25/03/2026
ঈদের সকালটা সেদিন যেন একটু অন্যরকম ছিল।
ফজরের আজানের পর থেকেই আকাশ মেঘলা,হালকা ঠান্ডা বাতাসে উৎসবের অনুভূতি।নতুন পাঞ্জাবি পরে সামি বের হতেই টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হলো।কেউ ছাতা খুলল,আবার কেউ হাসতে হাসতে বৃষ্টিতে ভিজেই ঈদগাহের দিকে এগিয়ে গেল।
ঈদগাহের দৃশ্যটা অত্যন্ত চমৎকার।
ঠিক যেন জীবন্ত একটি ছবি একটু পরপরই শিল্পীর একেকটি রঙের আঁচড়ে নিঁখুত হয়ে উঠছে।
বৃষ্টির মাঝেও জীবন থেমে নেই।
এক পাশে ছোট ছোট বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছে-কারও হাতে খেলনা,কারও হাতে বেলুন,কেউ বিক্রি করছে চানাচুর।
তাদের জামা ভিজে গেছে,চুলে পানি জমে আছে,তবুও তারা দাঁড়িয়ে আছে।কারণ হয়তো বাসায় কেউ অপেক্ষা করছে;হয়তো তার অসুস্থ মা শুয়ে আছে খাটে,দরজার দিকে তাকিয়ে,নীরবে ছেলের প্রতিক্ষায়;হয়তো পুরো পরিবার তাকিয়ে আছে এই দিনের আয়টার দিকে।
ঠিক পাশেই অন্য এক দৃশ্য-নতুন,পরিষ্কার পোশাক পরা বাচ্চারা বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে।
"বাবা,দেখো,গাড়িটা কী সুন্দর।কিনে দাও না।"
বাবা হাসিমুখে কিনে দিচ্ছে।
বাচ্চাটা খুশিতে লাফাচ্ছে।
দুইটা পৃথিবী।
একই জায়গায়,একই বৃষ্টির নিচে।
একটা বাচ্চা ভিজে জামা গায়ে খেলনা বিক্রি করছে,আরেকটা বাচ্চা সেই খেলনাই কিনে হাসছে।
নামাজ শেষে সবাই যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে "ঈদ মোবারক" বলছে,তখন সামির চোখে পড়ল এক ছেলেকে-ভিজে জামা পরে,হাতে খেলনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে হালকা হাসি,কিন্তু সেই হাসির ভেতরে ক্লান্তি।
সামি তার কাছ থেকে একটা ছোট খেলনা কিনল।ভিজে হাত দিয়ে ছেলেটা টাকা নিল,তারপর আস্তে করে বলল,"ভাইয়া,আরেকটা নিবেন?" কথাটা খুব সাধারণ ছিল,কিন্তু তার ভেতরে লুকানো ছিল একধরনের নীরব অনুনয়।
সামি একটু থামল,তারপর এক বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে চুপচাপ ঈদগাহ থেকে বাসার দিকে ফিরল।
*
বিকেলের আকাশটা তখনও পুরো পরিষ্কার হয়নি। সকালের বৃষ্টির ভেজাভাব রয়ে গেছে বাতাসে। সামি নতুন নোটগুলো হাতে নিয়ে আবার বের হলো-একটা ছোট ইচ্ছা নিয়ে।
পার্কে ঢুকতেই সকালের সেই দৃশ্যটা আবার বিস্তৃতভাবে চোখে পড়লো সামির।
একদিকে বেঞ্চে কিছু বাচ্চা নতুন সুন্দর জামা পরে বসে আছে,মা-বাবার সাথে গল্প করছে,কেউ আইসক্রিম খাচ্ছে,কেউ হাসতে হাসতে ছবি তুলছে।
তাদের চারপাশে নিশ্চিন্ত সুখ।
আর ঠিক পাশেই ছোট ছোট বাচ্চারা মলিন চেহারায় পুরনো পোশাক পরে ঘুরে ঘুরে খাবার ফুচকা বিক্রি করছে,কারও হাতে হাওয়াই মিঠাই,কারও হাতে ফুল।
"ভাইয়া নিবেন?"
"ভাইয়া একটা নেন না..."
পাশ ফিরে তাকাতেই সামির চোখে পড়ল-সকালের সেই ছেলেটা।
তার হাতে অনেকগুলো রঙিন বেলুন।
সামি একটু এগিয়ে বলল,"তোমার নাম কী?" ছেলেটা বলল,"সামি।"
সামি একটু চমকে উঠল;একই নাম।
অথচ দুজনের মাঝে কী আকাশ পাতাল পার্থক্য।
সে আবার জিজ্ঞেস করল,"এখনো এখানেই?" ছেলেটা প্রশ্নটা ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে সামির দিকে তাকালো,চিনতে পারেনি।সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য,প্রতিদিন হাজারটা মুখ দেখতে হয় তাকে,এতোগুলোর মধ্যে স্পেসিফিকলি কোনো একটাকে মনে রাখা তার পক্ষে সম্ভব না নিশ্চয়ই। ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,"জ্বি।ঈদ তো..আজকে একটু বেশি বিক্রি হয়।"
তার কথাটা শুনে সামির বুকটা কেমন যেন চেপে এলো।
কিছু একটা ভেবে সে পকেট থেকে একটা নতুন নোট বের করে ছেলেটার হাতে দিয়ে উল্টোদিকে হাঁটতে থাকলো।
ছেলেটা কিছু না বুঝে পিছন থেকে অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলো,"ভাইয়া,কিছু নিলেন না?"
সামি হেসে বলল,"না,এটা তোমার জন্য।"
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল,তারপর আস্তে করে হাসল।
সামি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে সেই হাসিটার দিকে নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে থাকলো,ওর কাছে ছোট্ট হাসিটাকেই অনেক বড় কিছু মনে হলো।
সামি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে গেল।
আরও কয়েকজন বাচ্চার থেকে কিছু না কিনেই বাচ্চাগুলোকে একটা করে নতুন নোট দিল। পরিমাণটা হয়তো খুব সামান্য,কিন্তু তারপরও নতুন টাকা পেয়ে ওরা খুশিতে দৌড়ে গেল অন্যদেরকে দেখাতে।
হঠাৎ সামির মনে হলো-সে যাদের দিচ্ছে,তারা হয়তো শুধু নিচ্ছে না,বরং তাকে কিছু শিখিয়ে দিচ্ছে।
পার্কের বেঞ্চে বসা এক বাচ্চা তার বাবার কাঁধে মাথা রেখে হাসছে।আর তার পাশেই আর একটা বাচ্চা ছেলে বাবার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাঁর পুরো পরিবারের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে।
বাড়ি ফেরার পথে আকাশটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠলো।
সামির মনে উঠলো,সেই সাথে তার নিজের ভেতরে জমে থাকা ভারটাও যেন একটু একটু করে হালকা হলো।
সেই মুহূর্তে হঠাৎই সামি বুঝতে পারল,ঈদ শুধু নিজের আনন্দে পূর্ণ হয় না।ঈদ পূর্ণ হয় তখনই,যখন সেই আনন্দের একটু অংশ অন্য কারো জীবনেও পৌঁছে যায়।
ঈদ মানে খুশি।
ঈদ মানে আনন্দ।
কিন্তু সত্যিকারের ঈদ তখনই যখন সেই খুশিটা সবার হয়,অন্তত একটু হলেও!
সেগমেন্টঃ ঈদ অনুভূতি
নামঃ আতকিয়া মায়িশা
কলেজঃ খুলনা মেডিকেল কলেজ,খুলনা
সেশনঃ ২০২৪-২৫