08/06/2026
আমার মেয়ে আমার পাসপোর্ট লুকিয়ে রেখেছিল আর আমার জামাই চিৎকার করে বলছিল, “আপনি এখন যেতে পারবেন না।” কিন্তু ওদের দুজনের কেউই জানত না যে ড্রয়ারে রাখা ওই দলিলটা আমি আগেই দেখে ফেলেছি। আমি কাঁদিনি; ওদের ক্রেডিট কার্ডগুলো ব্লক করলাম, আমার উকিলকে ফোন দিলাম, আর খুলে ফেললাম সেই গোপন ফাইলটা যা ওদের সাজানো সু সাজানো সংসারটাকে এক নিমেষে ছারখার করে দিতে পারে। 🧳
আমি আমার পাসপোর্টটা খুঁজে পেয়েছিলাম আমার নাতিটার খেলনার বাক্সের ভেতর।
প্যাকিং করা অবস্থায় নয়।
ভুল করে সেখানে চলেও যায়নি।
প্লাস্টিকের ডাইনোসর আর ভাঙা রঙের পেন্সিলের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ওটা।
আমার নিজের জন্মদাত্রী মেয়ে আমার হ্যান্ডব্যাগ থেকে ওটা চু"রি করেছিল।
নিউ জার্সির ওই কাঁচের প্রাসাদের মতো বাড়ির গেস্ট রুমে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে যখন পাসপোর্টটা ধরলাম, মনে হলো একটা মরা পাখি ধরে আছি।
নিচতলা থেকে আমার জামাই, রাশেদ, চিৎকার করছিল।
“সে এখন কোনোভাবেই যেতে পারবে না, মারিয়া! আবিরকে কে সামলাবে? রান্না কে করবে? ঘরদোর কে পরিষ্কার করবে? তোমার কোনো ধারণা আছে এখানে একটা আয়া বা কাজের বুয়া রাখতে কত ডলার খরচ হয়?”
আমার মেয়ে ফিসফিস করে বলল, “আস্তে কথা বলো।”
“আমার বয়েই গেছে! তোমার মা এখানে ফ্রিতে খাচ্ছে, ফ্রিতে ঘুমাচ্ছে। অন্তত কিছু তো কাজে আসা উচিত!”
'কাজে আসা'।
এই শব্দটা যতটা বুকে লাগার কথা ছিল, ততটা লাগল না।
কারণ ততক্ষণে ফ্রিজের গায়ে সেঁটে রাখা একটা রুটিন আমি দেখে ফেলেছি।
কাপর কাঁচা।
সকালের নাস্তা বানানো।
আবিরের টিফিন গোছানো।
ওকে স্কুলে দিয়ে আসা।
বাথরুম পরিষ্কার করা।
দুপুরের রান্না।
ড্রাই ক্লিনিং নিয়ে আসা।
বাগানে পানি দেওয়া।
রাত আটটার আগে রাতের খাবার রেডি করা।
কোথাও একটা ‘প্লিজ’ লেখা নেই।
কোথাও ‘আম্মা’ শব্দটা নেই।
কোনো ‘ধন্যবাদ’ নেই।
শুধু দায়িত্ব আর হুকুম।
যেন আমি দেশ-বিদেশ, সাগর পার হয়ে সিলেট থেকে এখানে এসেছি আমার নিজের মেয়ের বাড়িতে একজন বিনা বেতনের চাকরানী হতে!
তিন মাস আগে, মারিয়া আমাকে মাঝরাতে ফোন করে এত জোরে জোরে কাঁদছিল যে আমি ওর কথাই বুঝতে পারছিলাম না।
“আম্মা, আমি আর নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। রাশেদ সারাদিন অফিসে থাকে, আবিরকে একদম সামলানো যায় না, এই ঘরের কাজ আমাকে জ্যান্ত গিলে খাচ্ছে। দোহাই তোমার, তুমি চলে এসো। তোমাকে আমার খুব দরকার।”
আমি কোনো প্রশ্ন করিনি।
সন্তানের বিপদের কথা শুনলে কোনো মা কখনো হিসাব-নিকাশ করতে বসে না।
আমি আমার বুটিক আর কাপড়ের ছোট্ট দোকানটা বন্ধ করলাম।
আমার ঘরের চাবিটা প্রতিবেশী ভাবীর কাছে দিয়ে দিলাম।
ব্যাগে দেশি মশলা, ঘরের তৈরি পিঠা-পুলি, রাশেদের পছন্দের শুঁটকি, আর আবিরের জন্য নিজের হাতে বোনা একটা উলের সোয়েটার আর মারিয়ার ছোটবেলার সেই রুপোর নুপূর জোড়া যত্ন করে প্যাক করলাম।
পুরোটা প্লেনের জার্নিতে আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, “মেয়েটা তোকে এখনো মায়ের মতোই মনে করে, তাই ডেকেছে।”
কিন্তু যখন আমি আমেরিকায় ল্যান্ড করলাম, রাশেদ এয়ারপোর্টে আসেনি।
মারিয়া একা এসেছিল।
ক্লান্ত চোখ, মুখে একটা জড়োসড়ো হাসি। মেকআপ দিয়ে চোখের নিচের কালো দাগগুলো ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা।
“ওর একটা জরুরি মিটিং পড়ে গেছে,” মারিয়া তাড়াহুড়ো করে সাফাই গাইল।
ওদের বাড়িটা ছিল বিশাল।
ধবধবে সাদা রান্নাঘর, দুটো গাড়ি, ফাইভ স্টার হোটেলের মতো সাজানো লন।
সিঁড়িগুলো এত চকচকে ছিল যে নিজের ক্লান্ত মুখটা সেখানে আয়নার মতো দেখা যাচ্ছিল।
অথচ মারিয়া বারবার বলছিল ওরা নাকি এখানে “কোনো রকমে টিকে আছে।”
ছয় বছরের নাতি আবিরের প্রথম জড়িয়ে ধরাটাই ছিল আমার একমাত্র শান্তি।
“নানু!” ও চিৎকার করে আমার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। “তুমি কি সারাজীবন আমাদের সাথে থাকবে?”
আমি তখন হেসেছিলাম।
আমি জানতাম না এটা একটা বাচ্চার অবুঝ প্রশ্ন ছিল না। এটা ছিল ওদের পুরো পরিবারের একটা সুপরিকল্পিত ছক।
শুরুর দিকে আমি খুব আনন্দ নিয়েই সব কাজ করতাম।
মারিয়ার পছন্দের মাছের ঝোল রাঁধতাম।
স্কুলের বিশেষ দিনে আবিরের চুলগুলো সিংহের মতো করে স্টাইল করে দিতাম কারণ ও সিংহ সাজতে চেয়েছিল।
কাপড় ভাঁজ করা, লাঞ্চ বক্স রেডি করা, ঘর গোছানো, রাতে ঘুমানোর সময় ওকে কায়দা-আমপারা আর নবীদের গল্প শোনানো—সবই করতাম।
কিন্তু আস্তে আস্তে সেই সাহায্যটা ওদের কাছে ‘অধিকার’ হয়ে গেল।
অধিকার থেকে ওটা রূপ নিল ‘হুকুমে’।
আমি যদি কখনো এক কাপ চা নিয়ে পাঁচ মিনিট বসতাম, রাশেদ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলত, “ভালোই হলো আপনি এলেন, খালাআম্মা। এই ঘরটার দেখভাল করার জন্য একজন দায়িত্বশীল মানুষের খুব দরকার ছিল।”
'একজন মানুষ'।
মা নয়।
মুরব্বি নয়।
মেহমানও নয়।
কেবল একজন মানুষ।
একদিন রাতে পানি খাওয়ার জন্য নিচে নামছিলাম, তখন ড্রয়িংরুম থেকে ওদের কথা শুনতে পেলাম।
মারিয়া বলছিল, “আম্মা অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়েন।”
রাশেদ উপহাসের সুরে হেসে উঠল।
“ক্লান্ত কিসের? উনি কি এখানে ভাড়া দেন? কোনো বিল দেন? আমাদের অন্ন ধ্বংস করছেন না? একটা আয়া রাখতে গেলে মাসে চার হাজার ডলার লাগত। ঘর মোছার জন্য আরও এক হাজার। তোমার মা আমাদের প্রতি মাসে হাজার হাজার ডলার বাঁচিয়ে দিচ্ছেন।”
সিঁড়ির রেলিংয়ে আমার হাতটা জমে গেল।
মারিয়া মৃদুস্বরে বলল, “এভাবে বলো না।”
“তাহলে তুমি ওনাকে বোঝাও। আজ হোক বা কাল, বাংলাদেশে ওনার যা কিছু আছে—সিলেটের বাড়ি, জমিজমা, ব্যাংকের টাকা—সবই তো তোমার হবে। আমাদের শুধু এখন ওনাকে একটু ‘ম্যানেজ’ করে চলতে হবে।”
'ম্যানেজ করতে হবে'।
যেন আমি কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
কিংবা ঘরের কোনো আসবাবপত্র।
অথবা বুড়ো গাভী, যে মরার আগ পর্যন্ত শুধু দুধ দিয়ে যাবে।
আমি আর নিচে নামিনি।
কোনো চিৎকার-চেঁচামেচিও করিনি।
নিজের ঘরে ফিরে এসে আমার অর্ধেক খোলা সুটকেসের পাশে চুপচাপ বসে রইলাম।
ওই রাতেই আমি আমার হ্যান্ডব্যাগ থেকে সব জরুরি কাগজপত্র বের করে নিলাম।
পাসপোর্ট, ব্যাংকের কাগজ, দলিলের কপি, আর আমাদের ফ্যামিলি লয়ার অ্যাডভোকেট মোস্তফা সাহেবের দেওয়া একটা সিলগালা করা খাম।
তারপর সেই খামটা সুটকেসের ভেতরের লাইনিংয়ের চেইনের ভেতর লুকিয়ে রাখলাম।
পরদিন সকালে আমি এমনভাবে আলু পরাটা আর ডিম ভাজি বানালাম যেন কিছুই হয়নি।
আবিরকে দেখে হাসলাম।
রাশেদের শার্ট ইস্ত্রি করে গুছিয়ে রাখলাম।
আমার মেয়ে যে আমার দিকে তাকাতে পারছিল না, সেটাও খেয়াল করলাম।
এবং আমি সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কারণ আমাদের বয়সী মায়েদের মানুষ বড্ড নরম আর দুর্বল মনে করে ভুল করে।
ওরা ভুলে যায় যে আমরা সন্তান মানুষ করেছি, স্বামীর মৃত্যুর পর একা সংসার টেনেছি, ব্যাংকের সাথে লড়াই করেছি, তীব্র জ্বর গায়ে দিয়েও সেলাইয়ের কাজ করেছি আর সব অপমান হাসিমুখে হজম করেছি।
নরম কোনো জিনিস এত কিছু সহ্য করে টিকে থাকতে পারে না।
ইস্পাত পারে।
তিন দিন পর, সকালের নাস্তার টেবিলে আমি ওদের জানালাম।
“আমি আগামী শুক্রবার সিলেটের ফ্লাইটে দেশে ফিরে যাচ্ছি।”
মারিয়ার হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।
রাশেদ ফোন থেকে চোখ তুলে তাকাল।
“মানে?”
“আমার টিকিটটা ওপেন করা ছিল। আজকেই ডেট কনফার্ম করে নেব।”
আবিরের মুখটা ছোট হয়ে গেল। “নানু, যেও না।”
আমি ওর চুলে চুমু খেলাম।
“আমি তোমাকে রোজ ফোন করব, বাবা।”
রাশেদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“আপনি এভাবে হুট করে চলে যেতে পারেন না।”
আমি ওর দিকে তাকালাম। “মেয়ে বিপদে পড়েছে বলে এসেছিলাম। আর এখন যাচ্ছি কারণ নিজের আত্মসম্মান বাঁচানো দরকার।”
মারিয়ার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল।
এক সেকেন্ডের জন্য আমি আমার সেই ছোট্ট মেয়েটাকে দেখতে পেলাম।
যে আঙুল চুষে ঘুমাত।
যে স্কুলের প্রথম দিন আমাকে ছাড়া থাকতে না পেরে কেঁদে ভাসিয়েছিল।
কিন্তু ঠিক তখনই টেবিলের নিচ দিয়ে রাশেদ ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
আর মারিয়া চোখ নামিয়ে নিল।
সেদিন বিকেলে আমার হ্যান্ডব্যাগটা কেমন যেন হালকা ঠেকল।
খোলার আগেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম।
পাসপোর্টের পকেটটা খালি।
আমার ভিসার কপি গায়েব।
আমার বাংলাদেশের এনআইডি কার্ডটাও নেই।
এমনকি ব্যাগের চেইনে রাখা কিছু জরুরি ডলারও উধাও।
আমি শান্তভাবে খুঁজলাম।
কোনো আতঙ্কিত মহিলার মতো হন্যে হয়ে নয়।
একজন মা যেভাবে খোঁজে, যখন সে অলরেডি জানে কোন সন্তানটা সাধের ফুলদানিটা ভেঙেছে।
মারিয়ার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার দেখলাম—নেই।
রাশেদের স্টাডি রুম—তালা দেওয়া।
লন্ড্রি রুম—নেই।
তারপর আমি আবিরের খেলার ঘরে গেলাম।
সেখানেই ছিল ওটা।
আমার পাসপোর্ট।
একটা নীল খেলনার বাক্সের ভেতর।
প্লাস্টিকের ডাইনোসরের নিচে।
একটা ভাঙা লাল ক্রায়নের পাশে।
আমি দুহাত দিয়ে ওটা তুলে নিলাম।
আর ঠিক তখনই রাশেদ দরজায় এসে দাঁড়াল।
আমার হাতে পাসপোর্ট দেখে ওর মুখের রঙ বদলে গেল। কোনো লজ্জা নয়, চোখেমুখে ফুটে উঠল চরম ক্ষোভ।
“মারিয়া!” ও চিৎকার দিল। “তোমার মা এটা পেয়ে গেছে।”
মারিয়া দৌড়ে এলো।
ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
“আম্মা, শোনো—”
আমি হাত তুলে ওকে থামালাম।
“না।”
ও চুপ হয়ে গেল।
রাশেদ ঘরের ভেতর পা রাখল।
“আপনি এখন যেতে পারবেন না।”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
ওর হাতে যে ঘড়িটা শোভা পাচ্ছিল, সেটা গত ঈদে আমার টাকায় কেনা।
ও যে বাড়িতে দাঁড়িয়ে অহংকার করছে, সেটার ডাউন পেমেন্টের একটা বড় অংশ আমার অ্যাকাউন্ট থেকে গেছে।
ওরা যে ক্রেডিট কার্ডগুলো ব্যবহার করছে, সেগুলো আমিই ইমার্জেন্সি ব্যাকআপ হিসেবে খুলে দিয়েছিলাম, যখন মারিয়া কেঁদে বলেছিল আমেরিকার ব্যাংকগুলো নাকি নতুন ফ্যামিলিদের সহজে ক্রেডিট দিতে চায় না।
ও আমার দিকে আঙুল তুলল, যেন আমি ওর কোনো কাজের লোক।
“আমাদের একটা শিডিউল আছে। আমাদের বিল দিতে হয়। আবিরের স্কুল আছে। মারিয়ার ইন্টারভিউ আছে। আপনি মনে করেছেন আপনার একটু অহংকারে লাগল আর আপনি ডানা মেলে উড়ে চলে যাবেন?”
আমি হাসলাম।
আমার সেই হাসিটা ওকে রাগের চেয়েও বেশি ভয় পাইয়ে দিল।
“হ্যাঁ, যাব।”
মারিয়া কাঁদতে শুরু করল।
“আম্মা, প্লিজ। আমি এটা তোমাকে ফেরত দিয়ে দিতাম।”
“কবে?”
ওর কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
রাশেদ খেঁকিয়ে উঠল, “ভিকটিম সাজার নাটক বন্ধ করুন। আপনি নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছিলেন।”
“যাবও নিজের ইচ্ছায়।”
“এটা একটা পরিবার!”
“না,” আমি বললাম। “এটা চুরি।”
শব্দটা মারিয়ার গায়ে চাবুকের মতো লাগল।
“আম্মা…”
আমি ওর দিকে ফিরলাম।
“তুই আমাকে বলেছিলি সিলেটে আমার সাজানো জীবনটা ছেড়ে তোকে সাহায্য করতে আসতে, মারিয়া। তুই তো আমাকে বলিসনি যে তোর সংসারে একজন কাজের বুয়ার চেয়েও আমার দাম কম!”
ও নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে ফেলল।
একটা মুহূর্তের জন্য আমার ইচ্ছে করছিল ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিই।
এটাই মাতৃত্বের অভিশাপ।
সন্তান যখন আপনাকে আঘাত করে, তখনও আপনার প্রথম চিন্তা হয়—মেয়ের হাতটা কেটে রক্ত পড়ছে না তো?
তখনই রাশেদ হেসে উঠল।
অত্যন্ত ঠান্ডা আর কুৎসিত একটা হাসি।
“ঠিক আছে, যান! কিন্তু ভাববেন না আমরা আপনার পায়ে ধরব। আর আবিরকেও আপনি কোনোদিন দেখতে পাবেন না, এটা মাথায় রাখবেন।”
মারিয়া ফিসফিস করল, “রাশেদ…”
ও থামল না।
“আপনি ভাবছেন এই বয়সে বাংলাদেশে একা একা টিকে যাবেন? ওই একটা ছোট দোকান নিয়ে? আপনার যা কিছু সম্পত্তি আছে, সব তো শেষ পর্যন্ত আমাদের নামেই আসবে।”
আমি পাসপোর্টটা আমার ব্লাউজের পকেটে রাখলাম।
তারপর আমার ফোনটা বের করলাম।
রাশেদ বাঁকা হেসে বলল, “পুলিশ ডাকবেন? ডাকুন। গিয়ে বলুন আপনার নিজের পরিবার আপনার পাসপোর্ট ‘নিরাপত্তার’ জন্য লুকিয়ে রেখেছে।”
আমি পুলিশে ফোন করিনি।
সবার আগে আমি আমার ব্যাংকিং অ্যাপটা খুললাম।
প্রথম কার্ড—ক্যান্সেলড।
দ্বিতীয় কার্ড—ক্যান্সেলড।
ওদের জয়েন্ট ইমার্জেন্সি ক্রেডিট লাইন—ফ্রিজড।
ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজেকশন অথরাইজেশন—ব্লকড।
রাশেদের ফোনটা কেঁপে উঠল।
আবার ভাইব্রেট হলো।
তারপর পরপর কয়েকবার নোটিফিকেশন এলো।
ওর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
“কী করলেন আপনি?”
আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম।
ও তখন নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।
ওর ঠোঁট কাঁপছিল।
“আম্মা… কার্ডগুলো…”
“হ্যাঁ।”
রাশেদ রাগে আমার দিকে এক পা এগিয়ে এলো।
ঠিক তখনই আবির ওর স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াল। ও ভীষণ বিভ্রান্ত আর ভয় পেয়ে গেছে।
“নানু?”
রাশেদ থেমে গেল।
ভালো।
রাক্ষসরাও অন্তত ছোট বাচ্চাদের সামনে ভদ্র সাজার ভং ধরে।
আমি হাঁটু গেড়ে বসে আবিরকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম।
“আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি, বাবা,” ফিসফিস করে বললাম।
ও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“তুমি কি আম্মুর ওপর রাগ করেছ?”
আমি চোখ বন্ধ করলাম।
“না, দাদুভাই। আমি তোর আম্মুর জন্য খুব কষ্ট পাচ্ছি।”
মারিয়া পেছন থেকে একটা কান্নার গোঙানি চেপে ধরল।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে অ্যাডভোকেট মোস্তফা সাহেবকে ডায়াল করলাম।
দ্বিতীয় রিং হতেই উনি ফোন ধরলেন।
“হ্যালো, মিসেস চৌধুরী?”
আমি ফোনটা স্পিকারে দিলাম।
রাশেদের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
মারিয়া ফিসফিস করে বলল, “আম্মা, দোহাই তোমার, এটা করো না।”
আমি ওর দিকে তাকালাম।
আমার পাসপোর্ট চুরি করা ওই বেইমান মহিলার দিকে নয়।
তাকালাম আমার সেই ছোট্ট মেয়েটার দিকে—সিলেটের সুরমা নদীর বন্যার সময় যাকে আমি নিজের মাথার ওপর তুলে ধরে বুক সমান নোংরা পানি পার হয়েছিলাম, যাতে ওর গায়ে এক ফোঁটা ময়লা পানি না লাগে।
“এই কথাটার কথা তোর তখন ভাবা উচিত ছিল, মারিয়া, যখন তুই আমার পাসপোর্টটা লুকিয়ে আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছিলি।”
মোস্তফা সাহেব ওপাশ থেকে বললেন, “আপা, ওরা কি আপনার কাগজপত্র আটকে রেখেছে?”
“হ্যাঁ।”
“ওরা কি আপনাকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে?”
“হ্যাঁ।”
রাশেদ চিৎকার করে উঠল, “কে এই লোক? কী আজেবাজে কথা হচ্ছে!”
উকিল সাহেব ওকে পাত্তাই দিলেন না।
“তাহলে আপা, আমি আপনার সেই সিলগালা করা বিশেষ নির্দেশনামা বা 'উইল' এর ধারাটা এখনই কার্যকর করছি।”
মারিয়ার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল।
ও টাকা-পয়সার হিসাব জানত।
কার্ডের কথা জানত।
সিলেটের বাড়িটার কথাও জানত।
কিন্তু ও এই গোপন দলিলের কথা জানত না।
কেউ জানত না।
এমনকি রাশেদও না।
আমি আমার সুটকেসের কাছে গেলাম, লাইনিংয়ের চেইনটা খুলে সেই বাদামী খামটা বের করলাম।
আমেরিকায় আসার ঠিক আগের দিন আমি এতে সই করেছিলাম।
আমার মরহুম স্বামী মৃত্যুর আগে আমাকে হাত জোড় করে বলে গিয়েছিলেন এই ব্যবস্থাটা করে রাখতে; যখন ওনার নিজের ভাই ওনার মাকে জমি থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করেছিল, তখন থেকেই তিনি মানুষের লোভ চিনেছিলেন।
রাশেদ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
“কী ওটা?”
আমি খামের ওপরের টেপটা ছিঁড়ে ফেললাম।
ভেতরে এমন একটা আইনি দলিল ছিল যা সবকিছু ওলটপালট করে দেবে।
সিলেটের তিন তলা বাড়ি।
মৌলভীবাজারের পৈতৃক জমি।
আমার সব ফিক্সড ডিপোজিট।
আবিরের নামে করা ট্রাস্ট ফান্ড।
এবং এমন একটা বিশেষ একাদশ ধারা (Clause 11), যার জন্য আমার মেয়ে আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।
অ্যাডভোকেট মোস্তফা সাহেব স্পিকারে বললেন, “মিসেস চৌধুরী, আমি যদি এখন এই ১১ নম্বর ধারাটা আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করি, তবে আপনার মেয়ে এবং জামাতা আপনার একটি কানাকড়ি সম্পত্তির ওপরও কোনো আইনি দাবি করতে পারবে না। যদি না তারা আদালতের কাছে প্রথমে একটি বিষয়ের জবাবদিহি করতে পারে…”
মারিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “আম্মা, দোহাই তোমার, ওর সামনে ওটা পোড়ো না…”
চলবে,,,,,,,
#খাঁচার_ভেতর_ইস্পাত
পর্ব:০১
(এতো কষ্ট করে গল্প লিখি অথচ আপনারা পড়ার পর একবার জানানোরও প্রয়োজন মনে করেন না যে গল্পটা কেমন হচ্ছে।যে কয়েকজন কমেন্ট করেন, তারাও শুধু নেক্সট,নেক্সটই লিখতে জানেন।
আপনারা হয়তো জানেনও না,আপনাদের দুয়েকটা গঠনমূলক কমেন্টই একজন রাইটারকে কতটা উৎসাহ দেয় সামনে আরও ভালো করে লেখার জন্য।)