Pure Story Hub

Pure Story Hub Hi Dear Welcome To My (ISLAMIC STATUS) Page

 #মদিনার আকাশ সেদিন যেন অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়েছে মদিনার ঘরে ...
03/09/2026

#মদিনার আকাশ সেদিন যেন অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়েছে মদিনার ঘরে ঘরে। সাহাবায়ে কেরাম উদ্বিগ্ন। যাঁর মুখ দেখলে সাহাবিদের হৃদয়ে প্রশান্তি নেমে আসত, যাঁর কণ্ঠে কুরআনের আয়াত শুনে তাঁরা নিজেদের জীবন বদলে ফেলেছিলেন, সেই প্রিয় নবী (সা.) এখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবারের জন্য এই সময়টি ছিল আরও কঠিন। কারণ তাঁরা শুধু একজন নবীকে অসুস্থ অবস্থায় দেখছিলেন না; তাঁরা পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে ধীরে ধীরে দুনিয়ার জীবন থেকে বিদায় নেওয়ার পথে দেখতে পাচ্ছিলেন।

এই সময় ফাতিমা (রা.) বাবার কাছে এলেন। বাবাকে দেখেই তাঁর হৃদয় ভারী হয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। প্রিয় পিতার অসুস্থতা একজন মেয়ের হৃদয়কে কতটা ভেঙে দিতে পারে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে কাছে ডাকলেন। তিনি ফাতিমা (রা.)-এর কানে এমন একটি কথা বললেন, যা অন্যরা শুনতে পেল না। ফাতিমা (রা.) সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেললেন।

চারপাশের মানুষ বিস্মিত। কী এমন কথা বলা হলো, যার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় কন্যা এত কাঁদলেন? কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ (সা.) আবার তাঁকে কাছে ডাকলেন এবং তাঁর কানে আরেকটি কথা বললেন।

এবার আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। যে কন্যা কিছুক্ষণ আগে কাঁদছিলেন, তিনিই এবার হাসলেন। মানুষ আরও অবাক হয়ে গেল। একই মানুষকে এমন কী বলা হলো যে, এক মুহূর্তে তাঁর চোখে পানি আর পরের মুহূর্তে মুখে হাসি?

পরবর্তীতে ফাতিমা (রা.) এই ঘটনার ব্যাখ্যা করেছিলেন। প্রথমবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর এই অসুস্থতায় তাঁর ইন্তেকাল হতে পারে। পিতার কাছ থেকে বিচ্ছেদের সংবাদ শুনে ফাতিমা (রা.) কেঁদে ফেলেছিলেন। এটি ছিল স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি।

তিনি তো তাঁর বাবা। তিনি শুধু একজন নবী নন—তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। কিন্তু এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে জানালেন, তাঁর পরিবারের মধ্যে ফাতিমা (রা.)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন। তখন ফাতিমা (রা.) হাসলেন।

একটি মুহূর্তে তাঁর চোখের পানি আনন্দের অশ্রুতে পরিণত হলো। এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যে মানুষের জীবনের জন্য কত বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে!

আমরা সাধারণত মৃত্যু শব্দটি শুনলেই ভয় পাই। আমরা মনে করি, মৃত্যু মানেই সবকিছুর সমাপ্তি। কিন্তু একজন মুমিনের কাছে মৃত্যু পৃথিবীর জীবনের সমাপ্তি হলেও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের শুরু।

ফাতিমা (রা.)-এর সামনে তখন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন বিচ্ছেদ দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তিনি যখন জানলেন যে এই বিচ্ছেদ দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তাঁর হৃদয়ে অন্যরকম প্রশান্তি জন্ম নিল।

এখানে প্রথম শিক্ষা—**মুমিনের জীবনে বিচ্ছেদ আছে, কিন্তু চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ নেই।**দুনিয়ায় আমরা যাদের ভালোবাসি, একদিন তাদের কারও না কারও কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে। বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী—কেউই চিরকাল আমাদের সঙ্গে থাকবে না।

এই সত্য মানুষ যত তাড়াতাড়ি বুঝবে, তত বেশি সে ভালোবাসার মানুষগুলোর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করবে। কারণ আমরা যদি মনে করি, ‘সে তো সবসময় আমার সঙ্গে থাকবে’, তাহলে আমরা তার মূল্য বুঝতে দেরি করি।

একজন ছেলে প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে রাগ করে কথা বলে। বাবা বারবার ডাকলেও বিরক্ত হয়। স্ত্রীকে ছোট করে কথা বলে। স্বামীকে তার পরিশ্রমের জন্য কখনো ধন্যবাদ দেয় না।

কিন্তু একদিন হঠাৎ সেই মানুষটি আর পাশে থাকে না। তখন আফসোস হয়—

‘আরেকবার যদি ভালো করে কথা বলতে পারতাম!’
‘আরেকবার যদি তাকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম!’
‘আরেকবার যদি ক্ষমা চাইতে পারতাম!’

কিন্তু সময় ফিরে আসে না। তাই ফাতিমা (রা.)-এর সেই ঘটনা আমাদের শেখায়—**প্রিয় মানুষকে হারানোর আগে তার মূল্য বোঝো।**

তারপর আসে আরও গভীর শিক্ষা।

ফাতিমা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা ছিলেন। তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষের সান্নিধ্য ছিল। তিনি বাবার ভালোবাসা পেয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছেন, তাঁর জীবনের অসংখ্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকেও বাবার মৃত্যুর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এখান থেকে বোঝা যায়—**দুনিয়ায় কোনো সম্পর্কই মৃত্যুর নিয়মের বাইরে নয়।**

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মতো শ্রেষ্ঠ মানুষও দুনিয়ায় চিরকাল থাকেননি। তাহলে আমরা কীভাবে ভাবি যে আমাদের সম্পদ, বাড়ি, পরিবার, যৌবন বা ক্ষমতা চিরকাল থাকবে?

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো—সে ভবিষ্যতের জন্য এমনভাবে পরিকল্পনা করে, যেন সে কখনো মারা যাবে না। বছরের পর বছর টাকা জমায়। বাড়ি বানায়। জমি কেনে। ব্যবসা বাড়ায়। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে।

এসব করা নিষিদ্ধ নয়। বরং হালাল উপায়ে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। কিন্তু সমস্যা তখনই হয়, যখন মানুষ **দুনিয়ার ভবিষ্যতের জন্য সব প্রস্তুতি নেয়, অথচ আখিরাতের ভবিষ্যতের জন্য কিছুই প্রস্তুত করে না।**

একজন মানুষ তার সন্তানের জন্য লাখ টাকা রেখে যায়, কিন্তু তাকে নামাজ শেখায় না।
বাড়ি বানিয়ে যায়, কিন্তু সেই বাড়িতে কুরআনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করে না।
ব্যাংকে টাকা রেখে যায়, কিন্তু নিজের আমলের খাতা শূন্য রেখে যায়।

ফাতিমা (রা.)-এর জীবনের এই ঘটনা যেন আমাদের প্রশ্ন করে—**তুমি মৃত্যুর পর কী রেখে যেতে চাও? শুধু সম্পদ, নাকি এমন সন্তান ও আমল, যা তোমার জন্য উপকারের কারণ হবে?**

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ফাতিমা (রা.)-এর জীবনও দীর্ঘ হয়নি। সহিহ বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাঁর পিতার ইন্তেকালের প্রায় ছয় মাস পর ইন্তেকাল করেন।

এখানে আরেকটি শিক্ষা রয়েছে—**কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে।**

মানুষ সুখের সময় আল্লাহকে ভুলে যেতে পারে। কিন্তু বিপদের সময় সে আকাশের দিকে তাকায়। অসুস্থতার সময় দোয়া করে। প্রিয় মানুষ মারা গেলে আল্লাহকে ডাকে। কষ্টের সময় কুরআন খুলে বসে।

অর্থাৎ কষ্ট মানুষকে তার প্রকৃত অবস্থান মনে করিয়ে দেয়—**সে আল্লাহর বান্দা।**

ফাতিমা (রা.)-এর জীবনও আমাদের শেখায়, ভালোবাসা থাকবে, কান্না থাকবে, বিচ্ছেদের কষ্ট থাকবে—কিন্তু একজন মুমিনের হৃদয়ের শেষ আশ্রয় আল্লাহ।

একবার কল্পনা করুন, একজন বৃদ্ধ বাবা তাঁর মেয়েকে বলছেন—‘মা, একদিন আমাকে ছেড়ে তোমাকেও যেতে হবে।’ মেয়ে বাবার হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘আমি আপনাকে ছাড়া কীভাবে থাকব?’

বাবা বললেন, ‘মানুষ মানুষকে ছেড়ে যায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ছেড়ে যান না।’ মেয়েটি চুপ হয়ে গেল।

বাবা আবার বললেন, ‘তুমি আমাকে ভালোবাসবে, কিন্তু আমাকে তোমার রব বানাবে না। তুমি তোমার রবকে ভালোবাসবে, তাঁর জন্য জীবন সাজাবে। তাহলে বিচ্ছেদের পরও তোমার হৃদয় ভেঙে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে না।’

এই কথাটিই যেন ফাতিমা (রা.)-এর জীবনের একটি বড় শিক্ষা।

**মানুষকে ভালোবাসো, কিন্তু আল্লাহর চেয়ে বেশি নয়।**

কারণ মানুষ পরিবর্তনশীল। আজ পাশে আছে, কাল নেই। আজ সুস্থ, কাল অসুস্থ। আজ শক্তিশালী, কাল দুর্বল। আজ কথা বলছে, কাল নীরব।

কিন্তু আল্লাহ চিরঞ্জীব। তাঁর ওপরই ভরসা। তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন।

# # # মৃত্যুর কথা মনে রাখা কি দুঃখের বিষয়?

একজন যুবক একদিন এক আলেমকে জিজ্ঞেস করল, ‘হুজুর, আমি মৃত্যুর কথা মনে করতে চাই না। এতে আমার মন খারাপ হয়ে যায়।’

আলেম বললেন, ‘তুমি কি পরীক্ষার কথা মনে করতে চাও?’
যুবক বলল, ‘হ্যাঁ, কারণ পরীক্ষা আসবে।’
আলেম বললেন, ‘তাহলে মৃত্যুর কথা মনে রাখতে চাও না কেন? সেটিও আসবে।’ যুবক চুপ হয়ে গেল।
আলেম বললেন, ‘মৃত্যুকে স্মরণ করার উদ্দেশ্য হতাশ হওয়া নয়। উদ্দেশ্য হলো প্রস্তুত হওয়া।’

এই কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়; বরং জীবনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার জন্য। যে মানুষ জানে তাকে একদিন চলে যেতে হবে, সে অন্যায় করতে ভয় পায়। কারও হক নষ্ট করার আগে ভাবে। হারাম উপার্জনের আগে থামে।

অহংকার করার আগে মনে করে—‘একদিন আমাকে মাটির নিচে যেতে হবে।’
ক্ষমতা পেলে মনে করে—‘এটাও স্থায়ী নয়।’
সম্পদ পেলে মনে করে—‘এগুলোও একদিন অন্যের হয়ে যাবে।’ এই চিন্তাই মানুষকে বদলে দেয়।

# # # ফাতিমা (রা.)-এর কান্না আমাদের কী শেখায়?

ফাতিমা (রা.) কেঁদেছিলেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে—**কাঁদা ঈমানের দুর্বলতা নয়।**

প্রিয় মানুষকে হারানোর আশঙ্কায় চোখে পানি আসা মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। ইসলাম মানুষকে পাথর হতে বলেনি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রিয়জনের মৃত্যুতে কেঁদেছেন। তাই কেউ যদি বিপদে কাঁদে, তাকে ‘ঈমান দুর্বল’ বলে অপমান করা উচিত নয়। বরং তাকে সান্ত্বনা দিতে হবে, আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে এবং ধৈর্যের পথে সাহায্য করতে হবে।

তবে কান্নার সঙ্গে আল্লাহর প্রতি অসন্তোষ যেন না আসে। এই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ। **চোখ কাঁদতে পারে, কিন্তু হৃদয় আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারে।**

# # # ফাতিমা (রা.)-এর হাসি আমাদের কী শেখায়?

দ্বিতীয়বার যখন তিনি শুনলেন যে তিনি খুব শিগগিরই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে মিলিত হবেন, তখন তিনি হাসলেন। এখানে মৃত্যুর প্রতি কোনো বেপরোয়া মনোভাব ছিল না। বরং ছিল ঈমানের আশ্বাস।

এটি আমাদের শেখায়—**দুনিয়ার বিচ্ছেদ যতই কঠিন হোক, আখিরাতের আশা একজন মুমিনকে শক্তি দেয়।**

আজ একজন মা তার সন্তানকে নিয়ে চিন্তিত। একজন বাবা ঋণের চিন্তায় ঘুমাতে পারেন না। কেউ রোগের ভয়ে ভীত। কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কেউ প্রিয় মানুষ হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত।

এই সব মানুষের জন্য ফাতিমা (রা.)-এর জীবনের এই ঘটনাটি একটি কোমল বার্তা বহন করে— **দুনিয়ার জীবন খুব ছোট। তাই দুনিয়ার কষ্টকে চূড়ান্ত বাস্তবতা মনে করো না।**

আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখো।
নামাজ ঠিক করো।
হারাম থেকে বাঁচো।
মানুষের হক আদায় করো।
মা-বাবাকে সম্মান করো।
পরিবারের সঙ্গে ভালো আচরণ করো।
ক্ষমা করতে শেখো।
তওবা করতে শেখো।

তাহলে মৃত্যু তোমার কাছে শুধু ভয়ের নাম থাকবে না; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার বাস্তবতা হিসেবে মনে হবে।

# # # গল্পের শেষ শিক্ষা

মদিনার সেই ঘর আজ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। ফাতিমা (রা.)-ও চলে গেছেন। আলী (রা.)-ও চলে গেছেন। হাসান (রা.), হুসাইন (রা.)—তাঁরাও দুনিয়ার জীবন শেষ করেছেন।

একসময় যে মানুষগুলো একসঙ্গে বসতেন, কথা বলতেন, হাসতেন, কাঁদতেন—আজ তাঁরা সবাই আমাদের কাছে ইতিহাসের অংশ।

কিন্তু তাঁদের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁদের শিক্ষা শেষ হয়নি। আমরা আজও তাঁদের জীবন থেকে শিখতে পারি।

ফাতিমা (রা.)-এর চোখের সেই কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়—**প্রিয় মানুষকে ভালোবাসো, কারণ বিচ্ছেদ একদিন আসবেই।**

তাঁর সেই হাসি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—**আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করো, কারণ দুনিয়ার বিচ্ছেদের পরও মুমিনের জন্য আল্লাহর রহমতের আশা রয়েছে।**

আর তাঁর পুরো জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—**দুনিয়ার জীবন যতই প্রিয় হোক, আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।**

আজ রাতে ঘুমানোর আগে একবার নিজের হৃদয়কে প্রশ্ন করুন—**“আমি যদি আজই চলে যাই, আমার সঙ্গে কী যাবে?”**

বাড়ি যাবে না।
গাড়ি যাবে না।
ব্যাংকের টাকা যাবে না।
ব্যবসা যাবে না।
পদমর্যাদা যাবে না।
সামাজিক পরিচয়ও থাকবে না।

সঙ্গে যাবে শুধু **ঈমান, আমল এবং আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি।**
তাই জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ হলো—দুনিয়া ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং **দুনিয়ার মাঝেই আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হওয়া।**

ফাতিমা (রা.)-এর সেই অশ্রু আর হাসির ঘটনা যেন আমাদের হৃদয়ে একটি কথা লিখে দেয়—**“বিচ্ছেদকে ভয় করো না; বরং এমন জীবন গড়ো, যাতে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দিনটি তোমার জন্য লজ্জার নয়, আশার দিন হয়।”**

 #এক সময়ের কথা। মানুষ যখন ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা ও ক্ষমতাকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করত, তখন আল্লাহ তাআলা এমন এক...
02/09/2026

#এক সময়ের কথা। মানুষ যখন ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা ও ক্ষমতাকে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি মনে করত, তখন আল্লাহ তাআলা এমন একজন বান্দাকে বিশেষ প্রজ্ঞা দান করেছিলেন, যার হাতে ছিল না কোনো বিশাল রাজ্য, ছিল না সৈন্যবাহিনী, ছিল না অঢেল সম্পদ। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল ঈমান, মুখে ছিল হিকমত আর জীবনে ছিল আল্লাহভীতি। তিনি ছিলেন লোকমান।

লোকমান (রহ.)-এর পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় নানা কথা পাওয়া যায়। তবে কুরআন তাঁর সম্পর্কে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানায়, তা হলো—**আল্লাহ তাঁকে হিকমত বা প্রজ্ঞা দান করেছিলেন।** আল্লাহ বলেন, “আমি লোকমানকে হিকমত দিয়েছিলাম—‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো।’” (সূরা লুকমান: ১২)

এই একটি কথার মধ্যেই তাঁর জীবনের একটি বড় রহস্য লুকিয়ে আছে। তিনি জ্ঞানী হয়েছিলেন, কিন্তু জ্ঞানের কারণে অহংকারী হননি; বরং জ্ঞান তাঁকে শুকরগুজার বানিয়েছিল।

লোকমান (রহ.) বুঝতেন, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ সোনা-রূপা নয়, বরং এমন জ্ঞান যা তাকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাই তিনি নিজের সন্তানের জন্য এমন উত্তরাধিকার রেখে যেতে চেয়েছিলেন, যা মৃত্যুর পরেও তাকে উপকার করবে।

একদিন তিনি তাঁর ছেলেকে কাছে ডাকলেন।

ছেলেটি বাবার সামনে এসে বসতেই লোকমান (রহ.) শান্তভাবে বললেন, “হে আমার প্রিয় সন্তান...”

কুরআনে তাঁর উপদেশের ভাষা লক্ষ্য করলে একটি বিষয় খুব সুন্দরভাবে চোখে পড়ে। তিনি সন্তানকে ধমক দিয়ে শিক্ষা দেননি। তিনি ভালোবাসা দিয়ে ডাকতেন—**“ইয়া বুনাইয়্যা”—হে আমার প্রিয় ছোট্ট সন্তান।**

এটাই ছিল তাঁর শিক্ষাদানের প্রথম রহস্য।

তিনি জানতেন, শুধু সত্য কথা বললেই মানুষ সত্য গ্রহণ করে না। সত্যকে এমনভাবে বলতে হয়, যাতে তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়।

তারপর তিনি বললেন, “হে আমার প্রিয় সন্তান! আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না। নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলুম।” (সূরা লুকমান: ১৩)

লোকমান (রহ.) তাঁর সন্তানকে জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিলেন—**আল্লাহকে চিনো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।**

কারণ একজন বাবা যদি সন্তানকে শুধু ভালো চাকরি, বড় বাড়ি, অর্থ উপার্জন কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের শিক্ষা দেন, কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার শিক্ষা না দেন, তাহলে সে দুনিয়ার অনেক কিছু পেলেও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হারিয়ে ফেলতে পারে।

লোকমান (রহ.) তাই শিক্ষার ভিত্তি শুরু করেছিলেন ঈমান দিয়ে।

কিন্তু তিনি এখানেই থামলেন না।

তিনি জানতেন, সন্তান একদিন বাবার চোখের আড়ালে যাবে। এমন অনেক জায়গায় যাবে যেখানে বাবা তাকে দেখতে পাবেন না। তাই এমন এক বিশ্বাস তার অন্তরে গেঁথে দিতে হবে, যাতে সে মানুষের চোখকে ভয় না করলেও আল্লাহর নজরকে ভয় করে।

তিনি বললেন, “হে আমার প্রিয় সন্তান! কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা কোনো পাথরের ভিতরে থাকে, অথবা আকাশমণ্ডলে কিংবা পৃথিবীতে থাকে, আল্লাহ তা উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ।” (সূরা লুকমান: ১৬)

কী গভীর শিক্ষা!

মানুষের কাছ থেকে একটি ভুল লুকানো সম্ভব। বাবা-মায়ের কাছ থেকেও লুকানো সম্ভব। শিক্ষক, বন্ধু কিংবা সমাজের কাছ থেকেও লুকানো সম্ভব। কিন্তু আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই লুকানো যায় না।

লোকমান (রহ.) তাঁর সন্তানকে এমন একটি বিবেক দিতে চেয়েছিলেন, যা একা থাকলেও তাকে সৎ রাখবে।

কারণ সত্যিকারের চরিত্র তখনই প্রকাশ পায়, যখন কেউ দেখছে না।

এরপর তিনি সন্তানকে নামাজের শিক্ষা দিলেন।

তিনি বললেন, “হে আমার প্রিয় সন্তান! সালাত কায়েম করো...” (সূরা লুকমান: ১৭)

খেয়াল করুন, তিনি শুধু জ্ঞান অর্জনের কথা বলেননি। তিনি শুধু ভালো মানুষ হওয়ার কথা বলেননি। তিনি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম—সালাতের দিকে সন্তানকে আহ্বান করেছেন।

কারণ মানুষের হৃদয় যদি আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তার চরিত্রও ধীরে ধীরে সুন্দর হতে থাকে।

এরপর তিনি সন্তানকে সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে বললেন।

তিনি বললেন, “সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করো।” (সূরা লুকমান: ১৭)

কিন্তু তিনি জানতেন, অন্যকে ভালো কথা বলা সহজ নয়। কেউ ভালো কথা শুনে বিরক্ত হতে পারে, কেউ উপহাস করতে পারে, কেউ অপমান করতে পারে।

তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ করো। নিশ্চয়ই এটা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (সূরা লুকমান: ১৭)

অর্থাৎ ভালো পথে চলতে গেলে ধৈর্য লাগবে।

সত্য বললে সবাই প্রশংসা করবে—এমন নয়।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সবাই পাশে থাকবে—এমন নয়।

আল্লাহর বিধান মেনে চললে মানুষ কখনো কখনো বিদ্রূপও করতে পারে।

কিন্তু একজন মুমিনের লক্ষ্য মানুষের প্রশংসা নয়; তার লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি।

লোকমান (রহ.) এরপর তাঁর ছেলেকে এমন একটি শিক্ষা দিলেন, যা আজকের সমাজের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বললেন, “মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং পৃথিবীতে অহংকারের সঙ্গে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী, গর্বকারীকে পছন্দ করেন না।” (সূরা লুকমান: ১৮)

একজন মানুষ যখন অর্থ পায়, তখন সে গরিবকে তুচ্ছ করতে পারে।

যখন জ্ঞান পায়, তখন অজ্ঞ মানুষকে অপমান করতে পারে।
যখন ক্ষমতা পায়, তখন দুর্বল মানুষকে অবহেলা করতে পারে।
যখন সৌন্দর্য পায়, তখন অন্যকে ছোট মনে করতে পারে।

যখন সামাজিক মর্যাদা পায়, তখন সাধারণ মানুষকে নিজের সমান মনে করতে চায় না।

কিন্তু লোকমান (রহ.) তাঁর সন্তানকে শেখালেন—**তুমি যত বড়ই হও, মানুষের দিকে অবজ্ঞার চোখে তাকিয়ো না।**

কারণ মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার পোশাক, টাকা, বংশ বা পদে নয়; তার তাকওয়া ও চরিত্রে।

এরপর তিনি হাঁটার আদব শেখালেন।

তিনি বললেন, “তোমার চলনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করো...” (সূরা লুকমান: ১৯)

অর্থাৎ অহংকার করে এমনভাবে চলবে না যেন তুমি সবার চেয়ে বড়; আবার এমনও নয় যে তোমার আচরণে অশোভনতা প্রকাশ পায়।

তারপর তিনি বললেন, “তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই কণ্ঠস্বরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রীতিকর কণ্ঠস্বর হলো গাধার কণ্ঠস্বর।” (সূরা লুকমান: ১৯)

এখানে শুধু আওয়াজ কমানোর শিক্ষা নয়; বরং **ভদ্রভাবে কথা বলার শিক্ষা** রয়েছে।

অনেক মানুষ মনে করে, জোরে কথা বললেই তার কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়।

রাগ করে কথা বললে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যকে চুপ করিয়ে দিলে নিজের জয় হয়।

কিন্তু লোকমান (রহ.) তাঁর সন্তানকে শেখালেন—উচ্চস্বরে কথা বলা শক্তির প্রমাণ নয়; বরং সংযত থাকা চরিত্রের সৌন্দর্য।

এভাবেই একজন পিতা তাঁর সন্তানকে জীবনের সম্পূর্ণ একটি পথ দেখিয়ে দিলেন।

ঈমান থেকে শুরু করে নামাজ।
নামাজ থেকে চরিত্র।
চরিত্র থেকে সমাজের প্রতি দায়িত্ব।
দায়িত্ব পালনের পথে ধৈর্য।
আর মানুষের সঙ্গে আচরণে বিনয় ও সংযম।

লোকমান (রহ.)-এর এই শিক্ষাগুলো আমাদের সামনে একটি অসাধারণ সত্য তুলে ধরে—**সন্তানকে শুধু দুনিয়ার জন্য প্রস্তুত করলেই একজন বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে আখিরাতের জন্যও প্রস্তুত করতে হয়।**

আজ আমরা সন্তানকে শেখাই কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হয়, কীভাবে ভালো চাকরি করতে হয়, কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে যদি শেখানো না হয়—কে আমাদের সৃষ্টি করেছেন, কেন সৃষ্টি করেছেন, কার কাছে ফিরে যেতে হবে, মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে—তাহলে শিক্ষার একটি বড় অংশ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

লোকমান (রহ.) তাই তাঁর সন্তানকে সম্পদের পাহাড় দিয়ে যাননি; তিনি তাঁকে **হিকমতের শিক্ষা** দিয়েছিলেন।

তিনি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা একটি মানুষকে একা থাকলেও সৎ রাখে।
তিনি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা ক্ষমতা পেলেও অহংকারী হতে দেয় না।
তিনি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা বিপদ এলেও মানুষকে ধৈর্য ধরতে শেখায়।
তিনি এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন, যা মানুষকে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখে।

আর সবচেয়ে বড় কথা—তিনি সন্তানকে বুঝিয়েছিলেন, **মানুষ তোমাকে না দেখলেও আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।**

# # # লোকমান (রহ.)-এর জীবনের এই ঘটনা থেকে আমাদের ৮টি বড় শিক্ষা

**১. সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্পদ নয়, সঠিক ঈমান।**
সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু সঠিক আকিদা ও আল্লাহভীতি একজন মানুষকে সারা জীবন পথ দেখাতে পারে।

**২. ভালো শিক্ষা ভালোবাসা দিয়ে দিতে হয়।**
“হে আমার প্রিয় সন্তান”—লোকমান (রহ.)-এর এই সম্বোধন আমাদের শেখায়, সন্তানকে সংশোধন করার আগে তার হৃদয় জয় করতে হয়।

**৩. মানুষের চোখের চেয়ে আল্লাহর নজরকে বেশি ভয় করতে হবে।**
গোপনে করা ছোট কাজও আল্লাহর কাছে অজানা নয়।

**৪. নামাজকে জীবনের কেন্দ্র বানাতে হবে।**
লোকমান (রহ.) তাঁর উপদেশের মধ্যে সালাতকে বিশেষভাবে স্থান দিয়েছেন।

**৫. সত্যের পথে ধৈর্য অপরিহার্য।**
ভালো কাজ করলেই সবাই প্রশংসা করবে—এমন আশা করা উচিত নয়।

**৬. জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করবে।**
যে জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে তোলে, সে জ্ঞানের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়নি। আল্লাহ লোকমানকে হিকমত দিয়েছিলেন এবং তাঁকে শুকরিয়া আদায়ের শিক্ষা দিয়েছিলেন।

**৭. মানুষের প্রতি অবজ্ঞা করা যাবে না।**
আজ যে মানুষকে তুমি ছোট ভাবছ, আল্লাহর কাছে সে তোমার চেয়ে উত্তম হতে পারে।

**৮. কথা বলার মধ্যেও ইবাদতের শিক্ষা রয়েছে।**
চিৎকার, অপমান, অহংকার ও কঠোর ভাষা মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। সুন্দর ও সংযত কথা হৃদয় জয় করে।

শেষ পর্যন্ত লোকমান (রহ.) আমাদের সামনে এমন একজন জ্ঞানী মানুষের ছবি তুলে ধরেন, যিনি নিজের জ্ঞান প্রদর্শন করার চেয়ে তা দিয়ে একজন মানুষের জীবন গড়ে দিতে চেয়েছিলেন।

তাঁর কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎ মানে শুধু—সে কত টাকা উপার্জন করবে, কত বড় বাড়িতে থাকবে কিংবা কত বড় পদে বসবে—এটা ছিল না।

তাঁর কাছে সন্তানের প্রকৃত সফলতা ছিল—**সে আল্লাহকে চিনবে, নামাজ কায়েম করবে, সত্যের পথে থাকবে, বিপদে ধৈর্য ধরবে, মানুষের সঙ্গে বিনয়ী হবে এবং একদিন আল্লাহর সামনে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়াতে পারবে।**

আজ আমাদের ঘরে হয়তো লোকমান (রহ.) নেই। কিন্তু তাঁর উপদেশ কুরআনের পাতায় সংরক্ষিত আছে।

তাই সন্তানের হাতে শুধু মোবাইল তুলে দেওয়ার আগে তাকে আল্লাহর কথা শেখানো দরকার।
শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়ার আগে তাকে আখিরাতের প্রস্তুতি শেখানো দরকার।
শুধু মানুষের সামনে ভালো হওয়ার শিক্ষা নয়—**একাকী অবস্থায়ও আল্লাহকে ভয় করার শিক্ষা** দিতে হবে।

কারণ একজন সন্তানকে দুনিয়ার জন্য সফল বানানো বড় অর্জন হতে পারে, কিন্তু তাকে এমন মানুষ বানানো—যে আল্লাহকে ভালোবাসে, মানুষের হক আদায় করে এবং অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখে—এটাই হতে পারে একজন পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

 #বাগদাদের এক ব্যস্ত মহল্লায় সালেহ নামে এক ধনী ব্যবসায়ী বাস করত। তার বড় দোকান ছিল, অনেক কর্মচারী ছিল এবং ব্যবসাও দিন ...
02/09/2026

#বাগদাদের এক ব্যস্ত মহল্লায় সালেহ নামে এক ধনী ব্যবসায়ী বাস করত। তার বড় দোকান ছিল, অনেক কর্মচারী ছিল এবং ব্যবসাও দিন দিন ভালো হচ্ছিল। আল্লাহ তাকে সম্পদ দিয়েছিলেন। সে নিজেও মাঝে মাঝে গরিবদের সাহায্য করত। কিন্তু তার একটি অভ্যাস ছিল—কাউকে সাহায্য করলে সে চাইত, মানুষ যেন জানে যে সাহায্যটি সে করেছে।

কেউ তার কাছ থেকে খাবার নিলে সে বলত, “এটা কিন্তু আমার দোকান থেকেই দিলাম।”
কোনো দরিদ্র মানুষকে কাপড় দিলে পরিচিতদের সামনে বলত, “ওই লোকটাকে আমি কাপড় দিয়েছি।”
কেউ ঋণ চাইলে সাহায্য করার আগে বলত, “তুমি জানো, আমি না থাকলে তোমাকে কে সাহায্য করত?”

সে মনে করত, নিজের দানের কথা মানুষকে জানানোতে তার সম্মান বাড়ে।

একদিন বাজারে এক বৃদ্ধ এসে তার দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধের পোশাক পুরোনো, পায়ে ধুলো, মুখে ক্লান্তির ছাপ। তিনি আস্তে করে বললেন, “বাবা, কয়েকদিন ধরে ঘরে খাবার নেই। সামান্য কিছু খাবার দিলে আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন।”

সালেহ দোকানের ভেতর থেকে কিছু খাবার এনে বৃদ্ধের হাতে দিল। তারপর জোরে বলল, “সবাই শুনে রাখো, আমি আজ এই বৃদ্ধকে খাবার দিলাম।”

বৃদ্ধের মুখ সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। বাজারের কয়েকজন মানুষ তাকাল। সালেহ আবার বলল, “এমন মানুষদের তো সাহায্য করতেই হয়।”

বৃদ্ধ কোনো কথা না বলে খাবার নিয়ে চলে গেলেন। দূর থেকে বাহলুল (রহ.) ঘটনাটি দেখছিলেন। তিনি কিছু বললেন না। পরদিন সালেহ আবার এক দরিদ্র যুবককে কিছু টাকা দিল।

কিন্তু এবারও সে আশেপাশের লোকদের বলল, “এই ছেলেটার অনেক কষ্ট। আমি তাকে সাহায্য করছি।” যুবকটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

বাহলুল (রহ.) এবার সালেহের কাছে গেলেন। বললেন, “তুমি মানুষকে সাহায্য করছ?”
সালেহ গর্ব করে বলল, “জি। যতটুকু পারি করি।”
বাহলুল (রহ.) বললেন, “ভালো কাজ।”
সালেহ হাসল। “আপনি তো জানেন, আমি অনেক মানুষকে সাহায্য করি।”
বাহলুল (রহ.) বললেন, “আমি জানি না।”
সালেহ অবাক হলো। “কেন?”
“কারণ তুমি যাদের সাহায্য করেছ, তাদের মুখে তো শুনিনি। তোমার মুখেই শুনেছি।”
সালেহ কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ল।

বাহলুল (রহ.) বললেন, “একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দেওয়া ভালো। কিন্তু তার ক্ষুধার সঙ্গে তার লজ্জাকেও যদি মানুষের সামনে প্রকাশ করে দাও, তাহলে তুমি কি তার বোঝা কমালে, নাকি আরেকটি বোঝা বাড়ালে?”

সালেহ চুপ করে গেল। বাহলুল (রহ.) বললেন, “দানের সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো—যে হাতে দেওয়া হয়, সেই হাতের চেয়ে যে হৃদয়ে দেওয়া হয়, সেটি যেন বড় হয়।”

সালেহ বলল, “কিন্তু মানুষ জানলে তো অন্যরাও উৎসাহিত হবে।”
বাহলুল (রহ.) বললেন, “হ্যাঁ, প্রকাশ্যে ভালো কাজেরও স্থান আছে। কিন্তু প্রতিটি সাহায্যকে নিজের প্রশংসার মাধ্যম বানানো ভালো নয়। বিশেষ করে যার সাহায্য দরকার, তার সম্মান যেন তোমার দানের বিনিময়ে বিক্রি না হয়ে যায়।”

এই কথাটি সালেহের মনে লাগল। কিন্তু সে পুরোপুরি বদলাতে পারল না। কয়েকদিন পর তার দোকানে এক বিধবা নারী এলেন। সঙ্গে ছিল ছোট একটি শিশু। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, “আমার কিছু চাল দরকার।” সালেহ চাল দেওয়ার জন্য কর্মচারীকে ডাকল।

তারপর বলল, “এই মহিলার স্বামী নেই। আমি তাকে সাহায্য করছি।”
নারীর চোখে পানি চলে এল। তিনি বললেন, “ভাই, দয়া করে কাউকে বলবেন না।”
সালেহ থেমে গেল। বাহলুল (রহ.)-এর কথা তার মনে পড়ল।

সে বুঝতে পারল, নারীটি সাহায্য চাওয়ার চেয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ পাওয়াকে বেশি ভয় করছেন। সালেহ আস্তে করে বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না।” সে দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে খাবারের বস্তা পাঠিয়ে দিল। কেউ কিছু জানল না।

নারীটি চলে যাওয়ার পর সালেহ প্রথমবার মনে এমন এক আনন্দ অনুভব করল, যা আগে কখনো অনুভব করেনি।

কেউ তাকে প্রশংসা করেনি।
কেউ বলেনি, “সালেহ খুব দয়ালু।”
কেউ তার দিকে তাকিয়ে বাহবা দেয়নি।
তবু তার হৃদয় শান্ত ছিল।

সে ভাবল, “আজ আমি কাউকে সাহায্য করলাম, কিন্তু আমার নাম কোথাও এল না। তবু কেন এত ভালো লাগছে?”

সেদিন সন্ধ্যায় সে বাহলুল (রহ.)-এর কাছে গেল। বলল, “আজ আমি আপনার কথার অর্থ কিছুটা বুঝেছি।” বাহলুল (রহ.) বললেন, “কী বুঝেছ?”

“যখন আমি সাহায্য করতাম আর সবাই জানত, তখন আমি মানুষের প্রশংসা পেতাম। কিন্তু আজ কাউকে না জানিয়ে সাহায্য করেছি। তখন মনে হলো, আমি যেন সত্যিই কারও উপকার করেছি।”

বাহলুল (রহ.) বললেন, “মানুষের প্রশংসা না থাকলে যদি ভালো কাজের আনন্দ চলে যায়, তাহলে নিজের নিয়ত পরীক্ষা করা দরকার।”

সালেহ বলল, “তাহলে কি কাউকে সাহায্য করার পর কখনো বলা যাবে না?”

বাহলুল (রহ.) বললেন, “বিষয়টি শুধু বলা বা না বলার নয়। প্রশ্ন হলো—তোমার হৃদয় কী চায়? মানুষের প্রশংসা, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টি?”

সালেহ মাথা নিচু করল। এরপর সে নিজের আচরণ বদলাতে শুরু করল। একদিন এক দরিদ্র কর্মচারীর মেয়ের বিয়ে ঠিক হলো। বিয়ের খরচের জন্য তার অনেক টাকা দরকার। সে লজ্জায় কারও কাছে চাইতে পারছিল না। সালেহ বিষয়টি জানতে পারল।

সে কর্মচারীকে ডেকে বলল, “তোমার যতটুকু প্রয়োজন, আমি ব্যবস্থা করব।”
কর্মচারী বলল, “কিন্তু আমি কীভাবে টাকা শোধ করব?”
সালেহ বলল, “তোমাকে শোধ করতে হবে না।”
কর্মচারীর চোখে পানি এসে গেল। সে বলল, “আমি আপনার জন্য দোয়া করব।”

সালেহ বলল, “আমার জন্য দোয়া করার দরকার নেই। শুধু মনে রেখো, কখনো তুমি কাউকে সাহায্য করার সুযোগ পেলে তাকে সাহায্য করবে।”

কর্মচারী বলল, “আমি অবশ্যই করব।” এই কথাটি শুনে সালেহ বুঝল—একটি সাহায্য তখনই সুন্দর হয়, যখন সেটি শুধু একজনের সমস্যা সমাধান করে না, বরং ভালো কাজের একটি ধারাও তৈরি করে।

কয়েক মাস পর বাজারে সবাই লক্ষ্য করল, সালেহ বদলে গেছে। আগে সে সাহায্য করলে সবাইকে জানাত। এখন সে এমনভাবে সাহায্য করে, যেন সে কিছুই করেনি।

আগে দরিদ্র মানুষ দোকানে এলে তাদের সামনে প্রশ্ন করত, “কত টাকা আছে?”

এখন সে অনেক সময় চুপচাপ প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে দিত। আগে কেউ সাহায্য চাইলে তার অসহায়ত্ব নিয়ে কথা বলত। এখন সে চেষ্টা করত, যেন সাহায্য নেওয়া মানুষটি নিজেকে ছোট মনে না করে।

একদিন সেই বৃদ্ধ লোকটি আবার তার দোকানে এলেন, যাকে সালেহ একসময় সবার সামনে খাবার দিয়েছিল। বৃদ্ধ তাকে দেখে বললেন, “বাবা, তোমার দোকানের সামনে দাঁড়াতে আমার আগে লজ্জা লাগত।”

সালেহের বুক কেঁপে উঠল। সে বলল, “কেন?”
বৃদ্ধ বললেন, “কারণ সেদিন তুমি আমাকে খাবার দিয়েছিলে, কিন্তু সবাই জেনে গিয়েছিল যে আমি ক্ষুধার্ত।”
সালেহ মাথা নিচু করল। “আমি ভুল করেছিলাম।”
বৃদ্ধ বললেন, “কিন্তু আজ তোমার দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে অনেক মানুষ খাবার পায়। কেউ তাদের দেখে না।”

সালেহ অবাক হয়ে বলল, “আপনি কীভাবে জানলেন?”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “যে মানুষ ক্ষুধার্ত, সে সাহায্যের পথ চিনতে পারে।”
সালেহের চোখে পানি এসে গেল। সে বলল, “চাচা, সেদিন যদি আপনি আমাকে এই কথা বলতেন, হয়তো আমি বুঝতাম না। আজ বুঝতে পারছি।”
বৃদ্ধ বললেন, “মানুষ যখন অভাবের মধ্যে থাকে, তখন তার শুধু খাবার নয়, সম্মানও দরকার।”

এই কথাটি সালেহ কখনো ভুলল না। কিছুদিন পর এক যুবক তার কাছে এসে বলল, “আমি একটি কথা জানতে চাই।” “বল।”

“আপনি এখন সাহায্য করেন, কিন্তু কাউকে জানান না কেন?”

সালেহ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “কারণ আমি একসময় ভুল করতাম। আমি ভাবতাম, আমি একজন মানুষকে সাহায্য করছি। পরে বুঝলাম, অনেক সময় আমি সাহায্যের সঙ্গে তার কষ্টটাকেও প্রকাশ করে দিচ্ছি।”

যুবক বলল, “তাহলে সাহায্য করার সঠিক পদ্ধতি কী?”
সালেহ বলল, “যার প্রয়োজন, তাকে এমনভাবে সাহায্য করো যেন সে তোমার কাছে ঋণী হয়ে নিজেকে ছোট মনে না করে।”
যুবক বলল, “আর যদি সে সাহায্যের কথা সবাইকে বলে?”
সালেহ বলল, “সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু আমি যেন নিজের দানের প্রচার না করি।”
যুবক বলল, “আপনি কি এখনো আগের মতো দান করেন?”
সালেহ বলল, “আগের চেয়েও বেশি।” “কিন্তু কেউ জানে না?” “জানার দরকার নেই।”

একদিন বাহলুল (রহ.) তাকে বললেন, “সালেহ, তোমার সম্পদ কি কমে গেছে?”

সালেহ বলল, “না।”
“তোমার ব্যবসা?”
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
“তাহলে তোমার মুখে আগের গর্ব নেই কেন?”

সালেহ মৃদু হেসে বলল, “আগে আমি ভাবতাম, আমার টাকা দিয়ে মানুষকে সাহায্য করি। এখন বুঝি, আল্লাহ আমার হাতে সম্পদ দিয়েছেন, আর তিনি দেখছেন আমি সেটি কীভাবে ব্যবহার করি।”

বাহলুল (রহ.) বললেন, “এই বোঝাপড়াই মানুষকে দানের সৌন্দর্য শেখায়।”
সালেহ বলল, “আমি আরও একটি জিনিস শিখেছি।”
“কী?”

“গরিব মানুষের ঘরে খাবার না থাকা যেমন কষ্ট, তেমনি মানুষের সামনে নিজের অভাব প্রকাশ পাওয়াও কষ্ট। তাই সাহায্য করার সময় তার পেটের পাশাপাশি তার মর্যাদার কথাও ভাবতে হয়।”

বাহলুল (রহ.) বললেন, “আল্লাহ তোমাকে এই শিক্ষা ধরে রাখার তাওফিক দিন।”

সময়ের সঙ্গে সালেহের সম্পদ আরও বাড়ল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার দান যত বাড়ল, তার নিজের নাম তত কম শোনা গেল।

বাজারে অনেকেই জানত না, কার বাড়িতে রাতে খাবার পৌঁছে যায়। অনেকেই জানত না, কোন বিধবার ঘরের ভাড়া কে দেয়। কেউ জানত না, কোন এতিম শিশুর পড়াশোনার খরচ কে বহন করে। সালেহ এসব নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা করত না।

একদিন তার এক পুরোনো বন্ধু বলল, “তুমি তো আগে সাহায্য করলে সবাইকে জানাতে। এখন এত কিছু করেও চুপ থাকো কেন?”

সালেহ বলল, “আগে আমি মানুষের চোখে বড় হতে চাইতাম। এখন চাই, আল্লাহর কাছে আমার আমল কবুল হোক।”
বন্ধু বলল, “কিন্তু মানুষ তোমার ভালো কাজ জানবে না।”
সালেহ বলল, “মানুষ না জানলেও তো আল্লাহ জানেন।” বন্ধু আর কোনো কথা বলল না।

সেদিন রাতে সালেহ একা বসে নিজের পুরোনো দিনের কথা মনে করল। সে মনে মনে বলল, “হে আল্লাহ, আমি কতবার ভালো কাজ করে তার বিনিময়ে মানুষের প্রশংসা চেয়েছি! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার অন্তরকে এমন করুন, যেন কারও উপকার করে নিজের নাম ভুলে যেতে পারি।” তার চোখে পানি এসে গেল।

এই গল্প আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়—**দান শুধু অর্থ দেওয়ার নাম নয়; দান করার সময় মানুষের সম্মান রক্ষা করাও একটি নৈতিক দায়িত্ব।**

কেউ আপনার কাছে সাহায্য চাইলে তাকে এমনভাবে সাহায্য করুন, যেন সে মনে না করে যে তার দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া হচ্ছে।

কেউ আপনার কাছ থেকে ঋণ নিলে তাকে বারবার মনে করিয়ে দেবেন না।
কেউ আপনার দানে উপকৃত হলে তার সামনে নিজের দানের কথা বলে তাকে ছোট করবেন না।
কেউ অভাবের কথা আপনাকে বিশ্বাস করে বললে সেটিকে অন্যের আলোচনার বিষয় বানাবেন না।

কারণ একজন মানুষ যখন সাহায্য নিতে আসে, তখন সে হয়তো নিজের জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্ত নিয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

সে শুধু আপনার টাকা বা খাবার চায় না—সে চায়, তার সম্মানটুকুও যেন বেঁচে থাকে। আর একজন সত্যিকারের দানশীল মানুষ সেই সম্মানটুকু রক্ষা করে।

আমরা অনেক সময় দান করার পর মনে করি, “আমি তাকে সাহায্য করেছি।” কিন্তু আরও সুন্দর চিন্তা হলো—**“আল্লাহ আমাকে তার সাহায্য করার সুযোগ দিয়েছেন।”**

এই একটি চিন্তা মানুষের অন্তর থেকে অহংকার কমিয়ে দেয়। কারণ সম্পদ আমাদের নিজের শক্তির প্রমাণ নয়। আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। আজ আমরা সাহায্য করছি, কাল হয়তো আমরাই কারও সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করতে পারি।

তাই কাউকে সাহায্য করার সময় কখনো নিজেকে তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা উচিত নয়।
**হয়তো আজ আপনি দিচ্ছেন, কিন্তু আল্লাহর কাছে কে বেশি মর্যাদাবান—তা আপনি জানেন না।**

শেষ কথা হলো—**এমনভাবে দান করুন, যাতে আপনার হাতের দান একজন মানুষের জীবন সহজ করে, কিন্তু আপনার মুখের কথা তার হৃদয় ভারী না করে।**

যে দান মানুষের সম্মান কেড়ে নেয়, তার চেয়ে সেই সাহায্য সুন্দর—যার কথা দাতা ভুলে যায়, কিন্তু উপকার পাওয়া মানুষটি সারা জীবন মনে রাখে।

**সত্যিকারের দানশীল সে নয়, যে নিজের দানের গল্প সবাইকে শোনায়; সত্যিকারের দানশীল সে, যে কাউকে সাহায্য করে এবং মনে রাখে—আমি দাতা নই, আমি শুধু আল্লাহর দেওয়া সম্পদের একজন আমানতদার।**

 #নূহ (আ.)-এর জাতির মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে বিভিন্ন উপাস্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, তখন তাদের এই ভুল শুধু একজন মানুষের ভুল ...
02/09/2026

#নূহ (আ.)-এর জাতির মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে বিভিন্ন উপাস্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, তখন তাদের এই ভুল শুধু একজন মানুষের ভুল ছিল না। ধীরে ধীরে সেই ভুল একটি সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। এক প্রজন্ম যা করেছিল, পরের প্রজন্মও তা-ই শিখেছিল। তারপর তার পরের প্রজন্মও একই পথে চলেছিল। এভাবে একটি মিথ্যা বিশ্বাস মানুষের কাছে এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছিল যে, একসময় তারা সেটিকে সত্য মনে করতে শুরু করেছিল।

তাদের সমাজে কিছু মূর্তি ও উপাস্যের নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছিল। কুরআনে নূহ (আ.)-এর জাতির কয়েকটি উপাস্যের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—ওয়াদ্দ, সুওয়া‘, ইয়াগূস, ইয়াউক ও নাসর।

এই নামগুলো তাদের কাছে শুধু কিছু মূর্তির নাম ছিল না। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, সামাজিক রীতি এবং প্রচলিত বিশ্বাস।

ফলে কেউ যখন এসে বলল, “এগুলো ছেড়ে এক আল্লাহর ইবাদত করো,” তখন তারা শুধু একটি ধর্মীয় মতামত শুনল না; তারা মনে করল, তাদের পুরো ঐতিহ্যকে আক্রমণ করা হচ্ছে।

আর এখানেই নূহ (আ.)-এর দাওয়াতের সামনে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি তৈরি হলো।

# # পূর্বপুরুষের পথই কি সবসময় সত্য?

নূহ (আ.) তাঁদের বললেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য উপাস্য নেই।” কিন্তু মানুষ প্রশ্ন করল না—“কেন?”

তারা নিজেদের বিবেককে জিজ্ঞেস করল না—“আমরা যাদের সামনে মাথা নত করছি, তারা কি সত্যিই আমাদের কোনো উপকার করতে পারে?”
তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল না—“এই বিশাল সৃষ্টি কে সৃষ্টি করেছেন?”

বরং তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের পথ আঁকড়ে ধরল। এটি মানুষের একটি পুরোনো দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় কোনো বিষয়কে সত্য মনে করি শুধু এই কারণে যে, “আমাদের পরিবারে এমনই চলে এসেছে।”

কোনো কাজ ভুল হলেও আমরা বলি, “আমাদের বাপ-দাদারাও তো এটা করতেন।” কোনো প্রথা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও বলি, “এটা তো আমাদের বহুদিনের রীতি।”

কিন্তু নূহ (আ.)-এর জাতির ঘটনা আমাদের শেখায়—**কোনো বিশ্বাস বহু পুরোনো হলেই তা সত্য হয়ে যায় না।**

সত্যকে সত্য হতে হলে তার ভিত্তি সত্য হতে হবে।

# # নেতারা যখন মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়

নূহ (আ.)-এর জাতির সাধারণ মানুষদের অনেকেই নিজেদের সমাজের নেতাদের অনুসরণ করত। কুরআনে তাদের সম্পর্কে এমন কথাও এসেছে যে, তারা তাদের নেতাদের অনুসরণ করেছিল এবং সেই নেতারা তাদের আরও বেশি পথভ্রষ্ট করেছিল।

এখানে বিষয়টি খুব গভীর। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো সবকিছু নিজে যাচাই করতে পারে না। সে সমাজের জ্ঞানী, বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করে।

এটি স্বাভাবিক। কিন্তু বিপদ তখন শুরু হয়, যখন একজন মানুষ নিজের বিবেক ও সত্য যাচাইয়ের ক্ষমতা পুরোপুরি অন্যের হাতে তুলে দেয়।

তখন সে আর প্রশ্ন করে না। সে শুধু অনুসরণ করে। নেতা যেদিকে যায়, সেদিকেই যায়। সমাজ যেটাকে সত্য বলে, সেটাকেই সত্য মনে করে। সবাই যে কাজ করে, সে-ও সেটাই করে।

কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কেন এটা করছ?”
সে উত্তর দেয়—“সবাই তো করে।”

“আমাদের বড়রা এমনই করেছেন।”
“আমাদের সমাজে এটাই নিয়ম।”

কিন্তু সত্যের প্রশ্নে এই উত্তর যথেষ্ট নয়।

# # নূহ (আ.) মানুষকে নিজের চোখে দেখতে শেখালেন

নূহ (আ.) তাঁদের শুধু মূর্তি ছেড়ে দিতে বলেননি। তিনি মানুষকে আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান করেছিলেন।

তিনি আকাশের দিকে তাকাতে বললেন। চাঁদের দিকে তাকাতে বললেন। সূর্যের দিকে তাকাতে বললেন। পৃথিবীর দিকে তাকাতে বললেন। মানুষের নিজের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে বললেন।

অর্থাৎ তিনি যেন মানুষকে বলছিলেন—“তোমরা শুধু অন্যের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিও না। নিজের চোখে আল্লাহর নিদর্শন দেখো। নিজের বুদ্ধি দিয়ে চিন্তা করো। তারপর সিদ্ধান্ত নাও।”

এখানে নূহ (আ.)-এর দাওয়াতের একটি অসাধারণ দিক প্রকাশ পায়।
**ইসলাম মানুষকে চিন্তাহীন অনুসারী হতে শেখায় না; বরং আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে শেখায়।**

# # একটি মূর্তি কি সত্যিই কিছু করতে পারে?

ভাবুন, একজন মানুষ নিজের হাতে একটি মূর্তি তৈরি করল। সে মাটি, পাথর কিংবা কাঠ ব্যবহার করে সেটিকে আকৃতি দিল। তারপর সেই মূর্তির সামনে খাবার রাখল। তার কাছে সাহায্য চাইল। ভয় পেল। প্রার্থনা করল।

কিন্তু একটি সহজ প্রশ্ন সে করল না—“যে জিনিসটি আমি নিজেই তৈরি করেছি, সেটি কীভাবে আমার সৃষ্টিকর্তা হতে পারে?”

নূহ (আ.) মানুষকে এই মৌলিক সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনছিলেন। তাঁর জাতির সমস্যা ছিল না যে তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানত না। বরং তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যদের শরিক করেছিল এবং নিজেদের বানানো উপাস্যদের নিয়ে এমন বিশ্বাস গড়ে তুলেছিল, যা তাদের সত্য থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছিল।

নূহ (আ.) তাদের সেই ভুল চিন্তার ভিত্তি ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন।

# # একটি ভুল যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে

একজন বৃদ্ধ তার সন্তানকে একটি ভুল শিক্ষা দিল। সন্তান সেটি গ্রহণ করল। তারপর সে নিজের সন্তানকে একই শিক্ষা দিল। নাতিও সেটি গ্রহণ করল। এভাবে একসময় সবাই বলল—“এটাই তো আমাদের ঐতিহ্য।”

কিন্তু কেউ আর জানল না, সেই ঐতিহ্যের শুরু কোথায় এবং তার ভিত্তি কী। এটাই অন্ধ অনুসরণের বিপদ।

একটি মিথ্যা কথা বারবার বলা হলে তা সত্য হয়ে যায় না।
একটি ভুল কাজ বহু মানুষ করলে তা সঠিক হয়ে যায় না।
একটি অন্যায় প্রথা শত বছর চললেও তা ন্যায় হয়ে যায় না।

সত্যের মাপকাঠি মানুষের সংখ্যা নয়। সত্যের মাপকাঠি হলো আল্লাহর নির্দেশ।

# # নূহ (আ.)-এর সামনে সবচেয়ে কঠিন কাজ

নূহ (আ.) যখন তাঁর জাতিকে বললেন, “তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে এসো,” তখন তিনি শুধু কয়েকজন মানুষের অভ্যাস পরিবর্তন করতে বলছিলেন না।

তিনি এমন একটি সমাজকে পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছিলেন, যার ভুল বিশ্বাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।

তিনি এমন একটি ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা মানুষের কাছে এতটাই পরিচিত ছিল যে, তারা সেটিকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মনে করত। এ কারণে তাঁর কাজ ছিল অত্যন্ত কঠিন।

কিন্তু নূহ (আ.) জানতেন, কঠিন হওয়া মানেই অসম্ভব নয়। তিনি সত্যের দাওয়াত থেকে পিছিয়ে যাননি।

# # আমরা আজ কীভাবে অন্ধ অনুসরণ করি?

নূহ (আ.)-এর জাতির ঘটনা শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়। এর শিক্ষা আজও আমাদের জীবনে প্রযোজ্য। আমরা হয়তো মূর্তির সামনে দাঁড়াই না।

কিন্তু আমরা কি মানুষের মতামতের সামনে নিজের বিবেককে বিসর্জন দিই না?
কেউ জনপ্রিয় বলে তার কথা সত্য ধরে নিই না?
কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি কিছু বললে যাচাই না করেই বিশ্বাস করি না?
কোনো সমাজে সবাই একটি কাজ করলে আমরা কি ধরে নিই না যে সেটি অবশ্যই ঠিক?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো কথা বহু মানুষ শেয়ার করলে আমরা কি যাচাই না করেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নিই?

এগুলোও অন্ধ অনুসরণের আধুনিক রূপ হতে পারে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে শুনবে, চিন্তা করবে, যাচাই করবে এবং সত্য হলে গ্রহণ করবে।

# # বাবা-মাকে সম্মান করা আর অন্ধভাবে অনুসরণ করা এক নয়

ইসলাম বাবা-মাকে সম্মান করতে বলেছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করতে বলেছে। জ্ঞানীদের মর্যাদা দিতে বলেছে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ বড় হলেই তার প্রতিটি কথা সত্য হয়ে যাবে। যদি কোনো মানুষ আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহ্বান করে, সেখানে তার আনুগত্য করা যাবে না।
কারণ সৃষ্টিকর্তার অবাধ্যতা করে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যায় না।
এখানে সম্মান এবং আনুগত্যের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।

আপনি আপনার বাবা-মাকে সম্মান করবেন।
আপনি আপনার শিক্ষককে সম্মান করবেন।
আপনি আপনার বয়োজ্যেষ্ঠকে সম্মান করবেন।

কিন্তু সত্যের ব্যাপারে চূড়ান্ত মাপকাঠি হবে আল্লাহর নির্দেশ।

নূহ (আ.)-এর জাতির অনেক মানুষ এই পার্থক্য বুঝতে পারেনি। তারা পূর্বপুরুষের পথকে এতটাই আঁকড়ে ধরেছিল যে, আল্লাহর আহ্বানও তাদের সেই বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পারেনি।

# # একজন মুমিনের সাহস কোথায়?

সত্যের পথে চলতে কখনো কখনো একা হতে হয়। আপনার পরিবার অন্য কিছু বিশ্বাস করতে পারে। আপনার বন্ধুরা অন্য পথে যেতে পারে। আপনার সমাজ কোনো ভুল প্রথাকে স্বাভাবিক মনে করতে পারে। আপনি তখন যদি সত্য বুঝতে পারেন, আপনার সামনে দুটি পথ থাকে।

একটি হলো—“সবাই যেহেতু করছে, আমিও করব।”
অন্যটি হলো—“সবাই করলেও যদি এটি ভুল হয়, আমি তা ছেড়ে দেব।”

দ্বিতীয় পথটি কঠিন। কিন্তু একজন মুমিনের সাহস এখানেই। সে মানুষের ভয়ে সত্য ছাড়ে না। সে নিজের পূর্বের ভুলকে শুধু পুরোনো বলে আঁকড়ে ধরে রাখে না।

সে বলতে পারে—**“আমি এতদিন ভুল পথে ছিলাম। আজ সত্য বুঝেছি, তাই আমি ফিরে আসছি।”**

এই একটি বাক্য একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

# # ভুল স্বীকার করা কেন এত কঠিন?

কারণ মানুষ নিজের অতীতের সঙ্গে মানসিকভাবে জড়িয়ে থাকে। সে ভাবে— “আমি এত বছর ধরে এটা করেছি, তাহলে কি এতদিন ভুল ছিলাম?”

হ্যাঁ, মানুষ ভুল করতে পারে। কেউ দশ বছর ভুল করতে পারে। কেউ বিশ বছর ভুল করতে পারে। কেউ তার পুরো যৌবন ভুল পথে কাটিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু সত্য বুঝে ফিরে আসা কখনো লজ্জার নয়। লজ্জা হলো—সত্য বুঝেও অহংকারের কারণে ভুল পথে থাকা।

নূহ (আ.)-এর জাতির মানুষ যদি সত্য গ্রহণ করত, তাহলে তাদের পূর্বপুরুষের পথ ছেড়ে আসতে হতো।

তাদের নিজেদের সামাজিক অবস্থান বদলাতে হতো। কিন্তু সত্যের সামনে এই পরিবর্তনই ছিল তাদের জন্য কল্যাণের পথ।

# # নেতাকে নয়, সত্যকে অনুসরণ করুন

এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—**মানুষকে অনুসরণ করার আগে দেখুন, সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।**

একজন বক্তা জনপ্রিয় হতে পারেন।
একজন নেতা ক্ষমতাবান হতে পারেন।
একজন আলেম সম্মানিত হতে পারেন।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অভিজ্ঞ হতে পারেন।
কিন্তু প্রত্যেক মানুষই ভুল করতে পারে।

তাই ব্যক্তিকে ভালোবাসুন, সম্মান করুন, তার ভালো কথা গ্রহণ করুন—কিন্তু সত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে কোনো মানুষকে বসাবেন না।

যে কথা কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গ্রহণ করুন। যে কথা তার বিরোধী, তা প্রত্যাখ্যান করুন—যদিও বক্তা কত বড় ব্যক্তি হন। এটাই মুমিনের ভারসাম্য।

# # নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ সংগ্রামের আরেকটি শিক্ষা

নূহ (আ.) তাঁর জাতির মানুষের কাছে বছরের পর বছর সত্য পৌঁছে দিয়েছেন।

তাঁর সামনে ছিল পুরোনো বিশ্বাস। ছিল সামাজিক চাপ। ছিল নেতাদের বিরোধিতা। ছিল মানুষের জেদ। ছিল পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুসরণ। তারপরও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন।

এখানে আমাদের জন্য একটি অসাধারণ শিক্ষা আছে—**সত্যের পথে কাজ করার সময় শুধু বাইরের শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে হয় না; মানুষের ভেতরের অভ্যাস, অহংকার ও অন্ধ অনুসরণের সঙ্গেও লড়াই করতে হয়।**

কাউকে শুধু নতুন তথ্য দিলেই সে বদলে যাবে না। তার পুরোনো চিন্তার কাঠামো ভাঙতে হবে। তাকে চিন্তা করতে শেখাতে হবে। তাকে প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। তাকে সত্যের কাছে বিনয়ী হতে শেখাতে হবে।

# # আজ নিজের কাছে তিনটি প্রশ্ন করুন

প্রথম প্রশ্ন—**আমি কি কোনো বিষয় শুধু এই কারণে সত্য মনে করি যে, আমার পরিবার বা সমাজে তা বহুদিন ধরে চলে আসছে?**

দ্বিতীয় প্রশ্ন—**আমি কি কোনো ব্যক্তির কথা যাচাই না করে শুধু তার জনপ্রিয়তা বা মর্যাদার কারণে বিশ্বাস করি?**

তৃতীয় প্রশ্ন—**আমি যদি জানতে পারি যে এতদিনের কোনো বিশ্বাস ভুল ছিল, তাহলে কি আমি সত্য গ্রহণ করার সাহস রাখি?**

এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর একজন মানুষের নিজের অবস্থান সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে।

নূহ (আ.)-এর জাতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—তারা সত্যের সামনে দাঁড়িয়েও নিজেদের পুরোনো বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিল।

তারা নিজেদের নেতাদের অনুসরণ করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, সত্য তাদের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থিত হওয়ার পরও তারা ফিরে আসতে পারেনি।

তাই আমাদের উচিত নিজের হৃদয়কে এমনভাবে গড়ে তোলা, যেন সত্য আমাদের বিপক্ষে গেলেও আমরা সত্যকে গ্রহণ করতে পারি।

কারণ একজন সত্যিকারের মুমিনের পরিচয় হলো না যে সে কখনো ভুল করবে না। বরং তার পরিচয় হলো—**ভুল বুঝতে পারলে সে ফিরে আসবে।**

মানুষের কথা পুরোনো হতে পারে। কোনো প্রথা পুরোনো হতে পারে। কোনো সামাজিক রীতি বহু প্রজন্মের হতে পারে। কিন্তু সত্যের মূল্য তার বয়স দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সত্য হলো সত্য—যদিও পৃথিবীর সবাই তা প্রত্যাখ্যান করে।
আর মিথ্যা হলো মিথ্যা—যদিও পৃথিবীর সবাই তা অনুসরণ করে।

নূহ (আ.)-এর জীবন আমাদের তাই শেখায়—

**বড়দের সম্মান করো, কিন্তু সত্যের বিচার তাদের হাতে তুলে দিও না।**
**সমাজকে সম্মান করো, কিন্তু সমাজের ভুলকে সত্য বানিয়ে দিও না।**
**পূর্বপুরুষকে ভালোবাসো, কিন্তু তাদের ভুলকে ধর্ম বানিয়ে নিও না।**

আর যখন আল্লাহর সত্য তোমার সামনে স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থেকো না। সত্যের দিকে ফিরে এসো।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ তোমার পাশে থাকল কি না, সেটিই আসল প্রশ্ন নয়।

আসল প্রশ্ন হলো—**তুমি সত্যের পাশে ছিলে কি না।**

Address

Joypur

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Pure Story Hub posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Pure Story Hub:

Shortcuts

Share