01/03/2026
আগামী সোমবার আমেরিকার সঙ্গে ইরানের আলোচনার তারিখ ছিলো।
তার আগেই প্রতারণার সঙ্গে সুপ্রিম লিডার খামেনি, প্রেসিডেন্ট, সেনাপ্রধান সহ ইরানের সকল শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের হত্যার জন্য আগাম হামলা করলেও তা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।
এবার ইরান গতবারের কথা মাথায় রেখে তৈরি ছিলো।
চীন ও রাশিয়ার দেয়া আগাম গোয়েন্দা সতর্কীকরণের ফলে সবাইকেই সরিয়ে নেয়া হয়েছিল।
ইসরাইল ও আমেরিকার অব্যাহত বিমান ও মিসাইল হামলার জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশে অবস্থিত আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এবার আমেরিকা ও ইসরাইলের সাইবার হামলা এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং ইরানের উপর গতবারের মতো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ইরানের নিজস্ব চেষ্টার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সাইবার ও ইলেকট্রনিক জ্যামিং ডিফেন্স সিস্টেম ভালো কাজ করেছে।
ভেনিজুয়েলার পর গ্রীনল্যান্ড আর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ দখল করে চীন আর রাশিয়াকে সব জায়গা থেকে ঘাড় ধরে বের দেবার বিষয়টা তাদের খুব একটা পছন্দ হয়নি।
একারণে এইবার নজীরবিহীন গতিতে চীন আর রাশিয়া ইরানকে অস্ত্র আর ডিফেন্স টেকনোলজি সরবরাহ করেছে।
ইরান সীমান্ত থেকে রাশিয়ার সীমান্ত ৪৫০ কিলোমিটার দূরে। মাঝখানে বিশাল একটা লেক যার নাম কাসপিয়ান সাগর।
ফলে অন্য কোনো দেশের উপরে না গিয়েও বিমানে করে সরাসরি রাশিয়া থেকে ইরানে সাপ্লাই পাঠানো সম্ভব।
চীন যেহেতু রাশিয়ার সীমান্তে তাই চীনের পক্ষেও বিমানে করে ইরানে জিনিসপত্র পাঠানো সম্ভব;
ঠিক যেভাবে রাশিয়াকে হারানোর জন্য রুশ-আফগান যুদ্ধের সময় আমেরিকা পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে জিনিসপত্র পাঠাতো।
কাতারের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ১.১ বিলিয়ন ডলার দামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি মার্কিন রাডার সিস্টেম এফপি ১৩২ ধ্বংস করে দিয়েছে ইরান।
এই রাডার সিস্টেমের মিসাইল সনাক্ত করার রেঞ্জ বা আওতা ছিলো ৫০০০ কিলোমিটার।
আমেরিকা ও ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাড, আয়রণ ডোম, ডেভিডস স্লিং এগুলো এই রাডার সিস্টেমের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিলো।
তাদের সব ধরণের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম মিলেও আমেরিকার এই মহামূল্যবান রাডার সিস্টেমটিকে ইরানের বিশাল মিসাইল বহরের হামলা থেকে বাঁচাতে পারলোনা।
ইরানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র বহরের হামলার ফলে আরো ধ্বংস হয়েছে বাহরাইনের জুফেয়ার এলাকায় অবস্থিত পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর।
সেখানে তাদের নৌবাহিনীর জাহাজ মেরামত কারখানাও ছিলো।
আইআরজিসি জেনারেল ইবরাহিম জাব্বারি বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জানা উচিত, আজকে আমরা যে মিসাইলগুলো ছুঁড়েছি, সেগুলো আমাদের বহু পুরনো মডেলের মজুদ।
নতুন এমন জিনিস ছুঁড়বো, যা তারা আগে দেখেনি।
মূলতঃ পুরাতন মিসাইল ছুড়ে আমেরিকা ও ইসরাইলের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টরের মজুদ শেষ করার পরেই হাইপারসনিক মিসাইল ছুড়বে ইরান।
তবে পুরানো মডেলের মিসাইলের অত্যন্ত বিশাল বহরগুলোই পুরোপুরি আটকাতে ব্যর্থ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা আমেরিকান ও ইসরাইলের ঘাটিগুলো।
তাদের ধারণা ছিল গতবারের হামলায় ইরানের অধিকাংশ মিসাইল সিস্টেম ধ্বংস হয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত সাংবাদিক ও বিশ্লেষক আব্দুল বারী আতওয়ানের মতে, শুধু বিমান হামলা করে ইরানের সরকার পরিবর্তন করা অসম্ভব।
সামরিকায়িত রাষ্ট্র ইরান আয়তনের দিক থেকে (৬,৩৬,৩৭২ বর্গ মাইল) ইরাকের প্রায় ৪ গুণ এবং আফগানিস্তানের সোয়া ২ গুণ।
ইরানের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের উপযোগী দুর্গম পার্বত্য এলাকা।
আফগানিস্তানের প্রায় ৭৫% এলাকাও দুর্গম পার্বত্য এলাকা বলে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে বহিরাগত শক্তিশালী দেশগুলো বারবার চরম বিপদে পড়েছে।
তার উপর আমেরিকাকে খেদানো ও চরম ইস রাইল বিরোধী দেশ আফগানিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইরানের অবস্থান, যারা আগ্রাসী ইসরাইলের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধের জন্য অস্থির হয়ে আছে।
যদি স্থলপথে অভিযান শুরু হয়, তাহলে আমেরিকা- ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) এবং আমেরিকা- আফগানিস্তান যুদ্ধের (২০০১-২০২১) চাইতেও বহুগুন মারাত্মক অবস্থা এবং দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধ আমেরিকা ও ইসরাইলের জন্য অপেক্ষা করছে।
অনেকেই মনে করছেন ইরানের টিকে থাকার কোনো আশা নেই।
এটা আফগানিস্তান যুদ্ধের শুরুতেও অনেকেই মনে করেছিলেন।
সেই সময় ২০০১ সালে তালেবান সরকারের পতন হলেও তীব্র গেরিলা যুদ্ধ চলেছিলো ২০ বছর।
শেষ পর্যন্ত সুপার পাওয়ার হিসেবে পরিচিত আমেরিকাসহ ৩০ টা দেশের ন্যাটো সামরিক বাহিনী তড়িঘড়ি করে ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যায়।
সুতরাং, আদর্শিক রাষ্ট্রে সরকারের সাময়িক পতন বা শীর্ষ নেতার মৃত্যু মানে যুদ্ধের শেষ না বরং সূচনা মাত্র।
--------------------------------------------------------------------