14/05/2026
এমন আমি ঘর বেধেছি আহারে যার ঠিকানা নাই......
কেউ যদি জুনায়েদ আহমেদ পলককে তার বর্তমান ঠিকানা জিজ্ঞেস করে হয়ত তিনি বলবেন নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার সেরকোল তেলিগ্রামের কথা। কারণ ওখানেই জন্ম হয়েছিল বিরল চরিত্রের এই রাজনীতিবিদের। বিরল বলছি এ কারণে তিনি হচ্ছেন একমাত্র রাজনীতিবিদ কাম সাংসদ কাম মন্ত্রী যিনি প্রথম মেয়াদে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নেত্রীর বাসভবনের সামনে বসে পরেছিলেন। এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ওখানেই ছিলেন। বাংলাদেশ সংসদীয় ইতিহাসের কনিষ্ঠতম সদস্যের এখন আর কোন স্থায়ী ঠিকানা নেই। জেল-হাজতিদের স্থায়ী ঠিকানা থাকতে নেই এমনটাই তাদের ভাগ্য।
৭৭ মামলায় গ্রেফতার হয়ে এক কালের পরাক্রমশালী এই মন্ত্রীর দিন কাটে ইবাদত বন্দেগী, কোরান তেলাওয়াত ও লেখালেখি করে। মাঝে মধ্যে হাজিরা দিতে আদালতে আসেন। বোবা হয়ে তাকিয়ে থাকেন। প্রিজন ভ্যানের জানালা দিয়ে আকাশ দেখার চেষ্টা করেন। হয়ত অবচেতন মনে ফিরে যান ফেলে আসা দিনগুলোতে। কে যানে হয়ত আদালত পথের পথ ধরেই একদিন সৈন্য সামন্ত নিয়ে চলাফেরা করেছেন। চলাচল মসৃণ করতে হয়ত রাস্তার ট্রাফিক থেমে যেত। দলীয় বরকন্দাজের দল এক নজর দেখার জন্যে হয়ত চাতক পাখির মত অপেক্ষায় থাকতো। সে সব স্মৃতি আজ নিশ্চয় কষ্ট দেয় তাকে।
তিনি নিজকে এডভোকেট বলে দাবি করেন। স্ত্রী আরিফা জেসমিন ছিলেন নাটোরের সিংড়া সদরের দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। জীবন হয়ত চড়াই উৎরাই পাড় হয়ে চলে যাচ্ছিল কোন রকমে। মাথায় রাজনীতির পোকা ঢুকার পর হতেই শুরু হয় পালাবদলের পালা। ২০০৮ সালে পলকের ব্যাংকে ছিল ২০ হাজার টাকা। নগদ ছিল ৩০ হাজার আর সঞ্চয়পত্র ছিল ১৮ হাজার টাকার। স্ত্রীর অবস্থাও ছিল তথৈবচ!
একই সালে তার সম্পদ বলতে ছিল সর্বসাকুল্যে ১৫ শতক মাঠের জমি, ব্যাংকে ৫০ হাজার টাকা, নগদ ১০ হাজার টাকা, ১০ ভরি সোনা, ২৫ হাজার টাকা দামের একটি রেফ্রিজারেটর ও ১০ হাজার টাকা দামের একটি মোবাইল ফোন। এসব সম্পদের মালিকানা খোলাসা করেই মনোনয়ন তথা নির্বাচন বৈতরণী পার হয়েছিলেন।
এর পরের বার সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে বলেছিলেন। একজন 'সৎ' রাজনীতিবিদ ও প্রাথমিক স্কুল শিক্ষিকার আয় দিয়ে জীবন কত কষ্টে চলে তা নিয়ে চোখের পানিও ফেলেছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে প্রায় এক কোটি টাকার ১৪৪ ভরি সোনা, পাঁচটি কম্পিউটার, দু’টি এসি, দু’টি ফ্রিজ, তিনটি মোবাইল তিনি অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন এক কোটি ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৮৯৯ টাকার।
তবে মন্ত্রীর সততার জবাব দিয়েছিল তার আপন বড় ভাই নিজে। বড় ভাই জুবাইর আহমেদ নয়ন বলেছেন, হলফ-নামায় তার ছোট ভাই যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন তা বাস্তবের শত ভাগের এক ভাগও নয়। তিনি বলেন, একই পরিবারের মানুষ হয়েও আমি মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য আমার চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে পড়ুয়া মেধাবী মেয়ে ঋতি মৃত্তিকা নয়নকে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে না পারায় সে মারা গেছে।
স্ত্রী ছাড়াও মা, চাচা, শ্বশুর, শ্যালক ও তার ফাইভস্টার বাহিনীসহ অনুগত কর্মীদের নামে-বেনামে পলক শত শত বিঘা জমি কিনেছেন ও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। পলকের বড় ভাই জুবাইর আহমেদ নয়ন তার ভাইয়ের টেন্ডারবাজি, ৬৫০টি পুকুর দখল, চাকরি বাণিজ্য, কালো টাকা, হত্যা বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি কমিশন, খাসজমি বরাদ্দ বাণিজ্যসহ অসংখ্য অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং দখলবাজির বিষয়ে নিজের ও নিজের মারা যাওয়া মেয়ে ঋতি মৃত্তিকা নয়নের ছবিসহ ‘খাই খাই রাজনীতি আর কত দিন?’ শিরোনামে নাটোরে ব্যাপকভাবে পোস্টারিংও করেছেন।
বাস্তবতা হচ্ছে যুবরাজ সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিশ্বস্ত পার্টনার-ইন-ক্রাইম হওয়া সত্ত্বেও রানী মাতা পালানো আগে পলককে পালানোর বার্তা দিয়ে যাননি। দেশের আনাচে কানাচে লম্ফ জম্ফমান শত শত শেখদের সবাইকে আগ বাড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার নোটিশ দিলেও পলককে নিজের ভাবতে পারেননি পালের গোদা শেখ হাসিনা। স্বভাবতই জুনায়েদ পলক ঠাঁই পেয়েছেন জেল হাজতের চার দেয়ালে। যাদের জন্যে নিজের জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন তাদের একজন এখন দিল্লীর মেহমান আর অন্যজন ভার্জিনিয়ার অট্টালিকা-সম বাড়িতে অতিকায় এলস্যেসিয়ান কুকুরদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন।
এই লেখাটা লেখার তাগাদা অনুভব করতাম না যদি নবনীতা চৌধুরী ও বন্দনা কবির নামের আপার কতিপয় ভক্তের কিছু কথা ও লেখা না পড়তাম। নবনীতা চৌধুরী ইনিয়ে বিনিয়ে চিবিয়ে রবীন্দ্র আবেগ দিয়ে এমন সব কথা বলছেন যা শুনলে মনে হবে দেশে আওয়ামী ১৭ বছর কিছুই ঘটেনি। যা কিছু ঘটেছে তা ২৪'এর আন্দোলনে ও তার পরবর্তী দেড় বছরে। এসব কথা শুনে চুপ থাকাটা প্রায় অসম্ভব। পাল্টা কিছু বলতে গেলে হয়ত ভিডিও বানাতে হবে। কিন্তু এমন প্রতিভা তো আমার নেই। আর সময়ও একটা ফ্যাক্টর। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাসায় একটা কুকুর পালবো এবং কুকুরটার নাম রাখবো নবনীতা। আমার খুব পছন্দ এই নামটা।
পরিচিত প্রেম সম্রাজ্ঞী বন্দনা কবির আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে এমন কিছু কথা বলেছেন যা পড়ে না হেসে পারিনি।
পলাতকা আপা নতুন এক ভিডিওর মাধ্যমে জাতির কাছে ৬ মাস সময় চেয়েছেন। ৬ মাস পর দেশে ফিরছেন তিনি। এবং ফিরে সব 'অপরাধীদের' নাক খত দিয়ে জয়বাংলা শ্লোগান দিতে বাধ্য করবেন। কেবল নাকে খত! বন্দনাজীর গোস্বা এখানেই। গোস্বায় বলছেন, উনাকে দিয়ে কিছুই হবেনা! লগি-বৈঠার তাণ্ডব দেখতে চান এই প্রেম সম্রাজ্ঞী।
পলাতকা আপার ভক্তরা অপেক্ষায় আছেন। আশায় বুক বাধছেন। কারণে অকারণে এয়ারপোর্ট অবরোধ করার আহবান জানাচ্ছেন যাতে কেউ পালাতে না পারে। প্রিজন ভ্যানের ভেতর পলকের ম্রিয়মাণ চেহারাটা দেখে মনে পরে গেল আদালতে হাজিরা দিতে এসে তার জয়বাংলা শ্লোগান। আপার ৬ মাসের মিথ্যাচার আর ধান্ধায় দলের সহজ সরল সদস্যরা বিমোহিত হলেও নবনীতাদের জানা আছে আগামী বিশ বছর আওয়ামী লীগ এ দেশে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবেনা। ২০ বছর পর বেঁচে থাকলে শেখ হাসিনার বয়স হবে ১০০ বছরের উপর। ১০০ বছরের শেখ হাসিনা নাকে খত দেওয়াবেন এমন শক্তি দিয়ে ঈশ্বর কাউকে এ দুনিয়াতে পাঠান না। আর বৃদ্ধ বয়সের আপা জোরে জয়বাংলা শ্লোগান দিলে হয়ত পরিধানের কাপড় নষ্ট করে ফেলতে পারেন। প্রশ্ন এখানে একটাই, নবনীতা, বন্দনা, পলক আর আনিসদের কেউ কি সেদিন আপার ময়লা কাপড় বদলে দিয়ে এগিয়ে আসবেন?
©