10/05/2026
আমার আজকের কথাগুলো কে কিভাবে গ্রহণ করবেন জানি না। কেউ হয়তো সহমত হবেন, কেউ ভিন্নমত পোষণ করবেন। তবুও বাস্তবতার কিছু দৃশ্য, কিছু সফলতা কিংবা কিছু ব্যর্থতা মানুষকে বারবার ভাবিয়ে তোলে। সময়ের পরিক্রমায় কিছু ঘটনা মানুষের চিন্তার জগতকে নাড়িয়ে দেয়। আর সেই ভাবনা থেকেই আজ কিছু কথা বলতে ইচ্ছে হলো।
একজন মানুষ তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কী কী প্রয়োজন ! সেটা একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তবুও জীবনের কিছু জটিল মোড়ে এসে মানুষকে অভিজ্ঞদের কাছ থেকেও শিখতে হয়, বুঝতে হয়, উপলব্ধি করতে হয়। কারণ জীবন শুধু আবেগের নাম নয়; জীবন হলো অভিজ্ঞতা, ধৈর্য, সংগ্রাম ও আত্মবিশ্বাসের এক দীর্ঘ পথচলা।
সে ক্ষেত্রে একজন মানুষের জন্য প্রয়োজন জনসম্পৃক্ততা, আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা, ধৈর্য, সাহসিকতা, দূরদর্শিতা এবং আদম্য ইচ্ছাশক্তি। তবে সব কিছুর মাঝেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “সততা”। কারণ সততা এমন এক শক্তি, যা মানুষকে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা জনপ্রিয়তা সাময়িকভাবে মানুষকে সামনে আনতে পারে; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সম্মান এনে দেয় কেবল সততা ও চরিত্র।
আল্লাহ তাআলা বলেন ( إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الصَّادِقِينَ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্যবাদীদের ভালোবাসেন।” সূরা আত-তাওবা : ১১৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ، فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ
“তোমরা সত্যবাদিতা অবলম্বন করো। কারণ সত্যবাদিতা মানুষকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করে।” সহীহ মুসলিম।
কর্মক্ষেত্রে সততার কোনো বিকল্প নেই। একজন মানুষ যখন সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়, তখন তার সফলতার পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। তারই একটি আলোচিত উদাহরণ দেখিয়েছে দক্ষিণী চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা থালাপতি বিজয়। শুরু থেকেই রাজনৈতিক মাঠে তার তেমন সরব উপস্থিতি ছিল না। রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ইতিহাসও ছিল না। কিন্তু দল গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের জন্য একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়, তাই না?কীভাবে সম্ভব হলো?
অথচ আমাদের দেশে নতুন-পুরাতন শত শত রাজনৈতিক দল রয়েছে। কিন্তু ঘুরেফিরে ক্ষমতার চেয়ার সীমাবদ্ধ থাকে কয়েকটি দলের মাঝেই। প্রশ্ন হলো তা কেন হয়?
আল্লাহ তাআলা বলেন ( وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ )
“মানুষের জন্য তাই রয়েছে, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” সূরা আন-নাজম : ৩৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ إِذَا عَمِلَ أَحَدُكُمْ عَمَلًا أَنْ يُتْقِنَهُ
“তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজ করে, আল্লাহ ভালোবাসেন সে যেন তা সুন্দরভাবে ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করে।” বায়হাকী।
আজ যেভাবে তিনি সফলতার মুখ দেখতে পেরেছেন, তার পেছনে আমার জানামতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাহসিকতা, জনমত এবং সর্বোপরি “ঐক্য”। এলাকা ভিত্তিক কমিউনিটি শক্তি ছিল তার অন্যতম বড় ভিত্তি। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি মানুষের মাঝে ঐক্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কোনো ধরনের বিক্ষিপ্ততা তাকে দুর্বল করতে পারেনি। তিনি যেমন অন্যদের গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি অন্যরাও তাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। পারস্পরিক সম্মানবোধ ও আস্থার জায়গাটাই তাকে দ্রুত সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন ( وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا )
“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” সূরা আলে ইমরান : ১০৩
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন يَدُ اللَّهِ مَعَ الْجَمَاعَةِ
আল্লাহর সাহায্য জামাআতের (ঐক্যের) সাথে থাকে।” সুনান তিরমিযী।
এখন ঠিক সেই দিকগুলো আমাদের দেশের ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে একবার ভেবে দেখুন তো! কল্পনা করা যায়?
আমি যেহেতু মুসলিম, তাই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামপন্থী দলগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেব। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছি—একসময় বাংলাদেশে ইসলামী ধারার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম সীমিত ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিভক্ত হতে হতে অসংখ্য দল ও উপদলে রূপ নিয়েছে। কত দল, কত সংগঠন, তার যেন শেষ নেই। সংগঠনের নাম লিখতে গেলে হয়তো কলমের কালি শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তালিকা শেষ হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন ( وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ )
“তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না, তাহলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং তোমাদের শক্তি বিলীন হয়ে যাবে।” সূরা আল-আনফাল : ৪৬
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا
“এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীরসদৃশ; এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।” সহীহ বুখারী ও মুসলিম।
প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলো কেন আজও কাঙ্ক্ষিত সফলতার মুখ দেখতে পারলো না? কমতিটা কোথায়? কেন এত বিক্ষিপ্ততা? কেন এই বিচ্ছিন্নতা?
কখনো কি আমরা গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করেছি? আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো যখনই কোনো সমস্যা এসেছে, তখন সেটার সমাধান করার পরিবর্তে নতুন দল গঠন করাটাই যেন সহজ সমাধান মনে করা হয়েছে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, চেয়ারম্যান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, শীর্ষস্থানে থাকার ইচ্ছা ,
এসব বিষয় ধীরে ধীরে ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভক্তির জন্ম দিয়েছে।
ফলে যুগের পর যুগ ধরে অনৈক্য চলছেই। আর যারা এই অনৈক্য দূর করতে এগিয়ে এসেছে, তাদেরকেই অনেক সময় সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু বানিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ জনহিতকর কোনো কাজ নিয়ে এগিয়ে এলেও তাকে উৎসাহ না দিয়ে বরং কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য—আমরা সমালোচনা করতে যতটা পারদর্শী, সহযোগিতা করতে ততটা পারিনি। আমরা বিভক্ত হতে শিখেছি, কিন্তু এক হতে শিখিনি। আমরা নেতৃত্ব চাই, কিন্তু নেতৃত্বকে সহযোগিতা করতে শিখিনি। এসব কারণই আজ ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বলতার অন্যতম বড় কারণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন ( إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ )
নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।” সূরা আল-হুজুরাত : ১০
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَبَاغَضُوا وَلَا تَدَابَرُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا
“তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, বিদ্বেষ পোষণ করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না; বরং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো।” সহীহ মুসলিম।
তাই আমি মনে করি—আমাদের দেশের ইসলামী দলগুলোর উচিত সব জায়গা থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করা। অন্তত থালাপতি বিজয়-এর রাজনৈতিক উত্থান, তার জনসম্পৃক্ততা, ঐক্য ধরে রাখার কৌশল এবং সফলতার পেছনের কারণগুলো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা। কারণ সফলতার জন্য শুধু আবেগ নয়; প্রয়োজন ঐক্য, পারস্পরিক সম্মান, সাংগঠনিক দৃঢ়তা, নেতৃত্বের সততা এবং মানুষের আস্থা অর্জন।
আল্লাহ তাআলা বলেন ( وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ )
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।” সূরা আল-মায়িদা : ২
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন الْمُؤْمِنُ مِرْآةُ الْمُؤْمِنِ
“এক মুমিন অপর মুমিনের আয়না স্বরূপ।” সুনান আবু দাউদ।
হয়তো যেদিন ব্যক্তি-স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে উম্মাহর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, যেদিন বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতি শুরু হবে, সেদিনই ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনে সত্যিকারের শক্তি ফিরে আসবে। আর ঐক্য ফিরে এলে সফলতাও একদিন দরজায় কড়া নাড়বেই, ইনশাআল্লাহ।
— তৈয়িবী, গাজীপুর।