14/04/2026
সম্রাট আকবরের মনটা আজকে অনেকখানিই বিষন্ন !
আজ তিনি দরবারের কাজে মন বসাতে পারেন নি । দুপুরে তাঁর প্রিয় স্ত্রী, রাণী 'মরিয়াম উজ-জামানি' যাঁকে লোকে 'যোধা বাই' নামেই বেশী চেনে, নিজের ব্যক্তিগত রঁসুইখানায় সম্রাটের প্রিয় নিরামিষ রান্না করেছিলেন । কিন্তু সেটাও সম্রাটের মুখে রুচেনি !
কিন্তু মোঘল সাম্রাজ্যের বাদশাহ, পৃথিবীর সবচাইতে সমৃদ্ধ সাম্রাজ্য যাঁর অধীনে, যাঁর এক আদেশে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়, সেই পরাক্রমশালী সম্রাটে এই মন খারাপের কারণ কি ?
কারণটা হলো গতকাল তাঁর দরবারে আসা একখানা সংবাদ । সংবাদটি এসেছে বাঙালা মুলুক থেকে । সেখানকার দুইজন কৃষক সম্রাটের খাজনা পরিশোধ না পেরে আত্মহত্যা করেছে । খবরখানা সম্রাট আকবরের হৃদয়ে প্রচন্ড আঘাত করেছে ! প্রায় ১০ কোটি আদমসন্তানের সম্রাট তিনি । সেই পাথুরে আফগানিস্তান থেকে শুরু করে জংগলবেষ্টিত আরাকানের সীমানা পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকর্তা । কিন্তু নিজেকে তিনি শাসক নন, বরং এই বিপুলা জনগোষ্ঠী আর বিস্তৃর্ণভূমির অভিভাবক হিসেবেই মনে করেন । এই ১০ কোটি প্রজার ভাল-মন্দের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে । পিতা বাদশাহ্ হুমায়ুনের অকাল মৃত্যু হলে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে মসনদে উপবিষ্ট হবার পর থেকেই পুরোটা সময় তিনি রাজ্যের সংহতি, স্থিতি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন । যুদ্ধক্ষেত্র হোক কিংবা রাজদরবার - তাঁর মাথায় সবসময় প্রজাদের কল্যানের কথাই আবর্তিত হয় । রাজ্যের কৃষি, ব্যবসা, নির্মান, শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ের জন্য তিনি পদক্ষেপ নিয়েছেন । তাই তো মোঘল সাম্রাজ্য এই মুহুর্তে পৃথিবীর বুকে সবচাইতে শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধশালী সাম্রাজ্য, পুরো পৃথিবীর প্রায় তিনভাগের একভাগ সম্পদের মালিক ! কিন্তু সেই সাম্রাজ্যের দু-দুজন কৃষক আত্মহত্যা করেছে ! তাও আবার সম্রাটের খাজনা না দিতে পেরে ! এতো শুধু কষ্টকর নয়, বরং এযাবৎকাল ধরে তিনি প্রজাদের জন্য যত যা কিছুই করেছেন, তার সবটাই বৃথা করে দেবার মত ঘটনা ! তাহলে আর কি লাভ হলো এত ভাল ভাল পদক্ষেপ নিয়ে ? এমনটা হলে ইতিহাস তো তাকে প্রজা-নিপিড়ক শাসক হিসেবেই মনে রাখবে, মহান সম্রাট হিসেবে নয় ! পরকালে পূর্ব পুরুষ, পিতামহ মহান সম্রাট বাবরের সাথে দেখা হলে তিনি মুখ দেখাবেন কিভাবে ? হাশরের ময়দানে সর্বশক্তিমান আল্লাহ-তায়ালার কাছেই বা তিনি কি জবাব দিবেন ?
বিষন্ন সম্রাট সন্ধ্যার পর নিজের খাস বাগিচায় একাকী পায়চারী করতে লাগলেন । এমন সময় খাস নৌকর এসে খবর জানালো পন্ডিত ফতেহউল্লাহ সিরাজী এসেছেন সম্রাটের সাথে দেখা করতে । ফতেহউল্লাহ সিরাজী ভারতীয় নন, বরং জাতিতে ‘পারসিয়ান’ । তাঁর পূর্ব পুরুষদের বাসস্থান পারস্যের বিখ্যাত 'শিরাজ' নগরী বলে তখনকার রীতি অনুযায়ী নামের সাথে 'সিরাজী' যোগ করা হয়েছে । আকবর নিজে নিরক্ষর, লিখতে বা পড়তে পারেন না । তবে জ্ঞানের প্রতি তাঁর তীব্র তৃষ্ণা । নিজের দরবারে তিনি নিয়মিত পন্ডিত, আলেম, কবি, দার্শনিকদের আলোচনার আয়োজন করেন । তাঁদেরকে প্রশ্ন করেন, তাঁদের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেন । ফতেহউল্লাহ সিরাজী সম্রাটের রাজদরবারের একজন অমূল্য রত্ন ! গভীর জ্ঞানী এই পারসিয়ান পন্ডিতের বিচরন একাধারে ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য, ব্যাকরণ, দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, বলবিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে । বিষণ্ণতার এই মুহুর্তে ফতেহউল্লাহর সংগ তাঁর মনের মেঘ কাটাতে সাহায্য করবে বলে আকবরের মনে হলো । তিনি তাঁকে বাগিচায় নিয়ে আসার জন্য নৌকরকে আদেশ দিলেন ।
কিছুক্ষন পর ফতেহউল্লাহ সিরাজী এসে কুর্ণিশসহ সালাম জানালেন । সম্রাট আকবর সালামের উত্তর দিলেন । সম্রাটের বিষণ্ণ মেজাজ ফাতেহউল্লাহর নজর এড়ালো না । তিনি বিনম্রভাবে সম্রাটকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন । সম্রাট কিছু লুকালেন না, সন্ধ্যার আঁধারে খাস বাগিচায় নিজের মনে আগল খুলে দিলেন । সাথে সাথে নিজের মনেও হতাশাও ব্যক্ত করলেন ।
সব শুনে ফতেহউল্লাহ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন । তারপর শুরু করলেন "সম্রাট যদি অভয় দেন তো বলি । পবিত্র ক্বোরআনের সূরা সোয়াদের ২৭ নম্বর আয়াত নিশ্চয় সম্রাটের স্বরণে আছে । সেখানে আল্লাহ-তায়ালা বলেছেন -
"আমি আকাশ, পৃথিবী ও এ দু’ এর মাঝে যা আছে তা অনর্থক সৃষ্টি করিনি ।"
তারমানে পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ের পেছনেই কোনো না কোনো কার্যকারণ আছে । বান্দা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেই কারণগুলো খুঁজে বের করা, সেইভাবে ব্যবস্থা নেয়া, কাজ করা । বাঙালা মূলুকের দুজন কৃষকের আত্মঘাতী হবার সংবাদটি নি:সন্দেহে অতিশয় দু:খজনক এবং যে কোনো প্রজাবৎসল শাসকের জন্য হৃদয়বিদারক বটে । তবে এর পেছনেও নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে । সম্রাট যদি হুকুম দেন, তবে আমি সেই কারণটিকে খুঁজে বের করতে চাই, এবং দেখতে চাই কি পদক্ষেপ নিলে আপনার সাম্রাজ্যে এমন দু:খজনক আর ঘটবে না ।"
"অবশ্যই জনাব ফতেহউল্লাহ । আমি নিজেও মনে মনে ঠিক এই কথাই ভাবছিলাম । আপনি আমার হৃদয়ের কথা বুঝতে পেরেছেন দেখে ভাল লাগল ! আমি চাই আপনি এই বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর করুণ, মূল কারণ উদ্ভাবন করুন, এবং ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা যেন আর না হয় সেটির জন্য সঠিক পদক্ষেপ নিশ্চিত করুন । আমার পূর্ণ সহযোগীতা আপনার জন্য থাকবে ।" সম্রাট আকবরের কন্ঠস্বর একাধারে অনুরোধ এবং আদেশের মিশ্রণের মত শোনালো ।
সেদিনের মত ফতেহউল্লাহ সিরাজী বিদায় নিলেন ।
পরদিন থেকে তিনি তাঁর কাজ শুরু করলেন । ফতেহউল্লাহ একজন বিজ্ঞানী । পেছনের ঘটনা বের করার জন্য তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষনার পথই ধরলেন । শুরু করলেন তত্ব-তালাশ । লোক পাঠালেন বাঙালা মূলুকে, খোঁজ নিতে লাগলেন সমসাময়িক ঘটনাবলীর । কথা বললেন বাঙালার প্রশাসনিক কর্তাব্যাক্তি থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মচারীদের সাথেও । তারপর শুরু করলেন হাতে পাওয়া তথ্য নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা, এবং সেইমতো সমাধান খোঁজা । দুইয়ে দুইয়ে চার মেলালেন । কেটে গেল কয়েক মাস ।
প্রায় ৮ মাস পর সম্রাট আকবরের নিয়মিত দরবার । ফতেহউল্লাহ সিরাজী এসে কুর্ণিশ করে সম্রাটের কাছে নিজের বক্তব্য পেশ করার অনুমতি চাইলেন । সম্রাট অনুমতি দিলেন ।
"ভারতবর্ষের মহান সম্রাট, শাহেনশাহ্ আকবর, আজ থেকে প্রায় ৮ মাস আগে বাঙালা মূলুকের এক হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রেক্ষিতে আমার উপর একখানা দায়িত্ব ন্যস্ত করেছিলেন । আমি অত্যন্ত খুশী মনে আজ এই দরবারে জানাচ্ছি যে সেই দায়িত্ব আমি সম্পন্ন করেছি, এবং সেটির পূর্ণাঙ্গ বর্ণনা দেবার জন্য আজ আমি তৈরী । সম্রাট অনুমতি দিলে আমি এই দরবারে এখন সেটি পেশ করতে পারি ।"
"অনুমতি দেয়া হলো জনাব ফতেহউল্লাহ । আমি নিজেও গেল ৮ মাস ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আপনার কাজের ফলাফল জানার জন্য । বলুন আমার প্রজাদের এহেন আত্মঘাতি হবার আসল কারণখানা কি ? কিভাবে আমি এহেন ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটা রদ করতে পারি ? কে দায়ী এর জন্য ?" - সম্রাট আকবর অধীর আগ্রহে জিজ্ঞাসা করলেন ।
"অনুমতির জন্য ধন্যবাদ সম্রাট । আসলে 'কে' নয়, বরং বলা চলে 'কি' দায়ী ! আমার বিস্তারিত তেহকিকাতে (গবেষণার) ফলাফল হিসেবে যেটি পেয়েছি, তা হচ্ছে প্রজারা সম্রাটের মহানুভবতা এবং ন্যায়পরায়ণ শাসনে অত্যন্ত খুশী এবং সন্তুষ্ট, তারা সম্রাটের খাজনা একদম ঠিকঠাক মত পরিশোধ করতেও আগ্রহী । এনিয়ে তাঁদের মনের ভেতর কোনো বিরুপতা নেই ।” - ফতেহউল্লাহ সিরাজী একটু থামলেন ।
"তবে ? তবে সমস্যাটা কোথায় ? খাজনা আদায় করতে গিয়ে এহেন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটলো কেন তবে ? কে এর জন্য দায়ী ?" - সম্রাট আকবর আবারও অস্থিরকন্ঠে শুধালেন ।
"যেমনটি আগেও বলেছি মহান আলমপনা - 'কে' নয়, বরং বলা চলে 'কি' দায়ী ! সমস্যাটা আসলে খাজনার পরিমান, কিংবা উসূলকারীকে নিয়ে নয় । সমস্যার মূলে আসলে রয়েছে 'সময়' ! হ্যা জিল্লে-ইলাহী, সময়ই এই হৃদয়বিদারক ঘটনার আসল মুজরিম (অপরাধী) । আমরা খাজনা ধার্য্য এবং আদায় করি হিজরী সনের হিসেব অনুযায়ী । এই হিজরী সন চন্দ্র-বৎসর হিসেবে গণনা করা হয় । কিন্তু ভারতবর্ষের বাঙালা মূলুকের কৃষকগণ চাষাবাদ করে বর্ষা, শীত আর গ্রীষ্মকালের হিসেবে । তাদের চাষাবাদের এই হিসেব সুর্য্যের সাথে মিল রেখে গণনা করা হয় । তার উপর আবার চান্দ্রবৎসরের সাথে সুর্য্যবৎসরের প্রায় ১০-১২ দিনের একখানা বাৎসরিক ফারাক আছে । ফলে ৩১টি চন্দ্র বছর ৩০টি সৌর বছরের সমান হয়ে যায় । অর্থাৎ, হিসেবে বিশাল ফারাক তৈরী হয় । আমরা রাজস্ব আদায় করতে যাই চন্দ্রবছর অনুযায়ী, অথচ চাষাবাদ করা হয় সৌরবছর অনুযায়ী । সুতরাং, আমাদের উসূলকারী যখন খাজনা আদায় করতে কৃষকের কাছে যাচ্ছে, তখন কৃষকের গোলা থাকে ফাঁকা । সেখানে কোনো ফসল নেই, ফসল আসারও কথা নয় । সুতরাং, সে ঐ সময়ে খাজনা দিতে অপারগ হয়ে পরে । স্বাভাবিকভাবেই উসূলকারী তখন খাজনার জন্য চাপ দেয় । ফলাফল কৃষকদের অসহায় হাহাকার, ঋণগ্রস্থ হয়ে পরা এবং এমনতর হৃদয়বিদারক ঘটনা, যেটি ইতিমধ্যেই আপনার কানে এসেছে । এখানে দোষ কৃষকেরও নয়, উসূলকারীরও নয় । বরং দোষ ভুল সময়ের, দোষ ভুল ঋতুতে খাজনা আদায় করতে যাওয়ার নিময়খানায় ।" - ফতেহউল্লাহ সিরাজী একটানা বলে থামলেন ।
দরবারে এবার মৃদু গুঞ্জন উঠলো । কি বলে পারস্য থেকে আগত এই পন্ডিত ! এই সময়েই তো খাজনা আদায় চলছে সেই সুলতানী আমল থেকেই । কেন ? পারস্য আর আফগান থেকে আসা পূর্ববর্তী সুলতান-সাম্রাজ্যপতিরা কি এই হিজরী সন মেনেই বাঙালা মূলুকের খাজনা আদায় করেন নি ? এমনকি মহান সম্রাট বাবর যে লোদী বংশকে পরাজিত করে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন, সেই লোদীরাও কি এই হিজরী বৎসর হিসেবেই খাজনা আদায় করতেন না ? তবে আজ এমন কি হয়ে গেল যে চন্দ্র বৎসরের পরিবর্তে সূর্য্যকে ধরে সময় মাপতে হবে ?
ফতেহউল্লাহ সিরাজী দরবারের অস্বস্থি ঠিকই টের পেলেন । কয়েক শত বৎসর ধরে চলা রীতির বিরুদ্ধে কথা বলাটা মোটেও কোনো সহজ বিষয় নয়, সেটি তিনি নিজেও ভাল করেই জানেন । তবে তিনি বিজ্ঞানী, তাঁর বক্তব্য বৈজ্ঞানীক গবেষনার উপর নির্ভর করে তৈরী করা । সুতরাং, তিনি মোটেও পিছুপা হলেন না ।
আবার তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন "দরবারে আমার সম্মানীত সহকর্মীগণ হয়ত ভাবছেন এই রীতি মেনেই তো কয়েকশত বৎসর ধরে বাঙালা মূলুকের খাজনা আদায় করা হয়েছে, তাহলে নতুন করে আবার কি সমস্যা তৈরী হলো ! আসলে এই সমস্যাটি নতুন নয়, বরং বহু আগের থেকেই তৈরী হয়েছে । সেই যখন থেকে বাঙালায় সুলতানী আমল শুরু হয়, তখন থেকেই বাঙালার কৃষকগণ খাজনা প্রদানে এই সময়-সংক্রান্ত জটিলতা এবং পরিণামে নিগ্রহের শিকার হচ্ছে । হয়ত আগের কোনো সুলতান, সম্রাটগণ বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাননি, কিংবা হয়ত এটি তাঁদের কারোর নজরে আসেনি । কিন্তু জিল্লে-এলাহী, মহান সম্রাট, শাহেনশাহ্ জালাল-উদ-দীন মুহাম্মদ আকবর তো অন্যদের মতন নন । তিনি প্রজাদের কল্যানে নিবেদিতপ্রাণ, খুঁটিনাটি কোনোকিছুই তাঁর নজর এড়ায় না । তাই তিনি এবিষয়টি খেয়াল করেছেন এবং আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন এর পেছনের কারণ ও সমাধান বের করার । গেল দীর্ঘ প্রায় ৮ মাস ধরে আমি ঠিক সেটিই করেছি । আমার কাছে এখন এই সমস্যার সমাধানও আছে ।"
"কি সেই সমাধান জনাব ফতেহউল্লাহ সিরাজী ? আপনার সমাধান পেশ করুন, আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি ।" - ফতেহউল্লাহর কথা শেষ না হতেই সম্রাট আকবর আবারও তাড়া দিলেন ।
"সমাধান হচ্ছে নতুন একখানা বর্ষপঞ্জি ।" ফতেহউল্লাহ সিরাজী তাঁর সমাধান উপস্থাপন করা শুরু করলেন । "বাঙালা মূলকের ঋতুর সাথে মিল রেখে আর সৌরবর্ষের সাথে সমন্বয় করে তৈরী করা সম্পূর্ণ একখানা নতুন বর্ষপঞ্জি । আমি ইতিমধ্যেই এই বর্ষপঞ্জি তৈরীর কাজ প্রাথমিকভাবে অনেকখানি সম্পন্ন করেছি । আমি সন্মানিত জিল্লে-ইলাহী, মহান সম্রাট আকবরের সম্মানিত উপাধির সাথে মিল রেখে এই বর্ষপঞ্জির নাম দিয়েছি 'তারিখ-এ-এলাহি' । এই তারিখ-এ-এলাহি অনুযায়ী ৯৬৩ হিজরী বৎসরের প্রথম মাসকে এই বর্ষপঞ্জি প্রথম মাস হিসেবে গণনা শুরু করা হবে । ৯৬৩ হিজরী বৎসরটি আমি কেন নিয়েছি ? কারণ, ঐ বৎসরে ভারতবর্ষের বুকে মহান সম্রাট আকবরের শাহী রাজত্বকাল শুরু হয় । ঐ হিজরী বৎসরের প্রথম মাস ‘মুহররম’ মাসটি ছিল বাংলায় বৈশাখ মাস, এজন্য আমি 'বৈশাখ' মাসকেই নতুন এই বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করেছি । এই বর্ষপঞ্জিটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে এটি সূর্য্যের গতিবিধির উপর নির্ভর করে সরাসরি বাঙালা মূলকের কৃষিকাজের সাথে সম্পর্কিত । এই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী আমরা খাজনা আদায় করব বৎসরের একদম শুরুতে, অর্থাৎ বৈশাখ মাসে । ঐ সময়ের ঠিক আগেই বসন্তকালে ফসল কাটা হয়। তাই কৃষকদের গোলায় এসময়ে পর্যাপ্ত ফসল থাকে । এতে করে বাঙালার কৃষকরা যেমনভাবে নির্বিবাদে খাজনা পরিশোধ করতে পারবে, তেমনভাবে আবার রাজ উসূলকারীদের জন্যেও আদায়ের কাজটি কঠিন হবে না । এটি রাজ্যের প্রজাদের জন্য অক্লেশ এবং কল্যানমূখী একটি ব্যবস্থা হবে বলেই আমার বিশ্বাস । সব মিলিয়ে প্রজাদের কষ্ট লাঘবে মহামান্য জিল্লে-এলাহী যে উপায় খুঁজছিলেন এটি সেই উপায় এবং এটিই সর্বোত্তম উপায় ।" - ফতেহউল্লাহ সিরাজী তাঁর বক্তব্য শেষ করে থামলেন ।
তারপর ?
তারপর আর কি ! সম্রাট আকবর তৎক্ষণাত এই নতুন বর্ষপঞ্জি শুরু করার ফরমান জারি করলেন । বাঙালা মূলকের কৃষকদের সুবিধার কথা চিন্তা করে মোঘল সম্রাট জালাল-উদ-দীন মুহাম্মদ আকবরের আদেশে চালু হলো নতুন বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার । এই বর্ষপঞ্জির পোষাকি নাম হলো 'তারিখ-এ-এলাহি' বা 'ঐশ্বরিক সময়' । বাঙালার ঋতুর সাথে মিলিয়ে তৈরী করা হলেও তারিখ-এ-এলাহীর ১২টি মাসের নাম মূলত: পারস্যের নামের আদলে নামকরণ করা হলো - ফারভারদিন, আর্দি, খোরদাদ, কোর্দাদ , আমার্দাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম, ইসফান্দার, ফারওয়ারদিন এবং শাহরিওয়ার ।
তবে কথায় আছে যেকোনো রাজফরমানের চাইতে সাধারণ জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক রীতি ও ভাষা অনেক বেশী শক্তিশালী । তাই সম্রাট আকবরের এই ‘তারিখ-এ-এলাহী’ দ্রুতই বাঙালা মূলকে 'ফসলি সন' হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে । আর মাসগুলোও তাদের পারসিয়ান নামের চাইতে বরং বাংলা ভাষার বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন এবং চৈত্র নামে পরিচিত লাভ করে । বাঙালা মূলকে আমরা পাই আমাদের 'বাংলা বর্ষপঞ্জি' বা 'বাংলা বৎসর' বা 'বঙ্গাব্দ' বা ‘বাংলা সন’ ।
বাংলা সন চালু হবার পুরো উদ্দেশ্যই ছিলো খাঁটি অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক । এর পেছনে ধর্মীয় কোনো কারণই ছিল না - না ইসলামিক কোনো কারণ, না হিন্দুধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্য । স্রেফ খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যেই এই বাংলা ক্যালেন্ডারের উৎপত্তি । ইতিহাসের দিক থেকেও এটি কোনো 'হাজার বছরের ঐতিহ্য' নয়, বরং মাত্র সাড়ে চারশ' বছরের পুরানো । অথচ, এই পহেলা বৈশাখ আসলেই প্রতিবছর একদল বঙ্গীয় ক্যাচালপ্রেমী মানুষজন হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় কু-তর্ক শুরু করে । একদল এর সাথে মঙ্গল-অমঙ্গল জুড়ে দেয়, আরেকদল একে অনৈসলামিক বলে গণ্য করে । একদল এটি পালন না করলে খাঁটি ‘বাঙালি’ পরিচয় মুছে যাবে বলে ত্রাহী রব ছাড়ে, তো আরেকদল এটি পালন করলে ‘মুসলমানত্ব’ ঘুঁচে যাবে বলে তড়পায় ! অথচ, এর সূত্রপাতের পেছনে ছিলেন একজন তুর্কিবংশোদ্ভূত সম্রাট, আরেকজন পারসিয়ান মুসলিম পন্ডিত ! সুতরাং, আজকের এইসব এঁড়ে তর্ক নিতান্তই হাস্যকর ও নিদারুণ মূর্খামী !
আসুন সহজ বিষয়কে সহজভাবেই দেখি । বাংলা সন আদতে বাংলা জনপদের হাজার বছরের কোনো ঐতিহ্যও না, ধর্মীয় কিংবা অধর্মীয় কোনো বিষয়ও না । এটি একেবারেই প্রশাসনিক একটি উপলক্ষ্য মাত্র, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল নির্বিবাদে খাজনা আদায় করা, আর কিচ্ছু নয় । আর বর্তমানে এটি নিতান্তই একটি সামাজিক উৎসবের উপলক্ষ্য মাত্র । ইচ্ছে হলে উৎসব করি, ইচ্ছে না হলে না করি । তবে অন্ত:ত বোকার মত ক্যাচালটা না করি ।
সবাইকে শুভ নববর্ষ !