03/06/2026
#খন্ড_ইতিহাস
২ জুন। আজকের মতোই সেদিন একই তারিখ ৭১৪ খ্রিস্টাব্দের। ইরাকের ওয়াসিত শহরের এক অন্ধকার রাজকীয় কক্ষে শুয়ে ছটফট করছেন এক ব্যক্তি। প্রচণ্ড পেট ব্যথায় তার শরীর দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। শরীরের ভেতর তীব্র শীত অনুভবের কারণে চারপাশ বড় বড় উনুনে আগুন জ্বালিয়েও তার কাঁপুনি থামানো যাচ্ছে না। এই ব্যক্তিটি আর কেউ নন, উমাইয়া খিলাফতের সবচেয়ে প্রতাপশালী, বাগ্মী এবং একই সাথে চরম নির্মম ইরাকি গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম শুনলে তৎকালীন মক্কা, মদিনা আর ইরাকের মানুষের বুক কেঁপে উঠত। উমাইয়া খিলাফতের ভিত শক্ত করতে তিনি যে পরিমাণ রক্তপাত ঘটিয়েছেন, ইতিহাসে তার জুড়ি মেলা ভার। কাবা প্রাঙ্গণে পাথর নিক্ষেপ করা থেকে শুরু করে প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-র শাহাদাত ও তার মৃতদেহকে শূলে চড়ানো, সবকিছুর পেছনেই জড়িয়ে ছিল তার নাম।
কিন্তু মৃত্যুর ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে তার জীবনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। তৎকালীন বিখ্যাত ও প্রবীণ তাবেঈ সাঈদ বিন জুবায়েরকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার নির্দেশ দেন, তখন সাঈদ জল্লাদের তলোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় আল্লাহর কাছে একটি দোয়া করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আল্লাহ! আমার পর এই জালিম যেন আর কোনো মানুষকে হত্যা করার সুযোগ না পায়।"
সাঈদ বিন জুবায়েরের শাহাদাতের পর থেকেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করে। প্রতি রাতে ঘুমোতে গেলেই তিনি দেখতেন সাঈদ বিন জুবায়ের তার রক্তের ছোপ ছোপ দাগ নিয়ে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, "হাজ্জাজ, কোন অপরাধে তুমি আমাকে হত্যা করলে?"
তীব্র মানসিক যন্ত্রণা আর পেটের মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অবশেষে সম্ভাব্য ২ জুন তারিখে মাত্র ৫৩ কি ৫৪ বছর বয়সে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের অত্যাচারী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যুর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে, রাজকীয় চিকিৎসকেরা যখন তার বাঁচার আশা ছেড়ে দেন, তখন এই দাপুটে শাসক শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "হে আল্লাহ, মানুষ তো বলে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন না। কিন্তু আমি জানি, আপনার ক্ষমা আমার পাপের চেয়েও বড়। আপনি অন্তত আমাকে সবার সেই ধারণাটুকু ভুল প্রমাণ করার জন্য হলেও ক্ষমা করে দিন!"
হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যুর খবর যখন বসরার প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বসরীর কাছে পৌঁছাল, তখন তিনি আল্লাহর দরবারে সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। শূন্যে হাত তুলে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, "আল্লাহ! তুমি যেভাবে এই জালিমকে দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছ, একইভাবে তার রেখে যাওয়া নির্মম স্মৃতি ও নীতিগুলোকেও মানুষের মন থেকে মুছে দিও।"
লোকে তাকে জানালো হাজ্জাজ মৃত্যুশয্যায় শেষ কী আকুল আকুতি করেছিলেন। আজীবন হাজ্জাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার থাকা হাসান বসরী এই অনুশোচনার কথা শুনে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হাজ্জাজ কি আসলেই মৃত্যুর আগে এই কথা বলেছে?"
লোকেরা উত্তর দিল, "হ্যাঁ, ঠিক এই কথাটিই উচ্চারণ করেছে।"
তখন হাসান বসরী এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় ডুবে গেলেন। শান্ত গলায় বললেন, "সে যদি আসলেই খাঁটি মনে এই কথা বলে থাকে, তবে অলৌকিক কিছু ঘটা অসম্ভব নয়। হয়তো আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেও করতে পারেন!"
অবাক ব্যাপার, নরপিশাচখ্যাত হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার দরবারের দুজন প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ভাষাবিদ নসর ইবনে আসিম এবং ইয়াহিয়া ইবনে ইয়ামারকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন এমন একটি পদ্ধতি প্রচলনের জন্য, যা দিয়ে সাধারণ অনারবরাও নির্ভুলভাবে কুরআনের আরবি চিনে পড়তে পারেন। তারা দুজন তখন নুক্তা (ডট) ও হরকত (জের-জবর-পেশ) ব্যবস্থার উন্নয়ন করেন। খলিফা হযরত আলী (রা) ও আমিরে মুয়াবিয়া (রা)-র আমলেই অনারবদের মাঝে কুরআন পাঠ করতে সমস্যা হচ্ছিল, কারণ তারা তো আরবদের মতো কেবল অক্ষরের আকার দেখেই উচ্চারণ বলতে পারতো না, তাছাড়া কোথাও কোন স্বরধ্বনি হবে সেটাও বলতে পারতো না। তখন আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালি নামের একজন ভাষাবিদ বিভিন্ন স্বরধ্বনি চেনানোর একটি প্রাথমিক ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছিলেন। তার কজন ছাত্র ও সমসাময়িক পণ্ডিতরাও চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু পরবর্তীতে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই নুক্তা ও হরকতের কাঠামোতে নিয়ে আসা হয়, এবং এর ব্যবহার ফর্মালাইজ ও পপুলারাইজ করা হয়, যার ফলে অনারবদের কুরআন তিলাওয়াত একদম সহজ হয়ে পড়ে। তখন থেকে মোটামুটি ওই পদ্ধতিতেই অনারবরা কুরআন পাঠ করে চলেছে, যা কিনা অত্যাচারী হাজ্জাজ বিন ইউসুফের ভালো দিক হিসেবে তুলে ধরেন ইতিহাসবিদেরা।
হাজ্জাজকে কেমন চোখে দেখেন, পাঠক?
[উৎস- আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, কিতাবুল ফিহরিস্ত, আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন, হিলয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া।]