02/06/2026
মানুষের জীবন শুধু জন্ম, শিক্ষা, কর্মজীবন আর সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সম্পর্ক, ভালোবাসা, যত্ন আর পারস্পরিক দায়িত্ববোধ। আমরা পরিবার নামের যে প্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করি, সেই পরিবারের ভেতরেই কখনও কখনও তৈরি হয় এমন এক নীরব দূরত্ব, যা মানুষের জীবনের শেষ প্রান্তকে করে তোলে অসহনীয় নিঃসঙ্গ।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সবসময় অর্থ, পদমর্যাদা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা নয়; অনেক সময় তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন একজন মানুষের উপস্থিতি, একটি খোঁজ নেওয়ার ফোনকল, একটি দরজায় কড়া নাড়া শব্দ কিংবা পাশে বসে কিছুক্ষণ কথা বলার লোক। প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম বাড়িয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারেনি। আমাদের সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানবিক সম্পর্কের ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হয়ে ওঠার একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি হচ্ছে এই ঘটনা।
গতকাল মিরপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মৃত্যুর পর কতদিন তিনি সেখানে পড়ে ছিলেন, কখন শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে কাকে ডাকতে চেয়েছিলেন, কেউ নির্দিষ্ট করে জানে না। জীবনের শেষ অধ্যায়ে তিনি এতটাই একা ছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর খবরও পৃথিবী জেনেছে তিনি চলে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পরে।
তাঁর এক ছেলে যুগ্নসচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, আরেকজন কানাডায় প্রতিষ্ঠিত। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, একই ফ্ল্যাটে নাকি তার মেয়েও থাকতেন। কিন্তু এতদিন ধরে মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি বুঝতেই পারেননি।
জানা গেছে, মা ও মেয়ে আলাদা রুমে থাকতেন। ফ্ল্যাটটি মূলত ওই বৃদ্ধার মেয়ের। তারা মা-মেয়ে দুজনেই ওই বাসায় একা থাকতেন এবং সেখানে কোনো পুরুষ মানুষ ছিল না। নিউজ এর তথ্য অনুযায়ী ভদ্রমহিলার মেয়ের হাজবেন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন এবং তিনি কয়েক বছর আগে মারা যান।
দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধার ঘরটি ছিল অস্বাস্থ্যকর ও মানুষের বসবাসের অনুপযোগী। গত রোববার মেয়ে মাকে ডাকতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে মা অসুস্থ ভেবে একজন নার্সকে নিয়ে আসেন। নার্স রুমে প্রবেশ করে দেখতে পান, বৃদ্ধা অনেক আগেই মারা গেছেন এবং মরদেহে পচন ধরে গেছে। পরে স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটির কিছু দিক তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। বিশেষ করে, একই বাসায় থেকেও মেয়ে কীভাবে এতদিন কোনো গন্ধ বা অস্বাভাবিকতা টের পেলেন না, সেটি তদন্তের বিষয়।
ভদ্রমহিলার সন্তানেরা শিক্ষায়, পদমর্যাদায়, সামাজিক পরিচয়ে হয়তো সফল। কিন্তু একজন মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি এমন নিঃসঙ্গ, অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকেন, তাহলে সেই সাফল্যের মূল্য কতটুকু? আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছি, যেখানে বাবা-মায়ের জন্য সময় রাখা যায় না। নিয়মিত খোঁজ নেওয়া যায় না। তাদের একাকীত্ব, অসুস্থতা, ভয় কিংবা নিঃসঙ্গতার সঙ্গী হওয়া যায় না। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুর পরও সেই বৃদ্ধার পাশে কেউ ছিল না। যে মানুষটি হয়তো একসময় সন্তানের জ্বরের রাতে জেগে থেকেছেন, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে তাদের বড় করেছেন, তাঁর শেষ পরিণতি হলো একটি অগোছালো ও নোংরা কক্ষে আবদ্ধ জীবন।
নৈতিকতার আদালতে এই ঘটনাটির প্রভাব ব্যাপক। এখানে প্রশ্ন শুধু একজন বৃদ্ধার মৃত্যু নয়, প্রশ্ন আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের, আমাদের মানবিকতার, আমাদের দায়িত্ববোধের। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, একাকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সংখ্যাও বাড়ছে। অথচ আমরা নিজেদের সফলতার গল্পে এত ব্যস্ত যে, ঘরের কোণে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকানোর সময়ও যেন নেই।
একজন মা পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। কিন্তু তাঁর নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের সবার জন্য একটি প্রশ্ন রেখে গেল। আমরা কবে থেকে এত অমানবিক, এত অবিবেচক হয়ে গেলাম? আমরা না সমাজবদ্ধ জীব? ভদ্রমহিলার কি কোন আত্মীয়-স্বজনও ছিল না? তিনি কি ফোনও ব্যবহার করতেন না? ফোনেও কি তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগ রাখত না? মানুষ কি সত্যিই একা হয়ে মারা যায়, নাকি তার অনেক আগেই আমরা তাকে একা করে দিই?
মানুষের জীবনে শুধু আর্থিক সচ্ছলতা বা সামাজিক অবস্থানই যথেষ্ট নয়। অনেক সময় একই ছাদের নিচে থেকেও মানুষ ভয়াবহ একাকীত্ব, অবহেলা কিংবা মানসিক সংকটের মধ্যে জীবন কাটান। এই মৃত্যু কেবল একজন বৃদ্ধার মৃত্যু নয়। এটি আমাদের সমাজের একটি নীরব এবং বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি।
এটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যাদের আমরা ভালোবাসি, যাদের কাছে আমাদের অস্তিত্বের ঋণ, তারা যেন জীবিত অবস্থায়ই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে না যান। কারণ মৃত্যুর পর অনুশোচনা প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু জীবিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়। আল্লাহ মরহুমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাদের এমন পরিণতি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
তথ্যসূত্রঃ ঢাকা মেইল