29/07/2026
আপনার বন্ধু বান্ধব কাউকে কি এমন লাল আলোর মাস্ক পরে ঘুমাইতে দেখসেন?
আপনি কি জানেন, এখন বাজারে লাল আলোর মাস্ক, কম্বল, ইনফ্রারেড সনা এবং যোগব্যায়ামের স্টুডিও পর্যন্ত পাওয়া যায়। দাবি করা হয়, এগুলো ত্বকের বয়স কমাবে, মাংসপেশির ব্যথা কমাবে এবং ঘুম ভালো করবে। আসলে কতটা সত্যি?
রেডিয়েশন আর কেমোথেরাপির কারণে ক্যানসার রোগীদের মুখের ভেতরে অনেক সময় রস ঝরা ভয়াবহ ঘা হয়। আমি জানি আপনাদের অনেকের আত্মীয় স্বজনের সাথে এমনটা হইতে আপনারা নিজ চোখেই দেখসেন।
লাল আলো দিয়া কি এই ঘা সারানো সম্ভব?
শুনতে কোনো ওয়েলনেস কোম্পানির বিজ্ঞাপনের মতো লাগতেসে, তাই না? কিন্তু লাল আলো নিয়া বিজ্ঞানীরা যেসব গবেষণা করতেসেন, সেগুলোর কিছু ফলাফল আসলেই অবাক করার মতো।
এই ঘায়ের কারণে রোগীরা ঠিকমতো খাইতে পারেন না। কারও কারও অবস্থা এত খারাপ হয় যে নল দিয়া খাবার দিতে হয়।
এখন গবেষকেরা দেখতেসেন, লাল বর্ণালির দিকে টিউন করা এলইডি রোগীর মুখের ভেতরে বসাইলে অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে উপসর্গের উন্নতি হয়।
এই চিকিৎসাপদ্ধতির নাম “ফটোবায়োমডুলেশন” বা পিবিএম। এখানে লাল এবং ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার কইরে শরীরের কোষের কাজকর্মে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়।
ক্ষত দ্রুত সারানো অবশ্য এর সম্ভাব্য ব্যবহারের মাত্র একটা অংশ। চোখের ডাক্তাররা বয়সের কারণে চোখের ক্ষমতা কমে যাওয়ার চিকিৎসায় এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা ত্বকের বয়সজনিত পরিবর্তনের চিকিৎসায় কিছুদিন ধরেই লাল আলো ব্যবহার করতেসেন।
এখন পিবিএম নিয়া আরও বড় বড় জায়গায় গবেষণা চলতেসে। যেমন, দুর্ঘটনাজনিত মস্তিষ্কের আঘাত, আলঝেইমার, পারকিনসন্স, এমনকি উদ্বেগ, বিষণ্নতা, মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেসের মতো মানসিক সমস্যাতেও এই চিকিৎসা কাজে লাগতে পারে কি না, সেইটা দেখা হইতেসে।
কিন্তু একটা আলো শরীরের ভেতরে গিয়া এত কিছু করবে ক্যামনে?
লাল এবং ইনফ্রারেড আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য তুলনামূলক বড়। এই কারণে আলো টিস্যুর গভীরে ঢুকতে পারে। সেখানে আলোটা “সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজ” নামে একটা প্রোটিন শোষণ করে।
এই প্রোটিন থাকে মাইটোকন্ড্রিয়ার মধ্যে। মাইটোকন্ড্রিয়াকে বলা যায় আমাদের কোষের পাওয়ার হাউস। খাবারের গ্লুকোজের শক্তিকে এটিপি নামের একটা অণুতে রূপান্তর করতে এই প্রোটিন সাহায্য করে। আর কোষের বেশির ভাগ জৈব রাসায়নিক কাজ চালানোর জ্বালানি হইলো এই এটিপি।
নাইট্রিক অক্সাইড নামের একধরনের বিক্রিয়াশীল অক্সিজেন অণু অনেক সময় সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজকে নিষ্ক্রিয় কইরে ফেলে। লাল আলো সেই নিষ্ক্রিয় অণুগুলোকে আবার সক্রিয় করতে পারে।
এর ফলে সক্রিয় সাইটোক্রোম সি অক্সিডেজের সংখ্যা বাড়ে, এটিপি উৎপাদন বাড়ে এবং কোষ মেরামতের মতো কাজের জন্য বেশি শক্তি পায়। একই সঙ্গে কোষে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এনজাইমও বাড়ে, যেগুলো ক্ষতিকর বিক্রিয়াশীল অক্সিজেন অণুকে নিষ্ক্রিয় করে।
এইটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ধরনের অক্সিজেন অণু শরীরের অন্যান্য জৈব অণুর ক্ষতি করতে পারে।
আমাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়াও পুরোনো হয়। তখন ভুলবশত আরও বেশি বিক্রিয়াশীল অক্সিজেন অণু তৈরি হয় এবং বয়স্ক মানুষের শরীরে এটিপি উৎপাদন কমে যায়।
University College London-এর Institute of Ophthalmology-এর স্নায়ুবিজ্ঞানী Glen Jeffery দাবি করতেসেন, পিবিএম ব্যবহার কইরে বয়স বাড়ার এই প্রক্রিয়াটাকে কিছুটা “অ্যাডজাস্ট” করা সম্ভব হইতে পারে।
২০২০ সালে Professor Jeffery-সহ গবেষকেরা Journals of Gerontology-তে একটা প্রাথমিক গবেষণা প্রকাশ করেন। তারা দেখতে চাইসিলেন, চোখের রেটিনায় এই পদ্ধতিটা কাজ করে কি না।
রেটিনা নিয়া ওনার আগ্রহের কারণ ছিল, একজন মানুষের পুরো জীবনে সেখানে এটিপির পরিমাণ প্রায় ৭০% কমে যায়।
গবেষণায় দেখা যায়, ৪০ বছরের বেশি বয়সী স্বেচ্ছাসেবীদের রঙের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা গড়ে ২০% উন্নত হইসে। কিন্তু এই ফলাফলকে ক্লিনিকের নিয়মিত চিকিৎসায় পরিণত করার আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
Professor Jeffery আরেকটা গবেষণায় অংশ নেন, যেইটা ২০২৪ সালে Journal of Biophotonics-এ প্রকাশিত হয়। সেখানে গবেষকেরা দেখতে চেয়েছেন, লাল আলো রক্তে গ্লুকোজ হঠাৎ বাইড়া যাওয়ার হার কমাতে পারে কি না।
অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে চিনিযুক্ত পানীয় পান করেন। তাদের অর্ধেকের পিঠে ১৫ মিনিট লাল আলো দেওয়া হয়, যাতে তারা চোখে দেখে বুঝতে না পারেন যে আসলে কী চিকিৎসা দেওয়া হইতেসে। বাকিদের কোনো আলো ছাড়াই নকল চিকিৎসা দেওয়া হয়।
যাদের লাল আলো দেওয়া হইসিলো, তাদের রক্তে গ্লুকোজের সর্বোচ্চ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় ৭.৫% কম ছিল।
অংশগ্রহণকারীদের কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন না। তারপরও ফলাফলটা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে এই পদ্ধতির কোনো ব্যবহার থাকতে পারে।
দুর্ঘটনায় মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগীদের চিকিৎসাতেও লাল আলো ব্যবহার করার চেষ্টা চলতেসে।
University of Birmingham-এর নিউরোসার্জন David James Davies এবং তার সহকর্মীরা সিলিকনের মধ্যে এলইডি বসাইয়া একটা যন্ত্র তৈরি করতেসেন। ভবিষ্যতে রোগীর শরীরে এই যন্ত্র প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা আছে। প্রযুক্তিটার পেটেন্টের জন্যও তারা আবেদন করসেন।
বর্তমানে দুর্ঘটনায় মারাত্মক মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডের আঘাত পাইলে ডাক্তারদের হাতে খুব বেশি বিকল্প থাকে না। আহত জায়গায় চাপ কমানোর জন্য অনেক সময় অস্ত্রোপচার কইরে মাথার খুলি বা মেরুদণ্ডের কিছু অংশ সরাইতে হয়।
Mr Davies-এর কাছে লাল আলোর চিকিৎসা নতুন একটা সম্ভাবনা। তবে যন্ত্রটা এখনো মানুষের শরীরে ব্যবহারের পর্যায় থেইকা অনেক দূরে। শিগগিরই শূকরের ওপর পরীক্ষা করা হবে।
ধারণাটা হইলো, দুর্ঘটনার পরে কয়েক দিন ধইরে মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে কোষ মৃত্যুর একটা ঢেউ চলে। সরাসরি মস্তিষ্ক বা মেরুদণ্ডে অল্প সময়ের জন্য লাল আলো দিলে এই কোষ মৃত্যুর গতি কমানো সম্ভব হইতে পারে।
আলোটা স্নায়ুকোষের বিপাকীয় কার্যক্রম স্থিতিশীল করতে পারে। একই সঙ্গে মাইটোকন্ড্রিয়া থেইকা এমন সংকেত বাড়াইতে পারে, যেগুলো পরে জিনকে কোষের বৃদ্ধি এবং মেরামতে সাহায্য করতে বলে।
Mr Davies-এর মতে, কোষের কালচার এবং ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় কোষের মৃত্যু ২০% বা তার বেশি কমতে দেখা গেছে।
এই ২০% শুনতে হয়তো খুব বেশি মনে হইতেসে না। কিন্তু Mr Davies বলতেসেন, বাস্তবে এই পার্থক্যের অর্থ হইতে পারে, একজন মানুষকে সারা জীবন হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হবে, নাকি তিনি লাঠি ভর দিয়া হাঁটতে পারবেন।
মস্তিষ্কের অন্যান্য রোগেও পিবিএম কাজে লাগতে পারে বলে আশা করা হইতেসে। পারকিনসন্স এবং আলঝেইমার, দুইটার সঙ্গেই অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সম্পর্ক আছে। লাল আলো এই চাপ কমাতে পারলে, প্রচলিত ওষুধে যাদের কাজ হয় না, তাদের কিছুটা উপকার হইতে পারে। তবে এই গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীর ব্যথা কমানো এবং ক্ষত দ্রুত সারানোর ক্ষেত্রেও লাল আলো সহায়ক হইতে পারে। ফিজিওথেরাপিতে পিবিএম প্রদাহ কমায় এবং রক্ত চলাচল বাড়ায়। এর ফলে টেন্ডন, মাংসপেশি এবং গাঁটের আঘাতের ব্যথা কমতে পারে।
Professor Jeffery বলতেসেন, লাল আলোর জৈবিক উপকার আছে শুনে আমাদের খুব বেশি অবাক হওয়ার কথা না। মানুষ সূর্যের আলোর নিচেই বিবর্তিত হইসে।
কিন্তু আধুনিক জীবন আমাদের শরীর যেই ধরনের আলো পায়, সেইটা বদলাইয়া দিসে। জানালার কাচ অনেক সময় ইনফ্রারেড আলো আটকে দেয়। আবার অফিসের এলইডি বাতিতে তুলনামূলক বেশি নীল আলো থাকে।
Professor Jeffery মনে করেন, এর স্বাস্থ্যগত প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রভাব কত দূর পর্যন্ত যায়, বিজ্ঞানীরা এখনো জানেন না।
আর বিজ্ঞান যেইখানে “হইতে পারে” বলতেসে, ওয়েলনেস ইন্ডাস্ট্রি সেইখানে ইতিমধ্যেই “অবশ্যই কাজ করে” টাইপ ব্যবসা শুরু কইরে দিসে।
এখন বাজারে লাল আলোর মাস্ক, কম্বল, ইনফ্রারেড সনা এবং যোগব্যায়ামের স্টুডিও পর্যন্ত পাওয়া যায়। দাবি করা হয়, এগুলো ত্বক তরুণ করবে, মাংসপেশির ব্যথা কমাবে এবং ঘুম ভালো করবে।
এর মধ্যে কিছু জিনিস আসলেই কাজ করতে পারে।
কিন্তু সমস্যা দুইটা।
প্রথমত, বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে অনেক গবেষণার ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হইসে। অনেক গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা খুবই কম ছিল, আবার যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ দলও ব্যবহার করা হয় নাই।
দ্বিতীয়ত, এই চিকিৎসাগুলোর অনেকগুলোতেই সঠিক ডোজের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয় না।
আলোর উৎস শরীর থেইকা কত দূরে, ঠিক কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, যন্ত্রটা কত ভোল্টেজে চলছে এবং কতক্ষণ আলো দেওয়া হচ্ছে, সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হইলো, বেশি সময় লাল আলোর নিচে থাকলেই বেশি উপকার হবে, বিষয়টা এমন না।
অতিরিক্ত আলো কোষের বিপাকীয় কার্যক্রমে একধরনের “ট্রাফিক জ্যাম” তৈরি করতে পারে। তখন উল্টো এটিপি উৎপাদন কমে যাইতে পারে।
তাই সুস্থ মানুষের জন্য Professor Jeffery-এর পরামর্শ বেশ মজার। উনি বলতেসেন, একটা কুকুর কিনেন। তাইলে দিনে কয়েকবার অন্তত ২০ মিনিট কইরে বাইরে যাইতে হবে, আর শরীরের যতটুকু লাল আলো দরকার, সেইটা সূর্যের আলো থেইকাই পায়া যাবেন।
কাজেই লাল আলোর চিকিৎসা একেবারে ভুয়া কিছু না। এর পেছনে বাস্তব বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া এবং আশাব্যঞ্জক গবেষণা আছে। কিন্তু বাজারে যেই সব যন্ত্র বিক্রি হইতেসে, তার প্রত্যেকটা একইভাবে কাজ করবে, এইটা ধইরা নেওয়ার কোনো কারণ নাই।
লাল আলো কাজে লাগতে পারে। কিন্তু ঠিক কোন রোগে, কতটুকু আলো, কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে এবং কতক্ষণ ব্যবহার করতে হবে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জাইনা নিজের শরীরকে ওয়েলনেস কোম্পানির পরীক্ষাগার বানানো ঠিক হবে না।
তথ্যসূত্র: “The surprising benefits of red light”, The Economist, London, Vol. 460, Iss. 9509, 25 July 2026, pp. 71-72.
Chowdhury