Mufti Harun Siddik

Mufti Harun Siddik ইসলামের সঠিক তথ্য প্রচার করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

মুজাফফার বিন মুহসিনের কবলে তারাবির নামাজমুযাফফার বিন মুহসিনের একটি বই আমাদের হস্তগত হয়েছে। নাম হল ‘তারাবীর রাক‘আত সংখ্যা...
22/02/2026

মুজাফফার বিন মুহসিনের কবলে তারাবির নামাজ

মুযাফফার বিন মুহসিনের একটি বই আমাদের হস্তগত হয়েছে। নাম হল ‘তারাবীর রাক‘আত সংখ্যা:একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ । আসলে তিনি তাত্তি¡ক শব্দকে অপমান করেছেন। কেননা তিনি যা করেছেন, হাদীসের একজন প্রাথমিক তালিবুল ইলমও সেগুলো দেখে অবাক হয়ে যাবে!

হাদীস শাস্ত্রে এমন অপরিপক্ক ব্যক্তি কীভাবে হাদীস তাসহীহ এবং তাযয়ীফের মত কঠিন কাজে হাত দিতে পারে! বহু জায়গায় তিনি মারুফ এর অনুবাদ করেছেন মাজহুলের! সে কিতাবে তিনি তাহকীকের নামে বিশ রাকাতের তারাবীর ব্যাপারে সাইব বিন ইয়াজিদ রহঃ এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসকে জাল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেছেন! কিন্তু সেখানের দেড় পৃষ্টায় তিনি সতেরোটি কাচা ভুল করেছেন। এর অনেকগুলো হল রীতিমত জালিয়াতি এবং দাগাবাজি।

প্রথমে আমরা সাইদ ইবনে ইয়াযিদ রহঃ থেকে বর্ণিত হাদীসটি দেখুন। ইমাম বায়হাকী রহঃ ‘আস সুনানুল কুবরাতে’ উল্লেখ করেছেন।
عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ قَالَ : كَانُوا يَقُومُونَ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ فِى شَهْرِ رَمَضَانَ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً – قَالَ – وَكَانُوا يَقْرَءُونَ بِالْمِئِينِ ، وَكَانُوا يَتَوَكَّئُونَ عَلَى عُصِيِّهِمْ فِى عَهْدِ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ مِنْ شِدَّةِ الْقِيَامِ.
সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর (রাঃ)-এর যামানায় রামাযানে মাসে লোকেরা ২০ রাকাআত নামায আদায় করত।

এ হাদীস উল্লেখ করার পর মুযাফফার বিন মুহসিন বলেন: “ বর্ণনাটি জাল। এটি তিনটি দোষে দুষ্ট”।( তারাবীহর রাকাআত সংখ্যা: একটি তাত্তি¡ক বিশ্লেষণ, পৃষ্টা নং, ২৮)

প্রথম কথা হল, এ হাদীসকে মুযাফফার বিন মুহসিনের পূর্বে পৃথিবীর কোন মুহাদ্দিস জাল বলেননি। এমনকি খোদ আহলে হাদীসদের মাথঅর তাজ আবদুর রহমান মুবারকপুরী এবং আলবানী মরহুমও জাল বলেননি। দেখুন, হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসরা কি বলেন?

ইমাম নববী রহঃ বলেন-
وَعَن السَّائِب بن يزِيد الصَّحَابِيّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْه ، قَالَ : ” كَانُوا يقومُونَ عَلَى عهد عمر بن الْخطاب رَضِيَ اللَّهُ عَنْه فِي شهر رَمَضَان بِعشْرين رَكْعَة ، وَكَانُوا يقراؤون بالمئين ، وَكَانُوا يتوكؤون عَلَى عصيهم فِي عهد عُثْمَان من شدَّة الْقيام ” رَوَاهُ الْبَيْهَقِيّ بِإِسْنَاد صَحِيح
ইমাম নববী (৬৬৪হিঃ) হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন: ইমাম বায়হাকী হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন। (. খুলাসাতুল আহকাম, ১/৫৭৬. মুআসসিসাতুর রিসালাহ)

ইমাম ইরাকী রহ. (৮০৬ হিঃ) বলেন-
وفي سنن البيهقي بإسناد صحيح عن السائب بن يزيد رضي الله عنه قال كانوا يقومون على عهد عمر بن الخطاب رضي الله عنه في شهر رمضان بعشرين ركعة
অর্থাৎ, ইমাম বায়হাকী রহঃ সহীহ সনদে সাইব ইবনে ইয়াযিদের হাদীস বর্ণনা করেছেন। (ত্বারাহুত তাছরীব, ৩/৮৮. দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)

হাফেজ বদরুদ্দীন আইনী রহ. বলেন-
رواه البيهقي بإسناد صحيح عن السائب بن يزيد الصحابي قال كانوا يقومون على عهد عمر رضي الله تعالى عنه بعشرين ركعة
অর্থাৎ, ইমাম বায়হাকী রহ. সহীহ সনদে সাইব ইবনে ইয়াযিদের হাদীস বর্ণনা করেছেন। (উমদাতুল কারী, ৮/৪৮৫. মাকতাবাতুশ শামেলা)

হাফেজ ইবনুল মুলাক্কিন রহ. বলেন-
وَرَوَى الْبَيْهَقِيّ بِإِسْنَاد صَحِيح عَن عمر ্রأَن النَّاس كَانُوا يقومُونَ عَلَى (عَهده) بِعشْرين رَكْعَةগ্ধ
অর্থাৎ, ইমাম বায়হাকী সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। (আল বাদরুল মুনীর, ৪/৩৫০. দারুল হিজরাহ)

ইমাম যায়লায়ী রহ. বলেন-
عَنْ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ، قَالَ: كُنَّا نَقُومُ فِي زَمَنِ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ بِعِشْرِينَ رَكْعَةً وَالْوِتْرِ، انْتَهَى. قَالَ النَّوَوِيُّ فِي “الْخُلَاصَةِ১”: إسْنَادُهُ صَحِيحٌ،
অর্থাৎ, তিনি ইমাম নববীর কথাকে নকল করেছেন। তিনি বলেন: হাদীসের সনদ সহীহ। (নাসবুর রায়াহ, ২/১৫৪. আল্লামা ইউসুফ বানুরী তাহকীককৃত)

এ তালিকা আরো দীর্ঘ হতে পারে। দেখুন, কতজন মুহাদ্দিস হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। কোন মুহাদ্দিস এটাকে জাল বলেননি। এমন হাদীসকে মুযাফফার সাহেব একেবারে জাল বানিয়ে ফেললেন!
এরপর মুযাফফার বিন মুহসিন লিখেন: প্রথমত এর সনদে আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুবী আদ- দাইনুরী নামক রাবী আছে। সে মুহাদ্দিসদের নিকট অপরিচিত। রিজাল শাস্ত্রে এর কোন অস্তিত্ব নেই।

এ কয়েক লাইনে মুযাফফার বিন মুহসিন কয়েকটি অমার্জনীয় ভুল করেছেন। তিনি বলেছেন: এ হাদীসে একজন বর্ণনাকারী হলেন আব্দুল্লাহ ইবনে ফানযুবী, তিনি মাজহুল। কিন্তু আমরা দেখি যে, এ হাদীসের আরো সনদ রয়েছে, যেখানে উক্ত রাবী নেই। তখনতো আর হাদীসকে জাল বলা যাবে না। কারণ উক্ত মাজহুল রাবী নেই। ইমাম ইবনুল জা’দ রহ. স্বীয় “মুসনাদ” এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। সে বর্ণনায় উক্ত রাবী নেই।
حدثنا علي أنا بن أبي ذئب عن يزيد بن خصيفة عن السائب بن يزيد قال كانوا يقومون على عهد عمر في شهر رمضان بعشرين ركعة وإن كانوا ليقرءون بالمئين من القرآن
অর্থাৎ, ইবনুল জা’দ বর্ণনা করেন আলী থেকে, তিনি ইবনু আবি যি’ব থেকে, তিনি ইয়াযিদ বিন খুসাইফা থেকে, তিনি সাইব ইবনে ইয়াযিদ থেকে বর্ণনা করেন। (মুসনাদু ইবনুল জা’দ, হাদীস নং, ২৮২৫. মুআসসিসা নাদের, বায়রুত)

এমনিভাবে ইমাম বায়হাকী রহ. “মা’রিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার” এ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। সে সনদেও আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুবি নেই।
أخبرنا أبو طاهر الفقيه قال : أخبرنا أبو عثمان البصري قال : حدثنا أبو أحمد محمد بن عبد الوهاب قال : أخبرنا خالد بن مخلد قال : حدثنا محمد بن جعفر قال : حدثني يزيد بن خصيفة ، عن السائب بن يزيد قال : ্র كنا نقوم في زمان عمر بن الخطاب بعشرين ركعة والوتر গ্ধ وأخبرنا أبو زكريا قال : أخبرنا أبو الحسن الطرائفي قال : حدثنا عثمان بن سعيد قال : حدثنا يحيى بن بكير قال : حدثنا مالك قال : وحدثنا القعنبي فيما قرأ على مالك ، عن يزيد بن رومان ، أنه قال : ্র كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة গ্ধ
অর্থাৎ, খালেদ বর্ণনা করেন মুহাম্মাদ জাফর থেকে, তিনি ইয়াযিদ বিন খুসাইফা থেকে, তিনি সাইব ইবনে ইয়াযিদ থেকে বর্ণনা করেন। (মা’রেফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, ১১৪৩. মাকতাবাতুশ শামেলা)
মুযাফফার বিন মুহসিন কি নির্লজ্জভাবে এ সমস্ত সনদ একেবারে চেপে গেলেন! এ হাদীসের যে আরো অনেকগুলো সনদ রয়েছে, সেগুলোর কথা তিনি একটিবারও উল্লেখ করেননি! একটি সনদে একজন রাবীর কারণে পুরো হাদীসকে একেবারে জাল বানিয়ে ফেললেন!

দ্বিতীয়ত: তিনি বলেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে ফানযুবী অপরিচিত, রিজাল শাস্ত্রে এর কেন অস্তিত্ব নেই। এটি মুযাফফার বিন মুহসিনের চরম মূর্খতার প্রমাণ। কারণ আব্দুল্লাহ হলেন হাফিজুল হাদীস। প্রসিদ্ধ ইমাম। দেখুন ইমাম রিজাল শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমাম শামছুদ্দীন যাহাবী রহঃ তার সম্পর্কে কি বলেন:
والمحدث أبو عبد الله الحسين بن محمد الحسين بن عبد الله فنجوية الثقفي الدينوري الحافظ بنيسابور.
অর্থাৎ, আবু আব্দুল্লাহ ইবনে ফানজুয়াহ, প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস, তিনি ছিলেন হাফিজুল হাদীস।( তারিখুল ইসলাম, ৩/২৪৪)

ইবনুল আছির যাজারী তার সম্পর্কে লিখেন-
عرف بها أبو عبد الله الحسين محمد بن الحسين بن فنجوية الفنجوبي الدينوري الحافظ. روى عن أبي الفتح محمد بن الحسين الأزدي الموصلي أبي بكر بن مالك القطعي وغيرهما . روى عنه أبو إسحاق الثعلبي فأكثر في تفسيره. ويذكره كثيرا فيقول أخبرنا الفنجوبي.
অর্থাৎ, ফানজুবী নিসবতে প্রসিদ্ধ হলেন, আব্দুল্লাহ হুসাইন ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে হুসাইন ফানজুয়াহ আল ফানজুবী। যিনি হাফেযুল হাদীস ছিলেন। আবুল ফাত্হ আল আযদী আল মাওসীলি এবং আবু বকর ইবনে মালিক আল ক্বাতিয়ীসহ অন্যান্যদের থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তার থেকে আবু ইসহাক আস ছা’লাবী স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে অনেক রেওয়ায়াত এনেছেন।( তারবীর নামায, হাবীবুর রহমান আযমী, পৃষ্টা নং, ৫৬. দারুল উলুম লাইব্রেরী, ঢাকা)

এ রকম একজন হাফিজুল হাদীস সম্পর্কে মুযাফফার বিন মুহসিন বললেন: আব্দুল্লাহ ইবনে ফানযুবী অপরিচিত, রিজাল শাস্ত্রে এর কেন অস্তিত্ব নেই। তার জ্ঞানের দৈন্যতা এ সকল ক্ষেত্রে এসে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। কি পরিমাণ স্পর্ধা তার! একজন হাফিজুল হাদীসের ব্যাপারে বলছেন: রিজাল শাস্ত্রে তার কোন অস্তিত্ব নেই! হয়ত তিনি মূর্খ, অথবা জ্ঞান পাপী। আল্লাহ তাদের থেকে আমাদের হেফাজত করুন।

এ ইবারতে মুযাফফার বিন মুহসিন সাহেব লিখেছেন আদ- দায়নুরী। সেটা মারাত্বক ভুল। কেননা শুদ্ধ হল আদ দিইনাওয়ারী। দিইনাওয়ার নামক প্রসিদ্ধ শহরের দিকে নিসবত করে। ইয়াকুত আল হামাবী তদ্বীয় “ মু’যামুল বুলদান”এ দিইনাওয়ারেরর অনেক মুহাদ্দিসের কথা উল্লেখ করেছেন। দিনাওয়ারকে দাইনুর বলার দ্বারা আরবী ভাষায় তার কি বেহাল দশা, তা উলঙ্গভাবে প্রকাশ পেয়েছে! পাঠক, আপনি বলুন, যে শায়খ মাত্র দেড় লাইনে এতগুলো ভুল, যেগুলো তার মূর্খতার উপর দলীল, তারাই আজকে সমাজে সহীহ হাদীসের ধোয়া তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে! আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ পথে পরিচালিত করুন। আমীন।

মুযাফফার বিন মুহসিন সাহেব বলেছিলেন, হাদীসটি তিনটি দোষে দুষ্ট। প্রথম দোষ এবং সেখানে তার নির্লজ্জ জালিয়াতি এবং মিথ্যাচার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

২য় দোষ সম্পর্কে মুযাফফার বিন মুহসিন বলেন-
উক্ত বর্ণনায় ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফা নামে একজন মুনকার রাবী আছে। সে সহীহ হাদীসের বিরোধি হাদীস বর্ণনাকারী। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এজন্য তাকে মুনকার বলেছেন এবং আল্লামা যাহাবী ও ইবনু হাজার আসকালানী তা সমর্থন করেছেন।

এ কয়েক লাইনে মুযাফফার সাহেরব মূর্খতা এবং জালিয়াতির চূড়ান্ত পরাকাষ্টা প্রদর্শন করেছেন! যা একেবারে শিউরিয়ে উঠার মত।
প্রথম কথা হল, ইয়াযীদ বিন খুসাইফা বুখারী, মুসলিমের বর্ণনাকারী। ইমাম বুখারী এবং মুসলিম রহ. তাদের ‘সহীহ বুখারী’ এবং ‘সহীহ মুসলিমে’ তার সূত্রে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছেন। উদাহরণ স্বরুপ শায়খ যুহায়র নাসির তাহকীককৃত বুখারীর ৪৭০, ১০৭২, ২৩২৩, ২৩২৫ নং হাদীস দেখা যেতে পারে। ইমাম বুখারী রহ. ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফার সূত্রে বর্ণিত হাদীস উল্লেখ করেছেন। এমনিভাবে শায়খ ফুয়াদ আব্দুল বাকী তাহকীককৃত ‘মুসলিম শরীফ’ এর ৫৭৭, ১৫৭৬, ২১৫৩, ২৫৭২ নং হাদীস দেখা যেতে পারে। ইমাম মুসলিম রহঃ ও ইয়াযিদ বিন খুসাইফার সূত্রে হাদীস উল্লেখ করেছেন। মুযাফফার বিন মুহসিনের কথা অনুযায়ী তিনি সহীহ হাদীসের বিরোধি হাদীস বর্ণনাকারী হয়ে থাকেন, তাহলে ইমাম বুখারী এবং মুসলিম কেন তার সূত্রে হাদীস আনলেন? তাহলে কি বুখারী এবং মুসলিমে ইয়াযিদ ইবনে খুসাইফার সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলো জাল!

এবার দেখুন ইয়াযিদ ইবনে খুসাইফা সম্পর্কে জরাহ, তাদীলের ইমামগণ কি বলেন?
يزيد بن عبد الله بن خصيفة بن عبد الله بن يزيد الكندي المدني روى عن أبيه والسائب بن يزيد ويزيد بن عبد الله بن قسيط ومحمد بن عبد الرحمن بن ثوبان وعمرو بن عبد الله بن كعب وبسر بن سعيد وعبد الله بن عبد القاري وغيرهم وعنه الجعيد بن عبد الرحمن ومالك وأبو علقمة الفروي وسليمان بن بلال وإسماعيل بن جعفر والسفيانان والداروردي وآخرون قال الأثرم عن أحمد وابو حاتم والنسائي ثقة وقال الآجري عن أبي داود قال أحمد منكر الحديث وقال بن أبي مريم عن بن معين ثقة حجة وقال بن سعد كان عابدا ناسكا كثير الحديث ثبتا وذكره بن حبان في الثقات
অর্থাৎ, আছরাম রহঃ ইমাম আহমদ, আবু হাতিম এবং নাসায়ী থেকে বর্ণনা করেন, তারা সকলে তাকে ছিকাহ বলেছেন।
আজুরী আবু দাউদ থেকে, তিনি বলেন: ইমাম আহমদ তাকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন।
ইবনে মায়ীন তাকে ছিকাহ, হুজ্জত তথা হাদীসের ক্ষেত্রে দলীল বলেছেন। ইবনে সা’দ বলেন: তিনি ইবাদগুজার, বেশি হজ পালনকারী, বেশি হাদীস বর্ণনাকারী, বিশস্ত এবং গ্রহণযোগ্য।
ইবনে হিব্বান ছিক্বাহ বর্ণনাকারীদের জীবনী গ্রন্থ “কিতাবুছ ছিক্বাত” এ তার জীবনী উল্লেখ করেছেন। (তাহযীবুত তাহযীব, ৯/ ৩৫৫-৩৫৬. দারুল ফিকর, বায়রুত)

আমরা দেখতে পেলাম, ইয়াযীদ ইবনে খুসাইফাকে ইবনে মায়ীন, আবু হাতিম, নাসায়ী এবং ইবনে হিব্বান রহঃ ‘ছিকাহ’ বলেছেন। ইমাম আহমদ থেকে রেওয়ায়াত মুখতালিফ। আছরাম বলেন: ইমাম আহমদ তাকে ছিকাহ বলেছেন। আবু দাউদ বলেন: আহমদ তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন।মুযাফফার বিন মুহসিন সবগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু একটি রেওয়ায়াত গ্রহণ করে হাদীসকে জাল বানিয়ে ফেললেন! এ কেমন জালিয়াতি! এছাড়া ইমাম আহমদের কথা নকল করতে গিয়ে তিনি চরম অপরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ ইমাম আহমদ ‘মুনকার’ বলেননি। ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। কারণ মুনকার হাদীসের বিশেষণ হয়ে থাকে। বর্ণনাকারীকে কখনো মুনকার বলা হয় না!

হাফেজ ইবনে হাজার “তাকরীবুত তাহযীবে” বলেন:
يزيد بن عبد الله بن خصيفة بمعجمة ثم الركعة بن عبد الله بن يزيد الكندي المدني وقد ينسب لجده ثقة من الخامسة
অর্থাৎ, ইয়াযিদ বিন খুসাইফা হলেন ছিকাহ বর্ণনাকারী। (তাহযীবুত তাহযীব, তরজমা নং, ৭৭৩৮. শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা দাঃবাঃ তাহকীককৃত)

এমন বর্ণনাকারীর রেওয়ায়াতকে মুযাফফার বিন মুহসিন কিভাবে জাল বললেন?
এরপর মুযাফফার লিখেন: আল্লামা যাহাবী এবং ইবনে হাজার আসকালানী তা সমর্থন করেছেন।
এখানেও মুযাফফার বিন মুহসিন নির্লজ্জ উলঙ্গ জালিয়াতি এবং দাগাবাজি করেছেন। প্রথমে আমরা ইমাম যাহাবীর পুরো বক্তব্য দেখি। তিনি বলেন:
يزيد بن عبدالله بن خصيفة . وقد ينسب إلى جده فيقال : يزيد بن خصيفة . عن السائب بن يزيد ، وعروة ، ويزيد بن عبدالله بن قسيط . وعنه مالك ، وطائفة . وثقه أحمد من رواية الاثرم عنه ، وأبو حاتم ، وابن معين ، والنسائي . وروى أبو داود أن أحمد قال : منكر الحديث
অর্থাৎ, ইমাম যাহাবী বলেন: আছরামের বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম আহমদ তাকে ‘ছিকাহ’ বলেছেন।এমনিভাবে আবু হাতিম, ইবনে মায়ীন এবং নাসায়ী তাকে ছিকাহ বলেছেন। আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন: ইমাম আহমদ তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন। (মিযানুল ই’তেদাল, তরজমা নং, ৯৭১৫)

আপনি বলুন, ইমাম যাহাবী কোথায় সমর্থন করলেন? যদি নকল করার দ্বারা সমর্থন হয়ে যায়, তাহলে ইমাম যাহাবী আবু হাতিম, ইবনে মায়ীন এবং নাসায়ীর বক্তব্যকেও সমর্থন করেছেন! মুযাফফার বিন মুহসিন কেন পুরো বক্তব্য বাদ দিয়ে শুধু শেষেরটা গ্রহণ করলেন! এমন খেয়ানত করতে তার কলম কি আল্লাহর ভয়ে কেঁপে উঠেনি?

এবার হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানীর পুরো বক্তব্য পূর্বে গত হয়েছে। এখানে তার আরেকটি কিতাব “লিসানুল মিজান” এর বক্তব্য তুলে ধরছি।
يزيد بن عبد الله بن خصيفة بن عبد الله بن يزيد الكندي المدني عن السائب بن يزيد وعروة بن الزبير وعنه بن جريج وسليمان بن بلال وإسماعيل بن جعفر وطائفة وثقه أبو حاتم والنسائي وابن معين وأحمد
অর্থাৎ, আবু হাতিম, নাসায়ী, ইবনে মায়ীন এবং ইমাম আহমদ তাকে ‘ছিক্বাহ’ বলেছেন। (মিযানুল ই’তেদাল, তরজমা নং, ৯৭১৫)

এখানে ইবনে হাজার আবু দাউদের বর্ণনা করেননি। এছাড়া “তাকরীবে” তিনি একবাক্যে তাকে ‘ছিকাহ’ বলেছেন। কিন্তু মুযাফফার বিন মুহসিন বললেন: হাফেজ ইবনে হাজার ইমাম আহমদের বক্তব্য ‘মুনকারুল হাদীস’কে সমর্থন করেছেন! এমন নির্লজ্জ মিথ্যুকের কলমের বদ আছার থেকে আল্লাহ সাধারণ মুসলমানকে রক্ষা করুন।

এখন প্রশ্ন হল: আবু দাউদের বর্ণনা অনুযায়ী হাফেজ ইবনে হাজার তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলার কি কারণ? সে প্রশ্নের উত্তর হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ “ফাতহুল বারী”র ভূমিকা “হাদয়ূছ ছারী”তে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
يزيد بن عبد الله بن خصيفة الكندي وقد ينسب إلى جده قال بن معين ثقة حجة ووثقه أحمد في رواية الأثرم وكذا أبو حاتم والنسائي وبن سعد وروى أبو عبيد الآجري عن أبي داود عن أحمد أنه قال منكر الحديث قلت هذه اللفظة يطلقها أحمد على من يغرب على أقرانه بالحديث عرف ذلك بالاستقراء من حاله وقد احتج بابن خصيفة مالك والأئمة كلهم
অর্থাৎ, ইবনে মায়ীন তাকে ‘ছিকাহ এবং হুজ্জাত’ বলেছেন। আছরামের রেওয়ায়াত অনুযায়ী ইমাম আহমদ তাকে ‘ছিকাহ’ বলেছেন। এমনিভাবে আবু হাতিম নাসায়ী ইবনে সাদ তাকে ‘ছিকাহ’ বলেছেন। আবু দাউদের বর্ণনায় ইমাম আহমদ তাকে ‘মুনকারুল হাদীস’ বলেছেন।

হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: ‘মুনকারুল হাদীস’ শব্দটি ইমাম আহমদ সে সমস্ত বর্ণনাকারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন, যারা তাদের সাথীদের তুলনায় একটু আশ্চর্যজনক হাদীস বর্ণনা করেন। এটা তার অবস্থা পর্যালোচনা দ্বারা বুঝা গেছে। ইবনে খুসাইফার বর্ণনা ইমাম মালেক সহ সকল ইমাম ্রেওয়ায়াত করেছেন। (ফাতহুল বারী, মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা নং, ৪৫৩. দারূল মা’রেফা, বায়রুত)

দেখুন, এমন একজন ছিকাহ এবং সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে মুযাফফার বিন মুহসিন হাদীস জালকারী বানিয়ে ফেললেন? তাও আবার বিভিন্ন ইমামদের নামে দিন দুপুরে প্রকাশ্যে রাখ ডাক ছাড়া মিথ্যাচার করে! মনে হচ্ছে যে, দুনিয়াতে ওনি একাই গবেষক হয়েছেন! তার এগুলো কেউ বুঝতে এবং ধরতে পারবেনা! আসল চোর দুনিয়ার সবাইকে চুর মনে করে! এজন্য চুরি করে! আবার সিনাজুরি করে! আল্লাহ এমন জালিয়াতিকারীকে তুমি উত্তম বদলা দান কর।

মুযাফফার বিন মুহসিন ৩য় কারণ লিখেন: এটি কখনো ‘মুযতারাব’ পর্যায়ের। এই বর্ণনায় বিশ রাকাতের বর্ণনা এসেছে। কিন্তু অন্য বর্ণনায় আবার ২১ রাকাআতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই শায়খ আলবানী বলেন, এটি মুযতারাব পর্যায়ের হাদীস হওয়ায় পরিত্যাজ্য।
এখানে তিনি কয়েকটি ভুল করেছেন। তিনি লিখেছেন: এটি ‘মুযতারাব পর্যায়ের। অথচ হাদীস কখনো ‘মুযতারাব’ হয়না। ‘মুযতারিব’ হয়। এটা তার শাস্ত্র সম্পর্কে অপরিপক্কতার প্রমাণ। তার পরের ইবারত দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি ইযতেরাব কাকে বলে? সেটাও জানেননা। আসুন আমরা দেখে নেই যে, উসূলে হাদীসের ইমামগণ ইযতেরাবের সংজ্ঞায় কি বলেন? ইমাম ইবনুস সালাহ রহঃ বলেন:
المضطرب من الحديث : هو الذي تختلف الرواية فيه فيرويه بعضهم على وجه وبعضهم على وجه آخر مخالف له
অর্থাৎ, মুযতারিব বলা হয়, যে হাদীসের রেওয়য়াতে মতপার্থক্য হয়। কেউ কেউ একভাবে রেওয়ায়াত করেছেন। অন্য কেউ আরেকভাবে তাদের বিপরিত রেওয়ায়াত করেছেন। (মুকাদ্দিমাতু ইবনুস সালাহ, পৃষ্ঠা নং, ৫৫. মাকতাবাতুল ফারাবী)

হাফেজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাছীর রহ. বলেন:
وهو أن يختلف الرواة فيه على شيخ بعينه، أو من وجوه أُخر متعادلة لا يترحح بعضها على بعض. وقد يكون تارة في الإسناد، وقد يكون في المتن
অর্থাৎ, কোন শাযখ থেকে কোন হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে রাবীদের মধ্যে ইখতেলাফ হওয়া। অথবা হাদীসটি অপর কোন সনদে বর্ণিত হওয়া যে, একটিকে অপরটির উপর প্রাধান্য দেওয়া যায়না। (ইখতেসারু উলূমিল হাদীস, ৯. মাকাতাবাতুশ শামেলা)

আমরা জানলাম যে, একই হাদীস যদি ভিন্ন ভিন্ন সনদে বর্ণিত হয় এবং বিষয় বস্তু পরস্পর বিরোধি হয় যে, একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেওয়া যায় না। সেটাকে মুহাদ্দিসগণের নিকট ‘ইযতেরাব’ বলা হয়। কিন্তু ভিন্ন আরেকটিকে হাদীসে যদি এ হাদীসের বিরোধি বক্তব্য পাওয়া যায়, সেটাকে ‘ইযতেরাব’ বলা হয় না। কিন্তু মুযাফফার সাহেব এমন কাচা কাজ করেছেন এখানে। ভিন্ন আরেকটি হাদীস দেখিয়ে তিনি সাইব ইবনে ইয়াজিদের হাদীসে ইযতেরাব প্রমাণ করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করেছেন!

তিনটি কারণ দেখিয়ে মুযাফফার বিন মুহসিন হাদীসটিকে জাল বলেছেন। সে তিনটি কারণের উপর মোটামোটিভাবে পর্যালোচনা করা হল!

মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠায় তিনি কি পরিমাণ জালিয়াতি এবং দাগাবাজি করেছেন, আশা করি পাঠকরা সেটি দেখতে পেরেছেন! কিভাবে তিনি একটি সহীহ হাদীসকে মিথ্যার চূড়ান্ত পরাকাষ্টা প্রদর্শন করে জাল প্রমাণিত করেছেন। আমরা আসা করি, শায়খের কাছে এ পর্যালোচনা গুলো পৌছেছে। তিনি তার এমন মারাত্বক এবং হাস্যকর ভুল থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন। এমন গবেষক এবং শায়খদের থেকে আল্লাহ আমাদের নিরাপদ দুরত্বে রাখেন, যারা সহীহ হাদীসকে নিজেদের মতের বিপক্ষে হওয়ায় একেবারে জাল বানিয়ে ফেলে!

11/02/2026

নির্বাচন আসবে, যাবে। ফলাফল যা হওয়ার তা হবে। নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেশীর সাথে সংঘাতে জড়াবেন না। কারণ আপনার সুখে দঃখে আপনার প্রতিবেশীই আগে এগিয়ে আসবে।

10/02/2026

যারা গান বাজিয়ে ভোট চায়, তারা ইসলামিক দল হতে পারে না।

📘শবে বারাআতের আলোচনা"শবে বারাআত" ইসলামের মধ্যে একটি বরকতময় রাতের নাম যার ফজিলত অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হাদিসের ভাষ...
02/02/2026

📘শবে বারাআতের আলোচনা
"শবে বারাআত" ইসলামের মধ্যে একটি বরকতময় রাতের নাম যার ফজিলত অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী এ রাতে অসংখ্য গুনাহগার ও পাপিষ্ঠকে আল্লাহ তাআলা'র পক্ষ থেকে ক্ষমার ঘোষণা করা হয় এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এই রাতকে হাদিস শরীফে )لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ( "লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান" তথা শা'বান মাসের মধ্য রজনী বলা হয়েছে, যা আমাদের এই উপমহাদেশে শবে-বরাত (শুদ্ধ উচ্চারণ শবে-বারাআত) নামে লোকমুখে পরিচিতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করেছে।

আজকের জুমায় আমরা এই বরকতময়, ফযীলতপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা উত্তম তাওফীকদাতা।

📌শবে বারাআতের অর্থ
শবে বারাআত )شبرارت( এখানে দুটি শব্দ রয়েছে, প্রথম শব্দটি ফার্সি ভাষার আর দ্বিতীয়টি আরবী ভাষার শব্দ। অর্থাৎ আরবি ও ফার্সির সমন্বয়ে এই নামটি আমাদের কাছে পরিচিত। "শব" অর্থ হল রাত, "বারাআত" শব্দের অর্থ হল, নিষ্কৃতি লাভ করা, মুক্তি পাওয়া ও নাজাত পাওয়া, নির্দোষ হওয়া। এক কথায় বলা যায় "শবে বারাআত" অর্থ হল, জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার রাত বা নিষ্কৃতি লাভ করার রাত।

বড়পীর শাইখ আব্দুল কাদির জিলানী রহ. গুনিয়াতুত-তালিবীন কিতাবের ৩৩৭ নং পৃষ্ঠায় বলেন-

إِنَّمَا سُمِّيَتْ لَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ لِأَنَّ فِيهَا بَرَاءَتَيْنِ، بَرَاءَةً لِّلْأَشْقِيَاءِ مِنَ الرَّحْمَانِ وَبَرَاءَةً لِّلْأَوْلِيَاءِ مِنَ الخَذْلَانِ. অর্থ: "শবে বারাআত"কে শবে বারাআত এই জন্য বলা হয় কেননা, এই রাতে দুই ধরনের মুক্তি পাওয়া যায়-

১. এ রাতে গোনাহগার দুর্ভাগা লোকেরা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুক্তি পায়।

২. আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দাগণ ব্যর্থতা এবং নিরাশ হওয়া থেকে মুক্তি পায়। অর্থাৎ এমন বরকতময় রাত পেয়ে আল্লাহর রহমতে তাঁরা ব্যর্থ ও নিরাশ হননা। (গুনিয়াতুত-তালিবীন পৃষ্ঠা নং ৩৩৭)

তিনি আরো বলেন-

إِنَّ لِلْمَلَائِكَةِ لَيْلَتَيْ عِيدٍ فِي السَّمَاءِ كَمَا أَنَّ لِلْمُسْلِمِينَ يَوْتَيْ عِيدٍ فِي الْأَرْضِ، فَعِيْدُ الْمَلَائِكَةِ لَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ وَلَيْلَةُ الْقَدْرِ، وَعِيْدُ الْمُؤْمِنِينَ يَوْمُ الْفِطْرِ وَيَوْمُ الْأَضْحَى، وَعِيْدُ الْمَلَائِكَةِ بِاللَّيْلِ لأَنَّهُمْ لَا يَنَامُوْنَ.

অর্থ: যেভাবে পৃথিবীতে মানুষের জন্য দুটি ঈদ রয়েছে- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা, অনুরূপভাবে ফেরেশতাদের জন্যও আসমানে দুটি রাত রয়েছে। একটি শবে বারাআত আরেকটি হল শবে কদর। এই দুটি রাত তাদের জন্য ঈদের রাত। মুসলমানদের ঈদ দিনের বেলায় রাখা হয়েছে কেননা তারা রাতে ঘুমায়। আর ফেরেশতাদের ঈদ রাতের বেলায় রাখা হয়েছে কেননা তারা রাতে বা দিনে কখনো ঘুম যায় না। (গুনিয়াতুত-তালিবিন পৃষ্ঠা নং ৩৩৮)

✅শবে বারাআতের প্রামাণিকতা

"শবে বারাআত" এবং এই রাতে ইবাদত-বন্দেগী করা নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাই রাসুল সা. ও সাহাবা-তাবেয়ীনের যুগ থেকে অদ্যবধি এ রাতে বিশেষভাবে নফল ইবাদত ধারাবাহিকতার সাথে চলে আসছে।

হাদিস শরিফে এ রাতের নির্দিষ্ট কোন নাম উল্লেখ নেই, বরং )لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ বলে এর ফজিলত বর্ণনা

করা হয়েছে।

বিভিন্ন কারণেই বর্তমানে এ মুবারক রজনীটি প্রান্তিকতার শিকার। কিছু মানুষ সম্পূর্ণ "শবে বারাআত"কেই অস্বীকার করছে; আর কিছু মানুষ ফযীলতের নামে সীমালঙ্গন ও বিদআতে লিপ্ত হয়ে থাকে।
প্রান্তিকতা ইসলামে বড়ই নিন্দনীয় একটি বিষয়। ইসলামের অমোঘ নীতি হলো, কুরআন হাদীসে যতটুকু প্রমাণিত ততটুকু গ্রহণ ও পালন করা। যা প্রমাণিত নয় তা মূলেই বর্জন করা।

উপমহাদেশে এক শ্রেণির কিছু ভাই প্রমাণিত এ পবিত্র রজনীটির মূলেই অস্বীকার করছেন।

এই শ্রেণির লোকগুলোর যোগ্যতা বাংলায় কিছু হাদীসের কিতাব পড়া ছাড়া কুরআন-হাদীসের আবশ্যিক কোনো জ্ঞান নেই। তারা নিজেদের অতিগবেষণার মাধ্যমে ইসলামের সুপ্রমাণিত বিষয়গুলোকে জনসাধারণের মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।

তারা বলছে শবে বারাআতের হাদীসগুলো সহীহ নয়, এ রাতে ইবাদত করা বিদআত, ইত্যাদি।

অথচ বহু সালাফী আলেম শবে বারাআতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। "শবে বারাআত" সংশ্লিষ্ট হাদীসগুলোকে প্রমাণিত সাব্যস্ত করেছেন। শবে বারাআত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পরও বিদআত বলাটা হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞতা ছাড়া আর কী হতে পারে।

আর কেউ যদি জেনেশুনে এমনটি বলে থাকে তাহলে সে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাদীস অস্বীকারের মতো মারাত্মক অপরাধে অপরাধী।

মুহতারম মুসল্লিয়ান! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর হাদীসের প্রতি বিদ্বেষী হওয়া ছাড়া সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এ ফযীলতপূর্ণ রাতকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না।

মুহতারম হাজিরীন! এবার আসুন, আমরা জেনে নেই, শবে বারাআত সম্পর্কে
🔷তিন জন আলেমের কথা উল্লেখ করছি

১. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. (৭২৮হি.) হাদীস ও আছারের আলোকে "শবে বারাআত"কে প্রমাণিত করতে গিয়ে "মাজমুউল ফাতাওয়া" কিতাবের ২৩ নং খণ্ডের ১৩৬ নং পৃষ্ঠায় লিখেন-

لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقَدْ رُوِيَ فِي فَضْلِهَا مِنَ الْأَحَادِيثِ الْمَرْفُوْعَةِ وَالْآثَارِ مَا يَقْتَضِيْ أَنَّهَا لَيْلَةٌ مُفَضَّلَةٌ وَأَنَّ مِنَ السَّلَفِ مَنْ كَانَ يَخْضُهَا بِالصَّلَاةِ فِيْهَا، وَصَوْمُ شَهْرٍ شَعْبَانَ قَدْ جَاءَتْ فِيْهِ أَحَادِيْثُ صَحِيْحَةٌ.

অর্থ: শবে বারাআতের ফযীলত সম্পর্কে অনেক মারফু হাদিস এবং সাহাবাদের বক্তব্য রয়েছে, যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এটি একটি মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত রাত। এবং সালফে সালেহীনদের অনেকেই এই রাতকে নামাযের মাধ্যমে কাটাতেন এবং শা'বান মাসের দিনে রোজা রাখতেন, এবং এই রোজা সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদিসও বিদ্যমান রয়েছে। (মাজমুউল ফাতাওয়া: ২৩/১৩৬)

২. আরেক লা-মাযহাবী আলেম- শায়খ আবদুর রহমান মুবারকপুরী রাহ. (১৩৫৩হি.)। তিনি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে "শবে বারাআত"কে ভিত্তিসমৃদ্ধ সাব্যস্ত করেছেন। এবং যারা শবে বারাআতকে অস্বীকার করে তাদের বিরোদ্ধে বলেছে। যেমনটি তিনি জামে' তিরমিযী'র ব্যাখ্যাগ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযী'র ৩ নং খণ্ডের ৩৬৫ নং পৃষ্ঠায় লিখেন-

اعْلَمْ أَنَّهُ قَدْ وُرِدَ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ عِدَّةُ أَحَادِيثَ، مَجْمُوْعُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا، فَهَذِهِ الْأَحَادِيثُ بِمَجْمُوْعِهَا حُجَّةً عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ شَيْءٍ وَاللَّهُ تَعَالَى أَعْلَمُ (تحفة الأحوذي ٣٦٥/٣)

অর্থ: জেনে রাখো! শবে বারাআতের ফযীলত নিয়ে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যার সমষ্টি দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, নিশ্চয় এই ফযীলতপূর্ণ রাতের মজবুত ভিত্তি রয়েছে। এবং এই হাদিসগুলো সুস্পষ্টভাবে ঐ সমস্ত লোকদের মতের বিরোদ্ধে প্রমাণ করে যারা ধারণা করে যে, শবে বারাআতের কোন ফযীলত নেই। আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন। (তুহফাতুল আহওয়াযী খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৩৬৫)

৩. গায়রে মুকাল্লিদদের ইমাম, শায়েখ নাসীর উদ্দীন আলবানী মারহুম তাঁর সিলসিলাতুল আহাদীসিস-সাহিহা'র ৩ নং খন্ডের ১৩৮-১৩৯ নং পৃষ্ঠায় লিখেন-

إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-অর্ধ শাবানের রাতে (শবে বারাআতে] আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত মাখলুকের প্রতি মনযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।

"এই হাদিসটি সহীহ" কেননা এটি সাহাবাদের একটি বড় জামাত বর্ণনা করেছেন বিভিন্ন সনদে, আর প্রতিটি সনদ একটি অন্যটিকে শক্তিশালী করেছে।

তাদের মাঝে রয়েছেন হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাযি., হযরত আবু সা'লাবা রাযি., হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি., হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি., হযরত আবু হুরায়রা রাযি., হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি., হযরত আউফ বিন মালিক রাযি., হযরত আয়েশা রাযি. প্রমুখ সাহাবাগণ।

উপরে বর্ণিত সবক'টি বর্ণনাকারীর হাদিস তিনি তার কিতাব সহীহ হাদিস সিরিজে তাখরীজ তথা মূলসূত্র বের করার মাধ্যমে সুদীর্ঘ আলোচনা শেষে "শবে বারাআত" এর ফযীলত আছে কিনা? এর সমাধান হিসাবে তিনি বলেন-

وَجُمْلَةُ الْقَوْلِ أَنَّ الْحَدِيثَ بِمَجْمُوعِ هَذِهِ الطَّرُقِ صَحِيحُ بِلا رَيْبٍ وَالصَّحَةُ تَثْبُتُ بِأَقَلَّ مِنْهَا عَدَدًا مَا دَامَتْ سَالِمَةٌ مِنَ الضُّعْفِ الشَّدِيدِ كَمَا هُوَ الشَّأْنُ فِي هَذَا الْحَدِيثِ، فَمَا نَقَلَهُ الشَّيْخُ الْقَاسِمِي رَحِمَهُ اللهُ تَعَالَى فِي إِصْلَاحِ الْمَسَاجِدِ عَنْ أَهْلِ التَّعْدِيلِ وَالتَّجْرِيحِ أَنَّهُ لَيْسَ فِي فَضْلِ لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ حَدِيثُ صَحِيحٌ، فَلَيْسَ مِمَّا يَنْبَغِي الْإِعْتِمَادُ عَلَيْهِ، وَلَئِنْ كَانَ أَحَدٌ مِّنْهُمْ أَطْلَقَ مِثْلَ هَذَا الْقَوْلِ فَإِنَّمَا أُوتِيَ مِنْ قِبَلِ التَّسَرُّعِ وَعَدَمِ وَسَعِ الْجُهْدِ لِتَتَبُّعِ الطُّرُقِ عَلَى هَذَا النَّحْوِ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْكَ. وَاللَّهُ تَعَالَى هُوَ الْمُوَفِّقُ.

অর্থ: সারকথা হল এই যে, নিশ্চয় এই হাদিসটি উপরিউক্ত সকল সূত্রপরম্পরা দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে সহীহ। আর এর থেকেও কম সংখ্যক বর্ণনা ও সূত্রের দ্বারা কোন হাদিস সহীহ প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মারাত্মক দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকে, যেমনটি এই হাদিসের ক্ষেত্রে রয়েছে।

আর শাইখ কাসেমী রহ. "ইসলাহুল মাসাজিদ" নামক কিতাবের ১০৭ নং পৃষ্ঠায় জরাহ তা'দীলের ইমামগণ থেকে এই মর্মে যা বর্ণনা করেছেন যে, শা'বানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতের ফযীলত সম্পর্কে কোন সহীহ হাদিস নেই। এই কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এমনটি বলে থাকে তারা যথেষ্ট অনুসন্ধানমূলক গবেষণা না করার দরুন এবং এই বিষয়ে যথেষ্ট জানাশোনার অভাবের কারণে, তাড়াহুড়া করে এমনটি বলে থাকেন।

অতএব, এই বিষয়টি সঠিক অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয় যে, নিঃসন্দেহে উল্লিখিত হাদিসটির শক্তিশালী সূত্র রয়েছে। আল্লাহ তাআলা উত্তম তাওফীকদাতা। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস-সাহিহাহ: ৩/১৩৮-১৩৯)

অর্থাৎ শাইখ নাসির উদ্দীন আলবানী মারহুমও শবে বারাআতের ফযীলতকে স্বীকার করেন, যেহেতু তা সহীহ সূত্রে বর্ণিত আছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, কিছু লোক তাঁর অনুসারী হওয়ার দাবি করা সত্ত্বেও শবে বারাআতের ফযীলতকে অস্বীকার করে। আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত দান করুন। উল্লিখিত আলেমগণ ছাড়াও আরো অনেক সালাফী ইমাম "শবে বারাআত"কে প্রমাণিত বলেছেন। এ সম্পর্কীয় হাদীসও বর্ণনা করেছেন। আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার আশংকায় আর বর্ণনা করলাম না।

✅হাদিসের আলোকে শবে বারাআতের ফযীলত

হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহে শা'বানকে অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দিতেন। মাহে রমাযানের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি এ মাসে পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও গ্রহণ করতেন।

এ মাসের রয়েছে বহু বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত। প্রসিদ্ধতম বৈশিষ্ট হলো, 'লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান' নামক এক ফযীলতপূর্ণ রাত। কয়েকদিন পরই (১৪ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার দিবাগত রাত) এ বরকতময় রাত্রির শুভাগমন হতে যাচ্ছে। একজন মুসলিম হিসেবে এ রজনীর মহাত্ম ও তাৎপর্য সম্পর্কে সম্যক অবগতি আবশ্যক। অন্যথা মধ্যপন্থা থেকে বিচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্নে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত কয়েকটি হাদিস তুলে ধরা হল-

১. সুনানে ইবনে মাজার ১৩৯০, সহীহ ইবনে হিব্বানের ৫৬৬৫ নং, হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-

عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيَّ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ الجميعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

অনুবাদ-হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-অর্ধ শাবানের রাতে [শবে বরাতে] আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত মাখলুকের প্রতি মনযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন।

সূত্রসমূহ: (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬৬৫, মুসনাদুল বাযযার, হাদীস নং-২৭৫৪, মুসনাদে ইসহাক বিন রাহুয়াই, হাদীস নং-১৭০২, আল মুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৬৭৭৬, আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং-২১৫, সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস নং-১৩৯০, মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-২০৩, মুসন্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৩০৪৭৯, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৬২০৪)

২. জামে' তিরমিযীর ৭৩৯ নং হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: فَقَدْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ، فَخَرَجْتُ أَطْلُبُهُ، فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعُ رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ. فَقَالَ: «يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللَّهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ قَالَتْ، قَدْ قُلْتُ: وَمَا بِي ذَلِكَ، وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: «إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَنْزِلُ لَيْلَةَ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعَرِ غَنَمٍ كَلْبٍ

অর্থ: হযরত আয়িশা রাযি. বলেন, এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে না পেয়ে খুঁজতে বের হলাম। খুঁজতে খুঁজতে জান্নাতুল বাকীতে [মদীনার কবরস্থান] গিয়ে আমি তাঁকে দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, কি

ব্যাপার আয়েশা? [তুমি যে তালাশে বের হলে? তোমার কি মনে হয় আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল তোমার উপর কোন অবিচার করবেন? [তোমার পাওনা রাতে অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন? হযরত আয়শা রাযি. বললেন- আমার ধারণা হয়েছিল আপনি অন্য কোন বিবির ঘরে গিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন- যখন শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাত আসে অর্থাৎ যখন শবে বারাআত হয়, তখন আল্লাহ পাক এ রাতে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। তারপর বনু কালব গোত্রের বকরীর পশমের চেয়ে বেশী সংখ্যক গোনাহগার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন। (জামে' তিরমিযী, হাদীস নং-৭৩৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৬০২৮, মুসনাদে আব্দ বিন হুমাইদ, হাদীস নং-১৫০৯)

বি. দ্র. এই হাদিসের সনদে একজন রাবী আছেন, যার নাম হল "হাজ্জাজ বিন আরতাত" তিনি যদিও দূর্বল রাবী কিন্তু তার এই দূর্বলতা বৃদ্ধ বয়সে স্মৃতিশক্তি দূর্বলতার দরুন হয়েছে, মিথ্যা বলার কারণে নয়। অধিকাংশ মুহাদ্দিসীন তাকে দূর্বল হিসাবে সাব্যস্ত করলেও ইমাম ইবনু হিব্বান রহ. তার কিছু কিছু বর্ণনাকে সহীহ ইবনে হিব্বানে বর্ণনা করেছেন। তার থেকে বর্ণিত সকল সনদের মধ্যে সর্বোত্তম সনদ হল ঐ সনদ যেগুলো তিনি হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন। আর আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন যে, উপরে আমাদের বর্ণিত হাদিসটি হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত।

৩. সুনানে ইবনে মাজার ১৩৮৮ নং হাদিসে একটি দূর্বল সূত্রে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: " إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقُ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ

অর্থ: হযরত আলী বিন আবু তালীব রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-যখন শাবান মাসের অর্ধেকের রজনী আসে ["শবে বারাআত"। তখন তোমরা রাতে নামায পড়, আর দিনের বেলা রোযা রাখ। নিশ্চয় আল্লাহ এ রাতে সূর্য ডুবার সাথে সাথে পৃথিবীর আসমানে এসে বলেন-কোন গোনাহ ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি আমার কাছে? আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। কোন রিজিকপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দিব। কোন বিপদগ্রস্থ মুক্তি পেতে চায় কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করে দিব। আছে কি এমন, আছে কি তেমন? এমন বলতে থাকেন ফযর পর্যন্ত। (সূনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১৩৮৮, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস নং-৩৮২২) হাদিসটির সনদ হযরত মুহাদ্দিসীনের কাছে দূর্বল হলেও অন্যান্য সহীহ হাদিসের দ্বারা এই রাতের ফযীলত প্রমাণিত।

৪. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক কিতাবের ৮১৭৫ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: خَمْسُ لَيَالٍ لَا يُرَدُّ فِيهِنَّ الدُّعَاءُ: لَيْلَةُ الْجُمُعَةِ، وَأَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةُ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَلَيْلَتِي الْعِيدَيْنِ.

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: পাঁচটি রাত এমন রয়েছে যে রাতগুলোতে বান্দার দুআ ফেরত দেওয়া হয়না অর্থাৎ বান্দার দুআ কবুল হয়- ১। জুমুআর রাতের দুআ। ২। রজব মাসের প্রথম রাতের দুআ। ৩। শবে বারাআতের দুআ। ৪,৫। দুই ঈদের রাতের দুআ। (মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক হাদিস নং ৮১৭৫) এই হাদিসটি দূর্বল।

🔷শবে বারাআত সম্পর্কে মুফতী মুহাম্মদ তাকি উসমানী হাফিযাহুল্লাহ'র গুরুত্বপূর্ণ কথা

ইসলাহী খুতুবাতের ৪নং খণ্ডের ২৫৮ নং পৃষ্ঠায় এসেছে, শাইখুল ইসলাম হযরত মুফতী মুহাম্মদ তাকি উসমানী

বলেন:
واقعہ یہ ہے کہ شب براءت کے بارے میں یہ کہنا بالکل غلط ہے کہ اس کی کوئی فضیلت حدیث سے ثابت نہیں، حقیقت یہ ہے کہ دس صحابہ کرام رضی اللہ عنہم سے احادیث مروی ہیں، جن میں اس رات کی فضیلت نبی کریم صلی اللہ علیہ وسلم نے بیان فرمائی ہے، ان میں بعض احادیث سند کے اعتبار سے بے شک کچھ کمزور ہیں؛ ان احادیث کے کمزور ہونے کی وجہ سے بعض علماء نے یہ کہہ دیا کہ اس رات کی فضیلت بے اصل ہے، لیکن حضرات محد ثین اور فقہاء کا یہ فیصلہ ہے کہ اگر ایک روایت سند کے اعتبار سے کمزور ہو ، لیکن اس کی تائید بہت سی احادیث سے ہو جائے، تو اس کی کمزوری دور ہو جاتی ہے۔۔۔ لہذا جس رات کی فضیلت میں دس صحابہ کرام سے روایات مروی ہوں ، اس کو بے بنیاد اور بے اصل کہنا بالکل غلط ہے " اصلاحی خطبات ، ج : ۴، ص: ۲۵۸)

বাস্তব কথা হল, শবে বরাত সম্পর্কে এই কথা বলা সম্পূর্ণ ভুল যে এই রাতের কোনো ফজিলত হাদীস থেকে প্রমাণিত নয়। সত্য হলো, দশজন সাহাবায়ে কিরামের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে এমন হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতের ফজিলত উল্লেখ করেছেন।

তবে হ্যাঁ, এই হাদীসগুলোর মধ্যে থেকে কিছু কিছু হাদিস সনদের দিক থেকে নিঃসন্দেহে কিছুটা দুর্বল। এই দুর্বলতার কারণে কিছু আলিম বলেছেন যে এই রাতের ফজিলত ভিত্তিহীন। কিন্তু মুহাদ্দিসগণ এবং ফুকাহাগণের ফয়সালা হল, যদি কোনো বর্ণনা সনদের দিক থেকে দুর্বল হয়, কিন্তু অনেক হাদীস দ্বারা তার সমর্থন পাওয়া যায়, তবে সেই দুর্বলতা দূর হয়ে যায়।

সুতরাং এমন একটি রাত, যার ফজিলতের বিষয়ে দশজন সাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাকে ভিত্তিহীন এবং মূলহীন বলা সম্পূর্ণ ভুল। (ইসলাহী খুতবাত, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫৮)

✅শবে বারাআতে সালাফদের আমল

এই মর্যাদাপূর্ণ রাতকে আমাদের পূর্ববর্তী বুযুর্গগণ বিভিন্নভাবে ইবাদত বন্দেগিতে কাটাতেন, এবং তাদের পক্ষ থেকে খুবই উৎসাহমূলক বাণী ও বক্তবও রয়েছে-

১. লাতায়িফুল মাআরিফ কিতাবের ২৪৮ নং পৃষ্ঠায় আছে, বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত উমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ. বসরায় নিযুক্ত গভর্ণরের কাছে লিখে পাঠান-

إِنَّ عَلَيْكَ بِأَرْبَعِ لَيَالٍ، فَإِنَّ اللَّهَ يُفْرِغْ فِيُهِنَّ الرَّحْمَةَ إِفْرَاعًا، فَذَكَرَ هَذِهِ اللَّيَالِي الْأَرْبَعَ أَي لَيْلَةَ الْفِطْرِ، وَلَيْلَةَ الْأَضْحَى، وَلَيْلَةَ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، وَأَوَّلَ لَيْلَةٍ مِنْ رَجَبٍ).

অর্থ: তুমি বৎসরের চারটি রাতের প্রতি খুবই যত্নবান হবে, কেননা আল্লাহ তাআলা এই রাতগুলোতে ভরপুর রহমত নাজিল করেন, আর সেই রাতগুলো হল এই- দুই ঈদের রাত, শবে বরাত, রজব মাসের প্রথম রাত। (লাতায়েফুল মাআরিফ পৃ: ২৪৮)

২. ইমাম শাফেয়ী রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থ কিতাবুল উম্ম-এর ১নং খণ্ডের ২৬৪ নং পৃষ্ঠায় লিখেন-

وَبَلَغَنَا أَنَّهُ كَانَ يُقَالُ: إِنَّ الدُّعَاءَ يُسْتَجَابُ فِي خَمْسِ لَيَالٍ : فِي لَيْلَةِ الْجُمُعَةِ، وَلَيْلَةِ الْأَضْحَى، وَلَيْلَةِ الْفِطْرِ، وَأَوَّلِ لَيْلَةِ مِنْ رَجَبٍ، وَلَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ)

অর্থ: আমাদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছেছে যে, পাঁচটি রাতে দুআ কবুল করা হয়। যথা- ১. জুমুআর রাতে। ২. ও ৩. দুই ঈদের রাতে। ৪. রজব মাসের প্রথম রাতে। ৫. শবে বারাআতে। (কিতাবুল উম্ম-এর ১নং খণ্ডের ২৬৪ নং পৃষ্ঠা)

৩. ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. লাতায়িফুল মাআরিফ কিতাবের ২৪৪ নং পৃষ্ঠা থেকে ২৫৪ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত শবে বারাআত সম্পর্কে পক্ষে বিপক্ষের বিস্তারিত আলোচনা করার পর তিনি সমাধান হিসাবে বলেন-
فينبغي للمؤمن أنْ يَتَفَرَّغ في تلك الليلة لذكر الله تعالى ودعائه بغفران الذنوب وستر العيوب وتفريج الكروب، وأن يُقَدَّمَ على ذلك التوبة؛ فَإِنَّ الله يتوب فيها على من يتوب.

অর্থ: প্রত্যেক মুসলমান মুমিনের জন্য উচিত যে, ঐ রাতে (শবে বারাআতে) অন্যান্য কাজ থকে অবসর হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তাআলার যিক্স, গোনাহ মাফের জন্য, ইজ্জত সম্মানের হেফাজতের জন্য, সকল প্রকার বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দুআতে মাশগুল থাকা। আর সর্বাগ্রে তাওবাহ করা, কেননা এই রাতে আল্লাহ তাআলা খুব তাওবাহ কবুল করেন। (লাতায়িফুল মাআরিফ ২৫৪ নং পৃষ্ঠা)

📌আল্লাহ তাআলা যে সকল ব্যক্তিকে এ রাতেও ক্ষমা করেন না

আল্লাহ তাআলা গফুরুন রহীমুন, সাত্তারুন অর্থাৎ ক্ষমাশীল, দয়াময়, পাপগোপনকারী। তিনি সর্বদা স্বীয় বান্দাকে মাগফিরাতের চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতে চান। তা সত্ত্বেও এমন কিছু পাপ আছে! যে সকল লোক এই সমস্ত পাপে পাপিষ্ঠ আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করেন না। আসুন আমরাও জেনে নেই সেই পাপগুলোর পরিচয়, যেন আমাদের মধ্যে থাকলে আমরা তার থেকে বেচে থাকতে পারি-

১, ২। শিরককারী এবং মানুষের প্রতি বিদ্ধেষপোষণকারী।

(সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬৬৫)

عَنْ أَبِي مُوسَى الْأَشْعَرِيِّ، عَنْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «إِنَّ اللَّهَ لَيَطَّلِعُ فِي لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ الجميعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

অনুবাদ-হযরত আবু মূসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-অর্ধ শাবানের রাতে [শবে বরাতে] আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত মাখলুকের প্রতি মনযোগ আরোপ করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন ব্যক্তি ছাড়া সকলকে ক্ষমা করে দেন। (সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬৬৫)

৩। যারা অহংকারবশত টাকনুর নিচে কাপড় পরিধান করে- সহীহ বুখারীর ৩৪৮৫ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-

حَدَّثَنَا بِشْرُ بْنُ مُحَمَّدٍ، أَخْبَرَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ ، أَخْبَرَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، أَخْبَرَنِي سَالِمٌ، أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " بَيْنَمَا رَجُلٌ يَجُرُّ إِزَارَهُ مِنَ الْخُيَاءِ خُسِفَ بِهِ، فَهُوَ يَتَجَلْجَلُ فِي الْأَرْضِ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ".

হযরত 'ইবনু 'উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, এক ব্যক্তি গর্ব ও অহংকারের সাথে লুঙ্গি টাখনুর নীচে ঝুলিয়ে পথ চলছিল। এই অবস্থায় তাকে যমীনে ধসিয়ে দেয়া হল এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে এমনি অবস্থায় নীচের দিকেই যেতে থাকবে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৪৮৫)

বুখারীর ৩৬৬৫ নং হাদিসের অপর বর্ণনায় এসেছে-

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ لَمْ يَنْظُرُ اللَّهُ إِلَيْهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনু 'উমার (রাযি.) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি গর্বের সঙ্গে পরনের কাপড় টাখনুর নিম্নভাগে ঝুলিয়ে চলাফিরা করে, ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ্ তার প্রতি রহমতের দৃষ্টি দিবেন না। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩৬৬৫)

৪। বিন্দুপরিমাণ যার ভেতর অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেনা- সহীহ মুসলিমের ১৬৬ নং হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-

(8)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ، عَنِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ " . قَالَ رَجُلٌ إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً . قَالَ " إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ " .

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনু মাস'উদ (রাযি.) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এও কি অহংকার? রসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ 'আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৬)

৫। মদ্যপ।

৬। পিতামাতার অবাধ্য সন্তান।

৭। দায়ূছ।

এই তিন শ্রেণির লোককেও ক্ষমা করা হবে না- সুনানে নাসায়ীর বর্ণনায় এসেছে-

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم قَالَ ثَلَاثَةُ قَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِمْ الْجَنَّةَ مُدْمِنُ الْخَمْرِ وَالعَاقُ وَالدَّيُوْتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبَثَ.

অর্থ: হযরত ইবনু ওমর (রাযি.) থেকে বর্ণিতঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, 'তিন শ্রেণীর লোকের প্রতি আল্লাহ তা'আলা জান্নাত হারাম করেছেন। (১) সর্বদা মদপানকারী, (২) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান ও (৩) পরিবারে বেপর্দার সুযোগ দানকারী (দায়ূছ)' (সুনানে নাসায়ী: ২৫৬২)।

৮। যিনাকারী নারী ও পুরুষ- সুনানে আবু দাউদের ৪৬৯০ নং হাদিসের বর্ণনায় এসেছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم " إِذَا زَنَى الرَّجُلُ خَرَجَ مِنْهُ الإِيمَانُ كَانَ عَلَيْهِ كَالظُّلَّةِ فَإِذَا انْقَطَعَ رَجَعَ إِلَيْهِ الإِيمَانُ " .

হযরত আবু হুরাইরাহ (রাযি.) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন কেউ ব্যভিচার করতে থাকে তখন তার থেকে ঈমান বের হয়ে তার (মাথার) উপর ছায়ার ন্যায় অবস্থান করতে থাকে। অতঃপর যখন সে অবসর হয় তখন ঈমান তার নিকট ফিরে আসে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬৯০)

♦️শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট কোন নামায বা আমল নেই

এই রাতটি যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাত, তাই এতে নিজ সাধ্যানুযায়ী অধিক হারে ইবাদতে মগ্ন থাকার চেষ্টা করা। কিন্তু এই রাতকে উপলক্ষ্য করে অনেকেই নির্দিষ্ট সংখ্যক নামায তথা ১২ রাকাত, ১০০ রাকাত নামায আদায়ের গুরুত্বারোপ করে থাকে তা সম্পূর্ণ বর্জনীয়। এ সম্পর্কে হাফিযুল হাদিস ইমাম ইরাকী রহ. এবং ইমাম নববী রহ. বলেন-

قَالَ الْحَافِظُ الْعِرَاقِي فِي الْمُغْنِي: حَدِيثُ صَلَاةِ نِصْفِ شَعْبَانَ بَاطِلُ . وَقَالَ النَّوَوِيُّ فِي الْمَجْمُوعِ : أَمَّا صَلَاةُ الرَّغَائِبِ وَهِيَ ثِنْتَا عَشْرَةَ رَكَعَةً بَيْنَ الْمَغْرِبِ وَالْعِشَاءِ لَيْلَةَ أَوَّلِ جُمُعَةٍ مِنْ رَجَبٍ، وَصَلَاةُ لَيْلَةِ النَّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ مِائَةُ رَكَعَةٍ، فَلَيْسَتَا بِسُنَّتَيْنِ.

শবে বারাআতকে কেন্দ্র করে নামায আদায় সম্পর্কে যে সকল হাদিস বর্ণনা করা হয় সবগুলো বাতিল।

ইমাম নববী রহ. বলেন- রজব মাসের ১ম জুমার রাতে মাগরিব ও ঈশার মধ্যবর্তী সময়ে সালাতুর রাগায়েব নামে ১২ রাকাত নামায এবং শবে বারাআতে ১০০ রাকাত নামাযের যে প্রচলন রয়েছে তা সুন্নাহ সম্মত নয়।

ইসলাহী খুতুবাতের ৪নং খণ্ডের ২৫৯ নং পৃষ্ঠায় এসেছে, শাইখুল ইসলাম হযরত মুফতী মুহাম্মদ তাকি উসমানী হাফিযাহুল্লাহ বলেন:

واضح رہے کہ شب براءت اگرچہ انتہائی فضیلت والی رات ہے اور فقہاء کرام رحمہم اللہ نے اس رات میں جاگ کر عبادت کرنے کو مستحب قرار دیا ہے، لیکن اس رات میں کوئی خاص عبادت مقرر نہیں ہے۔ " اس رات میں جاگنا، اس میں عبادت کرنا باعث اجر و ثواب ہے اور اس کی خصوصی اہمیت ہے، البتہ یہ بات درست ہے کہ اس رات میں عبادت کا کوئی خاص طریقہ مقرر نہیں کہ فلاں طریقہ سے عبادت کی جائے، بلکہ نفلی عبادت جس قدر ہو سکے ، وہ اس رات میں انجام دی جائیں، نفلی نماز پڑھیں، قرآن کریم کی تلاوت کریں، ذکر کریں، تسبیح پڑھیں، دعائیں کریں، یہ ساری عباد تیں اس رات میں کی جاسکتی ہیں، لیکن کوئی خاص طریقہ ثابت نہیں۔ ( اصلاحی خطبات ، ج : ۴، ص: ۲۵۹)

এটি পরিষ্কার জানা দরকার যে, শবেবরাত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি রাত এবং ফুকাহায়ে কিরাম রহিমাহুমুল্লাহ এই রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করাকে মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) হিসেবে গণ্য করেছেন। তবে এই রাতে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নির্ধারিত নেই।

"এই রাতে জাগ্রত থাকা, ইবাদত করা নেকি এবং সাওয়াবের কাজ, এই রাতের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তবে এটিও সত্য যে, এই রাতের ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই যে শুধুমাত্র অমুক পদ্ধতিতে ইবাদত করতে হবে। বরং এই রাতে যতটুকু সম্ভব নফল ইবাদত করা যেতে পারে, যেমন: নফল নামাজ পড়া, কুরআন মজীদ তিলাওয়াত করা, জিকির করা, তাসবীহ পড়া, এবং দোয়া করা। এই সব ইবাদতই এই রাতে করা যেতে পারে, তবে নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি প্রমাণিত নেই। (ইসলাহী খুতবাত, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫৯)

✅শবে বারাআতে করণীয় আমল সমূহ

১. বেশি বেশি ইবাদত ও দোয়া করা

অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এবং মুহাদ্দিসীনদের মতামত হল এই যে শাবানের ১৫ তারিখের রাত ফজিলত পূর্ণ রাত। এতে ইবাদত করা, নফল আদায় ইত্যাদি বরকত এবং কল্যাণের কারণ। আর এটা একটি মুস্তাহাব আমল। তবে কেউ যদি এটাকে ওয়াজিব মনে করে তখন তা বেদআত হয়ে যাবে।

২. সুযোগ হলে কবরস্থানে গমন করে মাগফিরাতের দোয়া করা

শবে বারাআতের ফযীলতে আম্মাজান আয়িশা রাযি. এর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রাতে জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানে গিয়েছেন। সুতরাং যদি আমাদেরও সুযোগ হয় তাহলে আমরাও এ রাতে কবর জিয়ারত করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

তবে এটা সুস্পষ্ট হওয়া উচিত যে, একে জরুরী মনে না করা। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর জিয়ারতের এই আমলটি খুবই গোপনীয়ভাবে করেছিলেন। এমনকি স্ত্রীগণের মধ্য থেকে হযরত আয়েশা রাযি.কেও অবগত করেননি, এবং কোন সাহাবীকেও সাথে নিয়ে যাননি। পরবর্তীতেও সাহাবায়ে কেরামদেরকে এ রাতে কবর জিয়ারত করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করার প্রমাণ নেই। এজন্য শবে বারাআতে জামাতবদ্ধভাবে কবরে যাওয়া, কবরকে আলোকিত করা এবং এই কাজকে শবে বারাআতের একটি আবশ্যকীয় অংশ মনে করা, রাস্তাঘাটে আলোকসজ্জা করা। এসব কর্মকাণ্ড দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি এবং সীমালংঘন করার নামন্তর। তবে কোন ধরনের আবশ্যকীয় মনে না করে কবর জিয়ারত করা জায়েয।

৩. আরেকটি আমল হল শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখা।

হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে রাতের বেলায় নামাজ পড়া এবং পরদিন রোজা রাখা।

যদিও এই হাদিসটি সর্বসম্মতিক্রমে সকল মুহাদ্দিসিনদের নিকট খুবই দুর্বল কেননা এ হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে "আবু বকর বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আবি সাবরা" নামক একজন রাবি রয়েছেন। যার উপর জাল হাদিস বানানোর আরোপ রয়েছে।

তবে এই হাদিস ছাড়াও শবে বরাতের পরদিন রোজা রাখার ফযীলত অন্য হাদিসের মাধ্যমেও জানা যায়, সহীহ বুখারী'র ১১৭৮ নং হাদিসের বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، رضى الله عنه قَالَ أَوْصَانِي خَلِيلِي بِثَلَاثٍ لَا أَدَعُهُنَّ حَتَّى أَمُوتَ صَوْمِ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَصَلَاةِ الضُّحَى، وَنَوْمٍ عَلَى وِتْرٍ.

অর্থ: হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আমার খলীল ও বন্ধু (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে তিনটি কাজের অসিয়্যাত (বিশেষ আদেশ) করেছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তা আমি পরিত্যাগ করব না। (তা হল) ১. প্রতি মাসে তিনদিন রোযা রাখা। ২. সালাতুয-যোহা (চাশত এর নামায আদায় করা)। ৩. বিতরের নামায আদায় করে ঘুম যাওয়া। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১১৭৮)

প্রতি মাসে তিনটি রোযা রাখাকে বলা হয় "আয়‍্যামে বীয" এর রোযা। অর্থাৎ চন্দ্র যখন পরিপূর্ণ থাকে। আর আমরা জানি, প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩,১৪,১৫ তারিখ চাঁদের পূর্ণরূপ দেখা যায়। সে হিসাবে ১৩,১৪,১৫, তারিখে রোযা রাখার বিশেষ একটি ফযীলত রয়েছে। আর শবে বরাতের পরদিন অর্থাৎ ১৫ তারিখও আয়‍্যামে বীযের একটি দিন। সুতরাং শবে বারাআতের পরদিন রোযা রাখাও ফযীলতপূর্ণ আমল।

এছাড়াও পুরো শা'বান মাসই যেহেতু রোজা রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় তাই এই হিসাবেও শবে বারাআতের পরদিন রোযা রাখা যায়।

ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াতে বর্ণিত আছে উৎসাহমূলক রোজা কয়েক প্রকার। যথা-

(১) মহররমের রোজা। (২) রজবের রোজা। (৩) শা'বানের রোজা। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া: ১ নং খণ্ড ১০৩ নং পৃষ্ঠা)

এর দ্বারা জানা গেল শা'বানের ১৫ তারিখের রোজা ফুকাহায়ে কেরামদের কাছেও খুবই পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য একটি আমল। এবং উম্মতের আমল যুগের পর যুগ ধরে এমনভাবে চলে আসছে যেন এই আমলটি "তালাক্কী বিল-কবুল" এর স্তর অর্জন করে নিয়েছে (তালাক্কী বিল-কবুল মানে হল, এমন আমল যা যুগ যুগ ধরে সর্বসম্মতিক্রমে সবার গ্রহণের মাধ্যমে চলে আসছে)। আর মুহাদ্দিসীনদের উসুল অনুযায়ী দুর্বল হাদিস যদি "তালাক্কী বিল-কবুল" এর পর্যায়ে চলে যায় তখন তা সহীহ হাদিসের হুকুমে হয়ে যায়। আর এমনিতেও ফাজায়েলে আমলের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস গ্রহণযোগ্য তা সর্বজন স্বীকৃত।

❌শবে বারাআতের বর্জনীয় কাজসমূহ

উপরের আমলগুলো ব্যতীত

Address

Gazipur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mufti Harun Siddik posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share