Touhidul Islam Zoha

Touhidul Islam Zoha Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Touhidul Islam Zoha, Digital creator, গাইবান্ধা, Gobindganj.

Always Believe In Allah 🤗🧡
Writter of "Islamic Romantic" Genre

Writter Of -- শুন্যতার আবর্তন ; খরকুটো ; মরীচিকা ; কবুলিয়াত ; তাওয়াক্কুল ; কোয়ারেন্টাইন ; জ্বীন ; তাবিজ & তাকদীর

31/08/2026

#লালবাগকেল্লা
একবার হলেও ঘুরে দেখা উচিৎ ✌️🥹🧡🎀

#ঢাকা

শূণ্যতার আবর্তন : অধ্যায় -১০; পার্ট -০১তৌহিদুল ইসলাম জোহাহযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মধ্যরাত। চারপাশের কৃত্রিম...
27/08/2026

শূণ্যতার আবর্তন : অধ্যায় -১০; পার্ট -০১
তৌহিদুল ইসলাম জোহা

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মধ্যরাত। চারপাশের কৃত্রিম উজ্জ্বল আলোর নিচে ট্রলি ব্যাগ হাতে একা দাঁড়িয়ে বিলাল। তার ঠোঁটের কোণে লেপ্টে চরম বিজয়ের বিকৃত ও কুৎসিত এক হাসি। নিজের পেছনে ফেলে এসেছে কেবল একের পর এক ভাঙা হৃদয়, প্রতারণার ভয়াল ছাপ আর নির্লজ্জ আত্মরক্ষার ফাঁপা অহংকার—তবু তার অন্তরে কোনো অপরাধবোধ ছিল না, সে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত।

​বিমানের জানালার পাশে বসে সুদূর মেঘের দিকে তাকিয়ে তার মনে উদয় হওয়া শেষ ভাবনা: “দুনিয়ার বলদ মানুষগুলো সস্তা ভালোবাসা চায়, আর আমি চাই সুযোগ। ওরা এখন বসে বসে কাঁদবে, নিজের কপাল চাপড়াবে; আর আমি দূর দেশে গিয়ে নতুন কোনো শিকারে নতুন করে জীবনটা রঙে রঙে উপভোগ করব।”

​দানবীয় প্লেনটি তীব্র গর্জন করে আকাশের বুকে উড়াল দিল। তার ডানাগুলোর নিচে ধূসর হয়ে হারিয়ে গেল রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম... আর অসংখ্য ক্ষতবিক্ষত মন। বিলাল কোনোদিন পেছনে ফিরে তাকায় না, সে শুধুই গ্রাস করতে জানে।

​চট্টগ্রামের যান্ত্রিক ও ধুলোবালিঘেরা দিনগুলোর আড়ালে তাসফিয়া নিজেকে যেন দিন দিন আরও বেশি একা, নিঃসঙ্গ ও গুমোট অনুভব করছিল। চারপাশের সস্তা সম্পর্কের ছিন্নভিন্নতা, পদে পদে পৈশাচিক বিশ্বাসঘাতকতা—সব মিলিয়ে তার ভেতরটা এক গভীর অবসন্ন বিষণ্নতায় ছেয়ে যাচ্ছিল।

​সে নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করতে করতে ভাবলো, ‘আমার এখন এমন কাউকে খুব প্রয়োজন, যিনি কোনো বিচার ছাড়াই আমার মেন্টর হয়ে আমাকে বুঝতে পারবেন। যিনি আমার জীবনের ফেলে আসা পাহাড়সম ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার সঠিক আলো দেবেন।’

​ঠিক তখনই তার স্মৃতির কোণে ভেসে উঠল ছোটবেলার সেই অতি প্রিয় দূর সম্পর্কের বড় বোন—মাহমুদা আপুর কথা।

মাহমুদা আপু বর্তমানে নিজের চাকরির সূত্রে চট্টগ্রামেই বসবাস করছেন। তিনি একাধারে অত্যন্ত শিক্ষিতা, প্রাজ্ঞ, রুচিশীল এবং অদ্ভুত মার্জিত ও সুশ্রী ধার্মিকতায় ভারসাম্যপূর্ণ এক নারী।

​তাসফিয়া বুক কাঁপিয়ে বেশ দ্বিধা নিয়ে একটা মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠাল: “আপু, কিছুটা সময় দেওয়া যাবে? আমি খুব বিপদে আছি... একটু দেখা করতে চাই আপনার সাথে।”

​ওপার থেকে উত্তর আসতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না: “অবশ্যই বোন! তুমি আসবে আর আমি সময় দেব না? এই বড় বোনের দরজা তোমার জন্য সবসময় খোলা, চলে এসো।”

​সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাসফিয়া মাহমুদা আপুর ভাড়া বাসায় গিয়ে পৌঁছালো। ঘরটি খুব সাদামাটা, কিন্তু প্রতিটি কোণায় অদ্ভুত পরিপাটি ছোঁয়া ও প্রশান্তির সুবাস। সুতি ওড়না দিয়ে মাথা ও বুক খুব মার্জিতভাবে ঢেকে রাখা, চোখে এক স্নিগ্ধ ও স্বর্গীয় মায়াকাড়া সৌন্দর্য নিয়ে দরজা খুললেন মাহমুদা আপু।

তার চেহারা থেকে যেন এক ধরনের স্নিগ্ধ আলো ঠিকরে বের হচ্ছিলো। ​মাহমুদা আপু তাসফিয়ার মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে দরজা ছেড়ে দাঁড়ালেন, “এসো এসো, আমার ঘরের লক্ষ্মী বোন! কী ব্যাপার, চট্টগ্রাম বন্দরে বুঝি নতুন কোনো জলদস্যু এসেছে? চেহারা এমন শুকিয়ে আমসি বানিয়ে রেখেছ কেন?”

​মাহমুদা আপুর এই আকস্মিক হালকা রসিকতায় তাসফিয়ার ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটলেও তার চোখে পানি চলে এল। সে ইতস্তত করে বলল, “আপু, আমি নিজের ভেতরের অনেক কিছু মেলাতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি নিজের আত্মিক লড়াইয়ে চরমভাবে হেরে যাচ্ছি।”

​মাহমুদা আপু আলতো করে তার কাঁধে নরম হাত রাখলেন, “মানুষের জীবন তো শুধু সস্তা আবেগ আর সম্পর্কের সুতোয় বাঁধা নয় তাসফিয়া। মানুষের শরীরের ভেতরে যে অমর আত্মা আছে, তার ভেতরেও আলোর একটা পরম পথ থাকে—তুমি কি কোনোদিন সেটা খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছ?”

তাসফিয়া উত্তর দিতে পারলো নাহ।

​ডাইনিং টেবিলে বসে তারা লেবু চা খাচ্ছিলো দুজনে। তাসফিয়ার হঠাৎ মনে পড়ে গেলো লেবু চা নিলয়ের অনেক পছন্দের। তাসফিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার চোখ থেকে একফোটা পানি চায়ের কাপে পড়ে গেলো। জানালার ওপারে আলো-আঁধারির খেলা চলছিল।

তাসফিয়া এবার তার বুকের জমাট বাঁধা কষ্টের পাথরটা পুরো খুলে দিলো—নিলয়ের অসীম আধ্যাত্মিক ভালোবাসা, বিলালের পৈশাচিক প্রতারণা, আর নিজের দোলাচালে ভরা ধর্মীয় চেতনার সমস্ত লড়াই।

​মাহমুদা আপু চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে ধীর ও শান্ত স্বরে বললেন, “ভালোবাসা তখনই পূর্ণতা পায় তাসফিয়া, যখন তা আত্মিক হয়। যারা শুধু চামড়া আর শরীরের প্রেম চায়, তারা তো দিনশেষে মায়াজালের ছায়াকেই আঁকড়ে ধরে। আর যারা মন ও আত্মাকে ভালোবাসতে জানে, তারা সমস্ত অন্ধকারের মাঝেও আলোর সন্ধান পায়।”

​তাসফিয়া চোখে জল নিয়ে বিষাদ কণ্ঠে বলল, “আপু, আমি সত্যি ভীষণভাবে পথ হারিয়েছি। আমি জানি না আমি আসলে কে, আর কোন জাহান্নামের দিকে ভেসে যাচ্ছি।”

​মাহমুদা আপু তার চিবুকটা পরম মমতায় তুলে একটু চুপ থেকে বললেন, “তুমি একজন মুসলিমা। সেটাই তোমার সৃষ্টির প্রথম ও পরম পরিচয়। আর বাকি দুনিয়ার যত তকমা, পরিচয় আর সম্পর্ক—ওগুলো তো শুধু সাময়িক সময়ের খেলা।”

​ফিরে আসার সময় তাসফিয়া রিকশায় চেপে বসলো। আকাশের বুকে তখন ধবধবে পূর্ণিমার চাঁদ হাসছিল, আর রাতের ঠান্ডা বাতাসে ভাসছিল অদ্ভুত এক আধ্যাত্মিক শান্তি।

​রিকশার হুড তুলে দিয়ে তাসফিয়া মনে মনে ভাবল, “মাহমুদা আপুর কথাগুলো আমার হৃদয়ের গভীরে একদম গেঁথে গেছে। আমি জানি না নিজেকে কতটুকু বদলাতে পারব, তবে আজকের পর মনে হচ্ছে—আমার আলোর দিকে ফেরার এই কঠিন পথটা হয়তো আর একলার নয়।”

***পরবর্তী ও পূর্ববর্তী অংশ পিন কমেন্টে দেওয়া আছে***

#শূণ্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস #উপন্যাস_প্রেমী

25/08/2026

বইয়ের পাতা নাকি সিনেমার পর্দা—সাহিত্য কি তার মূল সৌন্দর্য হারাচ্ছে? 🎬📚

​একটি উপন্যাস যখন একজন পাঠক পড়েন, তিনি নিজের মনের মতো করে এক অপূর্ব কল্পনার জগৎ তৈরি করেন। কিন্তু পর্দায় রূপ দেওয়ার নামে যখন বাজে কাস্টিং, নেপোটিজম কিংবা সস্তা নির্মাণের আশ্রয় নেওয়া হয়, তখন পাঠকের সেই অনুভূতির ওপর সরাসরি আঘাত আসে!

​সাহিত্যকে সাহিত্যের জায়গায় থাকতে দিন। ব্যবসায়িক স্বার্থে বা জোর করে অনুভূতির সাথে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল বন্ধ হওয়া উচিত নয় কি?

​আপনার কী মনে হয়? বই থেকে বানানো সিনেমাগুলো কি সত্যিই বইয়ের মতো অনুভূতি দিতে পারে, নাকি সাহিত্যকে নষ্ট করা হচ্ছে? কমেন্টে জানান আপনার মতামত! 👇

​ #উপন্যাস #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা

21/08/2026

Nature X Peace ………🤗🧡🫠

শূণ্যতার আবর্তন ; অধ্যায় ৯ - পার্ট ০২তৌহিদুল ইসলাম জোহা​তাসফিয়া জানালার কাঁচের ওপারে চোখ রেখে নিজেকে প্রশ্ন করল, “আমি হয়...
20/08/2026

শূণ্যতার আবর্তন ; অধ্যায় ৯ - পার্ট ০২
তৌহিদুল ইসলাম জোহা

​তাসফিয়া জানালার কাঁচের ওপারে চোখ রেখে নিজেকে প্রশ্ন করল, “আমি হয়তো কোনোদিন ওমন পুরোদস্তুর ধার্মিক মেয়ে হয়ে উঠতে পারব না, তবে আমি আজীবন সেই পরম সত্যের খোঁজে থাকব—যা মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতা শেখায়, তবে তা অবশ্যই রবের দেওয়া সাধ্য ও সীমানার মধ্যে।

মানুষ চাইলেই তো বিলাসবহুল বিমানে চড়ে আকাশের বুকে উড়তে পারে, কিন্তু সে তো কোনোদিন পাখির মতো নিজের ডানা মেলে ইচ্ছামতো যেখানে-সেখানে উড়ে বেড়াতে পারে না!

এই সমাজে সবাইকে নিয়ে ওড়া সেই সুরক্ষিত ‘বিমান’টা আসলে হলো—সবার মতামত আর সহমতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটা পবিত্র হালাল বিয়ে। আর আধুনিকতার নামে আবেগে পড়ে এই যে আলগা পিরীতি আর যিনা—এ তো আসলে নিজের দুর্বল হাত দুটোকে ডানা মনে করে শূন্যে ওড়ার এক মিথ্যা ও আত্মঘাতী প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়! আর এর শেষ পরিণতি যে কতটা ভয়ংকর, তা আজ আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে?

আমরা যতই আধুনিকতার বুলি আউড়ে নিজেদের গা এলিয়ে বেড়াই না কেন, দিনশেষে যখন আচমকা আজরাইল এসে সামনে দাঁড়াবে, তখন এই মেকি প্রেম-ভালোবাসা কোন দিক দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাবে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।”

​সন্ধ্যার বেলা সমুদ্রের তীরে প্রলয়ংকরী ঢেউয়ের শব্দের মাঝে পাথরের ওপর একা দাঁড়িয়ে ছিল তাসফিয়া। তার চোখ তখন দূর সমুদ্রের নীল জলের ওপারে—একদম অজানা এক ভবিষ্যতের দিকে তাকানো, যেখানে জড়িয়ে ছিল গভীর অনুতাপ, এক অজানা চারিত্রিক বিপ্লবের তীব্র সন্ধান আর আল্লাহর অফুরন্ত করুণার এক বুক আশা।

​চট্টগ্রামের ভোরবেলাটা ছিল বড্ড ধোঁয়াটে আর কুয়াশায় ঘেরা। সমুদ্রের সেই নরম ও শীতল বাতাস যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসছিল এক নতুন দিনের সুবাস। তাসফিয়া তার ছোট্ট ফ্ল্যাটের জানালা খুলে বাইরের ভোরের আলোর দিকে তাকিয়ে দেখল, তার মনটা কেন জানি এক অজানা অস্থিরতা আর চঞ্চলতায় ভরে উঠছিল।

​ঠিক একই সময়ে, রাজশাহীর ক্যাম্পাস মসজিদের শীতল মেঝেতে সেজদায় পড়ে দুই হাত আকাশের দিকে তুলে পরম আকুতিতে কান্নাভেজা কণ্ঠে দোয়া করছিল নিলয় রহমান, “হে আমার দয়াময় আল্লাহ! তুমি তাসফিয়ার এই অস্থির অন্তরটাকে একজন প্রকৃত ‘মোরশিদ’ বা আলোর দিশারী বানিয়ে দাও। সে যেন এই দুনিয়ার মেকি মায়া ছিন্ন করে সত্যি মুক্তির পথে চলতে পারে। মালিক, আমার এই খাঁটি ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যেন তার জীবনের চলার পথে এক পরম বরকতময় ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।”

তার নিষ্পাপ চোখ জোড়াতে ছিল এক গভীর ও বিষাদময় দুঃখ, কিন্তু আল্লাহর প্রতি তার আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ছিল পাহাড়ের মতো অটুট।

​অন্যদিকে রংপুরের অন্ধকার আস্তানায় বসে বিলাল তার সাঙ্গপাঙ্গ ও গুন্ডাবাহিনী নিয়ে এক নতুন ভয়ংকর পরিকল্পনার ছক কষছিল। সে খুব ভালো করেই জানত, তাসফিয়াকে এভাবে সহজে ছেড়ে দেওয়া মানে সমাজের বুকে নিজের ক্ষমতার কাছে নিজের অজান্তেই চরমভাবে হেরে যাওয়া।

​সে টেবিল চাপড়ে তার অনুচরদের বলল, “তোরা যেভাবেই হোক চট্টগ্রামের বুকে ওর চারপাশে এমন একটা মরণফাঁদ তৈরি কর, যেখানে দাঁড়িয়ে ওর সামনে আর কোনোদিকে পালানোর বিন্দুমাত্র রাস্তা অবশিষ্ট না থাকে।”

​বিলালের এই উগ্র চক্রান্ত দেখে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু কামরান কিছুটা চিন্তিত ও শঙ্কিত হয়ে বলল, “বিলাল, তুই ভুল করছিস। এই অনৈতিক আর অসাধু পথ কোনোদিন মানুষের জীবনে শেষ পর্যন্ত শান্তি এনে দিতে পারে না।”

​বিলাল এক পৈশাচিক ও অট্টহাসি হেসে বলল, “শান্তি? আরে কামরান, আমার নিজের জীবনের জন্য কোনো শান্তির প্রয়োজন নেই ভাই! আমার একমাত্র প্রয়োজন হলো—ওই তাসফিয়ার জীবনের চরম অশান্তি!
একটা সম্পর্ক থেকে সে যখন ইচ্ছা নিজের মর্জি মতো বেরিয়ে যাবে? এটা কি মগের মুল্লুক নাকি? আর আমাকে এখানে বসে বসে ধর্মের আর সততার জ্ঞান দিচ্ছিস কামরান?
ভাই আমার... তুই নিজে যে নিজের আপন স্ত্রীকে ঘরে বন্দি রেখে বাইরে প্রতিদিন নতুন নতুন মেয়ের সাথে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াস, তখন কোথায় লুকিয়ে থাকে তোর এই সততার মহান জ্ঞান?”

বিলালের এমন তীক্ষ্ণ ও নোংরা জবাবে কামরান মাথা নিচু করে স্তব্ধ হয়ে রইল।

​চট্টগ্রামের সেই ছোট ফ্ল্যাটের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাচ্ছিল তাসফিয়া— “আমি হয়তো কোনোদিন আর পাঁচটা মেয়ের মতো পুরোপুরি ধার্মিক হতে পারব না, কিন্তু আমি আর নতুন করে সম্পূর্ণ হারামের ওই নোংরা নর্দমাতেও ডুবতে চাই না। আমি কেন জানি এই দ্বীন আর দুনিয়ার ঠিক মাঝখানের কোনো এক মধ্যপথে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। ইশ! এই সমাজের বুকে তারা কতই না ভালো আছে, যারা নিজেদের জীবনে দ্বীন আর দুনিয়াকে চমৎকারভাবে ব্যালেন্স করে চলতে পেরেছে!”

​সূর্য ডোবার ঠিক আগ মুহূর্তে, সমুদ্রের বালুকাবেলা ঘেঁষে একাকী ও ধীর পায়ে হাঁটছিল তাসফিয়া। তার চোখের কোণে মিশে ছিল অনুশোচনার তপ্ত অশ্রু, আর মনটা ছিল এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্বে অস্থির।

​রাত গভীর হলে, ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় বিছানায় বসে তাসফিয়া নিজের অন্তরের ভেতরের আসল রূপটাকে চিনতে পারছিল। রাজশাহী থেকে এই সুদূর চট্টগ্রামে পালিয়ে আসা, বিলালের কুৎসিত ছায়া থেকে নিজেকে দূরে রাখার অবিরাম চেষ্টা, আর ধর্মের পথে কিছুটা ফিরে এলেও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা ও সংশয়ে ঘেরা তার এই পুরো মন।

​আর ওদিকে রাজশাহীতে বসে নিলয় তখনও প্রতিটা নিঃশ্বাসে নীরবে তাসফিয়ার জন্য দোয়া করে যাচ্ছিল। পবিত্র ভালোবাসা আর ইসলামের সুশীতল ছায়ায় তাকে ফিরিয়ে আনার এক তীব্র আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল তার প্রতিটি মোনাজাতে; কিন্তু সে মনে-প্রাণে জানত, জোর করে কোনোদিন মানুষের মন বা হেদায়েত পাওয়া যায় না।

নিলয় মোনাজাত শেষ করে বলল, “হে আল্লাহ... তুমি তাসফিয়ার অন্তরকে তোমার ঐশ্বরিক আলোয় আলোকিত করে দাও। আমি শুধুএটাই চাই—সে যেন অন্তরের পরম শান্তি খুঁজে পায়, তা সে আমার সঙ্গে হোক... কিংবা আমাকে ছাড়া।”


রংপুরের বুকে বসে বিলালও যেন এক অদ্ভুত শূন্যতায় নিজের ভেতরের আসল খেলাটা বুঝতে পারছিল। সে মনে মনে উপলব্ধি করল—তাসফিয়ার প্রতি তার ভেতরের অনুভূতিটা কোনোদিনও পবিত্র ভালোবাসা ছিল না, বরং শুধু একাকীত্বের সময় পার করার জন্য তাসফিয়া তাকে অন্ধের মতো ধরে রেখেছিল। তবুও তার ভেতরের পুরুষালী জেদ আর উগ্র অভিমান তাকে কিছুতেই শান্ত হতে দিচ্ছিল না। সে তাসফিয়াকে ধ্বংস করার নতুন নতুন চক্রান্তে মগ্ন থাকলেও, তার নিজের মনটাও কেন জানি এক অদৃশ্য দুর্বলতা ও তীব্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।

​তাসফিয়া খুব ভালো করেই জানত, তার আগামী দিনের জীবনটা মোটেও সহজ নয়। পাপের জগত থেকে সত্যের পবিত্র পথে সম্পূর্ণ ফিরে আসা তার মতো এক মডার্ন মেয়ের জন্য বড্ড বেশি কঠিন। তবুও সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনকে শক্ত করে বিশ্বাস করাল—সে আজ থেকে ইসলামের মূল আদর্শগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করবে, তবে সম্পূর্ণ নিজের মতো করে।

সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, “আমি আজ থেকে সমস্ত হারাম সম্পর্ক আর যিনা থেকে হাজার মাইল দূরে থাকব, নিজেকে ভালোবাসতে শিখব, আর আমার আল্লাহর রহমতের অসীম আশার ওপর ভরসা রাখব।”

​চট্টগ্রামের সেই নিঝুম সন্ধ্যায় দূর থেকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। তাসফিয়ার সেই ম্লান চোখ জোড়াতে এখন একপাশে মিশে ছিল আলোর পথে ফেরার এক নতুন আশা, আর অন্য পাশে ছিল আগামী দিনের অজানা এক যাত্রার তীব্র ভীতি। জীবন হয়তো তাকে বড্ড কঠিন ও নিষ্ঠুর পাঠ শিখিয়েছে, কিন্তু দিনশেষে সে তার নিজের সেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া আত্মাকে আল্লাহর রহমতের আলোয় নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছে।

***পরবর্তী ও পূর্ববর্তী অংশ পিন কমেন্টে দেওয়া আছে***

#শুন্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস_প্রেমী #বাংলা_উপন্যাস #উপন্যাস #গল্প

শূণ্যতার আবর্তন : অধ্যায় ৯ ; পার্ট - ০১চট্টগ্রামের পুরোনো আর ব্যস্ত বন্দর এলাকা। চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে তাসফিয়...
19/08/2026

শূণ্যতার আবর্তন : অধ্যায় ৯ ; পার্ট - ০১

চট্টগ্রামের পুরোনো আর ব্যস্ত বন্দর এলাকা। চারপাশের যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে তাসফিয়া আমিন এখানে এসেছে স্রেফ একা কিছুটা সময় কাটানোর অজুহাতে, নিজের হারিয়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে নতুন করে চিনতে। ওখানকার বাইরের উত্তাল সমুদ্রের নোনা হাওয়া যেন মাঝে মাঝে তার ভেতরের একাকীত্বের তীব্র বেদনাকে কিছুটা হলেও হালকা করে দিয়ে যেত।

​সে খুব ভালো করেই জানত, চিরচেনা রাজশাহী শহর ছেড়ে এভাবে অচেনা এক শহরে পালিয়ে আসাটা মোটেও সহজ ছিল না; কিন্তু বিলালের পৈশাচিক মায়াজাল আর নিজের কলঙ্কিত অতীত থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য এই আত্মগোপন বড্ড বেশি প্রয়োজন ছিল। সে তার জীবনের সমস্ত ভয়ংকর ভুল থেকে আজ চিরতরে মুক্তি চায়, শুরু করতে চায় এক সম্পূর্ণ নতুন জীবন, যদিও তার অবচেতন মনের গহীন কোণে এক অজানা আশঙ্কার তীব্র ভয় লেপ্টে ছিল।

​একই সময়ে রাজশাহীর এক নিভৃত কোণে দাঁড়িয়ে নিলয় তখনও তাসফিয়ার আত্মিক পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর দরবারে অশ্রুসজল চোখে মোনাজাত করছিল। সে জানত, তাসফিয়া এখন রাজশাহী ছেড়ে অন্য কোথাও একলা লড়াই করছে, কিন্তু তাসফিয়ার প্রতি তার অবিনশ্বর অনুভূতি আর রাতের পর রাত জায়নামাজে বসে করা দোয়াগুলো রয়ে গেছে একদম অটুট ও অবিচল।

​নিলয় আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মনকে সান্ত্বনা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “তাসফিয়ার আলোর পথে ফেরার এই নতুন যাত্রাটা বড্ড কঠিন, বড্ড দুর্গম। কিন্তু আমি জানি, আমার দয়াময় আল্লাহ তাকে কোনোদিন মাঝপথে ফেলে দেবেন না; তিনি নিজেই তার পথ দেখাবেন। আর আমার কাজ?
আমার কাজ তো স্রেফ পরম ধৈর্য নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করা আর ওনার দরবারে অবিরাম দোয়া করে যাওয়া।”

​ঠিক সেই মূহুর্তে, রাজশাহীর দাওয়াহ সেন্টারের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূর আকাশের মেঘের ঘনঘটা দেখছিল আয়শা মাহমুদ। তার বুকের ভেতর তখন এক তীব্র ঝড়ের পূর্বাভাস। সে খুব ভালো করেই জানে, নিলয় যার জন্য এভাবে প্রতিটা দিন তিল তিল করে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে, সেই তাসফিয়া আজ শহর ছেড়ে নিখোঁজ।

​আয়শা জানালার গ্রিলটা শক্ত করে চেপে ধরে, নিজের একতরফা ভালোবাসার তীব্র মনস্তাত্ত্বিক কষ্ট বুকে চেপে পার্শ্ব কথোপকথনের সুরে একা একাই ফিসফিসিয়ে বলল, “নিলয় ... তুমি তো আজ তাসফিয়ার জন্য পুরো দুনিয়াকে একপাশে সরিয়ে রেখে শুধু দোয়ার হাত বাড়িয়ে দিয়েছো। আর এই যে তোমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে অন্য একজন মেয়ে যে নিজের জীবনের সমস্ত সুখ, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে শুধু তোমার এক চিলতে হাসির জন্য নিজের রবের কাছে প্রতিনিয়ত ভিক্ষা চায়—তার এই নীরব দহনের খবর কি তুমি কোনোদিন রাখবে?

তাসফিয়া হয়তো একদিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে তোমার পবিত্র চাদরে এসে আশ্রয় নেবে, আর আমি... আমি না হয় তোমার ভালো থাকার আড়ালে এক রহস্যময় দীর্ঘশ্বাস হয়ে এই দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবো। দিনশেষে আমার এই না-পাওয়ার তীব্র হাহাকারটুকু আমার রবের আদালতের এক পরম আমানত হয়েই বেঁচে থাকুক।”

​চট্টগ্রামের সেই নিঝুম ও ছোট ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের মাঝে তাসফিয়া যেন প্রতিনিয়ত নিজের অবাধ্য আত্মার সাথে এক অদৃশ্য মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ লড়ে যাচ্ছিল। সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল—অন্ধকার থেকে আলোর সঠিক পথে ফেরার এই লড়াইটা মোটেও সহজ নয়, আর নিজের দীর্ঘদিনের মডার্ন লাইফস্টাইলকে পুরোপুরি পাল্টে ফেলা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন।

​তার মনে পড়ে গেল বাবা অন্তিক আমিনের কথা। কর্পোরেট কাজের চাপের অজুহাতে তাকে তথাকথিত ‘বাবার রাজকন্যা’ বানাতে গিয়ে তার বাবা-মা তাকে যে সীমাহীন ও লাগামহীন স্বাধীনতা দিয়েছিল, তার বিষাক্ত পরিণতি আজ সে নিজের হাড়ের মজ্জায় টের পাচ্ছে।

তার বাবা-মা হয়তো কোনোদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে জানতেও পারবে না—তাদের এই মেকি ও লোকদেখানো অন্ধ ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে তাদের সাধের রাজকন্যা এতদিন বিলালের মতো এক লম্পট পশুর ঘরে মাত্র একজন রক্ষিতা হয়ে দিন কাটিয়েছে!

​রক্ষিতা? শব্দটা আজ নিজের মুখে উচ্চারণ করতেই তাসফিয়ার গা শিউরে উঠল। সমাজে আধুনিকতা তো এই নোংরা পাপের চমৎকার একটা ইংরেজি নাম দিয়েছে—'গার্লফ্রেন্ড'।

তাসফিয়া এক কুৎসিত হাসিতে নিজের মনেই বলল, “বাহ রে দুনিয়া! একটা জঘন্য পাপের গায়ে জাস্ট একটা ইংরেজি লেবেল সেঁটে দিলেই কি মনের ভেতর থেকে সেই পাপের ভয়ংকর কালো দাগ মুছে যায়?
ইংরেজি নাম দিলেই বুঝি পাপ আর পাপ থাকে না!?”

#শুন্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস_প্রেমী #উপন্যাস #বাংলা_উপন্যাস

শুণ্যতার আবর্তন ; অধ্যায় --০৮ ; পার্ট - ০২তৌহিদুল ইসলাম জোহা​রাজশাহীর সেই শান্ত সন্ধ্যার আলো যখন ফুরিয়ে আসছিল, তাসফিয়া ত...
13/08/2026

শুণ্যতার আবর্তন ; অধ্যায় --০৮ ; পার্ট - ০২
তৌহিদুল ইসলাম জোহা

​রাজশাহীর সেই শান্ত সন্ধ্যার আলো যখন ফুরিয়ে আসছিল, তাসফিয়া তখন তাদের বাড়ির বিশাল ও সুন্দর বাগানের এক কোণে একাকী বসে ছিল। তার মনে তখন এক অসীম ও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের আগুন জ্বলছিল। ধর্মের পথে সে কিছুটা ফিরে এলে তার অস্থির অন্তর যেন কোনোমতেই শান্ত হচ্ছিল না; মনে হচ্ছিল কোনো এক অদৃশ্য, অমোঘ তাড়া তাকে প্রতি মুহূর্তে ছুঁতে চাইছে।

​সে শূন্য বাগানের দিকে তাকিয়ে একা একাই বলতে লাগল, “আমি আমার এই জীবনে সবসময় শুধু একটুখানি স্থায়ী শান্তি চেয়েছি। কিন্তু আমার ভাগ্যলিপি আর আমার চলার পথ কেন কোনোদিন সরল আর সহজ হয় না? আমি কেন ওই পবিত্র নিলয়ের মতো পুরোপুরি খাঁটি হতে পারি না? হয়তো... হয়তো আমি কোনোদিন ওমন পারফেক্ট হতে পারবই না।”

​অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিলয় খুব ভালো করেই জানত, তাসফিয়া আর যাই হোক—তার মতাদর্শের বা তার মানসিকতার মেয়ে নয়। কিন্তু তাসফিয়ার প্রতি নিলয়ের যে অনুভূতি, তা ছিল সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ, জাগতিক লোভ-লালসার অনেক ঊর্ধ্বে। সে কখনো তাসফিয়াকে নিজের সামাজিক ক্ষমতার জোরে কিংবা আবেগের ভয় দেখিয়ে বেঁধে রাখতে চায়নি; বরং সে সবসময় ভালোবাসার অন্তরালে তাসফিয়ার আত্মিক মুক্তি আর হেদায়েতের পথই কামনা করেছে।

​এদিকে রংপুরের বুকে বসে বিলাল তখনো তাসফিয়াকে পুরোপুরি নিজের নোংরা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ফিরিয়ে আনার জন্য ছটফট করছিল। কিন্তু সে স্পষ্ট টের পাচ্ছিল, তাসফিয়া ক্রমশ তার হাতের মুঠো থেকে চিরতরে ফসকে যাচ্ছে। সে রাগে ও হীনমন্যতায় অন্ধ হয়ে তার অন্ধকার জগতের সাঙ্গোপাঙ্গদের ডেকে এক নতুন কুৎসিত চক্রান্তের নীলনকশা তৈরি করতে করতে বলল, “যে মেয়ে নিজের ইচ্ছায় কোনোদিন কাউকে সত্যি ভালোবাসতে শেখেনি, সে আমার এই ক্ষমতার জৌলুস হারিয়েও কোনোদিন শান্তিতে থাকতে পারবে না। আমি তাকে সহজে হারাতে রাজি নই।”

​বিলালের নির্দেশে তার সাথে থাকা অপরাধী চক্রের লোকেরা চারদিক থেকে তাসফিয়াকে মানসিকভাবে একা ও সমাজচ্যুত করার জন্য সুকৌশলে কাজ শুরু করে দিল।

​কয়েকদিন পর, তাসফিয়া আবারও সমস্ত দ্বিধা কাটিয়ে শেষবারের মতো নিলয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। তবে এবার তার চোখে কোনো দুর্বলতা ছিল না, বরং ছিল এক অদ্ভুত, কঠোর পাথরচাপা কাঠিন্য। সে নিলয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “নিলয়... আমাদের দুজনের চলার পথ সম্পূর্ণ আলাদা।

আমি তোমার মতো ওমন ধার্মিক নই, আর কোনোদিন হতেও পারব না। আমি আমার মতোই আমার নিজের চেনা নিয়মে চলব। তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের জন্য অনেক বড় এক প্রাপ্তি ছিল ঠিকই, কিন্তু... কিন্তু আমি এখন সম্পূর্ণ নিজের মতো করে একা বাঁচতে চাই।”

​নিলয় হয়তো জানতেও পারল না, তাসফিয়া তার নিজের বুকের ভেতর আস্ত একটা পাথরচাপা দিয়ে, নিজের সমস্ত অনুভূতিকে গলা টিপে হত্যা করে এই নিষ্ঠুর কথাগুলো বলেছিল। তাসফিয়া কোনোভাবেই চায়নি যে—তাকে একতরফা ভালোবেসে নিলয় অতীতে যে তীব্র মানসিক কষ্ট পেয়েছে, সেই কষ্টের স্মৃতি নিলয় আর কোনোদিন নিজের জীবনে বহন করুক। সে নিজেকে নিলয়ের জীবন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে নিয়ে তাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিল।

​নিলয় তাসফিয়ার এই পাথুরে মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ এক অদ্ভুত, ম্লান ও স্নিগ্ধ হাসি হাসল। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, “তাই তো তাসফিয়া... আসল ভালোবাসার প্রকৃত অর্থই হলো মুক্তি দেওয়া, কখনো কাউকে জোর করে বন্ধনে আটকে রাখা নয়।

তুমি তোমার নিজের মতো করেই তোমার সুন্দর জীবন গড়ে তোলো। শুধু আমার একটাই অনুরোধ—খেয়াল রেখো, এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াবী মায়া আর হারামের অন্ধকূপে যেন নতুন করে আর কোনোদিন ডুবে যেও না।”

​পরদিন একদম শেষ রাতে, ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগ মুহূর্তে তাসফিয়া তার নিজের ঘর থেকে অত্যন্ত নিঃসব্দে একাকী বেরিয়ে চলে গেল। তার অবয়বে তখন এক অদ্ভুত, গম্ভীর স্থিরতা বিরাজ করছিল—যেন কোনো এক অত্যন্ত কঠিন ও দুর্গম যাত্রার সূচনা হতে যাচ্ছে। সে খুব ভালো করেই জানে, তার বেছে নেওয়া এই নতুন পথ তাকে এক চরম একাকীত্ব আর একলা চলার দীর্ঘ হাহাকার এনে দেবে; কিন্তু নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মাকে চেনার জন্য আর রবের দরবারে নিজেকে সঁপে দেওয়ার জন্য এই একাকীত্ব বড্ড বেশি জরুরি ছিল।

​সে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় নিজের অবচেতনে নিজেকেই বলতে লাগল, “এবার থেকে আমি শুধু আমার নিজের জন্য বাঁচব। নিজের ফেলে আসা প্রতিটা ভুল থেকে শিক্ষা নেব, আর আমার আল্লাহর কাছে একান্ত নিভৃতে ক্ষমা চাইব।

তবে... তার আগে আমি নিজেকে পুরোপুরি আল্লাহর ভালোবাসায় বিলীন করতে চাই। আমি যদি আজ শুধু নিলয়কে পাওয়ার আশায় বা নিলয়ের মন জয় করার জন্য আল্লাহর ইবাদাতে মনোযোগ দিই, তবে তো সেই ইবাদাতের পবিত্রতায় কোথাও না কোথাও এক টুকরো শিরকের ছোঁয়া থেকে যাবে!

কারণ তখন আমার এই ইবাদাত আর চাওয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু তো আল্লাহ নন, বরং নিলয় হয়ে দাঁড়াবে। না... আমি তা হতে দেব না। আমি প্রথমে খাঁটি মন নিয়ে আমার আল্লাহকে ভালোবাসতে চাই, আর তারপর... তারপর যদি কোনোদিন যোগ্য হতে পারি, তবে আমার সেই রবের কাছেই নিলয়কে চিরতরে নিজের হালাল সঙ্গী হিসেবে চেয়ে নেব।”

​নিলয় তাসফিয়ার এই আকস্মিক চলে যাওয়াটা সহজভাবে মেনে নিলেও, তার হৃদয়ের গহীন কোণে তাসফিয়ার প্রতি থাকা সেই পবিত্র অনুভূতি বিন্দুমাত্র মরে যায়নি। সে মনে মনে জানত, বিগত দিনগুলোতে এই নিঝুম রাতে তাসফিয়ার হেদায়েতের জন্য সে আল্লাহর দরবারে যে প্রতিটা ফোঁটা চোখের জল ফেলেছে, তা কোনোদিন বৃথা যাবে না।

মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে যখন ক্যাম্পাসের সব মানুষ ছাদের নিচে বা বারান্দায় আশ্রয় নিত, তখন ওই জনমানবহীন খোলা মাঠে একা চোখ বন্ধ করে, দুই হাত আসমানের দিকে তুলে তাসফিয়ার সুরক্ষার জন্য পাগলের মতো দোয়া করা ছেলেটি আর কেউ ছিল না—সে স্বয়ং নিলয় রহমানই ছিল।

তাসফিয়া একদিন ফিরবেই—হয়তো অনেক দেরিতে, অনেক ঝড়ের ঝাপটা পেরিয়ে ফিরবে, কারণ তাকে দুনিয়ার কোনো মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং সরাসরি আরশের মালিক আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছে নিলয় ; তাসফিয়া ফিরবেই।

​অন্যদিকে রংপুরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে বিলাল ক্রমশ তার সেই উগ্র, কুৎসিত ও নোংরা চক্রান্তের পরিকল্পনা থেকে অদ্ভুতভাবে পিছিয়ে আসতে শুরু করল। তার মনের ভেতরের সেই আদিম ক্ষোভ আর প্রতিশোধের আগুন এখন এক অদ্ভুত, হালকা ও গুমোট হতাশায় রূপান্তরিত হয়েছিল। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কদর্য মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল—তাসফিয়া আসলে তার জীবনের এক জটিল, অমীমাংসিত অধ্যায়, যা যতই তাকে টানে, দিনশেষে এক তীব্র শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই দেয় না।

তার এই ক্ষমতার জৌলুস টিকিয়ে রাখতে হলে তাকে এখন নতুন কোনো আধুনিক মেয়েকে খুঁজতে হবে—যে কিনা এই সস্তা ট্রেন্ড আর আধুনিকতার চক্করে পড়ে নিজের সতীত্ব ও ইজ্জত অবলীলায় বিলিয়ে দেবে। বিলালের মতো পশুর আসলে দিনশেষে স্রেফ এটাই দরকার।

​কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। তাসফিয়া এখন এক দূরবর্তী শান্ত ও সবুজ গ্রামের একাকী বাগানের কোণে চুপচাপ বসে থাকে। যেখানে বসলে তার মনে হয়—বিগত ২০ বছর ধরে তার মনের ভেতর জমে থাকা জীবনের অনেক কঠিন প্রশ্নের উত্তর যেন প্রকৃতির নিয়মে ধীরে ধীরে তার সামনে স্পষ্ট হয়ে আসছে।

সে এখন নিয়ম করে পরম শান্তিতে পবিত্র কুরআন পড়ে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে এবং পাশাপাশি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের সুন্দর পথে একা চলতে শেখে।

​তার মনের অবচেতনের গভীর থেকে এখন এক নতুন, স্বর্গীয় আত্মিক শক্তির জন্ম হয়েছে—যা তাকে জীবনের আগামী দিনের সমস্ত ঝড়-ঝাপটা আর বাধার দেয়ালকে একা মোকাবিলা করার এক অদম্য ঈমানী সাহস জোগায়।

তাসফিয়া খুব ভালো করেই জানে, তার এই আলোর পথে টিকে থাকার যাত্রাটা বড্ড কঠিন, বড্ড দুর্গম; কিন্তু সে তার রবের ওপর তাওয়াক্কুল রেখে এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

***পরবর্তী ও পূর্ববর্তী অংশ পিন কমেন্টে দেওয়া আছে***

#শুন্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস #উপন্যাস_প্রেমী #বাংলা_উপন্যাস

শূন্যতার আবর্তন (​অধ্যায়: ৮ ; পার্ট: ০১)তৌহিদুল ইসলাম জোহা​রাজশাহীর সেই নিঝুম, একাকী রাতে জানালার পাশে স্থবির হয়ে বসে ছি...
05/08/2026

শূন্যতার আবর্তন (​অধ্যায়: ৮ ; পার্ট: ০১)
তৌহিদুল ইসলাম জোহা

​রাজশাহীর সেই নিঝুম, একাকী রাতে জানালার পাশে স্থবির হয়ে বসে ছিল তাসফিয়া। ওপারে তখন নিকষ কালো অন্ধকারের বুক চিরে ঝিরঝির করে হাওয়া বইছে, আর এপারে তার চোখের তারায় ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল জীবনের ফেলে আসা শত শত অমীমাংসিত প্রশ্ন, স্খলন আর বুকের গভীর থেকে উঠে আসা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ব্যথা।

​সে একসময় শূন্য আকাশে চোখ রেখে অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল, “হে আমার প্রতিপালক... আমার এই অশান্ত, কলুষিত অন্তর যেন একটুখানি প্রশান্তি পায়। তুমি আমাকে পথ দেখাও। তবে... তবে আমি খুব ভালো করেই জানি, আমি হয়তো কোনোদিনও ওই নিখুঁত নিলয়ের মতো পুরোপুরি তোমার দেখানো পবিত্র পথে চলতে পারব না।”

​তার ডান হাতের আঙুলে আলতো করে জড়িয়ে ছিল একটি কুরআনের তাসবিহ। কিন্তু তার অবচেতন হৃদয় খুব ভালো করেই জানত, সে মুখে অনুশোচনা করলেও এখনো পুরোপুরি সেই খাঁটি ও অবিচল বিশ্বাসের অধিকারী হয়ে উঠতে পারেনি। এক মুহূর্তের জন্য স্মৃতির পাতা ওল্টাতেই তার মনে পড়লো মা আনিকার কথা। ছোটবেলায় কত পরম মমতায় মা তাকে পাড়ার মক্তবের হুজুরের কাছে কুরআন শেখার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন পুরো পাড়ার সমস্ত ছেলেমেয়ের মধ্যে তাসফিয়ার সুমিষ্ট কণ্ঠের তিলওয়াতই ছিল সবচেয়ে সেরা, সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

আর আজ... আজকের এই ‘সো-কল্ড’ যান্ত্রিক আধুনিকতা আর সস্তা ট্রেন্ডের মায়া তাকে জীবনের কোন আঁধারে এনে দাঁড় করিয়েছে! এমন এক অন্ধকার, যার শেষ প্রান্তের আলোটা আসলে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা জাহান্নামের লেলিহান আগুনের ইঙ্গিত ছাড়া আর কিছুই নয়।

​একই সময়ে ক্যাম্পাসের বিশাল জামে মসজিদের সদর দরজার সামনে একা দাঁড়িয়ে ছিল নিলয় রহমান। আকাশের মেঘলা গুমোট আবহের দিকে তাকিয়ে সে এক গভীর, অবিচল আধ্যাত্মিক বিশ্বাসে অপেক্ষা করছিল তাসফিয়ার ফিরে আসার জন্য। তার ভেতরের অন্তরাত্মা বারবার এক অমোঘ আভাস দিচ্ছিল যে—তাসফিয়া ফিরবেই। আজ হোক কিংবা কাল, সে নিলয়ের জীবনে ফিরুক বা না ফিরুক, অন্তত নিজের রবের চাদরে আশ্রয় নিতে সে আল্লাহর হয়ে ফিরবেই ফিরবে।

​তবে দিনশেষে এই একবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক যুগে বেড়ে ওঠা একজন রক্ত-মাংসের তরুণ ছিল নিলয়। তাই সমস্ত আধ্যাত্মিকতার আড়ালে তার মনের কোনো এক সুপ্ত কোণেও লুকিয়ে ছিল আধুনিকতার কিছু চেনা ছোঁয়া—কখনো কখনো নিজের তরুণ মনের তীব্র স্বাদ কিংবা স্বাভাবিক অনুরাগ পাওয়ার এক তীব্র সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা।

​মসজিদের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী ও বন্ধু রাশেদ তাকে দেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নিলয়, তুই সারাজীবন শুধু উম্মাহর কথা ভাবলি, অন্যের হেদায়েতের জন্য নিজের রাতের পর রাত জায়নামাজে কাটিয়ে দিলি। তুই কখনো কি নিজের মনের এই তীব্র একাকীত্ব কিংবা নিজের সুন্দর একটা ভবিষ্যতের জন্য কিছু ভাবিস না?”

​নিলয় রাশেদের দিকে তাকিয়ে সেই চেনা স্নিগ্ধ ও বিষাদমাখা হাসি ফুটিয়ে বলল, “রাশেদ... আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য আর গন্তব্য হলো আমার আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টি করা মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করা। বাকি নিজের জীবনের যত পাওয়া-না পাওয়া আর ভাঙা-গড়ার গল্প আছে, তার সবটুকুর ভার আমি ওনার ওপরই ছেড়ে দিয়েছি।”

​রংপুরের বুকে বিলাল নামক সেই অন্ধকারের রাজপুত্রের ছায়া ও দাপট ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। তার কালো ব্যবসা আর এই বস্তুবাদী সমাজে তার অনৈতিক ও অবৈধ দখলদারিত্ব দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছিল। নিজের বাবার আদি জন্মস্থান ও পৈতৃক ভিটা হওয়ায় রংপুর এলাকাটি ছিল বিলালের নিজের হাতের মুঠোয়, একদম নিজের অভয়ারণ্য।

​একদিন সে তার বিলাসবহুল আস্তানায় বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে সহযোগী রাকিবকে উদ্দেশ্য করে বলল, “শোন রাকিব, আমি আমার জীবনে শুধু নিজের তাৎক্ষণিক মনের সুখ আর শারীরিক তৃপ্তি খুঁজি। আর তাসফিয়া? আমি তাকে কোনোদিনও সেই সুখের দাস বা বন্দি বানাতে চাইনি। সে নিজের থেকে আমার জৌলুসে ধরা দিয়েছিল, এখন হুট করে তার মনে ধর্মের ভূত চেপেছে।”

​রাকিব বিলালের উগ্র চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সতর্কতার সুরে বলল, “তোর ক্ষমতার পথ যতই মসৃণ আর দীর্ঘ হোক না কেন বিলাল, মনে রাখিস—দিনশেষে এই মহাবিশ্বের চরম ও পরম সত্যের মুখোমুখি তোকে একদিন হতেই হবে। সেদিন কিন্তু এই অবৈধ টাকা তোকে বাঁচাতে পারবে না।”

​বিলাল এক পৈশাচিক, ঠাণ্ডা ও ক্রূর স্বরে হেসে বলল, “সত্য? তুই কোন সত্যের কথা বলছিস রাকিব? এই দুনিয়াতে ‘সত্য’ বলতে আলাদা কিছু নেই। সত্যকে আমি আমার নিজের তৈরি করা নিয়মে, নিজের ক্ষমতার জোরে গড়তে চাই।”

​দিন যতই যাচ্ছিল, তাসফিয়া ততই তার জীবনের ফেলে আসা বিগত বছরগুলোর ভয়ংকর ভুল আর স্খলনগুলো নিজের অন্তরের গভীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছিল। ধর্মের পথে সে কিছুটা ফিরে এসেছে ঠিকই, কিন্তু সে যে এখনো সমাজ আর আধুনিকতার মায়া কাটিয়ে সম্পূর্ণ ধার্মিক হয়ে উঠতে পারেনি—এই নির্মম সত্যটা তার চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না।

​অবশেষে সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সাহস করে একদিন সে ক্যাম্পাসের এক নিভৃত কোণে নিলয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।

সে নিচের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত অপরাধীর সুরে বলল, “নিলয়... আমি সত্যিই মন থেকে চেষ্টা করব আল্লাহর দেখানো সঠিক পথে চলার। কিন্তু... কিন্তু আমি হয়তো সব কিছুতে তোমার মতো ওমন একান্ত ধার্মিক বা পর্দানশীন হয়ে উঠতে পারব না। আর না আমার বুকের ভেতর ওমন অটল তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভরসা আছে, যা তোমার মাঝে প্রতিনিয়ত দেখা যায়।”

​তাসফিয়া হয়তো নিজের অপরাধবোধ থেকে আরও কিছু কথা বলতো, কিন্তু নিলয়ের সেই চিরচেনা সরল, পবিত্র ও নিস্পৃহ চোখ জোড়া তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল। এই চোখজোড়া আজ বড্ড মলিন, বড্ড ক্লান্ত। যে মানুষটার মুখের সেই স্বর্গীয় হাসি তাসফিয়া নিজে হাতে কেড়ে নিয়েছে, সেই ব্যক্তিকে আবার নতুন করে কীভাবে বলবে যে—সে নিলয়ের কাছে জীবনের একটা নতুন সুযোগ চায়! নিলয় যেন তাকে সমস্ত অতীত ভুলে এক হালাল বন্ধনে নিজের করে গ্রহণ করে!

কিন্তু নিলয়ের ওই নিস্তেজ, বিষাদময় চোখ দুটো এই মুহূর্তে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছিল যে—নিলয়ের জীবনের এই সমস্ত মানসিক কষ্টের জন্য দিনশেষে একমাত্র তাসফিয়ার ভুল সিদ্ধান্তগুলোই দায়ী। তাসফিয়া নিজের ভেতরের তীব্র অনুশোচনা নিয়ে আর নতুন করে এই নিষ্পাপ ছেলেটাকে কোনো কষ্টের সাগরে ফেলতে চায় না।

​নিলয় তাসফিয়ার ভেতরের এই তীব্র মানসিক ঝড় টের পেয়ে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে তাসফিয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে বলল, “ইসলামে বা ভালোবাসায় কোনো জোরজবরদস্তির স্থান নেই তাসফিয়া।
ভালোবাসা মানে কাউকে শিকল দিয়ে বাধ্য করা নয়। আমি শুধু চাই, তুমি নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় তোমার জীবনের চলার পথ বেছে নাও। তবে হ্যাঁ, আমি সবসময় দোয়া করি—তোমার সেই বেছে নেওয়া পথটা যেন অন্তত হালাল আর আমাদের আল্লাহর পছন্দের সীমানার ভেতরে হয়।”

​তাসফিয়া এক মুহূর্তের জন্য নিলয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল, “আমার ভেতরের এই অনুভূতির গভীরতা হয়তো তোমার ওই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মতো পবিত্র নয় নিলয়... কিন্তু দিনশেষে আমি আমার এই যান্ত্রিক জীবনে শুধু একটুখানি অন্তরের শান্তি খুঁজছি। আর... আর আমার সেই আসল শান্তি হয়তো একমাত্র তোমার দিকে তাকিয়েই...”

​শেষের বাক্যটি তাসফিয়া মুখ ফুটে বলতে পারল না, সে তার নিজের মনের মণিকোঠার গভীরে পাথরচাপা দিয়ে রেখে দিল।

কিন্তু নিলয় যেন আজ তাসফিয়াকে স্বয়ং তাসফিয়ার চেয়েও অনেক বেশি ভালো করে পড়তে পারছিল। নিলয় আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমি শুধু চাই তাসফিয়া, তুমি যেন এই ধোঁকার দুনিয়ার ভিড়ে আর কোনোদিন হারিয়ে না যাও। নিজের হয়ে যদি থাকতে নাও পারো, অন্তত আমার রবের কাছাকাছি কোথাও থেকো।”

​একই দিন বিকেলে, রুমে বসে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল আয়শা মাহমুদ। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জমাট বাঁধা অশ্রু বাতাসের তীব্রতায় শুকিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল সাবিহা। সাবিহা কেবল তাসফিয়া ও নিলয়ের কলেজের সেই পুরনো কমন বন্ধুই নয়, বরং বর্তমানে ভার্সিটি লাইফেও সে তাসফিয়ার অত্যন্ত কাছের একমাত্র বান্ধবী। তাসফিয়ার জীবনের উত্থান-পতন আর নিলয়ের নীরব হাহাকার—দুটোই খুব কাছ থেকে দেখার কারণে সাবিহার অন্তরেও এক অদ্ভুত বিষাদ কাজ করত।

​সাবিহা আয়শাকে এভাবে একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকল। সে আয়শার পাশে এসে দাঁড়িয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “আয়শা আপু... তুমি কি এখনো নিলয় ভাইয়ের তাসফিয়ার প্রতি একতরফা ভালোবাসার কষ্টটা নিজের বুকের ভেতর চেপে রেখেছ? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তুমি নিজেকে তিল তিল করে শেষ করে দিচ্ছো।”

​আয়শা চট করে নিজের চোখের জল আড়াল করার চেষ্টা করে এক হাসি ফুটিয়ে বলল, “কী যে বলো না সাবিহা! আমি নিজেকে কেন শেষ করব? নিলয় ভাই তো আমাদের এই দাওয়াহ টিমের একজন পরম পথপ্রদর্শক। ওনার প্রতি আমার যে সম্মান আর শ্রদ্ধা...”

​সাবিহা আয়শার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বাধা দিয়ে বলল, “আমায় লুকাতে এসো না আপু। আমি তাসফিয়া আর নিলয় দুজনের সাথেই কলেজ পার করে এসেছি, আর এখন ভার্সিটিতেও তাসফিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ আমি লক্ষ্য করি। তাই তোমার ভেতরের এই নীরব দহন আর নিলয় ভাইয়ের প্রতি একতরফা ভালোবাসার পবিত্রতা আমি খুব ভালো করে বুঝি। তুমি নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে তাসফিয়াকে নিলয় ভাইয়ের জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিলালের বিরুদ্ধে আড়ালে থেকে যে চাল চেলেছ, তা যদি ভাইয়া কোনোদিন জানতে পারে?”

​আয়শা এবার জানালার বাইরে তাকিয়ে এক অসীম শূন্যতায় ভরা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে পার্শ্ব কথোপকথনের সুরে বলল, “জানলে জানবে সাবিহা! নিলয় আজীবন অন্যের সুখের জন্য নিজের চোখের জল বিসর্জন দিয়েছে। তাসফিয়া হয়তো একটা সময় পাপের সাগরে ডুবে ছিল, কিন্তু নিলয়ের আত্মিক শান্তি তো একমাত্র ওর মাঝেই লুকিয়ে আছে।

নিলয়ের ঠোঁটে এক চিলতে পবিত্র হাসি ফোটানোর জন্য আমি যদি নিজের এই একতরফা অনুভূতিকে আজীবন এক সুন্দর রহস্য বানিয়ে বুকের ভেতর কবর দিয়ে দিতে পারি, তবে তাতেই আমার পরকালীন মুক্তি। দিনশেষে আমার এই না-পাওয়ার হাহাকারটুকু না হয় আমার আর আমার রবের মাঝেই এক গোপন আমানত হয়ে বেঁচে থাকুক।”

​সাবিহা আয়শার এই আকাশসম ত্যাগের গভীরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে শুধু মনে মনে ভাবল—এই দুনিয়াতে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও কি সত্যিই বেঁচে থাকে!

***পরবর্তী এবং পূর্ববর্তী অংশ পিন কমেন্টে দেওয়া আছে***

#শুন্যতার_আবর্তন #তৌহিদুল_ইসলাম_জোহা #উপন্যাস #উপন্যাস_প্রেমী #বাংলা_উপন্যাস

Address

গাইবান্ধা
Gobindganj

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Touhidul Islam Zoha posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share