03/06/2026
রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে ছোট্ট একটা প্রতিবেদন।
ভিডিও : Nebadon Roy
(দাপ্তরিক নাম: মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ এবং বহুল আলোচিত একটি মেগা প্রকল্প।
বাগেরহাট জেলার রামপালে অবস্থিত এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে শুরু থেকেই এটি পরিবেশগত বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। নিচে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলো:
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র: একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা
১. পটভূমি ও মালিকানা
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার একটি অন্যতম বড় স্মারক।
উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (NTPC)।
যৌথ কোম্পানি: প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (BIFPCL) গঠিত হয়, যেখানে উভয় দেশের সমান (৫০:৫০) অংশীদারিত্ব রয়েছে।
মূল ঠিকাদার: ভারতের ভারত হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (BHEL)।
২. প্রকল্পের অবস্থান ও ব্যয়
অবস্থান: বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় পশুর নদীর তীরে প্রায় ৯১৫ একর জমির ওপর এই কেন্দ্রটি অবস্থিত। এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান সুন্দরবনের বহিঃসীমানা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে।
মোট ব্যয়: এই প্রকল্প নির্মাণে প্রায় ১৬,০০০ কোটি টাকা (আনুমানিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয় হয়েছে, যার একটি বড় অংশ ভারতীয় এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে।
৩. উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তি
মোট ক্ষমতা: এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট।
ইউনিট: এখানে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট রয়েছে। (প্রথম ইউনিটটি ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি ২০২৩ সালের শেষভাগে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে)।
প্রযুক্তি: পরিবেশ দূষণ কমাতে এই কেন্দ্রে আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল (Ultra-Supercritical) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তিতে কম কয়লা পুড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, ফলে কার্বন ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন তুলনামূলক কম হয়।
৪. অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ: ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সামগ্রিক বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকটাই লাঘব হয়েছে। বিশেষ করে মোংলা বন্দর ও খুলনা অঞ্চলের শিল্পায়নে এটি বড় ভূমিকা রাখছে।
কর্মসংস্থান: প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য স্থানীয় এবং জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন: বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিকে কেন্দ্র করে রামপাল ও আশপাশের এলাকায় রাস্তাঘাট, আবাসন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।
৫. পরিবেশগত বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জ
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি শুরু থেকেই পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। এর মূল কারণগুলো হলো:
সুন্দরবনের ওপর প্রভাব: পরিবেশবাদীদের মতে, সুন্দরবনের এত কাছাকাছি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ফলে বনের ইকোসিস্টেম, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জীবন বিপন্ন হতে পারে।
পশুর নদীর দূষণ: কয়লা পরিবহনের জন্য পশুর নদী ব্যবহার করা হয়। কয়লাবাহী জাহাজ চলাচল, কয়লার গুঁড়ো পানিতে মেশা এবং জাহাজের শব্দ দূষণের ফলে নদীর ডলফিন ও মৎস্য সম্পদ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ফ্লাই অ্যাশ (Fly Ash) এবং বটম অ্যাশ বাতাস ও মাটিকে দূষিত করতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে, যদিও কর্তৃপক্ষ এটি সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহারের দাবি করেছে।
৬. কর্তৃপক্ষের গৃহীত পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ
বিতর্ক ও উদ্বেগ নিরসনে BIFPCL এবং সরকার বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি করেছে:
FGD (Flue-Gas Desulfurization): বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইডের নির্গমন ৯৬% পর্যন্ত রোধ করার জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
উঁচু চিমনি: প্রায় ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনির মাধ্যমে উৎপাদিত গ্যাস অনেক ওপরে ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে লোকালয় বা সুন্দরবনের ওপর সরাসরি প্রভাব না পড়ে।
বদ্ধ কয়লা ইয়ার্ড: কয়লা খোলা আকাশে না রেখে ঢাকা অবস্থায় রাখা হয়, যাতে বাতাসে কয়লার গুঁড়ো না ওড়ে।
উপসংহার
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের জন্য একটি বড় মাইলফলক। তবে এর অর্থনৈতিক সুফলের পাশাপাশি সুন্দরবনের মতো একটি সংবেদনশীল বনের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কঠোর পরিবেশগত নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শতভাগ কার্যকারিতা বজায় রাখাই এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
#রামপালবিদ্যুৎকেন্দ্র #খুলনা #বাগেরহাট #নদী #পাওয়ার #বিদ্যুৎ #বাংলাদেশ