20/06/2026
গ্রামের বাইরে মারা গেলে কিংবা অমাবস্যার দিনে মারা গেলে মারমাদের প্রচলিত রীতি-নীতি: လောကသမ္မုတ္တိ (লকাসমুত্তি) বই কী বলে?...........................
(লেখাটি দীর্ঘ। যাঁরা সত্যিকার অর্থে জানতে চান এ প্রথা, রীতি-নীতি কীভাবে আসল, তাঁরা পড়তে পারেন।)
কোন দিনে/তিথিতে মারা গেলে কিংবা গ্রামের বাইরে মারা গেলে অথবা কীভাবে মারা গেলে মৃত্যু পরবর্তী কোন ধরণের আনুষ্ঠানিক কার্য সম্পন্ন করতে হয়, এটা নিয়ে 'လောကသမ္မုတ္တိ' (লকাসমুত্তি অর্থাৎ লোকসম্মতি) বইয়ে বিস্তারিত বলা আছে। লকা(লগা) মানে হচ্ছে পৃথিবী, এ জগৎ সংসার, ইহলোক। আর সমুত্তি হচ্ছে সম্মতি, সায় ইত্যাদি। অর্থাৎ ইহলোকে সবার সম্মতির ভিত্তিতে এক রাজাকে নির্বাচিত করা হয়েছিল এবং সেই রাজার নির্দেশনা সবাই মেনে চলত। পরবর্তীকালে সেই নির্দেশনা সম্বলিত বইটি 'লকাসমুত্তি' নামে পরিচিতি পায়।
একদম সংক্ষিপ্ত করে বললে এমন, গৌতম বুদ্ধ বোধিসত্ত্ব হিসেবে পারমি পূরণকালে ব্রহ্মরাজ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম মহাসম্মুত্তি ব্রহ্মরাজ। বাংলায় বললে হয়তো 'মহাসম্মতি রাজা' হবে। তিনি তাঁর আরও আটজন সহযোগীকে (ব্রহ্মা) নিয়ে পৃথিবীতে নেমে এসে। পৃথিবীতে এসে থাকতে থাকতে পৃথিবীর রুপ,রস,গন্ধে অভ্যস্ত হয়ে তাদের শরীর ভারী হয়ে যায়, পরবর্তীতে আর ব্রহ্মলোকে ফিরে যেতে পারেননি। পরে পৃথিবীতে বাস করতে করতে তাদের শরীর পৃথিবীর রুপ,রস, গন্ধের স্পর্শে মানুষের শরীরে রুপান্তরিত হয়ে যায়। কেউ নারী, কেউ পুরুষ হয়ে যায়। একসাথে থাকতে থাকতে তারা পরিবার গঠন করে, সন্তান-সন্ততি হতে ও পালন করতে শুরু করে। জনসংখ্যা বাড়তে বাড়তে একসময় দুটি রাজ্যে রুপান্তরিত হয়। এটিকে পৃথিবীর সৃষ্টি ও মানবসৃষ্টিকে নিয়ে বৌদ্ধ অর্থাৎ মারমাদের বিশ্বাসও বলা হয়।
সেই দুটি রাজ্যে মহাসম্মুত্তি রাজা কতগুলো অবশ্যকীয় পালনীয় নীতি-রীতি তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই রাজ্যে ৬ জন ব্যক্তির একসময় মনে হয়েছিল তারা ঠিকমতো মহাসম্মুত্তি রাজার নির্দেশ-উপদেশ মানছিল না। সেইসব রীতি-নীতি, শিক্ষা থেকে তারা বিচ্যুতি হয়েছিল মনে হওয়ায় তারা নিজেদের মৃত্যুর কামনা করেছিলেন। পরে মহাসম্মুত্তি ব্রহ্মরাজার কাছে গিয়ে তাদের মৃত্যুর অভিপ্রায় জানালে ব্রহ্মরাজ জিজ্ঞেস করলেন কে কীভাবে মৃত্যুবরণ করতে চায়! একজন জলে ডুবে মরতে চায়, অন্যজন গাছ থেকে পড়ে মরতে চায়, আরেকজন বাঘের কামড়ে মরতে চায়, পরেরজন বজ্রপাতে মরতে চায়, আবার একজন স্বাভাবিক রোগে মরতে চায়। যে যেভাবে মৃত্যুবরণ করতে চায় এভাবে একে একে নিজেরা বর্ণনা করতে লাগল। তাদের ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুর অনুমোদন দেওয়ার পরে তারা মৃত্যুবরণ করলে মহাসম্মুত্তি রাজা এ ৬ জনের জন্য 'মৃত্যু পরবর্তী ৬ ধরণের আনুষ্ঠানিক কার্য' পালনের জন্য নির্দেশ করেন। অর্থাৎ জলে ভেসে মরলে একরকম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, বজ্রপাতে মরলে আরেক ধরণের। তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও সুন্দর হচ্ছে স্বাভাবিক রোগে মরলে। বাকি ৫ ধরণের মৃত্যুর পরবর্তী অনুষ্ঠানাদি বিচিত্র ও অদ্ভুত রকমের, যেমন জলে ডুবে মরলে পরদিন পর্যন্ত রাখা যাবে না, শোকসভা বা মন্ত্রপাঠ করা যাবে না, বুদ্ধমূর্তির সামনে রাখা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আর বজ্রপাতে মরলে নিয়ম আরেক রকমের।
এটি ছিল মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অন্ত্যোষ্টিক্রোয়া ও আনুষ্ঠানিক কাজের প্রথম বিধিনিষেধ ও রীতি-নীতির তালিকা। এটির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ও মারমাদের পূর্বপুরুষেরা যুগের সাথে মিলিয়ে, নিজেদের পান্ডিত্য কাজে লাগিয়ে, সমাজকে নানান রকম রোগ-শোক ও অশরীরি প্রেত-ভূত থেকে রক্ষা করতে নানান রকম রীতি-নীতি তৈরি করেছিল, যা 'লকাসমুত্তি ক্যাং (বই)' নামে পরিচিতি পায়। এ মহাসম্মুত্তি (মাহা সামাদা) কে পৃথিবীর প্রথম রাজা হিসেবে মারমারা মনে করে, যার আমলে এ পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল। এ ধরণের ক্যাং (বই) এ লেখা আছে, গ্রামের বাইরে মৃত্যুবরণ করলে গ্রামে নেওয়া যাবে না, অমাবস্যার তিথিতে মৃত্যুবরণ করলে পরেরদিন ভোর হওয়ার আগে দাহক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। অথবা একই বাড়িতে দুজন মারা গেলে সেটাকে অশুভ হিসেবে বিবেচনা করা হত। উপরিউক্ত ৬ ধরণের মৃত্যুর মধ্যে ৫ ধরণের মৃত্যুকে যেহেতু অস্বাভাবিক ধরা হয়, সেহেতু নিশ্চয় কোন না কোন অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়, ভবিষ্যতে সমাজ ও জাতির ধ্বংস ও অমঙ্গলের আশঙ্কায় এমন নির্দেশনা, রীতি-নীতি পালনের বাধ্যবাধকতা ছিল। (সেই সময় প্রেত-ভূত, অমঙ্গলের বিশ্বাস প্রচন্ড পরিমাণে বিশ্বাস করত)।
এবার আসি, ধর্মীয় গুরু অর্থাৎ ভান্তেরা এ বিষয়ে জানেন কিনা? অমাবস্যার তিথিতে বা গ্রামের বাইরে কেউ মারা গেলে প্রথমেই ভান্তেদের প্রতি এ প্রশ্নটি করা হয়। সহজ উত্তর হচ্ছে, এটি ভান্তেদের অধ্যয়ন ও চর্চার বিষয় না। মূলত মারমাদের পড়াশোনা, অধ্যয়ন অর্থাৎ জ্ঞান চর্চার দুটি শাখা আছে। একটি হচ্ছে পারলৌকিক যেটাকে বলে 'লগি তারাহ্' (কেউ কেউ লগু তারাহ্ও বলে), অপরটি হচ্ছে লৌকিক, যেটিকে মারমারা বলে 'লগা তারাহ্'। প্রথমটি ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত অর্থাৎ দুঃখ হতে মুক্তি তথা নির্বাণের উদ্দেশ্যে জীবনাচার। পরেরটি এ জগৎ সংসারে সুখ-শান্তির উদ্দেশ্যে। এদিক দিয়ে বললে বর্তমান যুগের যাবতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা পরেরটি অর্থাৎ 'লগা তারাহ্' এর মধ্যে পড়ে। যেহেতু মৃত্যুর পরে গ্রামে আনা না আনা, দাহ নাকি সমাহিতকরণ- বিষয়গুলো লৌকিকতার বিষয়, তাই এ নিয়ে ভান্তেরা নাও জানতে পারেন। কারণ জ্ঞানের এ শাখার বিষয়াদি তাঁদের চর্চিত বিষয় না। তবুুও মারমা বর্ণমালা জানেন, একই স্ক্রিপ্টের লেখা বইপত্র, ফলে কেউ কেউ পড়েও থাকতে পারেন।
তাহলে লৌকিক সম্পর্কিত জ্ঞান চর্চা কারা করে আর কারা বিতরণ করে? মূলত বৈদ্য, মারমা সাহিত্যের বিদ্বান ব্যক্তি, মারমা বর্ণমালার গুরু (শিক্ষক) উনারাই এ জ্ঞানের চর্চা করেন এবং ছড়িয়ে দেন। কারণ এ লৌকিক জ্ঞানই তাদের অধীনস্থ চর্চার বিষয়। এ জ্ঞানের উদ্দেশ্য ইহজগতে সমাজ, জাতি, দেশের সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য কার্যকলাপ। এ দুটি শাখার মধ্যে বর্তমান কালে যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে, কেননা বর্তমানে শ্রামণ ও ভিক্ষুরাও লৌকিকতা জ্ঞান অর্থাৎ রাষ্ট্রের প্রচলিত জ্ঞান চর্চার বিষয়াদি নিয়েও পড়াশোনা করছেন। যদিও মিয়ানমারে পারলৌকিক জ্ঞান অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়াদি অধ্যয়নের আয়োজন আছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আছে।
আমার অভিমত:
মানুষের যেমন বিবর্তন ঘটে, তেমনটি চিন্তা-ভাবনারও বিবর্তন ঘটে। গত শতাব্দীতে যে বিশ্বাসটি সত্যরুপে গৃহীত ছিল সেটি আজ জাস্ট বিশ্বাস। তবুও এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য আছে। মানুষের চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাস জানা যায়। মারমা জাতিও এর ব্যতিক্রম নয়। মারমা জাতি ইতিহাসের বাঁকে কতগুলো বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে এগিয়েছে, কষ্টিপাথরে কতগুলো বিশ্বাস উত্তীর্ণ হয়েছে; ফলে এখনও বর্তমান আর কতগুলো পড়ে রইল ইতিহাসের পথে; ভবিষ্যতের পানে চেয়ে।
যে বিশ্বাসগুলো হারিয়ে গেছে, তার মধ্যে একটি হল বলি প্রথা। নিজের বা কাছের কারো মঙ্গলের জন্য দেবতার সন্তুষ্টির জন্য কোন পশু-প্রাণীর বলিপ্রথা এখন নাই বললেও চলে। এটি মানবিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারে নাই বলে প্রচলন কমে গেছে, কারণ এটি পাশবিক ও বেদনাদায়ক কাজ। এককালে প্রচলিত হত ঠিকই, কিন্তু এখন আর তেমন কেউ এ বলি প্রথা পালন করে না। আর বর্তমানে প্রচলিত যে প্রথা-বিশ্বাস যে, কেউ গ্রামের বাইরে মারা গেলে তাকে গ্রামে নিয়ে আসা হয় কি হয় না, এ বিশ্বাসটি এখনও যাচাইয়ের মাঝপথে আছে, কোন কোন গ্রাম অর্থাৎ গুগড়া, বিস্রিসহ খাগড়াছড়ির চেঙ্গী বেলীর দিকে প্রায় এ রীতি এখন আর মানা হয় না, অন্যদিকে রংখ্রে ডং (আলোটিলা) এর এ পাশে প্রাংনার আশে-পাশে গ্রামগুলোতে এখনও মানা হয়। আর কোন অমাবস্যার তিথিতে কেউ মারা গেলে পরেরদিন ভোর হবার আগে দাহক্রিয়া সম্পন্ন করার রীতি প্রায় সব গ্রামেই মানা হয়।
আমি সোজা কথায় বলব, এ রীতি অমানবিক এবং অতি সত্বর এ রীতি বাতিল হওয়া দরকার। আগে মানা হত, সেটার একটা ঐতিহাসিক ছিল। যেমন এ দিনে মারা গেলে অস্বাভাবিক ধরা হত, ভূত-প্রেত অর্থাৎ অশরীরী ভর করেছে মনে করা হয় আর অমঙ্গলের বার্তা হিসেবে ভাবা হয় যা কিছু নির্দেশিত রীতি-নীতি না মানলে গ্রামের আরও অনেকেরই মৃত্যুর শঙ্কা থাকত। আর পানিবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগগুলো সেসময়ে বেশি ছিল।
অস্বাভাবিকভাবে মৃত ব্যক্তির স্পর্শ করাটাই ছিল ঐ সময়ে আতঙ্কের বিষয়। প্লেগ, কলেরা ছিল সেসময়কার নিত্যসঙ্গী। মৃত ব্যক্তির থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার ভয় ছিল সবসময়। সেজন্য এ রীতিগুলো ওই সময়ে প্রচলিত। কিন্তু এ ২০২৬ সালে সেই ধারণা এখন চলনসই নয়। কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব আবিস্কার ও পথচলায় মৃত্যু কেন হয়, এটা সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর চিকিৎসা বিজ্ঞান দিতে পারে এবং এমনকি কীভাবে মৃত্যু হতে পারে সেটারও উত্তর দিতে পারে, ক্ষেত্র বিশেষে ভবিষ্যদ্বানীও করতে পারে। তাই সমাজে, গ্রামে কারোর ক্ষতির হবার সম্ভাবনাকেও চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্বারা প্রতিরোধ করা যায়।
যদি কেউ পালন করতে চায়, মৃত ব্যক্তি পরিবারের কোন আপত্তি না থাকে, তাহলে সেভাবেই অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া হতে দেওয়া দরকার। যদি তারা সেই রীতি মানতে চায় যে, অমাবস্যার দিনেও রাখা দরকার আত্মীয় স্বজনরা শেষ দেখা করতে পারে, তাহলে সেটাও করতে দেওয়া উচিত। মৃত ব্যক্তির পরিবার এমনিতে শোকে আচ্ছন্ন, সেই জায়গায় প্রথা-রীতির নামে অমানবিক এ ভার যোগ হলে অবর্ণনীয় দুঃখ নেমে আসে। প্রথা, রীতি-নীতি সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা, সুখ-শান্তির জন্য, কোন কাটা হয়ে গলায় আটকে পড়ার জন্য নয়, ভার হয়ে কোন শরীরকে ন্যুজ্ব করার জন্য নয়।
লেখা : মংসাই মারমা✍