20/02/2026
সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা: এ কোন নৈতিকতা?
আজকাল নতুন একটা কথা খুব শোনা যায় – “সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা”, “সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন”, “সমঝোতার ভিত্তিতে সব হচ্ছে”।
কথা শুনলে মনে হয়, যেন সব ঠিকঠাক, কেউ কাউকে জোর করছে না, তাই এতে কোনো অন্যায় নেই।
অথচ বাস্তবতা কি তাই?
একজন মন্ত্রী যখন দাঁড়িয়ে বলেন, সড়কে চাঁদা বলতে তিনি কিছু দেখেন না, যেটুকু হচ্ছে তা নাকি “সমঝোতার ভিত্তিতে” – তখন প্রশ্ন জাগে, তিনি কি সত্যিই জানেন না, নাকি না জানার ভান করেন?
এই দেশে কি সত্যি সত্যি ট্রাক, বাস, পণ্যবাহী গাড়ি, ছোট ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ – সবাই নিঃচাপে, খুশিমনে “সমঝোতা” করে টাকা দেয়?
সমঝোতা নাকি লুকানো জুলুম?
চলুন একটু সোজা উদাহরণ দেখি।
রাতের অন্ধকারে হাইওয়েতে গাড়ি আটকে “রেট ফিক্সড” – না দিলে হেনস্তা, মামলা, গাড়ি থামিয়ে রাখা।
হাটবাজারে ব্যবসায়ীকে বলে দেওয়া হয়, প্রতিদিন এত টাকা দিবেন, না দিলে দোকান থাকবে না।
এলাকার প্রভাবশালীরা “ডেভেলপমেন্ট ফান্ড” বা “কমিটি ফান্ড” নামে মাসে টাকা তোলেন, না দিলে নানা হয়রানি।
এইসব কি কোনও স্বাধীন “সমঝোতা”? নাকি জুলুমের অন্য নাম?
যখন এক পক্ষ শক্তিশালী, আরেক পক্ষ দুর্বল; এক পক্ষের হাতে ক্ষমতা, অস্ত্র, প্রভাব; আরেক পক্ষের হাতে শুধু দুঃশ্চিন্তা আর ভয়ের ঘাম – সেখানে যে চুক্তি হয়, তা আসলে চাপের চুক্তি, জুলুমের চুক্তি, নামমাত্র সমঝোতা।
যদি সবই সমঝোতা হয়, তবে হারাম কোথায়?
মন্ত্রীদের কথা যদি মেনে নেই – যেহেতু সবই “সমঝোতার ভিত্তিতে”, তাহলে তো যুক্তি দাঁড়ায়:ঘুষ জায়েজ, কারণ অফিসার কেউ বন্দুক ধরে ঘুষ চায় না, “সিস্টেমের কারণে” হয়, দু’পক্ষই নাকি রাজি।
সুদ জায়েজ, কারণ কেউ কাউকে জোর করছে না, “সিস্টেমের কারণে” ঋণ নিতে হয়।
ধর্ষণও একদিন কেউ বলে বসবে, “সমঝোতার ভিত্তিতে” হয়েছিল, প্রমাণ কোথায়?
এই ভয়ংকর মানসিকতা সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে। যখন ক্ষমতাধররা অন্যায়ের ভাষা বদলে তাকে “সমঝোতা” বলে চালিয়ে দেন, তখন অপরাধ শুধু কাঠামোয় থাকে না, নৈতিকতার ভিতেও ঢুকে পড়ে। রাষ্ট্র তখন নিরপেক্ষ বিচারক নয়, বরং অন্যায়ের অঘোষিত অংশীদার হয়ে যায়।সিস্টেমের নাম করে পাপ বৈধ করা আমরা বারবার শুনি, “সিস্টেমই এমন”, “সিস্টেম চেঞ্জ করতে হবে”, “ব্যক্তিকে দোষ দিয়ে লাভ কী?”।
কিন্তু একই সঙ্গে যখন দায়িত্বশীল মানুষরা বলেন – “এটা তো সমঝোতার ব্যাপার”, তখন দুটি জিনিস ঘটে:সিস্টেম বদলানোর কথা মুখে থাকলেও কাজে আর আসে না।বহু দুর্নীতিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়া হয়।ঘুষ, সুদ, চাঁদাবাজি – এগুলো শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়, এগুলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। কিন্তু এই ব্যর্থতাকে “সমঝোতা” বলে ডেকে যখন পরিষ্কার করা হয়, তখন যারা ভুক্তভোগী, তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যায়, প্রতিবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে।সত্যিকারের যোগ্যতা: সৎ, জ্ঞানী, আসক্তিমুক্তআজকে যদি জিজ্ঞেস করি – মন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা কী?
শুধু দলীয় আনুগত্য?
শুধু টাকা আর পেশিশক্তি?
শুধু “কম্প্রোমাইজ” করার দক্ষতা?
না, একজন মন্ত্রী হওয়ার আগে অন্তত তিনটি গুণ লাগবেই:তিনি ভালো মানুষ হবেন – মানে, ন্যূনতম নৈতিকতা থাকবে।তিনি জানবেন – আইন, অর্থনীতি, সমাজ, ধর্ম – অন্তত মৌলিক ধারণা ও বোধ থাকবে।তিনি মাদক ও অসৎ আসক্তি থেকে মুক্ত থাকবেন – চরিত্রগতভাবে দাঁড়াতে পারবেন অন্যায়ের বিপরীতে।এই দেশে কি ভালো মানুষ নেই? জ্ঞানী, সৎ, মাদকাসক্ত নয় – এমন কেউ নেই? আছে, অবশ্যই আছে। তাহলে কেন বারবার এমন মানুষ ক্ষমতায় আসে, যারা রাস্তায় চাঁদাবাজি দেখে না, ঘুষের গন্ধ পায় না, সুদের যন্ত্রণাকে “সিস্টেম” বলে এড়িয়ে যায়?বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ও “জুলাই যোদ্ধা”“জুলাই যোদ্ধা”রা এখনও আছে – যারা সবসময় ক্ষমতার গরম হাওয়া দেখে দলে ঢুকে পড়ে, আবার হাওয়া বদলালে স্লোগান বদলে ফেলে। তারা কখনোই আদর্শের রাজনীতি করে না, করে সুবিধার রাজনীতি। দল বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না।বিএনপি কি দেউলিয়া দল? এক কথায়: না।এই দেশে এখনও বহু মানুষ আছে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়।এখনও বহু কর্মী আছে, যারা জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়।তবে কোনো দলই টিকে থাকবে না, যদি তারা ভালো মানুষ, জ্ঞানী মানুষ, সাহসী মানুষকে সামনে না আনে, আর “জুলাই যোদ্ধা”দের দিয়ে রাজনীতি চালাতে থাকে।আমাদের করণীয়: নীরবতা ভাঙা, যুক্তি তোলাসামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে সব বদলানো সম্ভব না, কিন্তু এটা পরিবর্তনের একটি শুরু। তাই কিছু কাজ আমাদের করতেই হবে।“সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা” – এই ভাষাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।যে মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধি অন্যায়কে নরম ভাষায় বৈধ করতে চান, তাদের বক্তব্যের বিরোধিতা করতে হবে যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে।দল, ব্যক্তি, আইডল – কারও অন্ধ অনুসারী না হয়ে, নীতির অনুসারী হতে হবে।সৎ, জ্ঞানী, আসক্তিমুক্ত মানুষকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহ দিতে হবে, দল নির্বিশেষে।আসল প্রশ্ন খুব সোজা: আমরা কী চাই?এমন একটা দেশ, যেখানে অন্যায়কে নতুন নামে ডেকে হালাল বানানো হবে?নাকি এমন একটা দেশ, যেখানে দুর্বল মানুষের কান্নাকে “সমঝোতা” বলে থামিয়ে দেওয়া হবে না?নীরব থাকলে “সমঝোতার ভিত্তিতে অন্যায়” একদিন আইনের চোখেও স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কথা বলতে হবে, লিখতে হবে, জিজ্ঞেস করতে হবে – “মন্ত্রী সাহেব, আপনি যা দেখেন না, আমরা প্রতিদিন তা বয়ে বেড়াই।”