীতিবান মানুষ ছিলেন।
​পরদিন সকাল ঠিক ১০টা।
​আমরা চার ভাইবোন ড্রয়িংরুমে আদালতের আসামির মতো বসে আছি। বাইরে একটা কালো রঙের গাড়ি এসে থামার শব্দ হলো। আমাদের সবার চোখ দরজার দিকে।
​কয়েক মুহূর্ত পর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল একটি মেয়ে। পরনে সাদামাটা একটা সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা সাধারণ ঝোলা ব্যাগ। বয়স বড়জোড় তেইশ বা চব্বিশ। মেয়েটার চেহারা অত্যন্ত শান্ত, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কোনো আভিজাত্যের অহংকার নেই, নেই কোনো চাতুর্য। তাকে দেখে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক মনে হওয়া তো দূরের কথা, খুব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে বলেই মনে হয়।
​মেয়েটি ঘরে ঢুকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটু হাসল। তারপর বলল, "আসসালামু আলাইকুম। আমি আরিশা। মোতাহের আঙ্কেলের... মানে চৌধুরী সাহেবের উইলের সূত্রে আমি আজ এখানে এসেছি।"
​আসাফ ভাইয়া সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, "চৌধুরী সাহেব? আঙ্কেল? নাটক বন্ধ করো মেয়ে! পরিষ্কার করে বলো, কোন জাদুবলে তুমি আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছ? ব্ল্যা**কমেইল করেছ, নাকি কোনো জালিয়াত চ*ক্রের সদস্য তুমি?"
​আরিশা আসাফ ভাইয়ার এই রুঢ় আচরণে একটুও দমে গেল না। সে তার ব্যাগটা সোফায় রেখে সোজা ভাইয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আপনারা যেভাবে ভাবছেন, বিষয়টা তেমন নয়। এই সম্পত্তি আমি চেয়ে নেইনি, আমাকে দেওয়া হয়েছে। আর আমি কেন এসেছি, তার উত্তর এই ডায়েরিতে আছে।"
​আরিশা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরনো চামড়ার ডায়েরি বের করল। ডায়েরিটা দেখেই আমার বুকটা ছ্যাত করে উঠল। ওটা বাবার প্রিয় ডায়েরি ছিল, যা বাবা সবসময় নিজের কাছে রাখতেন!
​মেয়েটি ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রাখল..

চলবে...

✴️প্রাপ্য
✴️পর্ব ০১
✴️ভালো লাগলে শেয়ার করে পাশে থাকবেন।

আজকেই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে। গল্প সম্পর্কে ভালো কিছু বলবেন

⚛️ একবার ঈশ্বর বুদ্ধি বিতরণ করবেন বলে ঘোষণা করলেন । নির্দিষ্ট দিনে নারায়ণ বুদ্ধি বিতরণ শুরু করলেন । কিন্তু অবাক কাণ্ড ,...
21/08/2026

⚛️ একবার ঈশ্বর বুদ্ধি বিতরণ করবেন বলে ঘোষণা করলেন । নির্দিষ্ট দিনে নারায়ণ বুদ্ধি বিতরণ শুরু করলেন । কিন্তু অবাক কাণ্ড , বুদ্ধি বিতরণের লাইনে শুধু পুরুষেরা উপস্থিত , কোন মহিলা নেই । ফলে সমস্ত বুদ্ধি পুরুষেরাই পেলো । আসলে মহিলারা সেদিন লাইনে দাঁড়াবে বলে বিউটি পার্লারে সাজগোজ করতে গিয়েছিল । সাজগোজ শেষ করে বুদ্ধি বিতরণ স্থলে আসতে আসতে বুদ্ধি বিতরণ শেষ । সব মহিলাদের নজরে পড়ল একটি পোস্টার : " বুদ্ধির মজুত শেষ " ।
মহিলারা পোস্টারের লেখা দেখে চিৎকার , চেঁচামেচি করে যাচ্ছেতাই কান্ড শুরু করলেন । নারায়ণ তখন দ্বার রুদ্ধ করে যোগনিদ্রায় অভিভূত । মহিলাদের বেয়াদপি ও চিৎকারে বিরক্ত হয়ে পিতামহ ব্রহ্মা বাইরে এলেন ।
এক মহিলা ব্রহ্মাকে দেখে একগাল হেসে বললেন :
" হে পিতামহ , এ কেমন বিচার ? আমরা কি একেবারেই বুদ্ধিহীন থাকব ?"
ব্রহ্মা : " না , তোমাদের এই মধুর হাসিতেই পুরুষের বুদ্ধি কোন কাজ করবে না ।"
অপর এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এসে বললেন : " হে ব্রহ্মদেব , আমি যে হাসতে জানি না , আমি চিরদুঃখী , শুধু কাঁদতে জানি । আমার কী উপায় হবে ?"
ব্রহ্মা : " তোমাদের এই কান্নাতে ও পুরুষের বুদ্ধি কোন কাজ করবে না ।"
এবার আরেক মহিলা চিৎকার করতে করতে এগিয়ে এসে বললেন : " ভগবন , আমি তো হাসতেও পারি না , কাঁদতেও পারি না । ঝগড়া ছাড়া আর কিছুই জানি না । আমার কী হবে ?"
ব্রহ্মা : " তথাস্তু , তোমাদের এই ঝগড়াঝাঁটিতেও পুরুষের বুদ্ধি কোন কাজ করবে না ।"
অগত্যা ওই হাসি , কান্না আর ঝগড়ার মাধ্যমে পুরুষদের কাবু করার বুদ্ধি লাভ করলেন মহিলারা । আজও তারা ওই তিনটে বুদ্ধি দিয়েই পুরুষদের বেঁধে রাখেন ।
পুরুষের কোন বুদ্ধিই মহিলাদের ওই তিনটে বুদ্ধির সঙ্গে পেরে ওঠে না ।
⚛️ সংগৃহীত

অভাবপর্ব ০২চাচির সেই বিষাক্ত চিৎকার আর অপমা*নের তিরগুলো সেদিন শুধু আমার কানে নয়, সোজা এসে লেগেছিল ১২-১৩ বছরের একটা বাচ্চ...
21/08/2026

অভাব
পর্ব ০২

চাচির সেই বিষাক্ত চিৎকার আর অপমা*নের তিরগুলো সেদিন শুধু আমার কানে নয়, সোজা এসে লেগেছিল ১২-১৩ বছরের একটা বাচ্চার কলিজায়। মুখের ভেতর থাকা মাংসের অমৃত টুকরোটা মুহূর্তের মধ্যে যেন কয়লার মতো তেতো আর বি*ষাক্ত হয়ে গেল। আমি গিলতেও পারছিলাম না, ফেলতেও পারছিলাম না। চোখের জল আর নাকের জল এক হয়ে যাচ্ছিল। চাচা আর মেহমানরা যখন উঠোনে এসে আমাদের দিকে ঘৃণার চোখে তাকাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল মাটি দু-ভাগ হয়ে যাক আর আমি তাতে চোর সেজে চিরতরে হারিয়ে যাই।

মা সেদিন চাচির পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের মন গলেনি। মেহমানদের সামনে আমাদের চো*র অপবাদ দিয়ে, মায়ের হাতের রান্না করা সেই মাংস-পোলাও তো দূরের কথা, এক ফোঁটা পানিও আমাদের কপালে জোটেনি। উল্টো ধাক্কা দিয়ে আমাদের উঠোন থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।

সেদিন বিকেলে নিজের ভাঙা ঘরের মেঝেতে শুয়ে ছটফট করতে করতে আমি একটা জিনিস খুব ভালো করে বুঝে গিয়েছিলাম—এই দুনিয়ায় অভাবের চেয়ে বড় কোনো পাপ নেই, আর গরিবের আত্মসম্মান বলতে কিচ্ছু থাকতে নেই। চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের অবুঝ মনটাকে শক্ত করে বেঁধে ফেলেছিলাম। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, এই অপ*মানের শোধ আমি নেবই। তবে মারামারি করে নয়, নিজেদের ভাগ্য বদলে।

দিন গেল, মাস গেল, বছরের পর বছর কেটে গেল। ক্ষুধা আর অপ*মানকে পিঠের চামড়ায় সইয়ে নিয়ে আমি একটু একটু করে তরতাজা এক তরুণে পরিণত হলাম। কৈশোরের সেই হাড্ডিসার সোহান এখন শক্ত-সমর্থ যুবক। কিন্তু গ্রামের মাটিতে দিনমজুরি করে বা হাটে-বাজারে ছোটখাটো কাজ করে সচ্ছলতা আসছিল না। কেবল কোনোমতে মা-ছেলের দুই বেলা দুই মুঠো ভাত জুটত।

কিন্তু আমার স্বপ্ন তো শুধু বেঁচে থাকা ছিল না। আমার স্বপ্ন ছিল মায়ের মুখে চওড়া হাসি ফোটানো, মাথা উঁচু করে বাঁচা। আর তার জন্য প্রয়োজন ছিল বড় কোনো সুযোগের। ঠিক তখনই গ্রামের এক দালালের মাধ্যমে জানতে পারলাম, প্রবাসে যাওয়ার একটা সুযোগ আছে। কিন্তু তার জন্য দরকার অনেকগুলো টাকা।

আমাদের মতো নিঃস্ব মানুষের কাছে তত টাকা কোথায়? একমাত্র সম্বল ছিল বাবার রেখে যাওয়া আমাদের এই ভাঙা ভিটেমাটিটুকু। বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠলেও, চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অতীতের সেইসব নির্মম অপমা*ন। সিদ্ধান্ত নিলাম, এই বাড়ি আমি বিক্রি করে দেব।

সবচেয়ে বড় পরিহাস কী জানেন? যে চাচা আমাদের এক লোকমা ভাতের জন্য তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেই চাচাই আমাদের এই নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিতে সবার আগে এগিয়ে এলেন। তিনি জানতেন, এই মুহূর্তে টাকাটা আমার কতটা জরুরি। তাই বাজারের দামের চেয়ে অর্ধেক দামে আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু কিনে নিতে চাইলেন।

জমি রেজিস্ট্রির দিন চাচা যখন থরে থরে টাকার বান্ডিল আমার সামনে রাখছিলেন, উনার চোখেমুখে ছিল এক কুৎসিত জয়ের আনন্দ। আমি টাকার দিকে তাকাইনি, আমি তাকিয়েছিলাম চাচার চোখের দিকে। মনে মনে বললাম, “চাচা, আজ আপনি আমাদের ঘরটা কিনে নিলেন ঠিকই, কিন্তু সেদিন যে আমাদের আত্মসম্মানটা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন, তা কিনতে পারলেন না।”

অবশেষে চলে এলো সেই দিন। প্রবাসে যাওয়ার দিন। ব্যাগপত্র গুছিয়ে যখন উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, তখন চারপাশটা কেমন যেন অচেনা লাগছিল। এই মাটিতে আমার বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে আমার ক্ষুধার্ত শৈশবের কান্না।

মা সকাল থেকেই ঘরের কোণে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। আমি যখন মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, মা আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। দুই হাতে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মায়ের চোখের গরম জল আমার কাঁধ ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "বাজানরে, আমার বুকটা যে খালি হয়ে যাচ্ছে। তুই ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছে রে বাবা? অচেনা-অজানা দেশে যাচ্ছিস, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস। নিজের খেয়াল রাখিস বাজান।"

মায়ের সেই কান্না আমার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। আমি মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে উনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলাম। মায়ের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললাম, "কেঁদো না আম্মা। তোমার এই ছেলেরে ওরা এক টুকরো মাংসের জন্য চো*র বানিয়েছিল, এক প্লেট ভাতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিল। আমি যাচ্ছি আমাদের ভাগ্য বদলাতে। তুমি শুধু দোয়া করো, আমি যেন বুক ফুলিয়ে আবার তোমার বুকে ফিরে আসতে পারি। তখন এই গ্রাম দেখবে সোহান কী করতে পারে।"

মাকে বাবার এক দূর সম্পর্কের ভালো আত্মীয়ের জিম্মায় রেখে, ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিলাম। আর পেছন ফিরে তাকাইনি। রওনা হলাম এক বুক স্বপ্ন আর এক মহাসমুদ্র সমান প্রতি*শোধের আগুন নিয়ে, দূর প্রবাসের উদ্দেশ্যে। যেখানে হাড়ভাঙা খাটুনি আছে ঠিকই, কিন্তু অন্তত আপন মানুষের দেওয়া কুৎসিত অপমান নেই।

✴️৩য় পর্ব

​বিমানের জানালা দিয়ে যখন নিচে তাকোলাম, তখন চেনা পৃথিবীটা মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা মায়ের কান্নায় ভারী হয়ে ছিল, আর চোখের সামনে ভাসছিল চাচার সেই কুৎসিত জয়ের হাসি। দুবাইয়ের মাটিতে যখন প্রথম পা রাখলাম, তখন চারপাশের ঝলমলে আলো আর আকাশচুম্বী দালানকোঠা দেখে নিজেকে বড় বেশি অসহায় মনে হচ্ছিল। আমার মতো এক নিঃস্ব গাঁয়ের ছেলের জন্য এই শহর যেন এক গোলকধাঁধা।

​দালাল আমাদের নিয়ে গেল মরুভূমির তপ্ত বালুর বুকের এক লেবার ক্যাম্পে। একটা ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বারো-চোদ্দো জন মানুষকে থাকতে হতো। প্রথম দিন থেকেই শুরু হলো হাড়ভাঙা খাটুনি। ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মরুর গরমে যখন কনস্ট্রাকশন সাইটে রড আর সিমেন্টের বস্তা টানতাম, তখন মনে হতো গায়ের চামড়া পু*ড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধার তীব্রতা আর ক্লান্তিতে যখন শরীর ভেঙে পড়তে চাইত, তখন চোখের সামনে ভেসে উঠত দুটো দৃশ্য—এক, মায়ের মলিন মুখ; আর দুই, এক টুকরো মাংস মুখে দেওয়ায় চোর অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার সেই দুপুর।

​শরীরের সব ক্লান্তি আর কষ্টকে আমি জেদে রূপান্তর করলাম। ওভারটাইম খাটতাম, অন্যেরা যখন বিশ্রামের খোঁজে ঘুমাত, আমি তখন আরও চারটে পয়সা আয়ের জন্য অন্য সাইটে কাজ নিতাম। নিজের জন্য এক দিরহামও খরচ করতাম না। দালালের ধার শোধ করার পর প্রথম যেদিন মায়ের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠালাম, সেদিন রাতে ক্যাম্পে বসে লুকিয়ে অনেক কেঁদেছিলাম। ফোনে মায়ের কাঁপা কাঁপা গলার আওয়াজ শুনলাম, "বাজান, তোর পাঠানো টাকা পাইছি। তুই নিজেরে কষ্ট দিস না রে বাবা।" মায়ের ওই একটা কথাই আমার সব ক্লান্তি দূর করে দিত।

​দিন তো আর একভাবে যায় না। সততা আর কঠোর পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। দুই বছর কনস্ট্রাকশনে কাজ করার পর আমি টুকটাক আরবি আর ইংরেজি ভাষাটা রপ্ত করে ফেললাম। কথা বলা শেখার পর আমার কাজের পরিধিও বাড়তে লাগল। সাইটের ফোরম্যান আমার সততা আর কাজের প্রতি একাগ্রতা দেখে আমাকে সাপ্লাই চেইনের একটা ছোট দায়িত্ব দিলেন।
​সেখানেই আমার পরিচয় হয় কেরালার এক ভদ্রলোকের সাথে, নাম উন্নি কৃষ্ণান। তিনি দুবাইয়ে ছোটখাটো একটা কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করতেন। আমার কাজের গতি আর সততা দেখে উনি একদিন আমাকে বললেন, "সোহান, তুমি শুধু অন্যের অধীনে খাটছ কেন? তোমার যে বুদ্ধি আর পরিশ্রম করার ক্ষমতা, তুমি চাইলে আমার সাথে ভাগে ব্যবসা শুরু করতে পারো।"

​কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতর যেন এক ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেল। নিজের ব্যবসা! পুঁজি বলতে আমার কাছে তখন সামান্য কিছু জমানো টাকা ছিল। কিন্তু উন্নি ভাই বললেন, "টাকা বড় কথা নয় সোহান, তোমার সততা আর মাঠের অভিজ্ঞতাটাই আমার বড় পুঁজি।"
​ঝুঁকিটা আমি নিলাম। নিজের জমানো সবটুকু আর উন্নি ভাইয়ের পুঁজি মিলিয়ে আমরা যৌথভাবে (পার্টনারশিপে) একটা ছোট কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল সাপ্লাইয়ের ব্যবসা শুরু করলাম। প্রথম প্রথম দিন-রাত এক করে ক্লায়েন্টদের দরজায় দরজায় ঘুরতাম। অনেক সময় না খেয়েও দিন কাটাতে হতো। কিন্তু এবার লড়াইটা ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর।
​ধীরে ধীরে আমাদের ভাগ্য বদলাতে শুরু করল। এক বছরের মাথায় আমরা দুবাইয়ের দুটো বড় প্রজেক্টের সাপ্লাইয়ের কাজ পেয়ে গেলাম। লভ্যাংশের টাকা যখন প্রথম হাতে এলো, তখন আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। যে ছেলেটা এক লোকমা ভাতের জন্য চাচার ঘরের মেঝেতে গুটিসুটি মে*রে বসে থাকত, সেই সোহান আজ দুবাইয়ের বুকে একটা রেজিস্টার্ড কোম্পানির পার্টনার!

​ব্যবসায় উন্নতি হওয়ার পর গ্রামে মায়ের কাছে নিয়মিত ভালো অঙ্কের টাকা পাঠাতে লাগলাম। মাকে বললাম, "আম্মা, আর অন্যের জিম্মায় থাকতে হবে না। গ্রামের সবচেয়ে ভালো বাড়িটা ভাড়া নাও। নিজের একজন কাজের লোক রাখো। তোমার এই ছেলে আর চো*র না, সে এখন ব্যবসায়ী।"

​মাঝেমধ্যে মা ফোনে বলতেন, গ্রামের মানুষের মুখে মুখে নাকি এখন আমারই প্রশংসা। যে চাচা আমাদের চো*র বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনি নাকি এখন পাড়ায় পাড়ায় গল্প করেন—সোহান তার নিজের আপন ভাতিজা, তার র**ক্ত! শুনে আমার ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠত। মানুষের রূপ কত দ্রুত বদলায়!
​ব্যবসায় থিতু হওয়ার পর কেটে গেল আরও দুটো বছর। এখন আমাদের ব্যবসা বেশ বড়। নিজের একটা গাড়ি হয়েছে, দুবাইয়ের বুকে মাথা উঁচু করে চলাই এখন আমার পরিচয়। কিন্তু একটা অপূর্ণতা প্রতিনিয়ত আমার বুকে কাঁটার মতো বিঁধত—আমাদের সেই পিতৃভিটে, যা চাচা পানির দামে কিনে নিয়েছিলেন।
​একদিন রাতে মায়ের সাথে কথা বলার সময় বললাম, "আম্মা, অনেক তো হলো। এবার তোমার সোহান দেশে ফিরছে। তবে খালি হাতে নয়, বুক ফুলিয়ে। যে মাটি থেকে আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই মাটিতেই আমি আমার মায়ের রাজপ্রাসাদ গড়ব।"
​টিকিট কাটা হয়ে গেছে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই আমি পা রাখব আমার চেনা গাঁয়ের মাটিতে। মনে মনে ভাবলাম, “চাচা, সোহান আসছে। আপনার দেওয়া অপমানের হিসাবটা চুকিয়ে দেওয়ার সময় এবার চলে এসেছে।”

✴️অভাব
✴️পর্ব ০৪

দীর্ঘ পাঁচটা বছর পর যখন ঢাকার মাটিতে প্লেনটা ছুঁলো, তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর উত্তেজনার কাঁপন টের পাচ্ছিলাম। যে সোহান একদিন ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে এই দেশ ছেড়েছিল, সে আজ দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বিমানবন্দর থেকে একটা বড় গাড়ি ভাড়া করে যখন সোজা আমার চেনা গাঁয়ের মাটির রাস্তায় এসে নামলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। দামী গাড়ির হর্ন শুনে আর আলোর ঝলকানি দেখে গ্রামের মানুষ উৎসুক চোখে ছুটে এলো।

গাড়ি থেকে নামতেই আমার চোখ দুটো খুঁজছিল আমার মাকে। মা তখন আমাদের ভাড়া নেওয়া পাকা বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে দু-হাতে আঁচল চেপে কাঁদছেন। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না, মায়ের সামনে গিয়ে উনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এই কান্না আনন্দের, এই কান্না দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষার অবসানের। মাকে জড়িয়ে ধরে আমার মনে হলো, এতদিনে আমার সমস্ত হাড়ভাঙা খাটুনি আর কষ্ট সার্থক হয়েছে।

মায়ের জন্য দুবাই থেকে খাঁটি সোনার দামী গয়না, সুন্দর সুন্দর শাড়ি আর অনেক রকম ফলমূল নিয়ে এসেছিলাম। ঘরের ভেতর গিয়ে মায়ের হাতে যখন সোনার ভারী গয়নার বাক্সটা তুলে দিলাম, মায়ের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। মা বললেন, "এত দামী জিনিস দিয়ে আমি কী করব বাজান? তুই যে সহিসালামতে আমার বুকে ফিরেছিস, এটাই আমার সবচেয়ে বড় গয়না।"

ঠিক এই আবেগঘন মুহূর্তেই ঘরের দরজায় এক চেনা কাশির আওয়াজ শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি, দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছেন আমার চাচা! উনার পরনে একটা পরিষ্কার পাঞ্জাবি, আর মুখে এমন এক চিলতে হাসি, যেন উনি আমাদের কত বড় শুভাকাঙ্ক্ষী!

আমাকে দেখেই চাচা প্রায় ছুটে এসে দুই হাতে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। উনার গলার আওয়াজে তখন উপচে পড়া কৃত্রিম ভালোবাসা। চাচা গদগদ হয়ে বলতে লাগলেন, "আরে সোহান বাবা! তুই ফিরেছিস? কত বড় হয়ে গেছিস রে বাজান! তোরে দেইখা আমার বুকটা জুড়ায়ে গেল।"

আমি আলতো করে চাচার বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। উনার চোখের দিকে তাকালাম, যেখানে এখন আর সেই কুৎসিত জয়ের অহংকার নেই, বরং লেপ্টে আছে এক চরম লোভ। চাচা আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে, আবার আমার দিকে ফিরে হাত নেড়ে বলতে লাগলেন, "গ্রামে অনেকে অনেক কথা কয় সোহান। কিন্তু তুই তো জানিস, তোর বাপ যখন স্ট্রোক করে মা*রা গেল, মাথায় তো তখন কোনো ছাদ ছিল না। তোর বাপ তো নাই, কিন্তু আমি তো র*ক্তেরই চাচা! সেদিন তোকে টাকাটা দিয়ে যদি আমি বিদেশে না পাঠাতাম, তবে আজ তুই এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতি? বাপের দায়িত্বটা তো আমিই পালন করেছি রে বাবা!"

চাচার মুখে এত বড় মিথ্যা আর নির্লজ্জ দাবি শুনে আমার ভেতরের র**ক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। যে মানুষটা আমাদের নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে, বাবার শেষ স্মৃতি এই ভিটেমাটিটুকু পানির দামে চুষে খেয়েছিলেন; আজ তিনি দাবি করছেন তিনি নাকি আমার বাপের দায়িত্ব পালন করেছেন!

আমি ঠোঁটের কোণে একটা বিষাক্ত হাসি ফুটিয়ে শান্ত গলায় বললাম, "হ্যাঁ চাচা, খুব ভালো করেই মনে আছে। আমার বাবার জানাজায় আপনি সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিলেন। আর তারপর এক টুকরো মাংসের জন্য আমাকে চো*র বানিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর জমি কেনার নামে যে টাকাটা দিয়েছিলেন, তা দয়ার দান ছিল না চাচা; আমাদের শেষ সম্বলটুকু সস্তায় গিলে খাওয়ার লোভ ছিল। বাপের দায়িত্ব কাকে বলে, তা আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বোঝে না।"

আমার এমন সরাসরি জবাবে চাচার মুখের হাসি পলকে মিলিয়ে গেল। উনার ফ্যাকাশে মুখ দেখে আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে নষ্ট করতে চাইলাম না।

আমার ব্যাগ থেকে আর একটা সুন্দর উপহারের বাক্স বের করে নিলাম। এই পৃথিবীতে মা ছাড়া আর একজন মানুষকে আমি আমার আপন বলে ভাবতাম, তিনি হলেন আমার বড় চাচাতো বোন। যিনি নিজের মায়ের চোখের আড়ালে ক্ষুধার্ত সোহানের মুখে মাঝেমধ্যে মিষ্টি বা ফল তুলে দিতেন। উনার সেই সামান্য ভালোবাসাটুকু আমি কোনোদিন ভুলিনি।

মাকে বললাম, "আম্মা, আমি আপার বাড়ি থেকে আসছি।"

বড় আপার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি এখন পাশের গ্রামেই থাকেন। গাড়ি নিয়ে যখন উনার বাড়ির সামনে গিয়ে নামলাম, আপা তখন উঠোনে কাজ করছিলেন। গাড়ি থেকে আমাকে নামতে দেখে উনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

"সোহান! তুই..." আপার চোখ দুটো আনন্দে ভরে উঠল।

আমি হাসিমুখে উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আপা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "কত বড় হয়ে গেছিস রে ভাই আমার! তুই যে এত বড় মানুষ হয়ে ফিরেছিস, আমি দূর থেকে শুনে শুধু আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি।"

আমি আপার হাতে দুবাই থেকে আনা দামী উপহারের বাক্সটা আর মিষ্টির প্যাকেটটা তুলে দিলাম। বললাম, "আপা, তোমার সেই ছোট সোহান আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। সেদিন চাচি যখন আমাকে চো*র বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন শুধু তুমিই আমার দিকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়েছিলে। তোমার সেই ঋণের শোধ দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, এটা তোমার এই ভাইয়ের তরফ থেকে ছোট একটা উপহার।"

উপহারটা হাতে নিয়ে আপা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। উনার সেই আনন্দের অশ্রু দেখে আমার মনে হলো, এত বছর পর আজ যেন আমার বুকের ভেতরের একটা বড় ক্ষত উপশম হলো। আপন মানুষ তো তারাই হয়, যারা বিপদের দিনে পাশে থাকে; সুদিনের লোভে যারা ছুটে আসে, তারা নয়।

আপার বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে যখন নিজের গাড়িতে উঠলাম, তখন রাতের আকাশটা তারায় তারায় ভরে গেছে। মনে মনে ভাবলাম, আপন-পর চেনা শেষ। এবার আসল খেলা শুরু হবে। যে ভিটেমাটি থেকে আমাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, সেখানে এবার সোহানের রাজপ্রাসাদ উঠবে।

✴️অভাব
✴️পর্ব ০৫

আপার বাড়ি থেকে যখন ফিরলাম, তখন রাতের অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে। কিন্তু আমার বুকের ভেতরের আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছিল। সারারাত আমার চোখে ঘুম এলো না। বারবার মনে পড়ছিল সেই রান্নাঘরের পেছনের জানলা, মায়ের সেই আত*ঙ্কিত চোখ, আর চাচির সেই গগনবিদারী চিৎকার—"চোরের দল!" সকালে উঠেই আমি মনে মনে একটা চূড়ান্ত ছক কষে ফেললাম। যে অপমা*নের শুরু হয়েছিল একটা রান্নাঘর থেকে, তার শেষটাও আমি একটা রাজকীয় রান্নাঘর দিয়েই করব।

পরদিন সকালেই আমি গ্রামের কয়েকজন গণ্যমান্য মাতব্বর আর মেম্বার সাহেবকে আমাদের ভাড়া বাড়িতে ডাকলাম। খবর পাঠানো হলো চাচার কাছেও। চাচা যখন ভাবগম্ভীর মুখে এসে বসলেন, তখন উনার ধারণা ছিল হয়তো আমি উনাকে কোনো দামী উপহার দেব বা বিদেশের কোনো বড় ব্যবসার ভাগ দেব।

আমি সবার সামনে দাঁড়িয়ে সোজা কাজের কথায় এলাম। পকেট থেকে একটা দলিলের কপি বের করে টেবিলের ওপর রাখলাম। চাচার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, "চাচা, পাঁচ বছর আগে আমার প্রবাসে যাওয়ার জরুরি টাকার সুযোগ নিয়ে আপনি আমাদের পৈতৃক ভিটেমাটিটুকু পানির দামে লিখে নিয়েছিলেন। বাজারে তখন সেটার দাম ছিল অন্তত চার লাখ টাকা, কিন্তু নিরুপায় পেয়ে আপনি আমাকে দিয়েছিলেন মাত্র ২ লাখ। আজ আমি সেই ভিটেমাটি ফেরত চাই।"

আমার কথা শুনে চাচা থতমত খেয়ে গেলেন। মাতব্বরদের সামনে নিজের সম্মান বাঁচাতে তিনি একটু গলা চড়িয়ে বললেন, "আরে সোহান, ওটা তো আমি তোকে বিপদের সময় সাহায্য করেছিলাম। এখন তুই বড় লোক হয়েছিস বলে পুরোনো দিনের কথা ভুলে গেলি? ঐ জমি আমি এখন বেচব না। ওটা আমার ছেলেদের নামে থাকবে।"

আমি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলাম। ব্যাগ থেকে কুচকুচে কালো চামড়ার একটা ব্রিফকেস এনে টেবিলের ওপর রাখলাম। লকটা খুলতেই থরে থরে সাজানো কড়কড়ে টাকার বান্ডিলগুলো সবার চোখের সামনে চকচক করে উঠল। চাচার চোখের মণি লোভ আর বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।

আমি বললাম, "আমি জানি চাচা, আপনি বিনা লোভে শ্বাসও নেন না। দুই লাখ টাকার সেই জমির জন্য আজ আমি আপনাকে নগদ ১০ লাখ টাকা দেব। এই মাতব্বরদের সামনেই দলিল হবে। আপনি জমি ফেরত দেবেন কি না, সেটা এবার ভেবে বলুন। তবে মনে রাখবেন, রাজি না হলে এই সোহান অন্য উপায়েও জমি উদ্ধার করতে জানে। দুবাইয়ের আদালত আর আইনের মারপ্যাঁচ আমি ভালোই শিখে এসেছি।"

মেম্বার সাহেব টাকার বান্ডিল দেখে নিজেই চাচাকে কোণঠাসা করে ফেললেন, "আরে মিয়া, বাজারে ওই জমির দাম এখন বড়জোর পাঁচ লাখ। সোহান নিজের বাপের ভিটা বইলা ১০ লাখ দিতাছে। এইখানে না করার তো কিছু দেখি না। জমি দিয়া দাও!"

চাচা বুঝলেন, একদিকে নগদ ১০ লাখ টাকার লোভ, অন্যদিকে পুরো গ্রামের মাতব্বরদের চাপ—না করার কোনো উপায় নেই। অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও, নিজের কুৎসিত পরাজয় লুকাতে লুকাতে চাচা দলিলে সই করতে বাধ্য হলেন। জমি রেজিস্ট্রির কাজ শেষ হতেই আমি চাচার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, "চাচা, টাকার জোরে আপনি সেদিন আমাদের ছাদ কেড়ে নিয়েছিলেন, আজ সেই টাকার জোরেই আমি আমার বাপের মাটি ফেরত নিলাম।"

পরদিন থেকেই শুরু হলো এলাহী কাণ্ড। শহর থেকে বড় বড় আর্কিটেক্ট আর ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে এলাম। পুরোনো সেই ভাঙা ঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। আমি রাজমিস্ত্রিদের ডেকে নকশাটা বুঝিয়ে দিলাম, "এইখানে গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর ডুপ্লেক্স বাড়ি হবে। আর শোনো, বাড়ির রান্নাঘরটা যেন সবচেয়ে বড় আর আধুনিক হয়। দামী মার্বেল পাথর আর কাচ দিয়ে সাজাবে ওটা।"

মাসখানেকের মধ্যেই বাড়ির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেল। গ্রামের মানুষ প্রতিদিন বিকেলে এসে হা করে সেই রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ির কাজ দেখত। আর মেজো চাচা ও চাচি নিজেদের ঘরের জানলা দিয়ে সেই দৃশ্য দেখতেন আর হিং*সায় ভেতরে ভেতরে পুড়ে ম*রতেন। যে চো*র সোহানকে তারা লা*থি মে*রে তাড়িয়েছিলেন, সে আজ তাদের চোখের সামনে রাজপ্রাসাদ তুলছে!

কাজের মাঝেই একদিন দুপুরবেলা একটা খবর পেয়ে আমি একটু চমকে উঠলাম। মেজো চাচার বড় ছেলে, যে একসময় আমাকে দেখলে কুকু*রের মতো তাড়িয়ে দিত, সে নাকি ইউরোপে যাওয়ার জন্য দালালের খপ্পরে পড়ে ২০ লাখ টাকা খুইয়েছে। পুলিশ এসে তাদের বাড়িতে হানা দিয়েছে। চাচা হন্যে হয়ে গ্রামে গ্রামে টাকার জন্য ঘুরছেন, কিন্তু এই চড়া সুদের বাজারে কেউ উনাকে এক টাকাও ধার দিতে রাজি হচ্ছে না। ঋণ শোধ করতে না পারলে চাচার বড় ছেলের জেল নিশ্চিত।

বিকালে আমি আমাদের নতুন বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে তদারকি করছিলাম। ঠিক তখন দেখলাম, চাচা চো*রের মতো পা টিপে টিপে আমার উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। উনার সেই চওড়া ছাতি আজ যেন মাটির সাথে মিশে গেছে।

আমায় দেখে চাচা দুই হাত জোড় করে কেঁদে ফেললেন, "সোহান বাবা... আমারে বাঁচা। তোর ভাইডারে পুলিশে ধইরা নিয়া যাইব। তুই ছাড়া এই বিপদে আমার আর কেউ নাই বাবা। পুরোনো সব ভুল মাফ কইরা দে..."

আমি চাচার দিকে তাকালাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ১২ বছরের সেই সোহান, যে এক লোকমা ভাতের জন্য এই মানুষের সামনেই শুকনো থুতু গিলছিল। আজ চাকা ঘুরে গেছে। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস!

আমি পকেটে হাত দিয়ে চাচার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। উনার চোখের পানি আজ আমার মনে কোনো দয়া বা ক্ষোভের জন্ম দিল না, শুধু এক চরম তৃপ্তি এনে দিল। আমি বললাম, "চাচা, আপনার মনে আছে? ক্ষুধার্ত একটা বাচ্চার সামনে আপনারা আয়েশ করে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতেন, কেউ একটা রুটিও বাড়িয়ে দেয়নি। আর আজ আপনি আমার কাছে ২০ লাখ টাকা ভিক্ষা চান?"

চাচা মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমি উনার কাঁধে হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বললাম, "টাকা আমি দেব চাচা। আপনার ছেলের জেল হবে না। তবে একটা শর্তে..."

✴️অভাব
✴️পর্ব ০৬ (শেষ পর্ব)

আমার কথা শুনে চাচা চোখের পানি মুছতে মুছতে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী শর্ত বাবা? তুই যে শর্ত দিবি, আমি তাতেই রাজি। শুধু আমার ছেলেটাকে এই যাত্রায় জেল খাটা থেকে বাঁচা।"

আমি চাচার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বললাম, "শর্ত খুব সহজ চাচা। আজ থেকে কয়েক দিন পর আমার এই নতুন বাড়ির কাজ শেষ হবে। সেদিন আমি পুরো গ্রামের মানুষকে দাওয়াত করে খাওয়াব। সেই ভরা মজলিশে, গ্রামের সব মানুষের সামনে আপনাকে আর চাচিকে হাত জোড় করে আমার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। বলতে হবে যে সেদিন আপনারা একটা ক্ষুধার্ত বাচ্চার ওপর অন্যায় করেছিলেন, আমার মাকে চো*র অপবাদ দিয়ে পাপ করেছিলেন। যদি সবার সামনে মাথা নত করে নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেন, তবেই ২০ লাখ টাকার চেক আপনার হাতে যাবে।"

আমার শর্ত শুনে চাচার মুখটা মুহূর্তের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। যে অহংকারী মানুষটা সারাজীবন আমাদের মানুষ বলেই গণ্য করেনি, আজ তাকে পুরো গ্রামের সামনে মাথা নিচু করতে হবে! কিন্তু ছেলের জেলের ভ''য়ে উনার আর কোনো উপায় ছিল না। চাচা কোনোমতে মাথা নেড়ে বললেন, "আমি রাজি বাবা, আমি রাজি।"

চাচা চলে যাওয়ার পর আমি মেম্বার সাহেবের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করে উনার ছেলেকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করলাম কারন হাজার ভুল হলেও সে আমার বাবার বড় ভাই। টাকা পেয়ে চাচা-চাচির জান বাঁচল ঠিকই, কিন্তু ১০টি দিন উনাদের কাটল চরম এক মানসিক যন্ত্র*ণার মধ্য দিয়ে।

দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এলো। আমাদের ডুপ্লেক্স বাড়ির কাজ পুরোপুরি শেষ। বাড়িটি যেমন সুন্দর হয়েছে, তেমনি আধুনিক করা হয়েছে এর রান্নাঘরটি। বাড়ির ভেতরে বড় করে তৈরি করা ডাইনিং স্পেসের সামনে যখন মাকে নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম, মায়ের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। যে মা একদিন মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বিকেলে বাটিতে করে বেঁচে যাওয়া খাবার এনে আমার মুখে তুলে দিতেন, আজ তিনি এই বিশাল সুন্দর বাড়ির মালকিন। মায়ের মাথায় হাত রেখে বললাম, "আম্মা, তোমার কষ্টের দিন আজ থেকে চিরতরে শেষ।"

দুপুর গড়াতেই আমাদের বাড়ির বিশাল উঠোনে গ্রামের মানুষের ভিড় জমতে শুরু করল। পুরো গ্রামের ধনী-গরিব সব মানুষকে আমি দাওয়াত করেছিলাম। উঠোনের এক কোণে বড় বড় ডেকচিতে রান্না চড়েছিল পোলাও আর খাসির মাংসের। মাংস কষানোর সেই সুবাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তেই আমার স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল ১২ বছর আগের সেই দুপুর। সেদিন এক টুকরো মাংস মুখে দেওয়ায় চো*র অপবাদ শুনতে হয়েছিল, আর আজ ডেকচি ডেকচি মাংস রান্না হচ্ছে আমার নিজের বাড়িতে।

খাওয়াদাওয়া শুরু হওয়ার ঠিক আগে, আমি মেম্বার সাহেব আর মাতব্বরদের ইশারায় মাঝখানের মূল মঞ্চে ডাকলাম। পুরো গ্রামের মানুষ খাওয়া বন্ধ করে উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল। আমি মাকে এনে একটা চেয়ারে বসালাম।

তারপর চাচা আর চাচিকে সামনে ডেকে আনা হলো। গ্রামের শত শত মানুষের উৎসুক চোখের সামনে চাচা আর চাচি কাঁপতে কাঁপতে এসে আমার মায়ের সামনে দাঁড়ালেন। চাচির সেই হিং*স্র রূপ আজ উধাও, সেখানে কেবল লজ্জার কালো মলাট।

চাচা হাত জোড় করে সবার সামনে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ছোট বউ, আমাদের মাফ করে দাও। আমরা তোমার ওপর বড় অন্যায় করেছিলাম। মেহমানদের সামনে তোমাদের চো*র সাজিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আজ আমাদের পাপের শাস্তি আমরা পেয়েছি। আমাদের ক্ষমা করো।"

চাচির চোখ দিয়েও তখন টপটপ করে জল পড়ছিল। তিনি কোনোমতে বললেন, "আমারে মাফ কইরা দাও ছোট বউ।"

পুরো মজলিশে তখন পিনপতন নীরবতা। গ্রামের মানুষ ফিসফিস করে বলতে লাগল—অন্যায় করলে খোদা এই দুনিয়াতেই তার বিচার করেন। মা আমার চিরকালের নরম মনের মানুষ। চাচা-চাচির এই অবস্থা দেখে উনার চোখও ভিজে উঠল। মা চেয়ার থেকে উঠে উনাদের হাত নামিয়ে দিয়ে বললেন, "ঠিক আছে ভাই, ঠিক আছে আপা। যা হওয়ার হয়ে গেছে, আমি আর কোনো ক্ষোভ মনে রাখিনি। আল্লাহ আপনাদের ভালো করুক।"

আমার বুকের ভেতর এত বছর ধরে চেপে থাকা এক মহাসমুদ্র সমান ভারী পাথর যেন এক নিমেষেই নেমে গেল। এই দৃশ্যটি দেখার জন্যই আমি মরুভূমির ৫০ ডিগ্রি গরমে দিন-রাত এক করে র*ক্ত পানি করেছিলাম। আজ আমার মায়ের সম্মান আমি ফিরিয়ে দিতে পেরেছি।

এরপর শুরু হলো ভোজের মূল পর্ব। আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গ্রামের সব গরিব-দুঃখী মানুষ আর ছোট ছোট বাচ্চাদের পাতে পাতে গরম পোলাও আর মাংসের বড় বড় টুকরো তুলে দিতে লাগলাম। বাচ্চাদের তৃপ্তি করে খাওয়ার দৃশ্য দেখে আমার চোখ দুটো ভিজে উঠছিল।

সবার খাওয়া শেষ হলে, মা নিজের হাতে এক প্লেট গরম পোলাও আর মাংস নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। নিজের আঁচল দিয়ে আমার কপালের ঘাম মুছে দিয়ে মা পরম মমতায় প্রথম লোকমাটা আমার মুখে তুলে দিলেন।

মাংসের সেই স্বাদটা যখন আমার জিহ্বায় লাগল, তখন আমার মনে হলো—আজ আর এতে কোনো বি*ষ নেই, কোনো ভয় নেই। এ যেন এক পরম বিজয়ের অমৃত স্বাদ। মায়ের মুখের সেই চওড়া আর তৃপ্তির হাসি দেখার পর আমার মনে হলো, আজ থেকে সোহানের শৈশবের সেই তীব্র ক্ষুধা, অপমান আর ‘অভাব’ শব্দটা চিরতরে ঘুচে গেছে।

(সমাপ্ত)

কেমন লাগলো? আশা করি গঠনমূলক কমেন্ট করে জানিয়ে যাবেন।

এক প্লেট ভাতের আশায় ১২ বছর বয়সে চাচার ঘরের মেজেতে বসে টিভি দেখার বাহানায় বসে থাকতাম। তারা আমার সামনে খাবার খেতো কিন্তু আ...
20/08/2026

এক প্লেট ভাতের আশায় ১২ বছর বয়সে চাচার ঘরের মেজেতে বসে টিভি দেখার বাহানায় বসে থাকতাম। তারা আমার সামনে খাবার খেতো কিন্তু আমাকে কখনো বলতো না। আয় সোহান ভাত খা কয়টা সকাল থেকে তো না খেয়ে বসে আছিস। কিন্তু তারা কখনো এটা বলতো না। তাদের খাওয়া শেষ হলে আমি মন খারাপ করে ঘর থেকে চলে আসতাম। আর মায়ের জন্য অপেক্ষা করতাম বিকেল পযন্ত।

আমার বাবা যখন স্ট্রোক করে মা**রা গেলেন । আমাদের মাথার ওপরের আকাশটা যেন এক নিমেষেই ভেঙে চুরমা*র হয়ে গেল। বাবা মা**রা যাওয়ার পর আমাদের র**ক্ত মাংসের আপন চাচা রাতারাতি কেমন যেন পর হয়ে গেলেন। যে মানুষটা বাবার জানাজায় দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিলেন, তিনিই কদিন পর থেকে আমাদের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। মা আর আমার জীবনের কষ্টের দিনগুলো ঠিক তখন থেকেই শুরু।
​ক্ষুধা জিনিসটা বড় বালাই। ১২ বছরের একটা বাচ্চার পেট তো আর বোঝে না যে তার বাবা নেই, ঘরে চাল নেই। সকাল থেকে পেটে এক দানা দানাপানি পড়েনি। দুপুরের দিকে যখন ক্ষুধার তীব্রতায় পেটটা চোঁ-চোঁ করত, তখন আমি নিরুপায় হয়ে চাচার ঘরের দিকে হেঁটে যেতাম।
​চাচার ঘরের মেঝেতে বসে থাকার আমার একটা চেনা বাহানা ছিল—টিভি দেখা। তখন গ্রামে খুব বেশি ঘরে রঙিন টিভি ছিল না। চাচার ঘরে রঙিন টিভি চলত, আর আমি এককোণে গুটিসুটি মে*রে বসে থাকতাম। আমার চোখ টিভির পর্দায় থাকত ঠিকই, কিন্তু কান দুটো পড়ে থাকত রান্নাঘরের দিকে। কখন থালাবাসনের শব্দ হবে, কখন খাবার টেবিলে সাজানো হবে।
​একটু পরেই চাচি এসে খাবার বেড়ে দিতেন। চাচা, চাচাতো ভাইয়েরা সবাই মিলে গোল হয়ে বসতেন। তরকারির সুগন্ধ যখন আমার নাকে আসত, তখন মুখ ভরে লালা চলে আসত। আমি আড়চোখে দেখতাম ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর মাছের ঝোল। তারা আমার সামনেই আয়েশ করে করে খাবার খেতেন, চিবানোর শব্দ হতো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, কেউ একটিবারের জন্যও আমার দিকে তাকিয়ে বলত না—
​"আয় সোহান, ভাত খা কয়টা। সকাল থেকে তো না খেয়ে বসে আছিস।"
​না, তারা কেউ এই কথাটি কোনোদিন বলেনি। আমি টিভির দিকে তাকিয়ে শুকনো থুতু গিলতাম আর মনে মনে ভাবতাম, কেউ একজন অন্তত ডাকুক। কিন্তু তাদের খাওয়া শেষ হয়ে যেত, তারা হাত ধুয়ে উঠে যেতেন। কেউ আমার দিকে একটা রুটি বা এক দলা ভাতও বাড়িয়ে দিত না। যখন বুঝতাম আর কোনো আশা নেই, তখন তীব্র এক মন খারাপ আর চোখে জল নিয়ে গুটিসুটি মে*রে চাচার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতাম।

​নিজের ভাঙা ঘরের বারান্দায় এসে বসে থাকতাম। মা মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতে যেতেন সকালবেলা। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতো, আমার চোখ দুটো তাকিয়ে থাকত রাস্তার দিকে—কখন মা ফিরবে? মা যখন বিকেলে ক্লান্ত শরীরে আঁচলে করে বা কোনো বাটিতে করে মানুষের বাড়ির বেঁচে যাওয়া খাবার নিয়ে আসতেন, তখন মনে হতো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হাতে পেয়েছি। মা নিজের মুখে এক লোকমা না দিয়ে আমার মুখে তুলে দিতেন, আর আমি গোগ্রাসে তা গিলতাম।
​এরই মধ্যে মাঝে মাঝে একটু আনন্দের আলো আসত। আমাদের বড় চাচাতো বোন, যিনি শহরে থাকতেন। তিনি যখন মাঝে মাঝে গ্রামে আসতেন, তার মনটা ছিল খুব নরম। আমাকে দেখলেই ডেকে বলতেন, "সোহান, এদিকে আয়। এই নে মিষ্টি খা, ফল খা।" চাচির চোখের আড়ালে তিনি আমাকে এটা সেটা খেতে দিতেন। উনার ভালোবাসাটুকু পেয়ে আমার মনে হতো, এ পৃথিবীতে মা ছাড়া আমিও বোধহয় কারো আপন। কিন্তু কপাল খারাপ, কিছুদিন পরই উনার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর তিনি পুরোপুরি সংসারী হয়ে গেলেন, গ্রামে আসা কমে গেল। আর সেই সাথে চাচার ঘর থেকে আমার ওই সামান্য ভাগটুকুও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।

​দিন তো আর থেমে থাকে না। ক্ষুধা আর অপমা*নকে সঙ্গী করেই আমি আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম। শরীরে একটু শক্তি আসতেই আমি আর মায়ের ওপর পুরো বোঝা হয়ে থাকতে চাইলাম না। গ্রামের মানুষের জমিতে, হাটে-বাজারে ছোটখাটো টুকটাক কাজ করে দিতে লাগলাম। কেউ বিশ টাকা দেয়, কেউ খুশি হয়ে দুটো খেতে দেয়। এভাবেই আমাদের মা-ছেলের টানাটানির সংসার কোনোমতে চলতে লাগল। কষ্টের দিনগুলোর মধ্যেই আমি কৈশোর পেরিয়ে একটু একটু করে তরতাজা তরুণ হয়ে উঠছি।
​ঠিক এই রকম এক সময়ে, সেদিন দুপুরে চাচার বাড়িতে এক বিশাল শোরগোল। শহর থেকে চাচির বড় বোন, তার স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। ধনী আত্মীয়, তাই চাচার বাড়িতে এলাহী কাণ্ড। বাজার থেকে রুই মাছ, খাসির মাংস, পোলাওয়ের চাল—সব আনা হয়েছে।
​হঠাৎ চাচি আমাদের ঘরের সামনে এসে মাকে ডেকে বললেন, "ও সোহানের মা, ঘরে মেহমান আসছে। একলা হাতে সব রান্ধন পারতাছি না। একটু আইসা হাত লাগাও তো।"
​মা আমার চিরকালই সরল আর পরোপকারী। চাচির ডাক শুনে মা নিজের ঘরের কাজ ফেলে মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে চলে গেলেন চাচার রান্নাঘরে। মা পোলাও চড়ালেন, খাসির মাংস কষাতে লাগলেন। মাংস কষানোর সেই স্বর্গীয় সুবাস আমাদের ঘর পর্যন্ত আসছিল। রান্নাঘরে মা হাসিমুখে চাচির সাথে কাজ করছেন, আর সুস্বাদু সব পদ রাঁধছেন।
​দূর থেকে মায়ের সেই রান্নার দৃশ্য দেখে আমার মনে এক চিলতে আশার আলো জাগল। আমি ভাবলাম, মা যখন নিজের হাতে এত ভালো ভালো রান্না করছে, চাচি নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আজ আমাদের মা-ছেলেকেও একটু খেতে দেবে। অন্তত মেহমানরা খাওয়ার পর মা আর আমার পাতেও একটু মাংস-পোলাও জুটবে।
​টানা কয়েকদিন ধরে ভালো কোনো খাবার পেটে পড়েনি। খাসির মাংসের সেই সুবাসে আমার জিভে জল চলে এলো। আমি আর লোভ সামলাতে পারলাম না। পা টিপে টিপে রান্নাঘরের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চাচি তখন অন্য ঘরে মেহমানদের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। মা একা একা মাংসের ডেকচি নাড়ছেন।
​আমি চুপিচুপি রান্নাঘরের ভেতরে ঢুকে মায়ের শাড়ির আঁচল টানলাম। ফিসফিস করে বললাম, "আম্মা, আমারে এক টুকরো মাংস দেও না এখান থেকে? খুব ক্ষুধা লাগছে আম্মা, একটুখানি দেও।"
​মা আমার কথা শুনে চমকে উঠলেন। উনার চোখ দুটো ভয়ে আর আত*ঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। মা হড়বড় করে চারপাশটা দেখে নিয়ে আমার হাতটা চেপে ধরে সরাসরি না করে দিলেন, "হায় হায় বাজান! এগুলো বলিস না এখন। তোর চাচি যদি দেখে তুই এখান থেকে মাংস খাচ্ছিস, তা হলে আর রেহায় থাকবে না। আমাদের পিঠের চা*মড়া তুলে নেবে। যা এখান থেকে, পরে দেখব।"
​কিন্তু ক্ষুধার্ত ১২-১৩ বছরের জেদের কাছে তখন মায়ের ভয় হেরে গেল। আমি মায়ের বারণ শুনলাম না। ডেকচির পাশেই একটা বাটিতে কষানো মাংসের কয়েকটা টুকরো রাখা ছিল মেহমানদের দেওয়ার জন্য। আমি মায়ের চোখের তোয়াক্কা না করে, লোভ সামলাতে না পেরে চট করে হাত বাড়িয়ে সেখান থেকে বড় এক টুকরো মাংস তুলে নিলাম।
​মা "না না" করে ওঠার আগেই আমি সেই গরম মাংসের টুকরোটা মুখে পুরে দিলাম। মাংসের স্বাদটা জিহ্বায় লাগার সাথে সাথেই আমার মনে হলো যেন অমৃত খাচ্ছি। কিন্তু সেই সুখ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থায়ী ছিল।
​"ওরে চু*রের দল! ঘর তো না, চোরের আস্তানা বানাইছে!"
​হঠাৎ দরজার গোড়া থেকে এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল। আমি চমকে তাকিয়ে দেখি, চাচি দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। উনার চোখ দুটো রাগে লাল, আর মুখটা হিং*স্র দেখাল।
​চাচি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে রান্নাঘরে ঢুকে আমার হাতটা ঝটকা মে*রে ধরলেন। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগলেন, "চো*রের ঘরের চো*র! যেমন মা, তেমন তার পোলা! নিজে তো চো*র, এখন পোলারেও চু*রি করে মাংস খাওয়ানো শিখাইতাছে! মানুষের বাড়ির মেহমানের খাবার চু*রি করতে তরগো লজ্জা করে না?"
​মায়ের মুখটা পলকে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মা হাতজোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, "আপা, আমার পোলডারে বইকেন না। ও ছোট মানুষ, লোভ সামলাইতে পারে নাই। ও চু*রি করে নাই আপা..."
​কিন্তু চাচি তখন থামার পাত্র নন। তিনি উঠোনে গিয়ে চিৎকার করে চাচাকে শোনানোর জন্য বলতে লাগলেন, "সবাই আইসা দেখে যাও, চো*রের মা ছেলেকে চু*রি করে মাংস খাওয়াচ্ছে! এদের ঘরে আশ্রয় দেওয়াই আমাদের ভুল হইছে!"
​মুখের ভেতর সেই মাংসের টুকরোটা তখন আমার কাছে বিষের মতো লাগছিল। আমার চোখের সামনে আমার মায়ের আঁচলটা অপমা*নে কাঁপতে লাগল।

চলবে..

✴️অভাব
✴️পর্ব ০১
✴️ভালো লাগলে প্রথম পর্বটি শেয়ার করে পাশে থাকবেন।
✴️প্লিজ শেয়ার করবেন
খুব শীঘ্রই দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে দ্বিতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।

Address

Gaffargaon

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Ahassn Habib posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Ahassn Habib:

Shortcuts

Share