05/08/2026
শূন্যতার আবর্তন (অধ্যায়: ৮ ; পার্ট: ০১)
তৌহিদুল ইসলাম জোহা
রাজশাহীর সেই নিঝুম, একাকী রাতে জানালার পাশে স্থবির হয়ে বসে ছিল তাসফিয়া। ওপারে তখন নিকষ কালো অন্ধকারের বুক চিরে ঝিরঝির করে হাওয়া বইছে, আর এপারে তার চোখের তারায় ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল জীবনের ফেলে আসা শত শত অমীমাংসিত প্রশ্ন, স্খলন আর বুকের গভীর থেকে উঠে আসা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ব্যথা।
সে একসময় শূন্য আকাশে চোখ রেখে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “হে আমার প্রতিপালক... আমার এই অশান্ত, কলুষিত অন্তর যেন একটুখানি প্রশান্তি পায়। তুমি আমাকে পথ দেখাও। তবে... তবে আমি খুব ভালো করেই জানি, আমি হয়তো কোনোদিনও ওই নিখুঁত নিলয়ের মতো পুরোপুরি তোমার দেখানো পবিত্র পথে চলতে পারব না।”
তার ডান হাতের আঙুলে আলতো করে জড়িয়ে ছিল একটি কুরআনের তাসবিহ। কিন্তু তার অবচেতন হৃদয় খুব ভালো করেই জানত, সে মুখে অনুশোচনা করলেও এখনো পুরোপুরি সেই খাঁটি ও অবিচল বিশ্বাসের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেনি। এক মুহূর্তের জন্য স্মৃতির পাতা ওল্টাতেই তার মনে পড়লো মা আনিকার কথা। ছোটবেলায় কত পরম মমতায় মা তাকে পাড়ার মক্তবের হুজুরের কাছে কুরআন শেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন পুরো পাড়ার সমস্ত ছেলেমেয়ের মধ্যে তাসফিয়ার সুমিষ্ট কণ্ঠের তিলওয়াতই ছিল সবচেয়ে সেরা, সবচেয়ে আকর্ষণীয়।
আর আজ... আজকের এই ‘সো-কল্ড’ যান্ত্রিক আধুনিকতা আর সস্তা ট্রেন্ডের মায়া তাকে জীবনের কোন আঁধারে এনে দাঁড় করিয়েছে! এমন এক অন্ধকার, যার শেষ প্রান্তের আলোটা আসলে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা জাহান্নামের লেলিহান আগুনের ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছুই নয়।
একই সময়ে ক্যাম্পাসের বিশাল জামে মসজিদের সদর দরজার সামনে একা দাঁড়িয়ে ছিল নিলয় রহমান। আকাশের মেঘলা গুমোট আবহের দিকে তাকিয়ে সে এক গভীর, অবিচল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে অপেক্ষা করছিল তাসফিয়ার ফিরে আসার জন্য। তার ভেতরের অন্তরাত্মা বারবার এক অমোঘ আভাস দিচ্ছিল যে—তাসফিয়া ফিরবেই। আজ হোক কিংবা কাল, সে নিলয়ের জীবনে ফিরুক বা না ফিরুক, অন্তত নিজের রবের চাদরে আশ্রয় নিতে সে আল্লাহর হয়ে ফিরবেই ফিরবে।
তবে দিনশেষে এই একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক যুগে বেড়ে ওঠা একজন রক্ত-মাংসের তরুণ ছিল নিলয়। তাই সমস্ত আধ্যাত্মিকতার আড়ালে তার মনের কোনো এক সুপ্ত কোণেও লুকিয়ে ছিল আধুনিকতার কিছু চেনা ছোঁয়া—কখনো কখনো নিজের তরুণ মনের তীব্র স্বাদ কিংবা স্বাভাবিক অনুরাগ পাওয়ার এক তীব্র সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।
মসজিদের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ও বন্ধু রাশেদ তাকে দেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নিলয়, তুই সারাজীবন শুধু উম্মাহর কথা ভাবলি, অন্যের হেদায়েতের জন্য নিজের রাতের পর রাত জায়নামাজে কাটিয়ে দিলি। তুই কখনো কি নিজের মনের এই তীব্র একাকীত্ব কিংবা নিজের সুন্দর একটা ভবিষ্যতের জন্য কিছু ভাবিস না?”
নিলয় রাশেদের দিকে তাকিয়ে সেই চেনা স্নিগ্ধ ও বিষাদমাখা হাসি ফুটিয়ে বলল, “রাশেদ... আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য আর গন্তব্য হলো আমার আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টি করা মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করা। বাকি নিজের জীবনের যত পাওয়া-না পাওয়া আর ভাঙা-গড়ার গল্প আছে, তার সবটুকুর ভার আমি ওনার ওপরই ছেড়ে দিয়েছি।”
রংপুরের বুকে বিলাল নামক সেই অন্ধকারের রাজপুত্রের ছায়া ও দাপট ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। তার কালো ব্যবসা আর এই বস্তুবাদী সমাজে তার অনৈতিক ও অবৈধ দখলদারিত্ব দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছিল। নিজের বাবার আদি জন্মস্থান ও পৈতৃক ভিটা হওয়ায় রংপুর এলাকাটি ছিল বিলালের নিজের হাতের মুঠোয়, একদম নিজের অভয়ারণ্য।
একদিন সে তার বিলাসবহুল আস্তানায় বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সহযোগী রাকিবকে উদ্দেশ্য করে বলল, “শোন রাকিব, আমি আমার জীবনে শুধু নিজের তাৎক্ষণিক মনের সুখ আর শারীরিক তৃপ্তি খুঁজি। আর তাসফিয়া? আমি তাকে কোনোদিনও সেই সুখের দাস বা বন্দি বানাতে চাইনি। সে নিজের থেকে আমার জৌলুসে ধরা দিয়েছিল, এখন হুট করে তার মনে ধর্মের ভূত চেপেছে।”
রাকিব বিলালের উগ্র চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সতর্কতার সুরে বলল, “তোর ক্ষমতার পথ যতই মসৃণ আর দীর্ঘ হোক না কেন বিলাল, মনে রাখিস—দিনশেষে এই মহাবিশ্বের চরম ও পরম সত্যের মুখোমুখি তোকে একদিন হতেই হবে। সেদিন কিন্তু এই অবৈধ টাকা তোকে বাঁচাতে পারবে না।”
বিলাল এক পৈশাচিক, ঠাণ্ডা ও ক্রূর স্বরে হেসে বলল, “সত্য? তুই কোন সত্যের কথা বলছিস রাকিব? এই দুনিয়াতে ‘সত্য’ বলতে আলাদা কিছু নেই। সত্যকে আমি আমার নিজের তৈরি করা নিয়মে, নিজের ক্ষমতার জোরে গড়তে চাই।”
দিন যতই যাচ্ছিল, তাসফিয়া ততই তার জীবনের ফেলে আসা বিগত বছরগুলোর ভয়ংকর ভুল আর স্খলনগুলো নিজের অন্তরের গভীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল। ধর্মের পথে সে কিছুটা ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সে যে এখনো সমাজ আর আধুনিকতার মায়া কাটিয়ে সম্পূর্ণ ধার্মিক হয়ে উঠতে পারেনি—এই নির্মম সত্যটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না।
অবশেষে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সাহস করে একদিন সে ক্যাম্পাসের এক নিভৃত কোণে নিলয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত অপরাধীর সুরে বলল, “নিলয়... আমি সত্যিই মন থেকে চেষ্টা করব আল্লাহর দেখানো সঠিক পথে চলার। কিন্তু... কিন্তু আমি হয়তো সব কিছুতে তোমার মতো ওমন একান্ত ধার্মিক বা পর্দানশীন হয়ে উঠতে পারব না। আর না আমার বুকের ভেতর ওমন অটল তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভরসা আছে, যা তোমার মাঝে প্রতিনিয়ত দেখা যায়।”
তাসফিয়া হয়তো নিজের অপরাধবোধ থেকে আরও কিছু কথা বলতো, কিন্তু নিলয়ের সেই চিরচেনা সরল, পবিত্র ও নিস্পৃহ চোখ জোড়া তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। এই চোখজোড়া আজ বড্ড মলিন, বড্ড ক্লান্ত। যে মানুষটার মুখের সেই স্বর্গীয় হাসি তাসফিয়া নিজে হাতে কেড়ে নিয়েছে, সেই ব্যক্তিকে আবার নতুন করে কীভাবে বলবে যে—সে নিলয়ের কাছে জীবনের একটা নতুন সুযোগ চায়! নিলয় যেন তাকে সমস্ত অতীত ভুলে এক হালাল বন্ধনে নিজের করে গ্রহণ করে!
কিন্তু নিলয়ের ওই নিস্তেজ, বিষাদময় চোখ দুটো এই মুহূর্তে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল যে—নিলয়ের জীবনের এই সমস্ত মানসিক কষ্টের জন্য দিনশেষে একমাত্র তাসফিয়ার ভুল সিদ্ধান্তগুলোই দায়ী। তাসফিয়া নিজের ভেতরের তীব্র অনুশোচনা নিয়ে আর নতুন করে এই নিষ্পাপ ছেলেটাকে কোনো কষ্টের সাগরে ফেলতে চায় না।
নিলয় তাসফিয়ার ভেতরের এই তীব্র মানসিক ঝড় টের পেয়ে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে তাসফিয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে বলল, “ইসলামে বা ভালোবাসায় কোনো জোরজবরদস্তির স্থান নেই তাসফিয়া।
ভালোবাসা মানে কাউকে শিকল দিয়ে বাধ্য করা নয়। আমি শুধু চাই, তুমি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় তোমার জীবনের চলার পথ বেছে নাও। তবে হ্যাঁ, আমি সবসময় দোয়া করি—তোমার সেই বেছে নেওয়া পথটা যেন অন্তত হালাল আর আমাদের আল্লাহর পছন্দের সীমানার ভেতরে হয়।”
তাসফিয়া এক মুহূর্তের জন্য নিলয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল, “আমার ভেতরের এই অনুভূতির গভীরতা হয়তো তোমার ওই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মতো পবিত্র নয় নিলয়... কিন্তু দিনশেষে আমি আমার এই যান্ত্রিক জীবনে শুধু একটুখানি অন্তরের শান্তি খুঁজছি। আর... আর আমার সেই আসল শান্তি হয়তো একমাত্র তোমার দিকে তাকিয়েই...”
শেষের বাক্যটি তাসফিয়া মুখ ফুটে বলতে পারল না, সে তার নিজের মনের মণিকোঠার গভীরে পাথরচাপা দিয়ে রেখে দিল।
কিন্তু নিলয় যেন আজ তাসফিয়াকে স্বয়ং তাসফিয়ার চেয়েও অনেক বেশি ভালো করে পড়তে পারছিল। নিলয় আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমি শুধু চাই তাসফিয়া, তুমি যেন এই ধোঁকার দুনিয়ার ভিড়ে আর কোনোদিন হারিয়ে না যাও। নিজের হয়ে যদি থাকতে নাও পারো, অন্তত আমার রবের কাছাকাছি কোথাও থেকো।”
একই দিন বিকেলে, রুমে বসে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল আয়শা মাহমুদ। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জমাট বাঁধা অশ্রু বাতাসের তীব্রতায় শুকিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল সাবিহা। সাবিহা কেবল তাসফিয়া ও নিলয়ের কলেজের সেই পুরনো কমন বন্ধুই নয়, বরং বর্তমানে ভার্সিটি লাইফেও সে তাসফিয়ার অত্যন্ত কাছের একমাত্র বান্ধবী। তাসফিয়ার জীবনের উত্থান-পতন আর নিলয়ের নীরব হাহাকার—দুটোই খুব কাছ থেকে দেখার কারণে সাবিহার অন্তরেও এক অদ্ভুত বিষাদ কাজ করত।
সাবিহা আয়শাকে এভাবে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকল। সে আয়শার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “আয়শা আপু... তুমি কি এখনো নিলয় ভাইয়ের তাসফিয়ার প্রতি একতরফা ভালোবাসার কষ্টটা নিজের বুকের ভেতর চেপে রেখেছ? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তুমি নিজেকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছো।”
আয়শা চট করে নিজের চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করে এক হাসি ফুটিয়ে বলল, “কী যে বলো না সাবিহা! আমি নিজেকে কেন শেষ করব? নিলয় ভাই তো আমাদের এই দাওয়াহ টিমের একজন পরম পথপ্রদর্শক। ওনার প্রতি আমার যে সম্মান আর শ্রদ্ধা...”
সাবিহা আয়শার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বাধা দিয়ে বলল, “আমায় লুকাতে এসো না আপু। আমি তাসফিয়া আর নিলয় দুজনের সাথেই কলেজ পার করে এসেছি, আর এখন ভার্সিটিতেও তাসফিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ আমি লক্ষ্য করি। তাই তোমার ভেতরের এই নীরব দহন আর নিলয় ভাইয়ের প্রতি একতরফা ভালোবাসার পবিত্রতা আমি খুব ভালো করে বুঝি। তুমি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তাসফিয়াকে নিলয় ভাইয়ের জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিলালের বিরুদ্ধে আড়ালে থেকে যে চাল চেলেছ, তা যদি ভাইয়া কোনোদিন জানতে পারে?”
আয়শা এবার জানালার বাইরে তাকিয়ে এক অসীম শূন্যতায় ভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে পার্শ্ব কথোপকথনের সুরে বলল, “জানলে জানবে সাবিহা! নিলয় আজীবন অন্যের সুখের জন্য নিজের চোখের জল বিসর্জন দিয়েছে। তাসফিয়া হয়তো একটা সময় পাপের সাগরে ডুবে ছিল, কিন্তু নিলয়ের আত্মিক শান্তি তো একমাত্র ওর মাঝেই লুকিয়ে আছে।
নিলয়ের ঠোঁটে এক চিলতে পবিত্র হাসি ফোটানোর জন্য আমি যদি নিজের এই একতরফা অনুভূতিকে আজীবন এক সুন্দর রহস্য বানিয়ে বুকের ভেতর কবর দিয়ে দিতে পারি, তবে তাতেই আমার পরকালীন মুক্তি। দিনশেষে আমার এই না-পাওয়ার হাহাকারটুকু না হয় আমার আর আমার রবের মাঝেই এক গোপন আমানত হয়ে বেঁচে থাকুক।”
সাবিহা আয়শার এই আকাশসম ত্যাগের গভীরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে শুধু মনে মনে ভাবল—এই দুনিয়াতে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও কি সত্যিই বেঁচে থাকে!
***পরবর্তী এবং পূর্ববর্তী অংশ পিন কমেন্টে দেওয়া আছে***
#শুন্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস #উপন্যাস_প্রেমী #বাংলা_উপন্যাস