04/05/2026
আজ ২৯ এপ্রিল; পানছড়ি বাঙালি গণহ*ত্যা দিবস। যা মায়ানমারের মুসলিম নিধনের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়।
Tanvir Emon
১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল দিবাগত রাত আনুমানিক ৯ ঘটিকার সময় পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলায় বাঙালি জনগোষ্ঠীদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিসিজেএসএস। বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে, দাঁ দিয়ে কুপিয়ে এবং গুলি করে ৮৫৩ জন এর অধিক বাঙালিকে হত্যা করে পাহাড়ি এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তাদের হাত থেকে বাদ যায়নি নারী,শিশু,বৃদ্ধ কেউ।
মূলত পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী, লোগাং, লতিবান, উল্টাছড়ি, তবলছড়ি, আসালং, শনটিলা, ফাতেমা নগর, এবং পানছড়ি সদর উপজেলা সহ আরো ৫ টি গ্রামে গণহত্যা চালায় উপজাতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএসএস। এই বাঙালি গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস'র কেন্দ্রীয় সভাপতি সন্ত লারমা। পানছড়ির লতিবান, কুড়াদিয়াছড়া, শান্তিপুর ও লুগাং এলাকায় একযোগে এই হামলা চালানো হয়। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল চেঙ্গী নদীর জল।
সেই হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে ফিরে আসা বাঙালি ব্যবসায়ি মো: আজমত উদ্দিন জানান, "সেদিন আমি এশারের নামায পড়ে এসে, পরিবারের সবার সাথে ভাত খাচ্ছিলাম, এমন সময় শুনতে পাই মানুষের চিৎকার। বের হয়ে দেখলাম আমার বাঙালিদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বলছে। সবাই বলাবলি করছে শান্তিবাহিনী(জেএসএস) আক্রমণ করছে, পালাও পালাও। সেদিন আমার ছোট ছেলে আরাফাত(২২) নিখোঁজ হয়। পর্যন্ত তার লাশটিও খুঁজে পাইনি"। তিনি আরো বলেন, রাতের আঁধারে বাঙালিদের ঘরবাড়ীতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ঘুমন্ত মানুষকে পুরিয়ে মারা, ঘরের গরু ছাগল হাস মুরগী ইত্যাদি সম্পদ সহ কোটি টাকার মালামাল ধ্বংস করেই ক্ষান্ত হয়নি, বাবা মার সামনেই অবুঝ শিশুদের কে ধরে নিয়ে পাথরে আঘাত করে আবার উপর দিকে নিক্ষেপ করে নিচে ধাড়াঁলো চাকুতে ঠেঁকায়, যা সাপ্রতিক মায়ানমারের বৌদ্ধাদের মুসলমান রোহিঙ্গা নিধন এর কথা স্বরণ করিয়ে দেয়। সে দিন সন্ত লারমার নের্তৃত্বে জেএসএস (শান্তিবাহিনী) এরূপ অনেক লোমহর্ষক ঘটনা ঘটিয়ে রাতেই উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের জোর পূর্বক ভারতে নিয়ে যায়।
ঐ রাতে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার শুধু তানৈক্য পাড়া, আসালং এবং তাইন্দং বাজার সহ মোট ৪৯ জনের লাশ পাওয়া যায়। শতাধিক আহত হয়েছিল যাদের মধ্যে অনেকেই আজ পঙ্গু হয়ে দূর্বিসহ জীবন-যাপন করছে। সেদিন এই হত্যাকান্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালিদের টার্গেট করেই করা হয়েছিল। রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত একজন অপরাধীকেও আইনের আওতায় আনতে পরেনি। এখনো অনেক মানুষ পঙ্গু হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এ আক্রমণ ছিলো হঠাৎ এবং খুবই পরিকল্পিত। পরদিন (৩০ এপ্রিল ১৯৮৬) সারাদিন সীমান্তবর্তী বাঙালি গ্রামগুলো থেকে চাঁদের গাড়ি ভরে ভরে পোড়া-অর্ধপোড়া লাশ জমা হতে থাকে পানছড়ি সদর স্কুল প্রাঙ্গনে। সদর সংলগ্ন মাঠে তাদের সমাহিত করা হয়।
১৯৮৩ সালে শান্তিবাহিনীর নিজেদের আন্তঃকোন্দলের শিকার হয়ে তাদের নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নিহত হলে তাদের দলে তীব্র ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ শুরু হয়। সাধারণ পাহাড়িরা এই বিরোধের মধ্যে পড়ে অসহায়বোধ করতে থাকে। পার্টির প্রতি জনসমর্থন ধরে রাখতে এবং নিজেদের প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে তারা ভিন্ন কৌশল বেছে নেয়। ২৯ এপ্রিল হত্যাযজ্ঞ হয়, তবে ৩০ এপ্রিল পানছড়ি ও আশেপাশের এলাকা গুলোতে হটাৎ করেই কোনো উপজাতির উপস্থিতি পাওয়া গেলো না। তারা ভেবেছিল তাদের
এছাড়াও বাঙালি পূণর্বাসন ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা চেয়েছিল বাঙালিরা যেনো পালটা আক্রমণ করে। এর মাধ্যমে তারা জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা গুলোকে দেখাতে পারবে বাঙালিরাই তাদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে। পরবর্তীতে সায়ত্তশাষণের জন্য তারা বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করবে। তবে সেদিন উপজাতিয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বিপরীতে নিরীহ বাঙালিরা কোনো প্রকার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি৷ তারা শুধুমাত্র বিচার চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল সরকার এই মাস্টারমাইন্ড খুনি সন্ত লারমা সহ অন্যান্য সন্ত্রাসীদের বিচার করবে। কিন্ত আজ পর্যন্ত কারো বিচার হয়নি। বরং গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড সন্ত লারমা প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন।
হত্যাযজ্ঞের পরেও প্রিয়জনদের স্মৃতি জড়িত এই উপজেলা ছেড়ে যেতে চাইনি অনেক বাঙালি। তাদের'ই একজন তবলছড়ি ইউনিয়নের ইয়াছিন আরাফাত। তিনি বলেন, "আমরা পাহাড়ে এসেছি শান্তির খোঁজে। এটা যেমন পাহাড়িদের দেশ, তেমন আমাদেরও দেশ। এই দেশে সকল সম্প্রদায় মিলেমিশে বসবাস করবে। তবে এখানে এসে দেখলাম উল্টো চিত্র। পাহাড়িরা বাঙালিদের বিতাড়িত করতে চায় এখান থেকে। বেশ কয়েকবার সরকারের কাছে সায়ত্তশাসনের দাবিও জানিয়েছে তারা। তারা নাকি ৩ পার্বত্য জেলাকে নিয়ে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড নামক রাষ্ট্র করতে চায়। এটা নাকি তাদের দেশ। ২৯ এপ্রিল গণহত্যায় আমার পরিবারের ৪ জন সদস্য নিহত হয়েছে। আজও গুম, অপহরণ, চাঁদাবাজির স্বীকার হচ্ছি আমরা। আমরা আজও বুক ভরা আশা নিয়ে থাকি, কবে এই সন্ত লারমা সহ পাহাড়ের সকল সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিচার হবে। কবে বন্ধ হবে পাহাড়ের এই অস্থিরতা।
১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল সংগঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম গণহত্যার বর্বরতা কোন অংশে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে কম নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠন 'শান্তিবাহিনী' কর্তৃক অসংখ্য বর্বরচিত, নারকীয় ও পৈশাচিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালিরা। কিন্তু কোন এক অলৌকিক কারণে বাঙালিদের উপর সন্ত্রাসীদের চালানো এসব নির্যাতনের চিত্র প্রচার মাধ্যমে তেমন মান পায়নি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্যাতনকারী উপজাতিরা নিজেদের নৃশংসতার স্বরূপকে ঢেকে তিলকে তাল বানিয়ে দেশে-বিদেশে নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাছে পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা অত্যাচারিত। কাগজে-কলমে শান্তিবাহিনী না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্ য কমেনি, বরং তাদের হাতে বাঙালিরা যেমন হত্যার শিকার হচ্ছে, তেমনি নিহত হচ্ছে উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোর মানুষজনও।
১৯৮৬ সালের এই সময়টাতে The New York Times-সহ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। তারা একটি বড় নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ২,০০০ থেকে ৩,০০০ মানুষ গত ১০ বছরে জাতিগত সহিংসতায় মারা গেছে। তবে তাদের রিপোর্টে অনেক সময় বাঙালিদের ওপর হওয়া আক্রমণকে 'উপজাতিদের ওপর সেটেলারদের পাল্টা আক্রমণ' হিসেবে দেখানোর প্রবণতা ছিল, যা প্রকৃত সত্যকে আড়াল করত।
সেই সময় পানছড়ি গণহত্যার ঘটনা বিদেশী কিছু পত্রিকায় উঠে এসেছিল। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতার তুলনায় তা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। অনেক বড় বড় পত্রিকা সেই সময় এই গণহত্যাকে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' হিসেবে প্রচার করেছিল, যা আজ বিচারহীনতার অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গণহত্যাগুলোর অধিকাংশেরই বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
#পিসিজেএসএস
#পানছড়ি