22/10/2025
* বাংলাদেশের প্রথম গিটার সেনসেশন কে?
* আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি গিটারিস্টের নাম কী?
* আইয়ুব বাচ্চুদের প্রজন্মের অধিকাংশ গিটারিস্টের অনুপ্রেরণা কে ছিলেন?
তিনটি প্রশ্নের উত্তর একটাই। নয়ন হক মুন্সী।
আজ তাঁর মৃত্যুদিন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি দৈহিকভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যান, সেই ১৯৮১ সালে।
তো, নয়ন মুন্সীকে কি আমরা মনে রেখেছি?
তাঁকে স্মরণ করে কয়েকবছর আগে এই দিনে প্রথম আলোয় লিখেছিলাম। সেখান থেকে কিছু টুকরো কথা এখানে দিলাম। পুরো লেখা পড়তে চাইলে গুগলে 'নয়ন মুন্সী' লিখে সার্চ দিলেই প্রথমেই আমার লেখাটি পেয়ে যাবেন।
★
আজম খান বলেছিলেন হয়তো আগামী ২০০ বছরেও বাংলাদেশে এমন গিটারিস্টের জন্ম হবে না। বলার প্রেক্ষাপট ছিল সেই সময়, সেকারণেই বলেছিলেন। সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে স্কুলপড়ুয়া কিশোর নয়ন ছিলেন আজম খানের ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এর কিবোর্ডবিহীন লাইনআপের লিড গিটারিস্ট। আজম খান তখন হোটেল-সিনেমা হলের কনসার্টের পাশাপাশি ঢাকার পাড়া-মহল্লাও মাতাচ্ছেন। তিনি হৃদয় দিয়ে গাইতেন, সেটা গিটারে অনুবাদ করতেন নয়ন মুন্সী। আর আজম খান 'নয়ন সবার নয়ন মণি' গানটা নয়ন মুন্সীকে নিয়েই।
★
মায়েস্ত্রো নয়নকে দেখে তখনকার অনেক তরুণ হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিটার, তাঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে গিটারিস্ট হিসেবে তুমুল খ্যাতি পেয়েছেন। তাঁদেরই একজন প্রয়াত রকলিজেন্ড, আরেক গিটারতারকা আইয়ুব বাচ্চু। বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে আজম খানের সঙ্গে নয়ন মুন্সীর গিটার বাজানো দেখে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, নয়নের মতো গিটারিস্ট হবেন।
★
‘মাইলস’ ব্যান্ডের সদস্য ও বামবা সভাপতি হামিন আহমেদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সেই প্রজন্মের অধিকাংশ গিটারিস্টের অনুপ্রেরণার নাম ছিল নয়ন মুন্সী। শুনেছি, বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারবাদক-শিক্ষক প্রয়াত নিলয় দাশ ছাত্রদেরকে নয়ন মুন্সীর গল্প শোনাতেন।
★
একেবারে নিজের চেষ্টায় শিখেছেন প্রথমে, তখন তো শেখার এত সব মাধ্যম ছিল না। ঘুম থেকে উঠে গিটার, ঘুমাতে যাবার আগেও গিটার। যেখানেই যেতেন সঙ্গে রাখতেন। একটি সাক্ষাৎকারে নয়ন মুন্সীর বন্ধু ‘মাইলস’–এর সাবেক সদস্য, জনপ্রিয় তারকা শাফিন আহমেদ জানিয়েছেন, ঢাকার সায়েন্স ল্যাবে চলতি রিকশায়ও তাঁকে গিটার বাজাতে দেখা যেত হরহামেশাই। আমি তাঁর স্কুলের এক বন্ধুর কাছে শুনেছি, তাঁরা যখন স্কুলে আড্ডা দিতেন, সে সময় দেখা যেত গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে একমনে গিটার বাজাচ্ছেন।
★
ঢাকায় দীপ্তি ছড়িয়ে দারুণ কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে মাত্র ১৮ বছর বয়সে কানাডার এডমন্টনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ‘ফ্ল্যাশ ল্যান্ডিং’ নামে ব্যান্ডও করেছিলেন। শুনেছি, অডিশনের দিয়ে নাকি ব্যান্ডমেম্বার নিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি নয়ন মুন্সী এডমন্টনের একটি ফাইভস্টার হোটেলে নিয়মিত গিটার বাজাতেন, তাঁর দুর্দান্ত গিটার বাজানোতে মুগ্ধ হয়ে হোটেল অথোরিটি শো'য়ের নাম দেয় ‘দ্য নয়ন মুন্সী শো’।
★
শুধু এগুলোই নয়, কানাডাতে বিখ্যাত গিটারিস্ট কার্লোস সান্তানার কনসার্ট–ট্যুর প্রমোশনের জন্য গিটার প্রতিযোগিতা হয়েছিল, কথা ছিল সেখানের বিজয়ী সুযোগ পাবেন সান্তানার সঙ্গে এক মঞ্চে বাজানোর। হ্যাঁ, নয়ন মুন্সী সেখানে বিজয়ী হয়েছিলেন। আবার তখনই আমেরিকান এক রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা চলছিল তাঁর। যদিও এর কোনোটাই হয়নি আর। তার আগেই ঘটেছিল ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা।
ভাবুন!
এতোসব কীর্তি করেছিলেন কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সের মধ্যেই। ভাবা যায়! ১৯৮১ সালে কানাডাতে কার এক্সিডেন্ট। গাড়ি চালাচ্ছিলেন নিজেই। তো ওই দুর্ঘটনায় সব শেষ। নক্ষত্র পতন। সহসা ধূমকেতুর মতো উত্থান এবং প্রস্থান আকস্মিকভাবে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বিদেশি কোনো কনসার্টে তাঁকে দেখতে পেতাম, আর গর্ব করে বলতে পারতাম—
এই তো আমাদের নয়ন মণি নয়ন মুন্সী।