18/09/2026
যুবক! তোমার যৌবন কার জন্য?
শেষ লেখা। ২২৩ নাম্বার।
—আসহাবে কাহফ ও এক যুবকের ঈমানের সত্য ঘটনা—
সাধারণ লেখক
আল ওয়াসকুরুনী বিন নুরইসলাম
লেখা ২২৩ —
হে যুবক! হে যুবতী!
তোমার হাতে এখনো সময় আছে।
চোখে স্বপ্ন আছে,
বুকে শক্তি আছে,
পায়ে চলার সামর্থ্য আছে,
মুখে কথা বলার শক্তি আছে,
সিজদায় যাওয়ার সুযোগ আছে,
তাওবা করার দরজা এখনো খোলা আছে।
কিন্তু মনে রেখো—
যৌবন চিরদিন থাকবে না।
আজ যে মুখ আয়নায় দেখে তুমি নিজেকে সুন্দর মনে করছো,
একদিন সেই মুখ মাটির নিচে চলে যাবে।
আজ যে শরীর নিয়ে তুমি অহংকার করছো,
একদিন সেই শরীর কাফনের কাপড়ে ঢাকা হবে।
আজ যে চোখ হারাম দেখে আনন্দ পায়,
একদিন সেই চোখের আলো নিভে যাবে।
আজ যে পা গুনাহের পথে ছুটে চলে,
একদিন সেই পা আর চলবে না।
তাই প্রশ্ন হলো—
তোমার যৌবন কার জন্য? দুনিয়ার জন্য?
নাকি সেই রবের জন্য,
যিনি তোমাকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন?
---
প্রথম সত্য ঘটনা—
গুহার অন্ধকারে কয়েকজন যুবক
আল্লাহ তাআলা কুরআনে আসহাবে কাহফের ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।”
—সূরা আল-কাহফ, ১৮:১৩
খেয়াল করো—
আল্লাহ তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই তাদের সম্পদ বলেননি।
তাদের রাজত্ব বলেননি। তাদের সৌন্দর্য বলেননি।
তাদের বয়সও এমনভাবে বলেননি যে, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ ছিল।
বরং বলেছেন— তারা ছিল যুবক।
আর সেই যুবকদের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—
তারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল।
---
তাদের চারপাশের সমাজ ছিল শিরক ও ভ্রান্ত বিশ্বাসে পরিপূর্ণ।
মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে অন্য উপাস্যের সামনে মাথা নত করত।
কিন্তু কয়েকজন যুবকের হৃদয় তা মেনে নিতে পারল না।
তারা প্রশ্ন করল— আমাদের রব কে?
এই পৃথিবীর প্রকৃত মালিক কে?
আমরা কার সামনে মাথা নত করব?
তখন তাদের অন্তর বলে উঠল—
আসমান ও জমিনের রব একমাত্র আল্লাহ।
তারা সত্যকে চিনে ফেলেছিল।
কিন্তু সত্যকে চিনে ফেলা সহজ হলেও সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সবসময় সহজ নয়।
কারণ সত্যের পথে গেলে অনেক সময় মানুষ একা হয়ে যায়।
বন্ধুরা দূরে চলে যায়।
পরিবার বিরোধিতা করে।
সমাজ কথা বলে।
মানুষ হাসাহাসি করে।
কেউ বলে—
“এত ধার্মিক হওয়ার কী দরকার?”
কেউ বলে—
“জীবন তো একটাই, উপভোগ করো!”
কেউ বলে— “এখন বয়স আছে, পরে নামাজ পড়বে।”
কেউ বলে—
“এখন যৌবন, পরে তাওবা করবে।”
কিন্তু আসহাবে কাহফের যুবকেরা দুনিয়ার এই কথায় ভেসে যায়নি।
---
তারা বলেছিল—
আমাদের রব আসমান ও জমিনের রব।
আমরা তাঁর ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করব না।
কুরআনে আল্লাহ তাদের এই দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করেছেন।
হে যুবক! একবার ভেবে দেখো—
আজ যদি তোমার বন্ধুরা তোমাকে গুনাহের দিকে ডাকে, তুমি কী করবে?
তারা যদি বলে—
“চলো, হারাম সম্পর্ক করি।”
তুমি কী বলবে?
তারা যদি বলে—
“চলো, নামাজ বাদ দিই।”
তুমি কী বলবে?
তারা যদি বলে—
“চলো, হারাম ভিডিও দেখি।”
তুমি কী বলবে?
তারা যদি বলে—
“সবাই তো করে!”
তুমি কী বলবে?
তখন কি তুমি বলবে—
“সবাই করলেও আমি করব না। কারণ আমার রব আমাকে দেখছেন।”
এটাই ঈমানের পরীক্ষা।
---
আসহাবে কাহফের সিদ্ধান্ত
যখন তারা বুঝল যে তাদের ঈমান রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, তারা গুহার দিকে আশ্রয় নিল।
তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করল—
“হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজের জন্য সঠিক পথের ব্যবস্থা করুন।”
—সূরা আল-কাহফ, ১৮:১০
কী অসাধারণ দোয়া!
তারা দুনিয়ার রাজত্ব চায়নি।
তারা সম্পদ চায়নি।
তারা বিলাসবহুল প্রাসাদ চায়নি।
তারা চেয়েছিল—
আল্লাহর রহমত এবং সঠিক পথ।
---
তারপর কী হলো?
আল্লাহ তাদের গুহায় আশ্রয় দিলেন।
তাদের ওপর দীর্ঘ সময়ের জন্য নিদ্রা নেমে এলো।
আল্লাহ বলেন, তিনি তাদের বহু বছর গুহায় নিদ্রিত রেখেছিলেন এবং পরে তাদের জাগিয়ে তুলেছিলেন।
তারা যখন জেগে উঠল, তখন তাদের মনে হলো—
হয়তো তারা মাত্র একদিন অথবা দিনের কিছু অংশ সেখানে ছিল।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আল্লাহ তাদের ঘটনাকে মানুষের জন্য নিদর্শন বানিয়ে দিলেন।
---
হে যুবক!
দেখো—
তুমি হয়তো ভাবছো,
“আমি তো একা।”
কিন্তু আল্লাহর জন্য একা হওয়া কখনো পরাজয় নয়।
তুমি হয়তো ভাবছো,
“সবাই আমার বিরুদ্ধে।”
কিন্তু আল্লাহ তোমার সঙ্গে থাকলে তুমি একা নও।
তুমি হয়তো ভাবছো,
“আমার বন্ধুরা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে।”
কিন্তু আল্লাহর জন্য কাউকে ছেড়ে দিলে আল্লাহ তোমাকে ছেড়ে দেন না।
আসহাবে কাহফের যুবকেরা দুনিয়ার চোখে পালিয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু আল্লাহর কাছে তারা পরাজিত হয়নি।
বরং তাদের ঘটনা কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনে পড়া হবে।
---
দ্বিতীয় সত্য ঘটনা—
এক যুবক এবং একজন সুন্দরী নারী
রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমন এক যুবকের কথাও জানিয়েছেন, যে গুনাহের সুযোগ পেয়েও আল্লাহকে ভয় করেছিল।
সহিহ হাদিসে এসেছে—
কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর বিশেষ ছায়া পাবেন।
তাদের একজন হলো—
“এমন যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে।”
আর তাদের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তিও থাকবে, যাকে মর্যাদাশীল ও সুন্দরী কোনো নারী অবৈধ সম্পর্কে আহ্বান করবে, কিন্তু সে বলবে—
“আমি আল্লাহকে ভয় করি।”
—সহিহ মুসলিম ১০৩১a; সহিহ বুখারি ৬৮০৬
হে যুবক!
এখানে একটু থামো।
একবার নিজের দিকে তাকাও।
তোমার সামনে যখন হারামের দরজা খুলে যায়—
তখন কি তুমি মনে করো,
“কেউ তো আমাকে দেখছে না?”
মনে রেখো—
মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখেন।
মানুষ তোমার মোবাইলের স্ক্রিন দেখতে না পারলেও আল্লাহ দেখেন।
মানুষ তোমার গোপন চ্যাট জানে না—
আল্লাহ জানেন।
মানুষ তোমার রাতের গোপন কান্না জানে না—
আল্লাহ জানেন।
মানুষ জানে না তুমি একা ঘরে কী করছো—
আল্লাহ জানেন।
---
আসল তাকওয়া কোথায়?
মসজিদে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া অবশ্যই ইবাদত।
মানুষের সামনে ভালো কথা বলা ইবাদত।
কিন্তু তুমি যখন একা—
তখন তুমি কী করো?
এটাই তোমার ঈমানের বড় পরীক্ষা।
যখন তোমার হাতে ফোন,
ঘরে কেউ নেই,
কেউ তোমাকে দেখছে না,
তখন তুমি কি আল্লাহকে মনে রাখো?
যখন হারামের সুযোগ আসে—
তখন কি তোমার অন্তর বলে—
“না! আমার রব আমাকে দেখছেন।”
এই একটি বাক্য—
“আমি আল্লাহকে ভয় করি”
একজন মানুষকে জাহান্নামের পথ থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে।
---
হে যুবতী!
তোমার জন্যও এই শিক্ষা।
তোমার সৌন্দর্য আল্লাহর দেওয়া আমানত।
মানুষের দৃষ্টি পাওয়ার জন্য নয়—
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমার সৌন্দর্যকে সংরক্ষণ করো।
দুনিয়া তোমাকে বলতে পারে—
“নিজেকে দেখাও।”
ইসলাম তোমাকে শেখায়—
তোমার মর্যাদা তোমার হায়ায়।
দুনিয়া বলতে পারে—
“মানুষের প্রশংসা পাও।”
কিন্তু একজন মুমিন নারীর হৃদয় বলে—
“আমার রব আমার প্রতি সন্তুষ্ট কি না—এটাই আসল।”
তুমি যদি মানুষের চোখে সাধারণ হও,
কিন্তু আল্লাহর কাছে প্রিয় হও—
তবে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত নও।
আর যদি পৃথিবীর মানুষ তোমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে,
কিন্তু আল্লাহর কাছে তুমি অপছন্দনীয় হও—
তাহলে সেই প্রশংসা তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।
---
যৌবন আসলে কী?
যৌবন শুধু শক্তির নাম নয়।
যৌবন হলো—
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
এই বয়সে তুমি সিদ্ধান্ত নেবে—
আমি কার?
দুনিয়ার?
নাকি আল্লাহর?
এই বয়সে তুমি সিদ্ধান্ত নেবে—
আমি কাকে ভালোবাসব?
হারাম সম্পর্ককে?
নাকি হালাল ভালোবাসাকে?
এই বয়সে তুমি সিদ্ধান্ত নেবে—
আমি কোথায় যাব?
গুনাহের পথে?
নাকি জান্নাতের পথে?
---
হে যুবক!
একদিন তোমার বন্ধুরা তোমাকে ডাকবে না।
একদিন তোমার মোবাইল বাজবে না।
একদিন তোমার শরীর অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকবে।
একদিন ডাক্তার বলবে—
“সময় খুব কম।”
একদিন তোমার পরিবারের মানুষ তোমার চারপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদবে।
একদিন তোমাকে গোসল করানো হবে।
একদিন তোমার শরীরে কাফন পরানো হবে।
তারপর—
যে দুনিয়াকে তুমি এত ভালোবেসেছিলে,
সেই দুনিয়া তোমাকে মাটির নিচে রেখে ফিরে আসবে।
বন্ধুরা ফিরে যাবে/
পরিবার ফিরে যাবে।
সম্পদ ফিরে যাবে।
মোবাইল পড়ে থাকবে।
ঘর পড়ে থাকবে।
ব্যাংকের টাকা পড়ে থাকবে।
কিন্তু তুমি চলে যাবে—
তোমার আমল নিয়ে।
---
তাই আজই ফিরে এসো
যদি নামাজে দুর্বল হও—
আজ থেকেই শুরু করো।
যদি হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে থাকো—
আল্লাহর জন্য বের হয়ে এসো।
যদি অশ্লীলতায় ডুবে থাকো—
আজই সেই দরজা বন্ধ করো।
যদি গুনাহ করতে করতে হৃদয় শক্ত হয়ে যায়—
আজ রাতে সিজদায় গিয়ে কাঁদো।
বল—
“হে আল্লাহ! আমি ফিরে আসতে চাই।”
তুমি হয়তো বলবে—
“আমি তো অনেক গুনাহ করেছি।”
কিন্তু মনে রেখো—
আল্লাহর রহমত তোমার গুনাহের চেয়েও বড়।
তুমি যদি সত্যিই ফিরে আসো,
তাহলে তোমার অতীত তোমার শেষ পরিচয় নয়।
---
আসহাবে কাহফের যুবকদের শিক্ষা
তারা আমাদের শেখায়—
সত্যের পথে বয়স বাধা নয়।
তারা আমাদের শেখায়—
যুবক বয়স গুনাহের লাইসেন্স নয়; বরং ঈমানের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়।
তারা আমাদের শেখায়—
মানুষের ভয়কে অতিক্রম করে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হয়।
তারা আমাদের শেখায়—
দুনিয়ার নিরাপত্তার চেয়ে ঈমানের নিরাপত্তা বড়।
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস আমাদের শেখায়—
যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বড় হয়, তার জন্য কিয়ামতের দিন বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
---
শেষ কথা
হে যুবক!
তোমার বয়স এখনো আছে—
কিন্তু সময় নেই।
তোমার শক্তি আছে—
কিন্তু শক্তি চিরস্থায়ী নয়।
তোমার সৌন্দর্য আছে—
কিন্তু সৌন্দর্য চিরস্থায়ী নয়।
তোমার বন্ধু আছে—
কিন্তু তারা তোমার সঙ্গে কবরে যাবে না।
তোমার টাকা আছে—
কিন্তু কাফনের পকেট নেই।
তোমার স্বপ্ন আছে—
কিন্তু মৃত্যু স্বপ্ন দেখে আসে না।
তাই আজই সিদ্ধান্ত নাও—
আমি আমার যৌবন আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করব।
হারাম আমাকে ডাকবে—
আমি বলব,
“আমি আল্লাহকে ভয় করি।”
দুনিয়া আমাকে টানবে—
আমি বলব,
“আমার রব আমার জন্য যথেষ্ট।”
মানুষ আমাকে একা করে দেবে—
আমি বলব,
“আল্লাহ আমার সঙ্গে আছেন।”
গুনাহ আমাকে টানবে—
আমি বলব,
“আমি ফিরে আসব আমার রবের কাছে।”
আর যখন মৃত্যু আসবে—
তখন যেন আমার শেষ পরিচয় হয়—
আমি ছিলাম একজন গুনাহগার বান্দা,
কিন্তু আমি আমার রবের দিকে ফিরে এসেছিলাম।
---
হে যুবক!
হে যুবতী!
যৌবন শেষ হওয়ার আগে ঈমানকে শক্ত করো।
সময় শেষ হওয়ার আগে তাওবা করো।
মৃত্যু আসার আগে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো।
কারণ—
আল্লাহর জন্য কাটানো যৌবন কখনো বৃথা যায় না।
সাধারণ লেখক
আল ওয়াসকুরুনী বিন নুরইসলাম
লেখা ২২৩ —
Al-Waskoroni AWBN الويس القرني بن نوراسلام