31/07/2026
মেসওয়াক নবীজি (সাঃ) এর সুন্নাহ এবং মানুষের জন্য স্বভাবজাত। আসেন, প্রথমে মেসওয়াকের কিছু বৈজ্ঞানিক উপকারিতা সম্পর্কে জানি...
• দাঁত ও এনামেল সুরক্ষা:
মেসওয়াক: মেসওয়াকের নরম আঁশ প্রাকৃতিকভাবে দাঁতের উপরিভাগের এনামেল সুরক্ষিত রাখে এবং দাঁত ক্ষয় না করে ভেতরের ময়লা পরিষ্কার করে।
ব্রাশ ও পেস্ট: অনেক কড়া ব্রিসলের ব্রাশ এবং অতিরিক্ত অ্যাব্রেসিভ (ঘর্ষণকারী) টুথপেস্ট নিয়মিত ব্যবহারের ফলে দাঁতের এনামেল ক্ষয় হয়ে যায় এবং দাঁত সংবেদনশীল (সেন্সিটিভ) হয়ে পড়ে। ফলে ঠান্ডা ও গরম খাদ্য গ্রহন কষ্টসাধ্য হয়।
• মাড়ির রক্ত সঞ্চালন ও স্বাস্থ্য:
মেসওয়াক: মেসওয়াক ব্যবহারের সময় এর ডাল দিয়ে মাড়িতে প্রাকৃতিক উপায়ে জেন্টাল ম্যাসাজ হয়, যা মাড়ির টিস্যুতে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং মাড়ি শক্ত রাখে।
ব্রাশ ও পেস্ট: ভুল পদ্ধতিতে বা শক্ত ব্রাশ দিয়ে ব্রাশ করলে মাড়িতে অতিরিক্ত ঘর্ষণ লেগে রক্তপাত বা মাড়ি খসে যাওয়া নিত্যপ্রতিদিনের সমস্যা।
• লালা বা স্যালিভা উৎপাদন ও পরিপাকতন্ত্র:
মেসওয়াক: মেসওয়াক মুখের লালার গ্রন্থিকে বিশেষভাবে উদ্দীপিত করে। এই অতিরিক্ত লালা মুখের ভেতরের অম্লতা দূর করে এবং পাকস্থলীতে গিয়ে খাবার হজমে (ডাইজেশন) সরাসরি সহায়তা করে।
ব্রাশ ও পেস্ট: টুথপেস্ট দিয়ে ব্রাশ করার সময়ও লালা উৎপন্ন হয়, তবে টুথপেস্টে থাকা সোডিয়াম লরিল সালফেটের (SLS) মতো কৃত্রিম কেমিক্যালের কারণে মুখের ভেতরে সাময়িকভাবে স্বাদ কোরকের ক্ষতি হয় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে মুখে ঘা, শুষ্কতা, স্বাদকোরকের ক্ষতি, ওরাল অ্যালার্জি, পরিপাকতন্ত্রে প্রভাব সহ আরো অনেক ক্ষতি হয়ে থাকে।
• মুখের ভেতরের কেমিক্যাল ও টক্সিন বা বিষক্রিয়া:
মেসওয়াক: এতে কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক বা সিন্থেটিক উপাদান থাকে না। ফলে মুখের শ্লেষ্মাজ ঝিল্লি (Mucous membrane) হয়ে কোনো ক্ষতিকর কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশ করার ঝুঁকি থাকে না।
ব্রাশ ও পেস্ট: কমার্শিয়াল টুথপেস্টে কৃত্রিম ফ্লেভার, প্রিজারভেটিভ এবং সোডিয়াম লরিল সালফেট থাকে, যা মুখের সংবেদনশীল টিস্যু শোষণ করতে পারে এবং কারো কারো ক্ষেত্রে অ্যালার্জির কারণ হয়।
• মাইক্রোপ্লাস্টিক ও পরিপাক বা শ্বসনতন্ত্র:
মেসওয়াক: এটি শতভাগ বায়োডিগ্রেডেবল উদ্ভিদজাত উপাদান হওয়ায় এতে কোনো প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকে না, যা মানবদেহের পরিপাকতন্ত্রের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ব্রাশ ও পেস্ট: প্লাস্টিক টুথব্রাশের ব্রিসল ব্যবহারের ফলে বা ঘর্ষণে সূক্ষ্ম মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা তৈরি হয়, যা ব্রাশ করার সময় অজান্তেই মুখে প্রবেশ করে মানবদেহের ভেতরে জমা হয়। ফলে কোষে রাসায়নিক বিষক্রিয়া করে, অন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত করে, এমনকি শরীরের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune system) দুর্বল করে দেয়। কিছু বিজ্ঞানীদের মতে, শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হলে কোষীয় স্তরে তীব্র প্রদাহ (Inflammation) ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি হতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা পরোক্ষভাবে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে (টিউমার বা ক্যান্সার) ভূমিকা রাখে।
• গলার স্বর ও স্নায়ুতন্ত্রের সতেজতা:
মেসওয়াক: নিয়মিত মেসওয়াক মুখের ভেতরের স্নায়ুগুলোকে উদ্দীপ্ত করে এবং কফ বা আড়ষ্টতা দূর করে গলার স্বর পরিষ্কার ও মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
ব্রাশ ও পেস্ট: ব্রাশ ও পেস্ট মুখ পরিষ্কার ও সতেজ রাখলেও স্নায়বিক উদ্দীপনা বা গলার স্বর পরিষ্কারের ক্ষেত্রে মেসওয়াকের মতো প্রাকৃতিক কার্যকারিতা তো রাখেই বরং ক্ষতিই সাধন করে থাকে।
এখন প্রশ্ন হলো সাড়ে ১৪০০ বছর সাহাবীরা (রাদিআল্লাহু আনহুম) কি বৈজ্ঞানিক এসকল তথ্য উপাত্ত জানতেন.?
নাহ, তারা এর উপর আমাল করেছেন কারণ নবী করিম সাঃ এর উপর আমল নিজে করতেন এবং সকলকে করতে বলেছেন। এর সুস্পষ্ট প্রমাণও সহিহ হাদিসগুলো তে পাওয়া যায়। যেমন-
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
“আমার উম্মতের জন্যে যদি কষ্টসাধ্য না হতো, তাহলে অবশ্যই তাদেরকে প্রত্যেক সালাতের সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম”।
[সহীহ] - [সহীহ বুখারী ও মুসলিম] - [সহীহ মুসলিম - 252]
তাছাড়া নবীজি (সাঃ সর্বাবস্থায় মেসওয়াক করতেন...
হুযাইফা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতে (সালাতের জন্য) উঠতেন তখন মিসওয়াক দিয়ে মুখ কচলিয়ে পরিষ্কার করতেন।
[সহীহ] - [সহীহ বুখারী ও মুসলিম] - [সহীহ বুখারী - 245]
আয়িশাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (বাইরে থেকে এসে) বাড়িতে প্রবেশ করে সর্বপ্রথম মিসওয়াক করতেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৪৮২, ইসলামিক সেন্টারঃ ৪৯৮)
সহীহ] - [সহীহ মুসলিম]
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আল-আনসারি রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, চারটি জিনিস নবীদের চিরাচরিত সুন্নত। লজ্জা-শরম, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক করা এবং বিয়ে করা। (তিরমিজি, হাদিস, ১০৮০)
এমনকি রাসুলুল্লাহ সাঃ মৃত্যুর পূর্বেও মেসওয়াক করেছিলেন...
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (রাসুলুল্লাহ সা.-এর অন্তিম সময়ে) আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) প্রবেশ করলেন। তাঁর হাতে একটি মেসওয়াক ছিল, যা দিয়ে তিনি দাঁত মাজছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটির দিকে তাকালেন। [1]
তখন আমি তাঁকে বললাম, "হে আব্দুর রহমান! মেসওয়াকটি আমাকে দাও।" সে সেটি আমাকে দিল। আমি তা কেটে টুকরো করলাম এবং চিবিয়ে নরম করলাম। এরপর সেটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দিলাম। তিনি আমার বুকে হেলান দেওয়া অবস্থায় তা দিয়ে অত্যন্ত সুন্দরভাবে মেসওয়াক করলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৮৫০
(আন্তর্জাতিক নম্বর বা তাওহীদ পাবলিকেশন অনুযায়ী হাদিস নং: ৮৫০; ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুযায়ী হাদিস নং: ৮০৬)
শুধূ তা-ই না, নবীজি সাঃ মেসওয়াক করাকে মুখের পবিত্রতা বলেছেন।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"মেসওয়াক হলো মুখের পবিত্রতা এবং রবের সন্তুষ্টির মাধ্যম।"
(সহিহ বুখারি, তা‘লিক হিসেবে; সুনান আন-নাসায়ি, হাদিস নম্বর: ৫; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস নম্বর: ২৪১৮৫)
আসুন মেসওয়াক করার মাধ্যমে পবিত্রতা এবং রবের সন্তুষ্টি অর্জন করি। আল্লাহ তৌফিক দান করেন। আমিন।
#অঙ্গীকার